ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ভূমিকাঃ হূদয়ে বাংলাদেশ ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি প্রসঙ্গটা আবার নিয়ে আসার জন্য।তাঁর পোষ্ট এ আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা লিখতে চেয়েছিলাম। লেখা বেশ লম্বা হয়ে যায় বলে আলাদা পোষ্ট দিতে হল। এটা কোন কাউন্টার পোষ্ট নয়। দৃষ্টিভঙ্গির স্বাধীনতা সকলেরই আছে। ঘটনার পরিক্রমায় ডঃ ইউনূসের প্রতি আমি এখনো পজেটিভ ধারনা রাখি। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল থাকতে পারে। সম্মানীত পাঠকরা আমার ভূল ধরিয়ে দিতে পারেন স্বাধীনভাবে। আর এখানে অনেক বানান ভূল আছে। আমি চেষ্টা করবো সেগুলো ঠিক করার।
=============================================================

১৯৯৬ সালের শেষদিকে লাইসেন্স পেয়ে ১৯৯৭ সালের মার্চে গ্রামীণফোন যাত্রা শুরু করে।
২০০৩ সাল পর্যন্ত গ্রামীনফোনে শেয়ার ছিল টেলিনর ৫১%, গ্রামীন টেলিকম ৩৫%, মারুবেনি ৯.৫% এবং গণফোন ৪.৫%।
২০০৪ সালে যখন মারুবেনি তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিল তখন চুক্তির ধারা অনুযায়ী তা বাকী তিন শেয়ারহোল্ডার আনুপাতিক হারে কিনে নিল।
পরে যখন গণ ফোন তাদের ৬.৫% শেয়ার বিক্রি করতে চাইল টেলিনর তা কিনে নিল। গ্রামীন টেলিকমের দাবী হল টেলিনর গোপনে গণ ফোনের শেয়ার কিনে নিয়েছে আর টেলিনরের বক্তব্য হলো গ্রামীনফোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তারা এই শেয়ার কিনেছে।

টেলিনরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হল শেয়ারের বিষয়ে এই বিতর্ক কোম্পানীর ভবিষ্যতের জন্য খুব বেশী তাৎপর্যপূর্ণ নয়। (কী করে তারা নিশ্চিত হল যে ইউনূসের বাড়াবাড়ি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়?)

অক্টোবর ১৩, ২০০৬: ইউনুস নোবেল পুরস্কার পান।
নভেম্বর ১৭, ২০০৬: গ্রামীন ফোন তাদের লোগো পরিবর্তন করে।

(কেন হঠাৎ করে গ্রামীনফোনের লোগো পরিবর্তন করার দরকার হল? গ্রামীনফোনের আগের লোগোর সাথে আমাদের যে একটা মানসিক অধিকারবোধ ছিল তা নষ্ট করার জন্য? ইউনূসের নোবেল পাওয়ার পর বেশী দেরি করলে কী এই লোগো আর পরিবর্তন করা যাবেনা? জনগনের সেন্টিমেন্ট কে কি তারা ভয় পাচ্ছিল? )

সেপ্টেম্বর ২০০৮:
গ্রামীন টেলিকম এবং টেলিনরের সাথে চুক্তির একটা ধারা নিয়ে ইউনূস ও টেলিনরের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল যাতে বলা আছে কার্যক্রম শুরুর (১৯৯৭) ছয় বছরের মধ্যে টেলিনর তাদের শেয়ার ৩৫ শতাংশে কমিয়ে আনবে। কিন্তু ১০ বছর পার হয়ে গেলেও টেলিনর এই ধারার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায়নি।

শেয়ারের ইস্যুতে ইউনূস টেলিনরকে আদালতের মুখোমুখি করবে এই হুমকীর জবাবে টেলিনর তাদের শেয়ার কমানোর কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং প্রয়োজনে ইউনুসকে সুইডিশ আদালতে হাজির করার হুমকী দেয়।

যেহেতু গ্রামীনফোনের বেশীরভাগ শেয়ার টেলিনরের, তাই টেলিনর গ্রামীনফোনের উপর তাদের নিয়ন্ত্রনের কথা পুনরায় ব্যাক্ত করে।টেলিনরের তিন সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের প্রথমদিন ডেইলীষ্টারের সাথে এক সাক্ষাৎকারে টেলিনরের চেয়ারম্যান হ্যারল্ড নরভিক বলেন //এটা খুব সমস্যার কোন বিষয় নয়। আমরা গতমাসে ইউনুসের সাথে অসলোতে আলোচনা করেছি এবং আমি বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে আমরা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।//

উপরোক্ত ধারার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে টেলিনর যা বলে তাহলো //এটা ছিল এশিয়াতে আমাদের প্রথম বিনিয়োগ। তাই ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে টেলিনরকে এরকম এটা ধারা রাখতে হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পর আমরা যখন বাংলাদেশের মার্কেট সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছি তখন আমরা আমাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছি।//

(যদি এই বিনিয়োগে লোকসান হত তাহলে টেলিনরকে কি ধরে রাখা যেত? লোকসানের ভাগ বহন করার দায়িত্ব তখন কী ইউনূসকে নিতে হত না?)

