ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

রাজধানীতে এবার নিত্য-নতুন কৌশলে চাঁদাবাজি ও প্রতারনা শুরু হয়েছে। কাউকে ভয় দেখিয়ে , গোপনে বা কৌশলে কারো ব্যক্তিগত তথ্যে জেনে নিয়ে পরবর্তীতে তা পুঁজি করে টাকা লুটে নিচ্ছে এক শ্রেণির বখাটেরা। আর তাদের এই অভিনব কৌশলের কাছে হার মেনে যেকোনো ধরনের ঝুট-ঝামেলা এড়াতে অর্থ দিয়ে হলেও কোনো রকমে জীবনযাপন করছে অসহায় সাধারণ মানুষ। দিনদুপুরেই ঘটছে এসব ঘটনা। শত শত মানুষের সামনে ঘটনা ঘটলেও কেউ মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস রাখে না। কারণ, এই নতুনমাত্রার অপরাধীগণ অত্যন্ত ধূর্ত ও ভয়ংকর।

 ২৭ শে আগস্ট বিকাল ৫.১৫মিঃ, বিকাশ থেকে টাকা উত্তোলনের জন্যে পল্টন মোড়ের এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে যাই আমি। সেখানে গিয়ে টাকা উত্তোলনের ব্যাপারে দোকানদার কে জিজ্ঞেস করার মধ্যেই পাশে দাড়িয়ে থাকা এক লোক আমাকে অনুরোধ করে বলেন “ভাই আপনার মোবাইল দিয়ে এক মিনিট একটু জরুরী কথা বলা যাবে আমার পরিবারের সাথে?” অনুরোধের প্রেক্ষিতে নিতান্ত মানবিকতার তাড়নায় আমি আমার ব্যাবহৃত মোবাইলটি ঐ ব্যাক্তি কে কথা বলতে দিয়ে পুনরায় দোকানদারের সাথে টাকা উত্তোলনের ব্যাপারে কথা শুরু করি। তার কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই পাশে তাকিয়ে দেখি আমার মোবাইল এক মিনিট কথা বলার জন্যে যিনি নিয়েছিলেন ঐ লোক উধাও। এক প্রকার স্তব্ধ গেলাম আমি! দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম যে,”দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ ব্যাক্তি কে চেনেন কি না? জবাবে দোকানদার বললেন,”আপনি কার কথা বলছেন? আমি উনাকে চিনবো কিভাবে?”

এরপর আশেপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মেলে নি ভদ্রবেশী ঐ প্রতারকের। মোবাইলটি নিয়েই ক্ষ্যান্ত হয় নি ঐ প্রতারক; এরপর শুরু হয় প্রতারনার আরেক বিস্ময়কর অধ্যায়। অন্য মোবাইল দিয়ে নিজের হারানো মোবাইলে অন্তত ২৫-৩০ বার অনবরত কল দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি ঐ পক্ষ থেকে। আধা ঘন্টা পরে বাসায় ফিরে বাসার মোবাইল থেকে পুনরায় কল দিতেই থাকলাম। অবশেষে রাত ৯.৩০মি. এর কিছু পড়ে ঐ প্রান্ত থেকে কল রিসিভ করে প্রতারক চক্রের একজন। তাঁর কাছে মোবাইলটি’র ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বলে যে, সন্ধ্যায় উনি গুলিস্থান থেকে একজনকে আটক করেন এবং মোবাইলটি তাঁর কাছে পাওয়া গেছে। সাথে তিনি আমাকে পাল্টা ভয়ভীতি দেখিয়ে বলেন যে, মোবাইলসহ আটক হওয়া আসামী ছিনতাই ও মাদক ব্যাবসার সাথে জড়িত  এবং জব্দ হওয়া মোবাইলটিও না কি এসব অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই মোবাইলটি যদি আপনার হয়ে থাকে তবে আপনিও এসবের সাথে জড়িত, অতএব আপনাকে ‘ম’ অদ্যক্ষরের এক থানার কাছাকাছি এসে সাক্ষাত করে চা-নাস্তার জন্যে কিছু খরচ দিয়ে মোবাইলটি ফেরত নিতে হবে।” এসব আজগুবি কথাবার্তা শোনার পর আমি বুঝতে পারি যে, প্রতারকদের হাত থেকে মোবাইল ফেরত আনতে তাঁদের নির্দিষ্ট করে দেয়া ঐ দেয়া স্থানে গেলে এরপরে কি হতে পারে! তারপরেও ঘটনার প্রেক্ষিতে আমি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়দানকারি ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে উক্ত ‘ম’ অদ্যক্ষরের থানায় যোগাযোগ করে জানতে পারি যে ঐ থানায় প্রতারকের বলা নামে কোন পদে কেউ কর্মরত নেই। ততক্ষণে যা বুঝার তা ভালোভাবে বুঝে গেলাম। তাৎক্ষণিক করনীয় হিসেবে অপারেটর অফিসে ফোন করে ঐ রাতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই হারানো মোবাইলের।

