ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

কম্প্রিহেনসিভ ভাইভা শেষ করার আগে কার কার চাকরী কনফার্ম হলো এটা বড় একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। প্রেস্টিজ রক্ষার্থে ঢাকার বাইরে ফ্যাক্টেরিতে জয়েন করে প্রেস্টিজ রক্ষা করলাম। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিও আমার আশেপাশের এক ফ্যাক্টেরিতে জয়েন করে প্রেস্টিজ বাঁচিয়ে জাতে উঠলো।

একদিন ঘুরতে আসলাম সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। সবাই কত সুন্দর করে ঘুরাফেরা করছে; আর আমরা কিনা ফ্যাক্টেরিতে চারদেয়ালের মধ্যে বন্দি; ঢাকা শহরের কত কত অনুষ্ঠান মিস করছি। অতএব, চাকরী দ্রুত পাল্টাতে হবে; ঢাকা ফিরে আসতে হবে।

বন্ধুটি বিসিএস এর প্রস্তুতি নিতে লাগলো; আর সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে একটা সরকারী চাকরী বাগিয়ে নিল সাময়িকের জন্য। আমি কোনরকমে একটা ভার্সিটিতে ঢুকে চুপ করে রইলাম। বিসিএসের কী কী জানি ধাপ পার হয়ে বন্ধুর চাকরী হলো ঢাকার বাইরে। এবার সে হিসেব করতে বসলো, সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যে স্কেল সে পাচ্ছে, বিসিএস ক্যাডার হিসেবে এই স্কেলে আসতে তার কমপক্ষে ১৫ বছর লাগবে। তাও আবার পোস্টিং ঢাকার বাহিরে। অতএব তার আর জয়েন করা হলোনা।

হঠাৎ একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। একটা সরকারী ব্যাংকের হেড অফিসে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল লোন সেকশনে তার চাকরী হয়েছে। বর্তমান চাকরী ছেড়ে দিবে। যুক্তি হলো সুপারিনটেনডেন্ট যথেষ্ট মর্যাদাসম্পন্ন পদ নয়। তাই হলো।

প্রথম কয়দিন বেশ খোঁজ নিতাম; কিরে বাংকার, চাকরী কেমন চলছে? বাংকারে কখন ঢুকিস আর কখন বের হয়ে আসিস? দেখলাম, বেশ উৎফুল্ল। চট্টগ্রামের কোন একটা ফ্যাক্টরী ভিজিট ছিলো, ফ্যাক্টরীর মালিক আগেই বিমানের টিকেট পাঠিয়ে দিয়েছে, ফ্যাক্টরী ভিজিট শেষে কক্সবাজার, টেকনাফ ভিজিটের জন্য এসি মাইক্রোবাস ষ্ট্যান্ডবাই রেখে দিয়েছে। তবে হতাশার কথা হলো সাধারনত সন্ধ্যা ৭ টার আগে বাসায় ফিরতে পারেনা। ওয়ার্কলোড অনেক বেশী।

এর মধ্যে একদিন আমাকে বললো, একটা চাকরী দেখার জন্য। আমিতো অবাক; ফ্যাক্টরী বাদ দিলি, সুপারিনটেনডেন্ট বাদ দিলি, বিসিএস বাদ দিলি, এখন আবার বাংকার বাদ দিবি। তুই আসলে কী চাকরী করবি?

ওর কথা হলো, লোন সেকশনটা ঘুষে ভরপুর। ঘুষ না খেয়ে এখানে টিকে থাকা বেশ কষ্টকর।

এর কিছুদিন পর খবর পেলাম, ব্যাংকের ডিজিএমকে অফিসের ভেতরেই সে মারতে গেছে। কোন একটা লোন এসেসমেন্টে তার নেগেটিভ রিপোর্ট কেমন করে যেন পজিটিভ হয়ে গেল। বন্ধুর ক্ষোভ হলো, যদি ঘুষের কারনে সব প্রপোজাল পজিটিভ হয়ে যায় তবে কেন তাকে দিয়ে এসেসমেন্ট করানো বা স্পট ভিজিট করানো। কেনইবা তাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে কেরানীর মতো বসে থাকতে বাধ্য করানো হয়।

আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম, ইনিশিয়াল পোষ্টের একজন অফিসার একজন ডিজিএম কে তার অফিসের ভেতর মারতে যায়! দেখলাম বন্ধুটি নির্বিকার। তার সোজা কথা, “কিছুই হবেনা, ঘুষখোরদের কোন মেরুদন্ড থাকেনা” । আসলো হলোও তাই। ডিজিএমের তরফ থেকে উপরি লেভেলে কী একটা অভিযোগ করা হলো, উপরস্থ কর্মকর্তা দুজনকে চা খাইয়ে মিলিয়ে দিলেন। শেষ।

বন্ধুটি এখন সকালে অফিসে যায়, সাইন করে, আগের মতো ৬ ঘটিকা পর্যন্ত অফিসে বসে না থাকলে ও চলে। ফোন করে অফিসে আসতে পারবেনা বলে দিলেই হলো; ছুটির দরখাস্ত করা লাগেনা। কারও কোন অভিযোগ নাই। আমার বেশ হিংসা লাগে। এত কম ওয়ার্কলোড!

কিছুদিন আগে আমার কাছে এসে আবার হাজির। ২০ হাজার টাকা দরকার। কী করবি টাকা দিয়ে? “ বাংকারের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সে কেস করবে। তারা নাকি লুটেপুটে খাচ্ছে। কোন এক আইনজীবির সাথে কথা বলেছে, ২০ হাজার টাকা লাগবে”। টাকা আর দিলামনা। সবক দিয়ে ছেড়ে দিলাম “ বেশী বাড়াবাড়ি করা ঠিকনা। এখন বিয়ে করেছিস, চাকুরীতে সুস্থির হওয়া প্রয়োজন”। বুঝলাম, আমার কথা তার পছন্দ হয়নি।

পরশুদিন আবার ফোন করলো,“একটা চাকরী দেখ আমার জন্য! তদন্ত কমিটিতে মেম্বার হিসেবে আমাকে রেখেছে। তবে আমি ভাবছি প্রতিবাদে চাকুরী থেকে পদত্যাগ করবো”। সব কথাই আমাকে সাধারণত সে বলে। তবে কীসের প্রতিবাদে কেন পদত্যাগ করবে শুধু এটা বলতে চাচ্ছে না।

উপরওয়ালার রহমতে ছাত্রজীবনে পিঠের উপর যে সীলমোহর মারা হয়েছে তাতে আর যাই হোক, বাকী জীবন বন্ধুটির একমাসও বেকার বসে থাকতে হবেনা। সেজন্যই মাথাগুঁজে ঘুষখোরদের কাছে সুবোধ বালক সেজে চাকরী বাঁচিয়ে চলতে সে রাজী নয়। তবে তদন্ত কমিটির মেম্বার হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, তার কণ্ঠস্বরে ভীতি আছে, এই ভীতি চাকরী বাঁচানোর ভীতি নয়।

চাকরী বাঁচানোর ভীতি যাদের আছে তাদের তাহলে কী অবস্থা?

ট্যাগঃ:

মন্তব্য ৩ পঠিত