টেলিনরের সাথে ইউনুসের তিক্ততা আরো বেড়ে যায় যখন ইউনূস বাংলাদেশে টেলিনরের বিভিন্ন সাইটে শিশুশ্রম এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে অভিযোগ আনে।ইউনূসের এই অভিযোগ নরওয়ের মিডিয়াতে প্রকাশিত হলে টেলিনর বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশে তাদের শ্রমবিষয়ক নীতি রিভিউ করতে।

এর পরবর্তীতে আমরা টেলিনরের যে বক্তব্য পাই:
ব্যবসাজগতে অত্যাধিক জ্ঞান সম্পর্ন ডঃ ইউনূস বাংলাদেশে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যাক্তি। অস্বস্তিকর বিষযগুলো নিয়ে আক্রমন না করে বরং টেলিনরকে যথাসম্ভব সহযোগীতা করার জন্য আমরা তাকে আহ্বান জানাই”।

( এটা কি নোবেল প্রাপ্তির পর ইউনূসের প্রতি আমাদের ভালোবাসাকে ভয় পাওয়া?। চুক্তি অনুযায়ী টেলিনরের শেয়ার কমিয়ে গ্রামীনফোনকে বাংলাদেশের ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করার জন্য ইউনূস খুব সহজ কোন কাজটি করতে পারতো? পাবলিক সেন্টিমেন্ট বা আমাদের দেশপ্রেম নিশ্চয়। এটা খুব সহজ ছিল। জিপি বয়কটের মিছিল যদি আমরা উঠাতাম টেলিনর নিশ্চয় উপরোক্ত ধারাটির সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা করতে পারতো না। তাহলে ইউনূসের হাতের এই পারমাণবিক বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সবচেয়ে সহজ উপায় টেলিনরের হাতে কী ছিল? নিশ্চয় খুব সতর্কতার সাথে ইউনূসকে বিতর্কিত করে তোলা।)

নভেম্বর ২০১০: টম হেইনম্যান কর্তৃক এনআরকে চ্যানেলে গ্রামীন ব্যাংকের ফান্ড সম্পর্কিত একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশিত হয়।
ডিসেম্বর ২০১০: নরওয়ে সরকারের উত্তরে যা জানা যায় তা হল বিষয়টি ১২ বছর আগে মীমাংসিত।

(টম যখন এই ডকুমেন্টারি ফাইনাল এডিটিং করছিলো তখনো কি সে জানতো না বিষয়টা এক যুগ আগে মীমাংসিত? নাকি ডকুমেন্টারিতে মিমাংসার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তার প্রতি কোন নির্দেশ ছিল? এই ডকুমেন্টারি কি টেলিনরের কাজ? যাই হোক এই একমাস সময়ই টেলিনরের কাছে যথেষ্ট ছিল। তারা আমাদের সাইকোলজি নিশ্চয় ষ্টাডি করেছে। তাদের দেশের মানুষ এই মীমাংসিত বিষয়টা যত তুচ্ছ ভাববে, আমাদের দেশের মানুষ তা মোটেও ভাববে না। বরং আগুনে ঘি ঢালবে। অতএব, ইউনূসের বিষয়ে পাবলিক সেন্টিমেন্ট ধ্বংস করে জিপির ওপর টেলিনরের একচ্ছত্র আধিপত্য টেলিনর ঠিকই নিশ্চিত করে নিল। আর রাজনীতিতে নামতে গিয়ে কী কারনে জানি কাজী ফারুক হারাল প্রশিকা, আর ইউনূসের প্রান নিয়ে টানাটানি। টেলিনরের সোনায় সোহাগা! )

১১ জানুয়ারি ২০১১: সরকার গ্রামীন ব্যাংকের উপর তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষনা দেয়।

১৮ জানুয়ারি ২০১১: “বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কাজ করে। এখানে কোন আদর্শ নাই” -২০০৭ সালের এই মন্তব্যের জন্য বামপন্থি এক রাজনীতিবিদের মানহানির(?) মামলায় ইউনূসকে এদিন আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিতে হয়।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১: পল্লী ফোনে অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে এই অভিযোগে করা মামলায় ইউনূসকে পাবনার একটি আদালতে হাজিরা দিতে হয়।

মার্চ ২০১১: সরকার গ্রামীন ব্যাংকের কার্যক্রমের উপর তিন মাস ব্যাপী তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তের কারনে ইউনূসকে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামে উপস্থিত হতে দেয়া হয়নি।

ইউনূসের অবস্থা এখন সবার জানা। যে কৌশলেই হোক, টেলিনরের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। সরকার যে কারণেই হোক, ইউনূসকে গ্রামীন ছাড়া করেছে।

এখনও জিপিতে গ্রামীন টেলিকমের শেয়ার আছে, তবে টেলিনরের সাথে দরকষাকষি করার জন্য সেই ইউনূস তো নাই। অতএব টেলিনর প্রতিবছর কত হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেলো বা কতজন কর্মী ছাঁটাই করলো তা দেখার অধিকার ইউনূসের কী আছে?