ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

দুর্নীতির ধোঁয়া তুলিয়া বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করিয়া বসিল; কী অবিচার! আমার মতো অনেক গণ্ডমূর্খ সরকারের সমালোচনায় উঠিয়া পড়িলাম। দুর্নীতি যদি নাই বা ঘটিবে তবে কেমন করিয়া একটা কোম্পানী কালো তালিকাভুক্ত হইলো, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুনানীর তারিখ ঠিক হইলো! দুই ব্যক্তি না হয় সামান্য ব্যাপার, কিন্তু একটা কোম্পানীকে কালো তালিকাভুক্ত করিয়া সারা বিশ্বে ঐ কোম্পানীর বারোটা বাজাইয়া দেওয়া হইলো -ইহা তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়। এই সব কঠিন কঠিন যুক্তি হাতে লইয়া সুযোগ বুঝিয়া উঠিয়া বসিলাম। দুর্নীতি হইয়াছে তাই দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান নিয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের শ্লোগান তুলিয়া গলা ফাটাইলাম।

তবে দুর্নীতি বস্তুটি চাটিয়া দেখিতে একই রকম লাগিলেও চেহারায় সম্ভবত লাউ আর কদুর মতো ভিন্নতা রহিয়াছে, আর আবহাওয়া ও জলবায়ুগত পার্থক্যহেতু আইনের বইতে এই ভিন্নতা বিস্তর রূপ ধারন করিয়াছে! আমি আইনের মানুষ নই, তাই বিস্তর ভিন্নতা টা ভালোমত ঠাহর করিয়া উঠিতে না পারিলেও স্বাদে গন্ধে যে একই রকম হইবে সেই ভরসায় আবুল হটাও বলিয়া নাচানাচি করিতেছিলাম। শেষে স্বাদ আর জলবায়ুগত পার্থক্য নিয়া বিশেষজ্ঞদের পৌনঃপুনিক আইনী ব্যাখ্যায় নিজের মূর্খতা ধরা পড়িলো। তাই মূর্খতা যাহাতে আরো প্রকট হইয়া না যায় সেই ভয়ে চুপ মারিলাম। তবে কর্ণকুহর উন্মুক্ত রাখিলাম যাহাতে দুই একটা মধুবাণী মস্তকে প্রবেশ করাইয়া লইয়া নিজের মূর্খতা কিছুটা কমাইতে পারা যায় এবং দুর্নীতি বিরোধী শ্লোগানে এই যে গলা ফাটাইলাম তাহাতে যে সার্টিফিকেটে দেশপ্রেমিক জাতীয় কিছু একটা লেখা থাকিবে এই আশা কোন মতেই ছাড়িলাম না।

ফলাফল অত্যন্ত চমৎকার হইলো। কর্ণকুহরে যেই সমস্ত মধুবাণী প্রবেশ করিলো তাহা নিম্নরূপ-

“যেখানে তারা এক পয়সা ছাড় দেয়নি, সেখানে দুর্নীতি হল কী করে। বরং এর পেছনে কারা আছে, তাদের কী উদ্দেশ্য তা খোঁজ নেওয়া দরকার। একটি বিশেষ কোম্পানিকে কাজ দিতে বিশ্বব্যাংক তিনবার চিঠি দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সে কোম্পানিটি ভুয়া। তাহলে দুর্নীতি কোথায়? আমি যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবকে সরিয়েছি। প্রকল্প পরিচালককে সরিয়েছি। এর থেকে বেশি আর কে করেছে।”

“বিশ্বব্যাংক একটা ব্যাংক, জানি না এ ব্যাংকের অডিট (নিরীক্ষা) হয় কি না। এ ব্যাংকে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয় কি না। সেখানে টাকাপয়সা কী হচ্ছে, তার হিসাব-নিকাশ চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমরা বিশ্বব্যাংকের অংশীদার। তাদের হিসাব-নিকাশ বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটা আমাদের দাবি।”

“বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে এক পয়সার দুর্নীতি খুঁজে পায়নি। তবে দুর্নীতির গন্ধ পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে এক পয়সা অর্থ দেয়নি। ঋণ বাতিল করেছে। পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য সরকার দাতাদের পেছনে ঘুরবে না। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াব। নিজেদের তহবিল থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু করব।”

“কোনো এক ব্যক্তিবিশেষের একটি ব্যাংকের এমডি পদ নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঋণ বন্ধ করে দেবে, এ কথা অনেকে বলেছেন, আমি আগে থেকেই শুনে আসছিলাম।”

হায় হায়! না বুঝিয়া আবুল মামার বিরুদ্ধে কত কথা বলিয়াছি। সার্টিফিকেটে দেশপ্রেমিক বলিয়া বাহবা পাওয়া তো দূরের কথা, উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাইবার অভিযোগে এক্ষনে তো অভিযুক্ত হইতে চলিয়াছি। হার মানিলাম না; পিঠ বাঁচাইবার জন্য হইলেও আবুলের মতো নিরীহ জনদরদী মন্ত্রকের গদী কাত করিবার ব্যবস্থা না করিয়া ক্ষান্ত না হইবার পণ করিলাম। অতএব, প্রজাহিতৈষী রাজ দরবার বাধ্য হইয়া দেশপ্রেমিক সার্টিফিকেট সহযোগে আবুলকে ওএসডি করিলো।

