ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

কাজ করার জন্য গিয়েছিলাম মহেশখালী৷ মহেশখালীর রীতিনীতি তখন আমার জানা ছিল না৷ গিয়েছিলাম রাস্তা মেরামতে’র কাজে৷ রাস্তার কাজ বাদ দিয়ে লবণ এর মিলে কাজ নিয়েছি, আর এটাই আমার জীবনের প্রথম চাকরি৷ আমার সাথে আরো দুইজন ছিল৷ সেই মিলটির নাম ছিল জাকিরিয়া সল্ট৷ মিলের সবাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী, শুধু কেবল আমি’ই হিন্দু ধর্মের অনুসারী৷

আমাদের যেই লোক জাকিরিয়া সল্টে চাকরি লইয়ে দিতে সহায়তা করেছিলেন সেই লোকটির নাম ছিল ইসমাহিল৷ আমরা তাকে ইসলাম ভাই বলেই সম্মান করতাম। ইসলাম ভাই’র আরো তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন৷ তখন ইসলাম ভাই বলতেন আজ থেকে আমরা সাত বন্ধু৷ আমরা এক সাথে খেতাম, এক সাথে ঘুমাতাম, মোট কথা সাত মাথার এক মাথা৷ মিলে কাজ ছিল আট ঘন্টা৷ ছুটি হইত বিকাল পাঁচ ঘটিকায়৷ ছুটি’র পর আর দেরি করতাম না আমরা, ছুটে যেতাম মহেশখালী বাজারে৷ তখন প্রতি কাপ চা এর মূল্য ছিল চারআনা (২৫) পয়সা৷ সাতজন মিলে চা খেতাম পৌনে দুই টাকা, আর চারআনা দিয়ে চট্রগ্রামের আবুল বিড়ি কিনতাম৷ তারপর ছুটে যেতাম আদিনাথ পাহড়ে৷ এই যাওয়াটা ছিল শুধু আমার ইচ্ছার প্রতিফল৷ কারণ হল, আমি যেন তাদের খুবই প্রিয় একজন মানুষ৷ তাদের এই আচরণ দেখে আমার খুবই লজ্জা হত৷ আমি তাদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, কিন্তু না পারতাম না৷ এমনি করে কটে গেল চার মাস৷ আবার একদিন যদি আদিনাথ মন্দিরে যাওয়া না হয় পরদিন সকালবেলা মন্দিরের ঠাকুর মহাশয় এসে উপস্থিত৷ গতকাল মন্দিরে না যাওয়ার কারন জানতে চাইত, আজকে যাব কিনা সেটাও জিজ্ঞাসা করতেন৷ খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে কি না, টুকে টুকে সব খবর নিতেন৷

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির

এই আদিনাথ মন্দিরে বসে মন্দিরের ঠাকুর কর্তা’র সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়াছি৷ এই মন্দিরটি মহেশখালী বজার হতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে৷

ঢাকার লোক বলে কথা, যেখানে’ই যেতাম সাতজন, তবে আমার স্থানটুকু সবার আগের৷ সামান্য একটু লেখাপড়া জানি তাই অল্প দিনের মধ্যে সবার প্রিয় হয়ে উঠি৷ শ্রমিকদের মধ্যে শুধু আমিই একটু পড়তে লিখতে পারতাম, তার জন্যই আমার কদর ছিল সবার কাছে৷ মিলে ডিউটির পর ঘোরাফেরা করে মিলে এসে রাতের খাবার সেরে বসতাম চিঠি লিখনীতে৷ লিখতে বসলেও আরেক ঝামেলা দেখা যেত, ঝামেলা হল আগে আর পরে নিয়ে৷ সমাধান করে দিতেন ইসলাম ভাই৷ আমাকে বলতেন দুইটা চিঠি লিখবে৷ তখন সাতজন মধ্যে লটারি হত, আবার দিনের বেলায়’ই ঠিক করে রাখা হত কার চিঠি লিখা হবে৷ যার চিঠি লিখা হবে বিকালবেলা চা বিড়ির খরচ তাকেই বহন করতে হবে৷ অতি আনন্দে দিনগুলো অতিবাহিত করতে লাগলাম।

