ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাংলাদেশে তিন ধরনের গার্মেন্টস ব্যাবসায়ী আছে।
০১। কন্টাক্ট পার্টি
০২। শুধু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক
০৩। কম্পোজিট ফ্যাক্টরির মালিক

একটু বিস্তারিত বলি-
০১। কন্টাক্ট পার্টিঃ
এদের কোন ফ্যাক্টরী নাই। এধরনের কোন ফ্যাক্টরী স্থাপনের কোন পরিকল্পনা ও এদের নাই। এরা বিভিন্ন বায়িং হাউজের সাথে (বা বায়িং হাউজের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে) বৈধ বা অবৈধ সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে এদের অর্ডার পাওয়াতে খুব একটা সমস্যা হয়না। অর্ডার পাওয়ার পর এরা বিভিন্ন কম্পোজিট ফ্যাক্টরীতে কন্টাক্টে কাজ করায়। এ পর্যন্ত এদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই। অভিযোগটা অন্য জায়গায়।

– যখন অর্ডার রিসিভ করার জন্য এরা বায়ারের সাথে নিগোশিয়েট করে তখন প্রতিযোগী আসল কম্পোজিট এর মালিক বা গার্মেন্টস মালিক এর চাইতে কম প্রাইসে কাজ ধরে নেয়। ফলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই ডাম্পিং এর শুরু হয়।
– এদের যেহেতু কোন ফ্যাক্টরী নাই, অতএব শ্রমিক দায়বদ্ধতা ও এদের নাই। তাই এরা যত কম প্রাইসে চলতে পারে অন্যরা তত কম প্রাইসে চলতে পারেনা।
– এদের ডাম্পিং এর কারনে বায়াররা কম্পোজিট ফ্যাক্টরীতে ও কম প্রাইস অফার করে। এতে আমাদের দেশের রিয়েল ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা নষ্ট হয়।
– অর্থনৈতিক মন্দার কারনে কম প্রাইসে কাজ নিতে আমরা যতটুকু বাধ্য হয়েছি তার চাইতে বেশী বাধ্য হয়েছি এদের ডাম্পিং এর কারনে।
– এদের যেহেতু এই সেক্টরে কোন স্থায়ী বিনিয়োগ নাই তাই এরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত বেপরোয়া।

০২। শুধু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মালিকঃ
এদের কোন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ নাই। এরা যখন অর্ডার রিসিভ করে তখন স্পিনিং, উইভিং বা নিটিং, ডায়িং এবং ফিনিশিং কোন কম্পোজিট ফ্যাক্টরিতে কন্টাক্টে করায়। শেষে নিজের গার্মেন্টস এ এসে জামা বানায়। এ পর্যন্ত আমার আপত্তি নাই। আপত্তিটা অন্য জায়গায় –

– যেহেতু এদের স্থায়ী বিনিয়োগ কম তাই এদের ব্যবসায়ীক মনোভাব ও যথেষ্ট কম। এদের মধ্যে বেশির ভাগই তাদের স্থায়ী বিনিয়োগ তুলে নিয়ে এখন শুধু লাভ গুনছে।
– এদের সামর্থ্য থাকলেও এরা কম্পোজিট ফ্যাক্টরী করে না। বিদ্যুৎ আর গ্যাসের অভাবের দোহাই দেখায়।
– এদের অনেকেই যতদিন লাভের অংক যথেষ্ট বেশী ততদিন ব্যবসা করার মনোভাব নিয়ে চলে আর পুঁজি অন্য সেক্টরে (যেমন ঔষধ কোম্পানী) ট্রান্সফার করে।
– এরা কন্টাক্ট পার্টির মতো বাজার ডাম্পিং করে। শ্রমিকের বেতন বাড়ানোর মতো সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে এরা চলে না বা সক্ষমতা থাকলে ও বেতন বাড়ায় না যেহেতু যা ব্যবসা করার তা তারা ইতিমধ্যেই করে নিয়েছে।

– এদের কেউ কেউ আর কন্টাক্ট পার্টি মিলে সবচেয়ে ভয়ংকর যে কাজটি করে তা হলো শ্রমিক আন্দোলন উস্কে দেয়া (শ্রমিকের ন্যায্য দাবী তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করে)। এতে এদের লাভ হলো সরকারকে বুঝাবে লাভ কম তাই বেতন বাড়ানো যাচ্ছেনা। সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সীমান্ত ওপেন করে দিন। আমরা কম দামে সুতা কাপড় আনি আর একটু বেশী লাভ করি, শ্রমিকের বেতন বাড়াই। মুলত এরা যা করে (বা করতে চায়) তা হলো লক্ষ কোটি টাকার আমাদের বিনিয়োগ তথা কম্পোজিট ফ্যাক্টরী গুলো অচল করে দেয়ার বুদ্ধি করে, অন্য দেশকে ডাম্পিং এর সুযোগ করে দেয়।

০৩। কম্পোজিট ফ্যাক্টরির মালিকঃ
গার্মেন্টস হলো একটা প্রডাক্ট এর টোটাল প্রসেসিং এর মাত্র ৫%। কম্পোজিট ফ্যাক্টরির মালিকদের টোটাল প্রসেসিং লাইন (আংশিক ও থাকতে পারে) থাকে। তাই একজন শুধু গার্মেন্টস মালিক যেখানে ৫% প্রসেসিং (শুধু দর্জিগিরি) এর উপর লাভ করে সেখানে কম্পোজিট মালিকরা ১০০% প্রসেসিং এর উপর লাভ করে। তাই এদের আর্থিক সক্ষমতা বেশী। এরা ইচ্ছা করলে শ্রমিকের বেতন বাড়াতে পারে (তবে দ্রব্য মূল্যের সাথে সমন্বয় রক্ষার্থে প্রতি মাসে মাসে নয়)। কিন্তু –