আবুলের সার্টিফিকেট নিয়া মনের ভিতর একটু যে ট্যাঁ টুঁ করে নাই তাহা জোর দিয়া বলিতে পারিবো না, তবে সৌভাগ্যের বিষয়টাতো দেখিতে হইবে। যেইখানে নিরাপরাধ আবুলকে নিয়ে এত শোরগোল তুলিবার অপরাধে প্রাপ্য শাস্তি হইতে নিষ্কৃতি পাইলাম সেইখানে আর কী কথা থাকিতে পারে। আর মোটা মোটা বইয়ের মতো দেশপ্রেমিকের সংজ্ঞাটির যে নতুন নতুন সংস্করণ হইতে পারে এই বিষযটা ভুলিয়া যাওয়াতো তুচ্ছ অন্যায় নয়। অতএব, নিজের সার্টিফিকেটে যে দেশপ্রেমিক লেখা হয় নাই তাহাতে খুব একটা খেদ নাই, আবুলনামা লিখিয়া যে অপরাধ করিয়াছি আর তাহাতে যে কোন মাশুল দিতে হয় নাই ইহাই সৌভাগ্য!

তবে কর্ণকুহর যে খোলা রাখিয়াছিলাম তাহা বন্ধ করিতে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। হঠাৎ করিয়া নতুন মধুবানে সচকিত হইয়া পড়িলাম।

“আমাদের ওপর অহেতুক কেউ অপবাদ চাপাবে তা বরদাশত করা হবে না। আমরা দান-খয়রাত চাই না, হাত পেতে চলতে চাই না। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সেতু নির্মাণ করে দেখিয়ে দেব আমরাও পারি।”

“আবুল হোসেন দেশপ্রেমিক। তাই তিনি দেশের সম্মান রাখতে পদত্যাগ করেছেন। কোন মন্ত্রীর ‘গাটস’ থাকে যে পদত্যাগ করে! এটা একমাত্র আওয়ামী লীগ আমলেই সম্ভব। আমাদের সেই সাহস আছে।নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি দেখেই বিশ্বব্যাংক আবুল হোসেনের সঙ্গে লেগেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগের জন্য বারবার চাপ দিচ্ছিল। সেই বিশেষ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো কমিশন খেয়েছে কি না, আপনারা সাংবাদিকেরা সেটা খতিয়ে দেখেন।”

ইহা কিসের আলামত? ঋণ দরকার আমাদের; বিশ্বব্যাংকের নয়। তাহা হইলে একদিকে বিশ্বব্যাংকের সহিত দেনদরবার করিবার জন্য জাইকা প্রেসিডেন্টকে মধ্যস্থতাকারী বানাইয়া অন্যদিকে বিশ্বব্যাংককে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট ধরাইয়া দিয়া এবং একমাত্র বিশ্বব্যাংককে সন্তুষ্ট করিবার জন্যই যে আবুলের মতো সৎ, দেশপ্রেমিক, সাহসী মন্ত্রক কে ওএসডি করা হইলো ইহা বার বার স্মরণ করাইয়া দিয়া আমরা কী করিতে চাহিতেছি? আমাদেরকে ঋণ দিবার জন্য বিশ্বব্যাংক যে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে তাহাতো জানিতাম না। আমরা কী আসলেই চাহিতেছি যে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করুক? নাকি বিশ্বব্যাংক যে দুর্নীতিপ্রাণ আর আবুল যে দেশপ্রেমিক; জনগনের সামনে ইহা প্রমাণ করাটাই মুখ্য?

আবুলকে ওএসডি করিবার পর বিশ্বব্যাংক যদি ঋণ দিয়াই বসে তবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ হইতে পদ্মা ইস্যুতে প্রথম হ্ইতে বর্ষিত বিভিন্ন বিবৃতির বিপক্ষে ইহাই প্রমাণ হইয়া পড়িবে যে, বিশ্বব্যাংক নিজে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হইলেও পদ্মা সেতু বিষয়ে তাহারা আমাদের দুর্নীতির কারনেই ঋণ চুক্তি বাতিল করিয়াছিলো; এক্ষনে সরকার ব্যবস্থা নিতে শুরু করায় তাহারা আবার আসিয়াছে। বিশ্বব্যাংক যাহাতে আবার না আসিয়া পড়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাহাতে অটুট থাকে সেই জন্যই কি আমাদের মধুবাণী বর্ষন অদ্যাবধি সমানতালে চলিতেছে ? নাকি অন্য কোন পক্ষকে কথা দেওয়া হইয়াছে? যেইভাবেই হউক, বিশ্বব্যাংক কে হটাইয়া তদস্থলে প্রতিশ্রুত পক্ষকে সুযোগ করিয়া দিতে হইবে? সাপ ও মরিলো, লাঠিও ভাঙ্গিলোনা। নাকি বিশ্বব্যাংকের যৌথ তদন্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যাহা পারিবারিক সংজ্ঞার সাহায্যেও এড়ানো কঠিন হইয়া উঠিতে পারে?

জনগনকে লইয়া বিশেষ চিন্তিত হইবার কিছু নাই। এই দেশের জনগন অত্যন্ত সহজ সরল। তাহাদের উদ্দেশ্যে কষ্ট করিয়া একটা বিটিভি ভাষন দিলেই চলিবেঃ

“প্রিয় দেশবাসী, বিশ্বব্যাংক বলেছিলো দুর্নীতি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সরিয়ে দিতে বলেছিলো। আমরা তা করেছি। এখন কেন বিশ্বব্যাংক ঋণ দিচ্ছেনা। আমরা কি আগেই বলিনি যে বিশ্বব্যাংক নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান?”

অতএব, প্রমানিত হইলো, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতিপ্রাণ, আবুল দেশপ্রেমিক। আবুল হোসেনকে নিয়া যাহারা অহেতুক সমালোচনা করিয়াছিলেন তাহারা এখন কী বলিবেন?