হঠাৎ এক সময় লবনের দাম কমে গেল৷ মিলে কাজও কমতে লাগল, আবার আমার সাথে আসা দুইজনের বাড়ি হতে তাদের ফিরিয়ে নিতে লোক এসে হাজির৷ আমি তাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলাম আমার মা’র কথা, তাদের কাছ থেকে উত্তর মিলল তোমার মা কিছু বলেনি৷ রাত্রি যাপন করার পর সকালবেলা আমার সাথে’র দুইজন জাকিরিয়া সল্ট মিল হতে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহেশখালী ত্যাগ করে, আমি তখন একা হয়ে গেলাম৷ মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল আমার। ইসলাম, আজাহার ও হানিফ ভাই আমাকে সান্ত্বনা দিতেন, বলতেন তুই নিতাই আমাদের আপন ভাই, আমরা খেলে তুই বাদ যাবি না৷ তাদের এই শান্ত্বনায় কিছুতেই আমার মন ভরছে না৷ শুধু অামার মায়ের কথাই মনে পড়ছে, কিছুতেই আমার মা’কে মন থেকে দূরে রাখতে পারছিলাম না৷

মহেশখালী বৈদ্য মন্দির

মহেশখালী বৈদ্য মন্দির৷ এই বৈদ্য মন্দিরটি মহেশখালী বাজার সংলগ্ন৷

সাথের তিনজন যাওয়ার পর সেই দিন আর মিলে কাজ করতে মন চাইল না, এক পর্যায় কাঁদছিলাম৷ আমার এমন অবস্থা দেখে ইসলাম ভাই সহ সকল শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিল৷আমি তখন আমার শোবার ঘরে কাগজ কলম নিয়ে বসছি আমার অভাগী মায়ের কাছে পত্র লেখার উদ্দেশে৷ এমন সময় ইসলাম ভাই সহ আরো চার পাঁচজন লোক আমার কাছে গিয়ে হাজির৷ আমার ভীষণ রাগ হতে লাগল৷ আমি শুধু ইসলাম ভাইকে বললাম দাদা আমাকে বিরক্ত করবেন না৷ ইসলাম ভাইয়ের বুঝে নিতে আর দেরি হল না, সবাইকে নিয়ে তিনি আমার কাছ থেকে চলে এলেন৷ আমি তখন ভাবলাম এখানে চিঠি লেখা যাবে না৷ আমি তখন কাগজ-কলম নিয়ে সোজা চলে গেলাম সেই আদিনাথ পাহাড়ে’র আদিনাথ মন্দিরে৷

মন্দিরে’র ঠাকুর কর্তা আমাকে দেখে খুব খুশি৷ বলল দুপরবেলা তুমি মন্দিরে’র প্রসাদ সেবা না করে যাবে না৷ আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিলাম, তারপর বললাম আমি তো কর্তা প্রসাদ সেবা করতে আসিনি৷ আমি এসেছি নিজের একটা কাজ সারতে৷ ঠাকুর কর্তা বললেন আচ্ছা ঠিক আছে, কাজ সেরে প্রসাদ নিয়ে যেও৷ আমি আমার মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে সোজা চলে গেলাম মন্দিরের সামনের বারান্দায়৷ তখন সঙ্গে করে নিয়ে আসা কাগজ কলম বের করে বসলাম৷

