ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

যে পৃথিবীতে আমরা যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছি তা কবে মহান সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছিলেন এবং আদম সন্তানদের কবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তা আমরা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারব না। এ বিষয়ের জ্ঞান একমাত্র সৃষ্টিকর্তারই আছে। জীবের আগমনের পরেই তারা বিভিন্ন দল, সম্প্রদায়, শ্রেণী-গোষ্ঠী, বংশ দ্বারা বিভাজিত ও পরিচিত হতে শুরু করে পরস্পরের মধ্যে। এরপর মানুষই নিজেদের সুবিধার্থে পৃথিবী নামক এই বিশাল ভূখণ্ডটিকে বিভিন্ন ভাগে করে, ভাগগুলোকে পরবর্তীতে বিভিন্ন উপ-ভাগে ভাগ করে নেয় নিজেদের মধ্যে এবং তারা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পরে এর একেকটি ভাগ, উপ-ভাগে নিজেদের জীবনধারণের তাগিদে। সর্বশেষ এই বিশালাকৃতির পৃথিবীটা বিভিন্ন অংশে ভাগ হয়ে পরিচিতি পায় একেকটি মহাদেশ, উপ-মহাদেশ হিসেবে।আবার এগুলোর অন্তর্ভুক্ত আছে বিভিন্ন আকৃতির দেশ। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তো আমাদেরকে অবিভাজিত পৃথিবী উপহার দিয়েছিলেন তবে মানুষ কেন এটাকে দেশ, মহাদেশ এ ভাগ করে নিল? উত্তরে একটি কথা বলা যায়,সৃষ্টিকর্তা তো কোন ধর্মগ্রন্থে এমনটা বলে দেন নি যে এই পৃথিবী অবিভাজ্য, তোমাদের সুবিধার্থে একে বিভিন্ন অংশে বিভাজন করতে পারবে না এবং যদি বিভাজন করো তবে তা মহাপাপের শামিল হবে।

তাহলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে যখন উত্তর ও দক্ষিন দুটো ভাগে বিভাজন করা হল তখন আমাদের সামনে এত সমস্যা তৈরি হওয়ার কারন থাকারও কথা নয় এ জন্য যে আমাদের দেশে যত ধর্মের মানুষ আছে তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের কোথাও এমনটা উল্লেখ নেই যে দেশের রাজধানী বিভাজিত হলে বসবাসরত নাগরিকদের সমাজ-সংস্কৃতি,নাগরিকত্ব,প্রচলিত প্রথা,নিয়মকানুন,জাতিগোষ্ঠী,নিজ নিজ বংশপরিচয় এবং সর্বোপরি দেশ জলে ভেসে বিলীন হয়ে যাবে। আরও একটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করে দেখা উচিত যে এই রাজধানী বিভাজনের ব্যাপারে আমাদের দেশের প্রচলিত আইনের ভাষ্য কি?এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ভাবে দেশের প্রচলিত আইনগুলোতে কোন কিছুই ব্যাক্ত করা নেই, বিশেষ করে সাংবিধানিক আইনেও বলা নেই যে রাজধানী আবিভাজ্য, শুধু বলা আছে যে দেশের রাজধানী হবে ঢাকা।

রাজধানী ঢাকা কে কোন ব্যাক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বিভাজন করা হয়নি কিন্তু একটি দলীয় সরকার এটি করেছে আর তাতেই যত বিপত্তি। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমানো, পরিকল্পিত নগরায়ন, শহর উন্নয়ন, বসবাসরত নাগরিকদের মানসম্পন্ন ও দ্রুত সেবাপ্রদান, জনগনের ভোগান্তি কমানো এইগুলো ঢাকা শহরে বসবাসরত মানুষের আজকের দাবী নয়, অনেক আগেরই দাবী ছিল। আর সরকার এই দাবীগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজধানী কে দুটি অংশে ভাগ করে নাগরিক সমস্যাগুলো কিছুটা হলেও কমানোর চেষ্টা করেছে মাত্র, নিজেদের নামে ভাগ ভাগ করে এক একটি ওয়ার্ড কে তো আর নেতাদের নামে বরাদ্ধ করে দেয় নি।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজ কর্মের গতিশীলতা আনয়ন, একটি প্রতিষ্ঠানের উপর অসহনীয় কাজের চাপ কমানো এবং নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রমে তদারকি বৃদ্ধির লক্ষ্যে যখনই এই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভাজন আইনটি পাস হলো ঠিক তখনই দেখা গেল দেশের প্রধান বিরোধীদল একে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে লুফে নিল। আর তাদের সংগে যোগ দিল সুবিধাবাদী কথিত সুশীল সমাজের কিছু লোক যাদের কাজই হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যে মেয়াদে যারা প্রধান বিরোধী দলে থাকে, তাদের ও দেশের সহজসরল জনগণকে বিভিন্ন কাল্পনিক রূপকথার মতো মন্তব্য-বিবৃতি প্রদান করে সরকার,বিরোধী দল এবং দেশের জনগণকে পরস্পরের মুখোমুখি করে দাঁড় করিয়ে দেয়া।

যদি বিরোধীদল ও কথিত সুশীল সমাজ জনগনের মঙ্গলের জন্য এসব করত তাহলে কোন প্রকার আলোচনা-সমালোচনার কথাই আসত না। কিন্তু কষ্টের বিষয় হলো এই বিভাজনে দেশের বা রাজধানীতে বসবাসরত নাগরিকদের কোন ক্ষতি হবে না জেনেও তারা এর ঘোর বিরোধিতায় লিপ্ত, সরকারের প্রতি বিদ্বেষের প্রথম কারন হলো ক্ষমতাসীন সরকারী দল এই আইনটি প্রণয়ন করেছে তাই এটি ভুল ও জনবিরোধী আর দ্বিতীয় কারণটি হলো আমাদের দেশের শতকরা ৬০-৬৫ ভাগ জনগন এখনও এতটাই সহজ-সরল যে কোন গুজব যদি একবার আমাদের কান পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারে তবে তা শুনতে যতটুকু সময় ব্যায় হয় বিশ্বাস করতে তার চেয়েও কম সময় ব্যায় হয় এবং এই বিশ্বাস কে ধারন করে আমরা জীবন বাজী রাখতেও পিছ পা হই না। আর আমাদের এই দুর্বলতাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আমাদের রাজনীতিবিদদের একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য। অথচ যারা তাদের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে জীবন বাজী রেখে তাদেরই স্বার্থে যুগে যুগে জীবন পর্যন্ত দিয়েছে, সেই অভাগা জনগনের রেখে যাওয়া উত্তরসুরিরা আজ পর্যন্ত কিছুই পায় নি এই রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে। পেয়েছে শুধু তারাই, যার নায়ক এই মরণ খেলার।

ঢাকাকে বিভক্তি নিয়ে দেশের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে আর এক মরণ খেলা, যে খেলার ফলাফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ জিতবে কেউ হারবে আর মাঠের বল বলুন বা দাবার গুটিই বলুন তা হবে আমাদের সহজ-সরল জনতার মধ্যে থেকে আমি অথবা আপনি। কারন “কান নিয়েছে চিলে” তাদের বলা এমন একটি কথাকে কেন্দ্র করে “কানের খোঁজে, চিলের পিছে মরবো ঘুরে আমরা সবাই মিলে………………….”