– সারাদেশে যতগুলো গার্মেন্টস আছে তার তুলনায় এদের সংখ্যা অনেক কম।
– এরা এদের ফ্যাক্টরিতে বেতন বাড়ালে পাশের শুধু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী যদি তাদের বেতন সমহারে না বাড়ায় তখন পাশের গার্মেন্টস এ আগুন জ্বলে। ফলে এদের এ মুহুর্তে বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা থাকলেও এরা বাড়াতে পারছেনা। (টিভিতে নিশ্চয় আপনারা দেখেছেন, একজন শ্রমিক বলছিল কিছু কিছু মালিক বেতন বাড়াতে রাজী ছিলো, আর হঠাৎ সব ফ্যাক্টরী বন্ধ)

শ্রমিকরা কেন মারমূখী হয়ে উঠে?
বর্তমান বাজারে আমরা অনেকেই কাজকে ভালোবাসতে পারিনা হতাশার কারনে (যেহেতু শুধু খেয়ে পরে বাঁচতেই বেতন শেষ, ভবিষ্যত কোথায়)। শ্রেণীভেদ হিসেবে স্বপ্নের একটা সীমা থাকা উচিত – একথা হয়তো অনেকেই বলবেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে স্বপ্নের সীমা তো থাকে না।
এখন একজন গার্মেন্টস শ্রমিক হয়তো তিন বেলা ঠিকমত খেতে পাচ্ছে না, স্বপ্ন তো দুরে থাক। সে কি করে তার কাজকে ভালোবাসবে। কাজ করতে হয় তাই করে। জীবনটা তো টেনে নিতে হবে।

তাই রুটি রুজির কথা বলে এদেরকে সহজেই সংগঠিত করা যায়। যে মেশিনটা তাকে দুবেলা খাবার যোগাচ্ছে, আমার মনে হয় মুলত হতাশার কারনেই উত্তেজনার মুহুর্তে তারা তা ভুলে যায়। মালিক পক্ষ তো কখনো এদেরকে কাছে নিয়ে ডেকে কথা বলে না। কোন কাজে সহানুভুতি দেখায় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী-
সস্তা শ্রম আমাদের এ শিল্পের মেরুদণ্ড। এ কথার আড়ালে অতি মুনাফাভোগীরা শ্রমিক শোষনটাকে আপনাদের চোখের আড়ালে রাখছে। ভেতরে যা চলছে তা অত্যন্ত নির্মম। অতি মুনাফালোভীদের কারনে কম্পোজিট মালিকরা সক্ষমতা থাকলেও বেতন বাড়াচ্ছে না।
এদের সাথে যোগ হয়েছে স্থানীয় বাড়ীর মালিকরা। কথায় কথায় বাড়ী ভাড়া বাড়ায়। এর সবাই নির্মম কষাই।

এই শিল্প রক্ষার্থে দীর্ঘ মেয়াদী কর্মপরিকল্পনার বিকল্প নাই। আপনারা দয়া করে কোন বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে স্টাডি করুন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী- আমি ক্ষুদ্র মানুষ। দুটি কথা বলি-
০১। প্রাইভেট ভার্সিটির জন্য যেমন স্থায়ী ক্যাম্পাস বাধ্যতামূলক করেছেন, তেমনি শুধু গার্মেন্টস মালিকদেরকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে দিন যাতে তারা কম্পোজিট ফ্যাক্টরী করতে বাধ্য হয়। যাতে শর্ট টার্ম লাভের চিন্তা এরা না করতে পারে।
০২। মার্কেট থেকে কন্টাক্ট পার্টি উচ্ছেদ করুন। এরা ডাম্পিং করে।
০৩। শিল্প এলাকার বাড়ীর মালিকদেরকে বাড়ী ভাড়া বাবদ সরকারকে যে ট্যাক্স দেয় সে অনুযায়ী ভাড়া নির্দিষ্ট রাখতে বাধ্য করুন।
০৪। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য যানবাহনে হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করা যায় কিনা চিন্তা করুন। বাস মালিকরা প্রতি স্টপেজে লোক উঠায়, অথচ ভাড়া নেয় যেখানে নামব তার চাইতে দূরের স্টপেজের।
০৫। টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির মালিকদের জন্য লাভের একটা নির্দিষ্ট সীমা ঠিক করে দিন। এর অতিরিক্ত লাভের অংশ শ্রমিকরা ও পাবে। এতে কোম্পানীর লাভ লসের সাথে শ্রমিকরা ও একাত্ম হবে। বাইরে থেকে কেউ উস্কানী দিয়ে এদেরকে সংগঠিত করতে পারবে না।

আমার জানামাত দুটো ফ্যাক্টরির কথা পরবর্তী পোস্টে লিখব আশা করি।

***
ধন্যবাদ জানাচ্ছি জিনিয়াকে। আপনি শেষ পর্যন্ত আমাকে নিবন্ধন করিয়ই ছাড়লেন। – অনিকেত