তাঁর কিছুদিন পরে হারানো মোবাইলে যাঁদের নম্বর সংরক্ষণ করা ছিলো তাঁদের অনেকের কাছেই জানতে পারি যে, এক লোক তাঁদের কাছে ফোন করে বিভিন্ন বানোয়াট মিথ্যা ঘটনা ব্যক্ত করে মোবাইলের মালিক কে হারানো মোবাইলটি ফেরত নেয়ার অনুরোধ করে বিকাশে টাকা দিতে বলে। এই অসাধু-চক্রটি যাঁদের কাছে ফোন করে এসব ধান্ধাবাজি করার চেষ্টা চালিয়েছিলো তাঁরা অবশ্য কেউই প্রতারকদের এসব কথার পাত্তা দেন নি।

এতকিছুর পরেও থেমে থাকেনি ঐ ধূর্ত প্রতারকচক্রের দল। সকল চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পুনরায় তাঁরা শুরু করে অন্য চেষ্টা। তারই ধারাবাহিকতায় আমি পুনরায় আমার হারানো নম্বর দুটি সচল করার পর থেকেই আসতে থাকে অচেনা ৪/৫টি নম্বর থেকে কল,মিসড কল ও ক্ষুদে বার্তা। ক্ষুদে বার্তাগুলোতে আমাকে পূর্বের ন্যায় বিভিন্ন অসাধু কর্মের সদস্যে আখ্যায়িত করে বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে অন্যথায় আমার নামে অস্ত্র-মাদক,বিস্ফোরক মামলা’র ভীতি দেখানো হয় ও আমার পরিচিতজনদের কাছে ফোন করে আমার নামে পরিকল্পিত বানোয়াট কুৎস্য রটানোর হুমকি দেয়া হয়। এবার আর ধৈর্যের বাঁধ ধরে রাখতে না পেরে আমিও পাল্টা উত্তরে বলি যে,”তুই যে বা যেই বাহিনীর সদস্যে হও না কেন,চিহ্নিত করে ধরতে পারলে হাড্ডি গোশতো এক করে দেব তোদের। এইসব বাটপারি আমার সাথে করে পার নাও পেতে পারো; দরকার হলে তোদের খুঁজে বের করতে সারাজীবনের সময় ব্যয় করে ফেলবো।”

একপর্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মাত্রা উপলদ্ধি করে তথ্য প্রমানসহ এর থেকে প্রতিকার ও নিজের সুরক্ষা চাইতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হই কারন এছাড়া ওদের খুঁজে পাওয়ার কোন উপায় নেই। প্রতিনিয়ত দেশজুড়ে শতসহস্র ভারী ভারী চাঞ্চল্যকর অভিযোগের সমাধানের ভীরে আমার দেয়া অভিযোগের সুরাহা করার মতো সময়-সুযোগ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাবে কি না, আমার জানা নেই। অনেকের দৃষ্টিতে আমার সমস্যাটি নগণ্য হলেও এটার গুরুত্ব আমার নিকট পাহাড় সম। ওদের ব্যবহৃত নম্বরগুলো ও অবস্থান চিহ্নিত করার মতো সারঞ্জামও আমার কাছে নেই, কিন্তু ধরতে পারলে এমন ব্যবস্থা করে দিতাম “যাতে মৃত্যু অবদি অন্তত একবেলা হলেও স্মরণ করতো যে, মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করার শাস্তি কোন মাত্রার ও কত প্রকার হতে পারে।” তা করতে গেলে নিশ্চিত আইন নিজ হাতে তুলে নিতে হবে কিন্তু এতেও আমার আপত্তি নেই কারন ওরা যা করেছে এবং করে যাচ্ছে তাতে আমার অন্তরের গহীনে সংরক্ষিত মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা নামক জিনিসগুলো প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সেদিন সরল মনে একজনের উপকার তো কোন প্রতিদানের বিনিময়ে করার সুপ্ত বাসনা ছিলো না মনে, তবে কেন আমার বিশ্বাস নিয়ে ওরা জুয়া খেলায় মত্ত হয়ে উঠেছে ? এভাবেই তো কিছু মানুষরূপী নর্দমার কীটদের চেয়েও নিকৃষ্ট জানোয়ারদের কারনে সমাজে অবিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত হয়ে গড়ে উঠে এবং কলুষিত হতে থাকে সমাজ।

এমন সব নিত্যনতুন প্রতারণামূলক বিস্ময়কর ঘটনার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান পুরো ঢাকা শহর জুড়ে। এমতাবস্থায় এই ধূর্ত, অপরাধী, প্রতারক চক্রের দমনে একমাত্র আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দলের দ্বারা পরিচালিত বিশেষ অভিযান ব্যাতিত অন্য কোন উপায় আছে বলে বিশ্বাস করার কোন কারন নেই। কোন সাধারন ডায়েরীর অভিযোগে সাধারন কোন অভিযান চালিয়ে এই অসাধারন ধূর্ত অপরাধীদের আটক বা দমন করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি না। এরা মেধাবী-ভয়ংকর-সংঘবদ্ধ এক অপরাধী চক্র যাঁদের বহুরূপী প্রতারণার জাল সর্বত্র বিস্তৃত এবং যাঁদের উদ্দেশ্যেই হলো সুযোগ নিয়ে প্রতারণামূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সহজ সরল সাধারন মানুষকে সর্বস্বান্ত করা।