ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্লোগান নিয়ে ১৯তম জাতীয় সম্মেলন করতে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আমরা ইতমধ্যেই জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শান্তির মডেল জাতিসংঘে গৃহিত হয়েছে। এ শান্তির মডেলে পরস্পর ক্রিয়াশীল যে ছয়টি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলোঃ (ক) ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূল, (খ) বৈষম্য হ্রাস, (গ) বঞ্চনা লাঘব (ঘ) কর্মযজ্ঞে সকলকে সম্পৃক্তকরণ, (ঙ) মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং (চ) সন্ত্রাস নির্মূল।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৭ তম অধিবেশনে এই শান্তির মডেলের উপর প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার যে দুটি বিষয় আমার মনোযোগ সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করেছে তা হলোঃ
০১। ‘‘ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষার লক্ষ্যে আমরা সন্ত্রাস ও সকল প্রকার চরমপন্থার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করেছি।’’ এবং
০২। ‘‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা অবশ্যই ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে হতে হবে। যার মাধ্যমে শান্তিময় বিশ্ব গড়ে উঠবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটিই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহার।’’ -অত্যন্ত সাহসী উচ্চারণ সন্দেহ নাই। অভিনন্দন।

ছাত্ররাজনীতি এবং ছাত্রনেতা নির্বাচন নিয়ে হৈচৈ এবং চেঁচামেচি কম হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর এখন নিয়ম হয়ে গেছে অস্ত্রবাজিতে কে সেরা, কে কয়টা মামলার আসামী, কে কতটা নির্ভীকভাবে টেন্ডার ছিনতাই করতে পারে এগুলোকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে নেতা নির্বাচন করা।

‘‘ ছাত্রলীগের ভাল পদ পেতে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বেপরোয়া ছিলাম আমরা। সে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে বিশ্বজিৎকে খুন করেছি। বিশ্বজিৎকে খুনের পরও নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে এমনভাবেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে ৩ খুনি।
৮ দিনের রিমান্ডে তারা গোয়েন্দাদের জানিয়েছে, ছাত্রলীগের সামনের কমিটিতে ভাল পদ নেয়ার প্রত্যাশা ছিল তাদের। এ কারণে তাদের মধ্যে তাগিদ ছিল কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে নিজেদের পারফরম্যান্স শো করার। এ ক্ষেত্রে হরতালকেই তারা বড় অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল।’’

নেতৃত্ব লাভের জন্য সবাই কেন এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে? সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে পারফরম্যান্স হিসেবে কারা গ্রহন করছে? শাকিলরা এ ধারনা কেমন করে পেল? রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা ও শান্তির মডেল দু‘টো কী করে পাশাপাশি চলে? এ শান্তির মডেল কি শুধুমাত্র লোক দেখানো কিছু?

বিশ্বজিৎ কিংবা শাকিল কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় যে উদাহরণ হিসেবে এখানে নিয়ে আসাটা অযৌক্তিক বরং সারাদেশে হাজারো বিশ্বজিতরা শাকিলদের হাতে নির্যাতিত হয়ে আসছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা এমন হয়ে গেছে যে, বিশ্বজিতদের লাশের উপর দিয়ে হেটে আসতে পারলেই শাকিলদেরকে হাই কমান্ড চিনতে পারে, তাদের পক্ষে কথা বলে, আশ্রয় দেয়। এজন্যই শাকিলদের সংখ্যা দিন দিন কমছেনা বরং বেড়ে চলছে।

‘রামুর সহিংসতা, তাজরিনে আগুন এবং বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়’’- এটাতো কোন অসাম্প্রদায়িক শান্তির মডেলের কথা হতে পারেনা। তাই প্রশ্নটা কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে – ‘‘জিরো টলারেন্স’’ কাদের জন্য এবং ‘‘ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সার্বভৌম সমতা’’ কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? ধর্মীয় ক্ষেত্রেই কি সাম্প্রদায়িকতা সীমাবদ্ধ নাকি রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার অট্টহাসি আমরা ইচ্ছা করেই লালন করছি, উপভোগ করছি? শান্তির মডেল কি কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য? প্রধানমন্ত্রী তো রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার বাইরে এসে জনগনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কথা বলেননি। এ ধরনের রাজনীতির-কলেই তো শাকিলরা জন্মলাভ করছে, চাপাতিপ্রিয় হয়ে উঠছে; মায়ের কোলে বসে তো কেউ শিখছেনা।

রাজনৈতিক মঞ্চের গতানুগতিক বক্তৃতায় এখন তেমন আর আগ্রহ পাইনা। তাই শান্তির মডেলের অসাম্প্রদায়িক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নেতৃত্বের গ্রহনযোগ্য গুনাবলী ও তার অরাজনৈতিক মূল্যায়ণ, রাজনীতির বানিজ্যিক ব্যবহার বন্ধকরণ এবং ‘‘ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সার্বভৌম সমতা’’ বাস্তবায়নের কৌশল সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা চাই, বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি চাই।

শাকিলদের প্রজনন ক্ষেত্র বন্ধ করুন, বন্ধ করুন রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার অট্টহাসি। অন্যথায় রাজনীতি-কলের বর্তমান চরিত্র ও তদোদ্ভুত সাম্প্রদায়িকতায় আপনাদের সমর্থনের বিপরীতে শান্তির মডেলকে সাংঘর্ষিক অথবা লোক দেখানো প্রচারণা বলে মনে হচ্ছে।