ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

১৯৯৯ সালে বিষাক্ত মদ খেয়ে এলাকার ৮ জন মারা গেলো। ধীরে ধীরে বাড়ী গেলাম। কয়েকজনকে নিয়ে বাজারে গিয়ে সেই মদ বিক্রেতাকে খুঁজলাম। এলাকায় নেই।

প্রায় ছয় সাত মাস পরে খবর পেলাম সেই মদ বিক্রেতা আবার এলাকায় এসেছে। থানায় গেলাম। পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে গিয়ে বললাম যাকে খুঁজছেন তিনি বাড়ীতেই আছেন।

কর্মকর্তা বেশ ত্বরিৎকর্মা হয়ে উঠলেন। এক্ষুনি তিনি ফোর্স পাঠাচ্ছেন। অতএব আমি নিশ্চিন্তমনে ঘরে ফিরলাম। দুপুর গেল। বিকাল গেলো। পরদিন বিকাল হলো। পুলিশ আর আসলোনা। বুঝলাম আর আসবেনা। রাতে ডেকে আনালাম সেই মদ বিক্রেতাকে। বলে দিলাম এলাকায় থাকতে চাইলে মদ বিক্রি চলবেনা। মেনে নিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর এ কাজ করেনি।

চারদলীয়জোটের শেষের দিকে এসে আবার শুরু হলো মদ বিক্রি। তবে এবার বিক্রেতা একজন নয়। বাজারের তিন দিকে তিন জন। আর এদের মধ্যে একজন আমাদের বাড়ীর। (আমাদের বাড়ীটা প্রায় ২০০ পরিবারের একটা গুচ্ছগ্রাম বলতে পারেন)।

বাড়ীতে গেলাম। সমমনা সবাই বসে বাড়ীর মদ বিক্রেতাকে ডাকলাম। এলাকায় কাজের অভাব এবং দারিদ্রের কারনে এই পেশায় জড়িত এরকম ব্যখ্যা সে দিল। এই কাজ ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। বিদেশ যাওয়ার খরচের একটা অংশ আমরা কয়েকজন মিলে জোগাড় করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ও দিলাম। সময় নিল কিছুদিন। কিন্তু বিদেশের ব্যপারে আগ্রহ দেখলামনা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এসে গা ঢাকা দিল। তারপর আবার স্বরুপে প্রত্যাবর্তণ।

বাড়ীতে গেলাম। শুনলাম ভয়াবহ কথা। বাজারে মদ রাখেনা। মদ রাখে বাড়ীতে। সন্ধ্যার পর প্রয়োজনীয় পরিমান নিয়ে বাজারের বাইরে রাস্তার পাশে একটা আস্তানায় বসে।

বাড়ীর পাশের পরিত্যক্ত পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) এলাকা। সেখানে শুরু হয়েছে আরও ভয়ংকর কাজ। জেলা শহর থেকে মেয়ে নিয়ে আসা হয়। রাতে পরিত্যক্ত পাউবো অফিসে চলে আদিম ব্যবসা। গভীর রাতে মদসেবীরা অনেক সময় বাড়ীতে ঢুকে মদের জন্য। বাড়ীর সবার তো আর বিল্ডিং নেই, এটাচড বাথরুম ও নেই। প্রকৃতির ডাকে অনেক মেয়েকেই ‍মুল ঘরের বাইরে যেতে হয়।

এর মধ্যে এই মদ বিক্রেতার ভাতিজা (নয়ন ) টঙ্গির আরো কয়েকজন মিলে ঢাকা থেকে একটা মাইক্রো ভাড়া করে নিয়ে রাতের বেলা পাউবো এলাকার ভেতরে মাইক্রো ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ড্রাইভারকে জবাই করা কালে এলাকার নাছিরভাই (বাজারে দোকান আছে। দোকান বন্ধ করে বাড়ী আসছিলেন। পাউবো অফিসটা আমাদের বাড়ীর পাশেই) এর নজরে আসে। ড্রাইভার বেঁচে যায়। আর কিলাররা ততক্ষনে কেটে পড়ে।

নয়নের খবর নিলাম। বাড়ীতে সে বিয়ে করেছে আগেই। ইতিমধ্যে ঢাকায় কোন এক মাদক ব্যবসায়ীর মেয়েকেও বিয়ে করেছে। এলাকায় দৌড়ানি খেলে ঢাকায় আসে । ঢাকায় দৌড়ানি খেলে এলাকায় যায়। তার কিছুদিন আগে এক সাংবাদিকের মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিল। কীভাবে জানি এলাকার থানা পুলিশ টের পেয়ে ধরে নিয়ে যায়। আবার জামিনে ছাড়া পায়।

