ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ,চাঁদাবাজি,মানুষ গুম এই ধরনের অপরাধগুলো দেশে বিগত ১০ বছরের চেয়ে বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক আধুনিকায়নের পাশাপাশি অপরাধীরাও ক্রমেই অপরাধজগতে উন্নত থেকে উন্নত কৌশল অবলম্বন করছে। হয়তো এসব আধুনিক অপ কৌশল প্রয়োগ করে তারা বিভিন্ন অপরাধের চেষ্টায় লিপ্ত কিন্তু নিতান্তই তা সাময়িক সময়ের জন্য, কারন বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি ভয়ংকর সব অপরাধীরা সর্বোচ্চ কৌশল অবলম্বন করেও আইনের ফাঁক গলে বেরোতে পারে নি। যেকোনো ভাবেই হোক তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পালাক্রমে ধরা পরেছে এবং তাদের অধিকাংশই এখনও বিচারের আওতায় আছে আবার কেউ কেউ অপরাধের শাস্তিও ভোগ করছে। বর্তমানে গুপ্তহত্যা নামক জঘন্য অপরাধটি দেশে এমনভাবেই বেড়েছে যে একে কেন্দ্র করে সাধারন মানুষ চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ,ব্যাবসায়ী,ছাত্র এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও কয়েকজন সদস্য এর শিকার হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পরেই সংবাদে আসে যে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে গেছে তারপর কারও মৃত অবস্থায় হদিস পাওয়া গিয়েছে আবার এখন পর্যন্ত কারো কারো খোঁজও মিলে নি। একটি সংঘবদ্ধ অপরাধিচক্র যে এই অপরাধগুলো করে যাচ্ছে তা প্রায় নিশ্চিত এই কারনে যে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নৈতিকতা এখন পর্যন্ত এতটাই নিচে নেমে যায় নি যে তারা গ্রেপ্তারের নামে ধারাবাহিকভাবে এমন বেআইনি কাজ করেই যাবে আর তা কোনদিনই প্রকাশ পাবে না। যতগুলো ঘটনা ঘটেছে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে তারা প্রায় সবাই একটি কৌশলই অবলম্বন করেছে যা হলো [সাদা পোশাক,সাদা গাড়ি,হ্যান্ডকাপ,অপরাধীদের একই দেহের গড়ন,অস্ত্র,গাড়িতে তুলেই চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়া] এবং বেশীরভাগই সময় হিসেবে বেঁছে নিয়েছে দুপুরের পরের সময়,সন্ধ্যা নামার পর পরেই ও গভীর রাত্রে। আর বাসা থেকে যাদের তুলে নিয়ে গেছে শুরুতেই পরিবারের সদস্যদের এমন আতংকিত করেছে যে পরিবারের সদস্যরা তাদের পরিচয়পত্র,গ্রেফতারী পরোয়ানা দেখতে চাওয়ার মতো কোন সুযোগই পায় নি সাথে এতই স্বল্প সময়ে অপরাধগুলো করেছে নিশ্চিত হবার জন্য নিকটস্থ থানা,পুলিশ ফাঁড়ি বা র‍্যাবের কোন দফতরে যোগাযোগও করা সম্ভব হয় নি। আবার কাউকে তুলে নিয়ে গেছে তার বাসস্থান বা এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূর থেকে।

আর সকল ক্ষেত্রেই একটি পরিচয় দিয়েছে তা হল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। ব্যাপারটা এখানেই,(১)তারা যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হত তবে কাজটি করার সময় তারা কেন তাড়াহুড়া করে তাদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ ব্যাক্তির পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় দেন নি?(২)যাদের কে ধরে নিয়ে গেছে তারা কেউই অবৈধ অস্ত্রধারী নয় তবে কেন তাদের পরিবারের সম্মুখে বা যেখান থেকে তুলে নিয়ে গেছে সেই স্থানে প্রকাশ্য একাধিক অস্ত্র প্রদর্শন করে জনমনে চরম ভীতিসঞ্চার তৈরি করেছে?(৩)আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল অভিযানে সব সময় তারা তো একই রঙের গাড়ি ব্যাবহার করেন না তবে কেন তারা এই ক্ষেত্রে একই ধরনের সাদা গাড়িগুলোই ব্যাবহার করল?(৪)আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কখনোই কাউকে গ্রেপ্তেরের পরে চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেন না এবং কাউকে গ্রেপ্তার করতে খুব বেশী বেগ পেতে না হলে প্রাথমিক অবস্থায় আঘাত করেন না তাহলে এই ক্ষেত্রে তারা কেন এই কাজটি করতে গেলেন যেখানে এটি করতে গিয়ে কোন প্রকার বাঁধা বিপত্তির সম্ভাবনার লেশমাত্রও ছিল না?(৫)যেহেতু আক্রান্তরা কেউই পালিয়ে ছিলেন না বা পালানোর বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজটি করতে গিয়ে সকল ক্ষেত্রে কেন তারা দিনের সবচেয়ে নিরিবিলি সময় ও স্থান কে বেছে নিয়েছিলেন?(৬)সর্বোপরি এতগুলো ঘটনা ঘটল, তারা যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হত অন্তত একটি ঘটনার পরে তো ধরে নিয়ে যাওয়া ব্যাক্তিকে থানা বা আদালত বা র‍্যাবের ক্যাম্পে সোপর্দ করতেন কিন্তু সে রকমও কোন উদাহরন এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে পাওয়া যায় নি।

গুপ্তহত্যা সম্পর্কে এই প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর খুজতে গেলে কোন উত্তরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।এমতাবস্থায় সমাজের কেউ যদি স্বাভাবিকভাবে না ভেবে অনেক বাড়িয়েও এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভাবেন যে তারা কোন না কোনভাবে প্ররোচিত হয়ে এ কাজগুলো করেছে, তাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ করা তো দূরের কথা তাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকানোও যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় না।এত বিশাল একটা বাহিনীতে যে বিপথগ্রস্থ কেউ নেই,তারা যে শতভাগই উত্তম তাও আবার নয় কিন্তু সে সংখ্যা ২০-৩০% এর বেশী নয়,আর এই ২০-৩০% সদস্য এতটাই বিপথগ্রস্থ নয় যে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক পরিকল্পিত গুপ্তহত্যার সাথে জড়িয়ে যাবেন আর তাদের উপরমহল কিছুই জানবে না।

সকল প্রশ্নের উত্তরে একটি জিনিসই পাওয়া যাবে তা হল কোন খারাপ উদ্দেশ্যে একটি ভয়ংকর সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে এই ঘৃণ্য অপরাধগুলো করে যাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে সাধারন জনগনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর বিরূপ ধারনা পোষণ করিয়ে তারা কৌশলে পার পেয়ে গিয়ে তাদের ঐ খারাপ উদ্দেশ্যে সফল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

তাই আসুন কোন নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমান ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ না করে আমরা সম্মিলিতভাবে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এসব অপরাধী নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সহযোগিতা ও আন্তরিকতার হাত বাড়িয়ে দেই, তাহলে গুপ্তহত্যা কেন তার চেয়েও বড় অপরাধ রোধ করা সম্ভব।