ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

অনলাইন নির্ভর যুগে যেহেতু বিভিন্ন পরিবহনের টিকেট অনলাইন টিকেটিং সেবার বদৌলতে ইন্টারনেট সমর্থিত মুঠোফোনেও ক্রয় করা যায়, সেহেতু ভোগান্তি নিরসনে এবং কিছু অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ দিয়ে হলেও সময় বাঁচাতে এর জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। সর্বক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথে এর আবির্ভাব নিঃসন্দেহে মানব জীবনে ইতিবাচক কিছু উপহার দিবে সে প্রত্যাশাই ২০১৬ এর ২৫শে ডিসেম্বর সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বরিশালগামী দিনে চলাচলকারী কথিত অত্যাধুনিক ক্যাটারমেন ভ্যাসেল (নৌযান) গ্রীনলাইন-২ এ ২৪/১২/২০১৬ ইং সন্ধ্যায় অনলাইন টিকেটিং পোর্টাল paribahan.com থেকে বিজনেস ক্লাসের ২টি টিকেট তাঁদের নির্দেশনা মোতাবেকই ক্রয় করেছিলাম। যেহেতু ২৫ তারিখ বড়দিনের ছুটি এবং টানা তিন দিনের ছুটির শেষ দিন ছিলো তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঝামেলামুক্ত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে টিকেট এর জন্য কোন অফিসে না গিয়ে আধুনিকতার আশ্রয় নিয়ে ছিলাম। ২৪ তারিখ সন্ধ্যায়ই টিকেট নিশ্চিত করে বিকাশের মাধ্যমে সার্ভিস চার্জসহ লেনদনও সম্পন্ন করি। উপরন্তু তাঁদের অফিসে ফোন করে এটাও জেনে নিয়েছিলাম যে, ঘাটে গিয়ে কি কোন আনুষ্ঠানিকতার অধ্যায় বাকি রইলো কি না। তাঁরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানালো যে, স্যার গ্রীনলাইন কোম্পানি থেকে আপনার মুঠোফোনে যাবতীয় তথ্য সম্বলিত যে ক্ষুদে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে সেটা দেখালেই হবে। এরপরে এমন একটি নামকরা কোম্পানির সম্পর্কে আর কোন শঙ্কা মানুষ হিসেবে আমার মনে বিন্দুমাত্র ছিলো না।

২৫শে ডিসেম্বর যথারীতি যাত্রা শুরুর ৪৫ মিনিট আগেই তিন বছর বয়সী মেয়েটা, স্ত্রী সমেত হাজির হলাম লালকুঠি লঞ্চঘাটে। পৌঁছে পন্টুনে বাধা নৌযানে আরোহণ করতে যেয়ে শুরু হলো বিপত্তি। গেটে তাঁদের সুপারভাইজার, কোম্পানির লোক, নৌযানের চালক, স্টাফ থেকে শুরু করে আরো অনেকেই ছিলেন। তাঁরা টিকেট দেখতে চাইলে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললাম যে, আমার টিকেট অনলাইনে ক্রয়কৃত এবং তাঁর স্বপক্ষে মোবাইল বের করে গ্রীনলাইন কোম্পানি থেকে পাঠানো নিশ্চিতকরণ বার্তা (ই-টিকেট) দেখালাম। তাঁরা একে একে সবাই এমনভাবে দেখলো যে, পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য জাতীয় কোন কিছু দেখছে। সুপারভাইজার আর ঘাটে দায়িত্বরত তাদের স্টাফ বললো, এর কোন ভিত্তি থাকলে আপনি ঘাটের কাউন্টারে গিয়ে কাগজে মুদ্রিত টিকেট নিয়ে আসেন।

তাঁরা যখন একথা বলতেছে তখন ঘড়িতে ৭.৫০ মি.। মানে হাতে আছে ১০ মিনিট কাউন্টারে যেতে সময় লাগবে ২-৩ মিনিট। পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে মেয়েটিকে স্ত্রী’র কোলে দিয়ে ছুটলাম কাউন্টারের পানে। গিয়ে দেখি লাইনে নিম্নে হলেও ১০০+ জন নারীপুরুষ টিকেট ক্রয়ের জন্য অপেক্ষমাণ। এখন এতো মানুষের মধ্যে দিয়ে সিরিয়াল ভেঙ্গে কি করে একটি মুরগির খোপের মতো জরাজীর্ণ কক্ষে বসে থাকা কাউন্টারের লোকজনের সাথে কথা বলবো তার কোন সুযোগই ছিলো না। অন্যদিকে শুনতে পাচ্ছি তাঁদের মহামূল্যবান ভেসেল হুইসেল দিয়ে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি শুরু করে ফেলেছে। এটা দেখে পুনরায় দৌড়ে আসতে আসতে তারা ছেড়ে ১০-১২ দূরে চলেও গেছে। অন্যদিকে আমার স্ত্রী মেয়েটা কে নিয়ে ব্যাগ সামাল দিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা।