তো কী করা যায়। সমমনা কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম পাউবোর আদিম ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। বাজারের সব মদ বিক্রেতার বিরুদ্ধে তো কিছু করা যাবেনা। বাড়ীর বিক্রেতাকে থামাতে হবে। পুলিশকে তো কয়েকবারই জানানো হলো কিছুই হয়না। কয়েকজন মিলে একমত হলো প্রতিরোধ করতে হবে। তবে সরাসরি নয়। সময় যথেষ্ট খারাপ।

আমি ঢাকা চলে আসলাম। আর বাকীরা রাতের বেলা পাউবো অফিস পাহারা দিতো। বাড়ীতে মদের চালান ঢুকতে দিতোনা। এক্ষেত্রে বলে রাখি, ওরা আমাকে নেতা হিসেবে ধরে নিয়েছিল। যে কোন কাজে আমার ছোট ভাই সাথে থাকলে তারা সাহস পেত। যাতে যে কোন পুলিশি ঝামেলা থেকে আমি তাদেরকে রক্ষা করতে পারি। কিন্তু আমি তো জানি আমার দোড় কতটুকু।

এ উভয় পক্ষের মুখোমুখি আবস্থান অনেকগুলো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেয়। এই মদ বিক্রির পেছনের গডফাদার কে জানিনা কিন্তু দেখা গেল আদিম ব্যবসা আর মদবিক্রির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে নাজেহাল হতে শুরু করলো। এলাকার যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের জন্য মদ ফ্রি হয়ে গেলো। ছোট ছোট অনেক পাতি সন্ত্রাসীর জন্ম হলো। আমার সামনে সরাসরি কেউ দাঁড়ায়না কিন্তু রাতের বেলা কে যেন ঘরের সামনে পায়খানা করে রেখে যায় অথবা পলিথিনে ভরে ছুঁড়ে মারে। বাইরের বাল্ব কীভাবে যেন ভেঙ্গে যায়।

আর ড্রাইভার জবাইয়ের মামলার সাক্ষী খুঁজতে পুলিশ আসলে সাক্ষী নাছিরভাই আর আমার এক চাচা পালিয়ে বেড়ান। পুলিশ তো আর সবসময় সাক্ষীকে নিরাপত্তা দিবেনা।

নেতা হিসেবে আমি খুব অযোগ্য তাই এ ধরনের অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে যে গ্রুফটা ছিলো তারা কীভাবে যেন অপর পক্ষের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, বাহুবল আর নয়নের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নমুনা দেখে ধীরে ধীরে ভেঙ্গে গেল।

শেষে ওরা চড়াও হল আমার ওপর। উপায় না পেয়ে আবার গেলাম থানায়। হয়তো একজন শিক্ষক দেখে ওসি সাহেব বেশ খাতির করলেন। আমি ঢাকা চলে আসলাম। কিছুদিন পর এলাকায় ওসি সাহেব এবং এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তি মিলে মিটিং হলো। মাদক বিরোধী কমিটি হলো। কেউ গ্রেফতার হলো না।

আফসোস। মাদক বিরোধী যে কমিটি হলো সে কমিটির একজন কর্তা ব্যক্তির স (করাতকল) মিলেই তো রাতের বেলা মদ বিক্রি হয়।

ঢাকা শহরের বাক্সবন্দী জীবন মায়ের ভালো লাগেনা। আর তাঁর ইচ্ছা, যে ভিটেতে তাঁর স্বামী মারা গেছেন সে ভিটেতেই তিনি মরতে চান। মদ নিয়ে আমাদের এত মাথা ব্যথার কারন মা বুঝে না। অতএব আমার উপায় নেই। মাকে পাহারা দেয়ার জন্য ছোট ভাইকে এলাকায় রাখতে হয়। এখন তার দায়িত্ব হলো মুখ বুঁজে ময়লা পরিস্কার করা। ভাঙ্গা বাল্ব পরিবর্তন করা। বধির সেজে সকল উস্কানীমূলক কথা এড়িয়ে যাওয়া। এভাবেই চলছি গত তিন বছর।

মাদক বাহিনী ঠিক করে নিয়েছে গোড়া না কাটলে ওরা শান্তি পাবে না। তাই মা নিষেধ করে দিয়েছেন যেন বাড়ী না যাই। বাড়ীর মাদক বিক্রেতা বিএনপি করে। জানি বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমার রক্ষা নাই।

গত পরশুদিন বাড়ীতে ফোন করলাম। মা বললো নয়নের চাচাকে (মদ বিক্রেতা) পুলিশ মদসহ ধরে নিয়ে গেছে। পুলিশ কয়দিন তাকে ধরে রাখতে পারবে জানিনা। তবে পুলিশকে তো ধন্যবাদ দিতেই হবে।