ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আজকের বিজয় দিবস উদযাপিত হছে একটা ভিন্ন আবহে , অনেকটা যেন সত্যিকার উৎসবের আমেজে । আগে কোথায় যেন একটা কমতি থাকতো, বুকের কোন এক কোনায় একটা অব্যক্ত বেদনা আর আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকতো । বিজয় দিবসেও অনেক রাজাকারের গাড়িতে পতাকা উড়ত । আজকের বিজয় দিবসের আগে সেই চিত্র নেই । অনেক বড় বড় রাজাকারের ফাঁসি হয়েছে , বিজয়, স্বাধীনতার অর্জন অনেকখানি-ই আজ কলংক মুক্ত হয়েছে । আজ মনে আগের চেয়ে সান্তনা অনেক বেশি । কিন্তু এখনো অনেক রাগের কারন ঘটে যখন দেখি কেউ কেউ বলে ‘এতো বছর পরে এই বিচারের নামে দেশকে বিভক্ত করার কি দরকার ছিল , কিংবা এই রাজাকের সেই মানুষ না , এই মানুষ ধর্মিয় নেতা।’

কেউ কেউ বলে, ‘রাজাকারদের বিচার করলে মুক্তি যোদ্ধাদের বিচার করছেনা কেন যারা অনেক বিহারিকে মেরে ফেলেছে বিনা বিচারে ।’ ঘেন্নায় তখন গা রি রি করে । যারা বলে, তাদের অনেকের তখন জন্ম-ই হয়নি বা ঘুবই ছোট ছিল । পাকিস্তানি মিলিটারি আর রাজাকাররা যে কী করেছে , ওদের ভয়ে মানুষ কেমন মৃতপ্রায় হয়ে বাঁচত সেই সময়, সেই সকল দৃশ্য এরা দেখেনি। আমি এবং আমার মত যারা,তখন অনেক ছোট হলেও অনেক কিছু দেখেছি । কেমন করে এক মা তার সন্তানের নিরাপদে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকে । কেমন করে একটা ছোট বাচ্চা ছেলে তার মা ঘরে ফিরবে কিনা ভেবে নানীর কোল ঘেসে বসে থাকে প্রতিক্ষায় সেটা আমি দেখেছি । আমি দেখেছি কেমন বিকৃত রুচি নিয়ে মিলিটারি আর রাজাকাররা রাস্তার কোনায় মানুষকে দাড় করিয়ে রেখে তার লুঙ্গির বাঁধন খুলে সে মুসলমান কিনা সেটা দেখাতে বাধ্য করতো । আমি দেখেছি আমার মা যখন হাসপাতালে চাকুরিতে যেতো কাজ শেষে ঘরে ফেরার আগে পর্যন্ত আমার নানী হাতে তসবী নিয়ে আয়তুল কুরসি না কি যেন পড়তেই থাকতো । আমি আর আমার বোন না বুঝে দুষ্টামি করলে বকা দিতেন, যে কেমন করে আমাদের মনে এতো আনন্দ আসে এই বলে । কি ভয় আর সংকা নিয়ে একেকটা সন্ধ্যা আসতো তখন আমাদের জন্য ।
আমার একটা ঘটনার কথা বেশ মনে পড়ে । আমি খালার বাড়ি সোনারগাঁয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম ৭১-এর কোন একটা সময়ে । ফেরার পথে আমাদের বাস যাত্রাবাড়ি-র কাছে আসতেই বাস থামিয়ে পাকিস্থানি মিলিটারিরা বাস থেকে সবাইকে নামিয়ে লাইন ধরে দাড়া করালো । সবার কাছে থাকা ছোট-খাটো ব্যাগ , তাদের জামা প্যান্ট-লুঙ্গি তল্লাশি করছিল । আমার সাথে সাথে ছোট একটা ব্যাগে পিঠা বা ঝুরি পিঠা জাতীয় কিছু ছিল । সেটা দেখে নিয়ে আমি খুব ছোট বলে আমাকে আগেই আবার বাসে উঠতে দিল । প্রায় সবাইকে বাসে ফেরত উঠতে দিলেও একজন কি দু’জনকে বাসে উঠতে দিলনা । ওদেরকে রেখেই বাস ছেড়ে দিতে হুকুম দিল । আমি জানিনা সেই মানুষগুলো আর কোনদিন তাদের বাড়ি ফিরে এসেছিল কিনা । অনেক কিছুই আমিও ভুলে গিয়েছিলাম । লিখতে গিয়ে আবার আজ মনে পরছে হালকা মতন । কি ভয় যে সেদিন পেয়েছিলাম ! বাসায় এসে আমার নানীকে ধরে বলেছিলাম সেই ভয়ের কাহিনী । কি ভয় আর কষ্টে কেটেছে আমাদের সেই সব দিন আর রাত , সেটা আজকের অনেকেই বুঝবেনা । আর সেইসব না বুঝে যখন কেউ তর্ক করতে আসে তখন মনে হয় , কষে গালে একটা…!