পরে ঘাটে কর্তব্যরত স্টাফকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমার বিজনেস ক্লাসের সিট নম্বর সম্বলিত ই-টিকেট নিয়ে সময় অপচয় করলেন আপনারা, আর এখন প্যাসেঞ্জার না নিয়েই কিভাবে আপনাদের নৌযানটি ছেড়ে গেলো? উত্তরে বললেন, ‘আপনি আগে বলবেন তো এটা!’ আমাদের জাহাজ এখনো পুরোপুরি যাত্রা শুরু করেনি বরং আপনি আবার কাউন্টারে গিয়ে বলে আসুন যে, আপনি আনলাইন টিকেটের যাত্রী। ততক্ষণ পর্যন্ত উনার কথার উপর ভরসা করে পুনরায় কাউন্টারে গিয়ে দেখলাম যে তাঁদের দুইজন লোক কাউন্টারের বাহিরে হাতে লিখে টিকেট বিক্রি করছে। তাঁদের সমস্যার কথা জানাতেই বললো যে, ‘শীঘ্র দৌড় দেন, আমাদের ট্রলারে তেল যাবে ঐ নৌযানের। আপনি ট্রলারে গিয়ে জাহাজে উঠতে পারবেন। শুনে দৌড়ে এসে দেখি আরেকটি জাহাজ গ্রীনলাইন-৩ ঘাটে বাধা আর আগের লোকটি সেটাতে যাত্রী তুলছে। ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের তেলের ট্রলার কোথায়? উত্তরে জানালো যে এই জাহাজের অন্য সাইডে, আপনি জাহাজের পাশের সরু জায়গাটি দিয়ে হেঁটে ট্রলারে উঠুন।’

সেটাও মেনে নিয়ে কোলে মেয়েটিকে শক্ত করে চেপে ধরে একহাতে ব্যাগ আর অন্যহাত স্ত্রী’র হাত সমেত এক ফুটের মতো জাহাজের পাশের অবশিষ্ট জায়গা ধরে ছুটলাম, ট্রলার দেখলাম তাঁদের, চিৎকার করে ডাক দিচ্ছি আর ছুটছি কিন্তু ট্রলার তো তাঁদের আধ্যাত্মিক কোম্পানির আধ্যাত্মিক নিয়মে দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে গেল। ব্যর্থ হয়ে মাথা অন্যদিকে ঘুরাতেই দেখলাম যে, এতক্ষণ যে পথটুকু দিয়ে দৌড়ে এসেছি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জিং, আর আমি কোলে ছোট্ট মামনিটিকে নিয়ে দৌড়ে এসেছি! স্ত্রী’র মুখে কোন কথা নেই, ও শুধু ভয়ে কেঁপেই যাচ্ছে আর বলছে যে চলো আমাদের যেতে হবে না। টিকেটের টাকা গচ্ছা গেলে যাক। কোনমতে ওদের নিয়ে পুনরায় সাইড ঘুরে পন্টুনে উঠতেই প্রথম বয়ানকারিকে পেয়ে গেলাম। কিন্তু চোখের সামনে ভাসছে যে, ওদের তামাশার মূল্য দিতে গিয়ে আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমার বাবুটা সমেত আমরা তিনজনই ডুবে মরার পথে এগিয়ে গিয়েছিলাম। একমাত্র মহান রাব্বুল আলামিনের করুণায় ফেরত আসা।

