ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর, বি) অটিজম দিবস ২০১৮ সালের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে  বলেছে,  পরিবার ও চিকিৎসকদের জ্ঞানের অভাবে অটিজম আক্রান্ত রোগীর সঠিকসংখ্যা নিরূপিত নয়।

এ রকম একটা প্রেক্ষাপটে অটিজম নির্ণয়ের জন্য সীমিত সুযোগেরও সঠিক প্রচারণা নেই।  জানিয়ে রাখি সরকারি হাসপাালগুলোতে অটিজম নির্ণয় ও এটি থেকে উত্তরণের জন্য ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ রয়েছে। দু’একটি বাদে অন্য সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই।

এটি  আলোচনার মূল বিষয় নয়, বিষয়টি ভিন্ন- সেটি হলো অটিজম আক্রান্ত শিশু, ব্যক্তির প্রতি আমাদের আচরণগত পরিবর্তনটা খুব জরুরি।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চেয়ে দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি। অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি তার মনের ভাব সঠিক উপায়ে, প্রথাগত ছকে প্রকাশ করতে পারেনা।  তাই তাকে বোঝা, তার পরিবাররের  কষ্ট উপলব্ধি করার মানসিকতা থাকা দরকার।

অন্যসব মানুষের মতই অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরও আকাঙ্খা আছে। আছে দিনযাপনের অন্যসব অনুষঙ্গও।  আর এজন্য আমরা তাদের প্রতি যদি সহায়তার হাত বাড়াতে সংকোচবোধ করি,  এটা হবে অপরাধ। এ অপরাধ দু’পক্ষ করছেন, এক পক্ষ হলেন- মাবাবা, আত্মীয়স্বজন। আরেক পক্ষ হলো সমাজ।

পরিবার-পরিজন চাইলেও  সমাজ এমন একটা চাপ তৈরি করে রাখে।পরিবারের অন্য সদস্যদের অনেকটা করুণাকাঙ্খি হিসাবে সমাজ বিবেচনা  করে। এমন চাপের কারণে পরিবার হীনতায় ভোগে।

অথচ বিষয়টি এমন নয় যে একটি শিশুর হার্টে ফুটো আছে, সেটি আপনি কার্ডিয়াক সার্জনের কাছে গিয়ে মেরামত করতে পারছেন। বরং এ্ং সংকটে একটা শিশুকে নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক সময়ের দরকার হয়। ২০ থেকে ২২ বছর বা আরো বেশি।

অটিজম আক্রান্ত শিশুশিক্ষার কথা বলি।আমি দেশের সবচেয়ে অগ্রসর শহর রাজধানী ঢাকার কথাই বলছি। সরকারি বা বেসরকারি স্কুলের  ওয়েবসাইটে গেলে আপনি দেখতে পাবেন অটিজম বাচ্চাদের পড়ার অপশন আছে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, এখানে অটিজম শিক্ষার্থী নেওয়া হয় না।

এখানে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই মূলধারার শিক্ষায় অটিজম আক্রান্ত শিশুকে নিতে চায় না। সরাসরি বললে, না নেয়ার জন্য যত রকমের ছুঁতো আছে, তার সবই তারা দিয়ে থাকেন। আর অভিভাববকে দেন মিথ্যা সান্ত্বনা।

এ সুযোগকে সামনে রেখে রাজধানীকে অটিজম বাচ্চাদের জন্য ‘বিশেষ স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে অভিভাবকরা পড়িয়ে থাকেন, আর যেহেতু কোনো একজন ব্যবসায়ী  দয়া করে স্কুল চালান, তাই  রাষ্ট্রের এখানে চমৎকার শব্দের বক্তৃতা দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

বিশেষ স্কুলগুলোর ফি কমপক্ষে মাসে ৪ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেশন ফি তো আছেই। একটি স্কুল  প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়াই দিনের পর দিন স্পেশাল স্কুল চালাচ্ছে, কিন্তু এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না অভিভাবকরা। করলে তাকে বোঝানো হয়, আপনার বাচ্চার বহু সমস্যা, তবুও দয়া করে যে তারা রাখছেন, এটা একটা বিশাল মহানুভবতা।

একজন অটিজম আক্রান্ত বাচ্চার জন্য চার  রকমের থেরাপি দরকার হয়ে থাকে, তবে কারো কারো ক্ষেত্রে দুই বা এক রকমের –  ফিজিওথেরাপি,  অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, বেহেভিয়ারাল থেরাপি।

সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন বিনামূল্যে থেরাপি দেয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় তাদের কার্যক্রম রয়েছে।  তবে সিআরপি প্রতি ৪৫ মিনিটের থেরাপির জন্য ৩৪৫ টাকা। অন্যসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৪৫০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা নিয়ে থাকে।  তার উপর সিরিয়াল পাওয়া  খুবই কষ্টের।  কিন্তু এ কষ্ট, সমস্যা এবং থেরাপিস্টের অবহেলার কথা আপনি জানাতে পারবেন না, কারণ অভিযোগ করলে ওরা আপনাকে বাচ্চা নিয়ে সেখানে যেতে ডিসকারেজ করবে।

প্রতিবন্ধী বাচ্চাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে আশপাশের লোকেরা বিরক্ত হয়। কারণ আপনার বাচ্চাটি হয়ত হঠাৎ করে হেসে উঠলো, বা কেঁদে ফেললো বা তার অনুভূতি প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়ে সে চিৎকার করলো, লাফালাফি করলো- এসব সবার কাছে অস্বাভাবিক।  তারপর ফিসফিস করে বলবে- এমন বাচ্চা নিয়ে রেস্টুরেন্টে কেউ আসে!

ঢাকায় গণিত শেখানোর  কোচিং ব্যবসা করে আলোহা।  তারা বিশেষ বাচ্চাদের নেয় না। কারণ তাদের সে রকম ক্যাপাসিটি নেই! এটা বলেই তারা বিদায় করেন অভিভাবকদের।

অনেকে আছেন হয়ত আপনার কথা শুনে খবু মন খারাপ করলেন, তারপর ভুলে যাবেন। যখন কোনো রেগুলার স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করতে চাইবেন, স্কুলে সবারই এমন একটা ভাব আপনি একটা  উটকো ঝামেলা ঘাড়ে চাপাতে এসেছেন। এখানে বাচ্চা নিয়ে ঢুকে পরিবেশটা নষ্ট করছেন।

স্কুলে যান বা মাদরাসায় নিয়ে যান, সবখানে এক কথা- ও তো বসে না। আমরা ওকে নিয়ে কী করবো? খুবই  বাস্তবভিত্তিক প্রশ্ন। কিন্তু এটাকে কেউ চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিতে চান না। এমনকি বাবামা যদি বিশেষ শিশুর জন্য একজন শিক্ষকের বাড়তি বেতনও দিতে চান, তারপরও স্কুল এতে আগ্রহী হয়না।

আমার নিজেরও একজন অটিজম আক্রান্ত বাচ্চা আছে, সে অভিজ্ঞতা থেকেই আমি লিখছি।

তবে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিংপুল কর্তৃপক্ষ, বাতিঘর সাংস্কৃতিক স্কুল, নালন্দা অন্যতম। অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের জন্য সুইমিং দারুণ কাজ দেয়, বিশেষ করে হাইপার অ্যাকটিভ বাচ্চার ক্ষেত্রে।

বিশেষ শিশুদের জন্য কিছু করার সময় এখন। আর এর প্রথম শর্তই হচ্ছে তাদের সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা। সেই মানসিকতাই পারে সমাজের বিশেষ শিশুদের জন্য স্বস্তি এনে দিতে।