ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) এক অতি সামান্য খোঁচায় ২০১২ এর সেপ্টেম্বরের শেষদিকে কক্সবাজারের রামু তে একটি তুচ্ছ ব্যাপারকে বিষদ ইস্যু বানিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মাধ্যমে শেষ করে দেয়া হয়েছিলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অসংখ্য উপাসনালয় ও তাঁদের আবাসস্থল গুলোও। কেউ কিছু নিশ্চিত থাকা তো দূরের কথা, শুধু কানকথা শুনেই এক আশ্চর্য দানবীয় ধর্মীয় অনুভূতির উদয় হয়েছিলো সেই ন্যাক্কারজনক কুকর্মে অংশ নেয়া ধর্মান্ধদের কলুষিত হৃদয়ে। সে ঘটনা এদেশের শান্তিপ্রিয় প্রতিটি নাগরিকের মনে চরমভাবে আঘাত হেনেছিলোও বটে। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফসলসরুপ সে ঘটনায় মানুষ অবাক হলেও আশাবাদী ছিলো এই ভেবে যে, পরবর্তীতে হয়তো ঐ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের দল আর যাই করুক অন্তত প্রযুক্তি কে হাতিয়ার বানিয়ে এমন অমানবিক কর্মে লিপ্ত হতে চাইলেও সফল হতে পারবে না। সে ঘটনার পরে অনেক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিলো সরকার, তাই আমরা আরো আশ্বস্ত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, এটাই শুরু আর এটাই শেষ।

কিন্তু সেদিনের আমাদের সকল আশা-ভরসা ও বিশ্বাস কে পুনরায় ধুলোয় মিশিয়ে দিলো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী দের হালনাগাদ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। এবারো একই কায়দায় সেই রামু’র ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সিলেটের হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের ছাতক, বরিশালের বানরিপাড়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু ধর্মবলম্বীদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় পাঁচ দিনের ব্যাবধানে দুই দফা আক্রান্ত হয়।

ফেইসবুকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের দেড় শতাধিক ঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। অর্ধশতাধিক প্রতিমা ভাংচুর করা হয় উন্মাদের মতো। এমনকি তারা আমাদের জাতির জনকের ছবিও ভেঙ্গেচুরে ফেলে রাখে মাটিতে।

তবে এবারের ঘটনাটি কে সার্বিক পর্যালোচনা শেষে প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র ধর্মীয় উন্মাদনা ও বিভাজন সৃষ্টির অভিপ্রায় বলে মানতে নারাজ আমি। কারন সুনির্দিষ্ট ধরণের একই ঘটনা অসচেতনতার দরুন একবার ঘটতে পারে কিন্তু এ ঘটনার সূত্রপাত ও সমাপ্তি পূর্বের ঘটনাটির চেয়েও করুণ। এবার একইসাথে সল্প সময়ের ব্যবধানে ওরা এতগুলো স্থানে একই ধর্মের লোকজনের উপর এবং উপাসনালয়ে হামলা চালিয়ে কিসের ইঙ্গিত দিলো সেটা আমাদের বুঝার চেষ্টা করতে হবে।

২০১২ এর সেপ্টেম্বরে রামুতে ওরা তাণ্ডব চালিয়ে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চেয়েছিলো তখন জাতিসংঘের ৬৭ তম অধিবেশন চলছিলো আর এবার যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সিলেটের হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের ছাতক, বরিশালের বানরিপাড়ায় হামলা হলো সে সময়টাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আমাদের দেশের জন্যে। কারন গত সেপ্টেম্বরে গেল জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশন, কিছুদিন পূর্বে চীনের রাষ্ট্রপতি সফর করে গেলেন বাংলাদেশ, তার পরদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন ভারতে বিমসটেক এর সম্মলনে।

আর একটু গভীরভাবে ভাবলে আরো একটি জিনিস সামনে আসতে পারে। সেটি হলো পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক নামেমাত্র বিদ্যমান যেটা কিছুদিন পূর্বে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় পরিষ্কার হয় এবং ভারতে হিন্দু ধর্মবলম্বীগণ সংখ্যায় গরিষ্ঠ। এক্ষেত্রে চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশে তাৎপর্যপূর্ণ সফর কে ভারতের গাত্রদাহে পরিণত করতে গিয়ে যদি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মবলম্বীগণের উপর অত্যাচার-জুলুম করা হয় ও তাঁদের উপাসনালয় ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় তবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের একটু হলেও বিরুপ ধারণা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে চীনের সাথে যেহেতু পাকিস্তানের সুসম্পর্ক বিদ্যমান সেহেতু বাংলাদেশ হতে অন্য ধর্মের লোকজন কে অত্যাচার-নির্যাতন করে কোণঠাসা করে যদি এইদেশ কে পাকিস্তানের মতো ধর্মরাষ্ট্রে পরিচিত করে দেওয়া যায় তবে এর সাথে জড়িত সংঘবদ্ধ কুচক্রী মহলের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন না হলেও বাংলাদেশ কে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় কিছুটা হলেও বেগ পেতে হবে যা ঐ আহাম্মকদের নিকট এক বিশাল প্রাপ্তি মনে মনে।

যাই হোক দুটি ঘটনার সময়,কাল,প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উপরোক্ত আশংকাসমূহ নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনার ফসল। বাস্তবে এমনটা নাও হতে পারে।

সর্বশেষ একটি কথাই বলতে চাই, প্রশাসনের একার পক্ষে এ ধরণের ঘটনা প্রতিহত কিংবা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় । আমরা যদি প্রতিটি নাগরিক বিবেকের দুয়ার উন্মোচন করে কাঠমোল্লা না হয়ে রাসূল (সা.) এর প্রদর্শিত সরলপথে নিজ জীবন কে পরিচালিত করতে সক্ষম হই তবে ইহকাল-পরকালের বহু ফয়দা আদায় হবে।