যেহেতু, ফিরে আসা দ্বিতীয় জীবন সেহেতু এর বিহিত না করে আসার মতো পাত্র আমি নই। হক আদায়ের বিষয়ে মাঠ ছেড়ে দর্শক হওয়ার পাত্র কোনদিনই ছিলাম না। সেই প্রথম বয়ানকারি কোম্পানি স্টাফের দিকে নেক দৃষ্টির পরিবর্তে গুনাহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, এখন নতুন কি সমাধান দিবেন আপনারা…? আপনাদের কথা শুনতে গিয়ে তো সপরিবারে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরত এসেছি আল্লাহ্‌ পাকের ইচ্ছায়, এবার বলুন আমার টিকেট কেন আপনারা বা আপনার কোম্পানি মেনে নিবে না। শুরু হয়ে গেলো তুমুল বাকবিতণ্ডা আর যুক্তি খণ্ডনের প্রলয়। অবশেষে এই জাহাজের সুপারভাইজার এসে বললো যে, আচ্ছা আপনারা ভেতরে গিয়ে বসুন। আমাদের এই ট্রিপে সিট খালি গেলে সেটাতে আপনারা যেতে পারবেন। ওনার প্রস্তাবে যে কিছু বলবো, কণ্ঠ থেকে স্বর বের হচ্ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শুধু মামনিটার দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি কি হতে পারতো পরিণতি আজ! কোনভাবে একটু পানি গলায় ঢেলে সরাসরি জাহাজে উঠে গিয়ে আমার আগের জাহাজে যে সিট বরাদ্ধ ছিলো তার চেয়েও সামনে এগিয়ে বসলাম। কিন্তু চোখের সামনে থেকে ঐ দৃশ্যটা যাচ্ছে না কোনমতেই।

ওরা দেখলো যে একটা শিশু আমার কোলে, সাথে স্ত্রী কিন্তু তারপরেও ঐ অহংকারী কোম্পানির স্টাফগুলোর মনে সামান্য মানবতাবোধের উদয় হলো না। আসনে বসে চোখ বন্ধ করে আমার মালিক কে বলেছিলাম, “হে আমার রব,হে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিচারক এবং শেষ দিবসের মালিক, আমি সম্পূর্ণ সঠিক থাকার পরেও যারা ক্ষমতার জোরে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন হয়রানি করলো যাতে আমার অবুঝ ও নিষ্পাপ সন্তান কেও আমি হারিয়ে ফেলতে পারতাম; তাঁদের কসুর তুমি কোনদিন মাফ করো না।”

শুধুমাত্র ওদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে একটি নিষ্পাপ শিশু এবং একজন নারী সেদিন আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন বাজি রাখতে বাধ্য হয়েছিলো। বিশ্ব মানবতা পদদলিত হয়েছিলো ওদের পদতলে। ওরা অনেক অর্থ-বিত্তের প্রভাবশালী মালিক, মিনিটে মিনিটে নিয়মকানুন বানায় আবার ভাঙ্গে কিন্তু অহংকার আর দম্ভে ওরা সেদিন ভুলেই গিয়েছিলে যে, অসহায় মজলুমের দীর্ঘশ্বাস আর আর্তনাদ মহান রবের আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নিশ্চয়ই তিনি দম্ভকারী দের একটি সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন, অতঃপর পাকড়াও করে থাকেন।

green-420170422164937

গতকাল ২৩/০৪/২০১৭ইং বিকেলে ঢাকাগামী সেই গ্রীনলাইন-২ ই একটি মালবোঝাই কার্গোর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে পতিত হয়ে তলা ফেটে অর্ধ ডুবো হয়ে গেল কোনমতে যাত্রীরা প্রাণে রক্ষা পায়। যাত্রীরা সবাই নিরাপদে আছেন কিন্তু বিপদে পতিত ঐ স্বেচ্ছাচারী, অমানবিক এবং দানবীয় আচরণের কোম্পানিটি।

ডুবন্ত গ্রীনলাইন-২

বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে গেছে। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরের ধারে নেয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণে বেঁচে গেছেন। এ ঘটনায় কার্গোটি পানিতে ডুবে গেছে। একই সঙ্গে গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের নিচের অংশও পানিতে তলিয়ে গেছে। শনিবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ অভিশাপ নয়, প্রকৃতির এই নিয়মটি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, “ক্ষমতা আর অর্থের গরমে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দুনিয়াবি লোভে অন্যেকে সাময়িক জুলুমের পাত্রে পরিণত করতে পারবে, কিন্তু যার হুকুম ব্যতীত নিঃশ্বাস চলে না তার থেকে কভু পরিত্রাণ পাবে না। এক সেকেন্ডের জন্য হলেও তার বিচারের পাল্লায় আমাদের সবাইকে উঠতে হবেই হবে।” অনেক দম্ভভরে দাপিয়ে বেড়াও লালকুঠি লঞ্চঘাটের লাট সাহেবের বাবু কিন্তু বিধাতার হুকুমে আজ তুমি কাবু!