পত্র লেখা আরম্ভ করলাম, “শ্রীগুরু সহায়”শ্রী চরণকমলেষু, শ্রদ্ধেয়, মা জননী কেমন আছেন? আশা করি পরম করুণাময় আপনার শারীরিক ও মানসিক ভালভাবে রেখেছেন৷ সেই সাথে আশা রাখছি যে বড়দাদা সহ আমার তিন বোনকে ও সৃষ্টিকর্তায় ভালভাবে রেখেছেন৷ মা আমি আপনার আশীর্বাদে এক প্রকার ভালভাবেই আছি৷ মা আমার জন্য আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমি মা এখানে খুবই ভালভাবে আছি৷ মা জননী আমার, আজ মা আপনাকে ভীষণ মনে পড়ছে৷ কেন যে এত মনে পড়ছে তা আমি জানি না মা৷ আমার মন বলছে মা আপনি কাঁদছেন আমার জন্য, আর কেনইবা কাঁদছেন সেটুকু ও আমার মনে জানা দিচ্ছে মা৷ আমার সাথের দুইজন ফিরছে সেই জন্য, তাই না মা? তাতে কি হয়েছে মা, বর্তমানে আমি তো আপনার অবুঝ সন্তান নই মা৷ আমার মন বলছে আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন আমার ফিরে আসার ভাড়া তাদের কাছে দিতে, যোগাড় করতে পারেননি৷ তাতে কী হয়েছে মা, আমি তো ফিরবই৷ মা আমি এখানে ভালভাবে আছি, প্রতিদিন ২৫(পচিশ) টাকা করে প্রতিদিন মুজুরী পাচ্ছি মা৷ কিন্তু মা লবণের কাজ তো মা, একসাথে অনেক দিন কাজ করা যায় না মা৷ লবণের জ্বলে সমস্ত শরীর ঘা হয়ে যায় মা৷ অবশেষে ঔষধসেবন না করা পর্যন্ত আর কাজ করতে পারি না৷ মা আমার লেখাপড়া’র জন্য কোন প্রকার চিন্তায় থাকবেন না, আমি মা আসার সময় আমার স্কুলে পড়ার চারখনা বই সাথে করে নিয়ে এসেছি, দিনের বেলায় তো পড়তে পারি না মা, রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আমি আমার বই নিয়ে পড়তে থাকি৷ মা লেখার আরো অনেক ছিল, তবু আর বিশেষ কিছু লিখলাম না, শুধু লিখব আমার জন্য আপনার রাঙ্গা চরণের আশীর্বাদ যেন বহাল থাকে মা৷ আর বড় দাদাকে বলবেন আমার জন্য আশীর্বাদ করতে৷ আমার তিনি দিদিকে বলবেন আমার জন্য কান্নাকাটি না করে আমার জন্য আশীর্বাদ যেন করে৷ আর কি ইতি আপনার অতি আদরের ছোট ছেলে নিতাই৷

চিঠি লেখা শেষ করার পর ঠাকুর কর্তা বললেন এবার হাতমুখ ধুতে যাও, কর্তার আদেশ পাইয়া চিঠি খানা কোমরে গুঁজে হাতমুখ ধুতে যাই৷ হাতমুখ ধুয়ে আসার পর দেখি কাঁসার থালায় প্রসাদ৷ ঠাকুর কর্তা বললেন সেবন করতে বস৷ সেবনের মাঝে কর্তা জিজ্ঞাসা করলেন কি লিখলে? বললাম মায়ের কাছে চিঠি লিখলাম৷ প্রসাদ সেবনের মাঝে আরো অনেক কথা, তখন বিকাল গড়িয়েছে৷ আমি কর্তা হইতে বিদায় নিয়ে সোজা চলে এলাম মিলে৷ ততক্ষণে আমার জন্য ইসলাম ভাই সহ সকলে পাগল প্রায়, আমাকে দেখা মাত্র সবাই হৈ হৈ করে উঠে৷ ইসলাম ভাই বলল কোথায় ছিলি সারাদিন? বললাম মন্দিরে, ইসলাম ভাই বললেন এতক্ষণ! বললাম একটা চিঠি লিখলাম মায়ের কাছে৷ পরদিন মহেশখালী বাজারে গিয়ে চিঠিখানা পোস্ট করে দেই নারায়ণগঞ্জের ঠিকানায়৷

সোনাদিয়া দ্বীপ

সোনাদিয়া দ্বীপ

প্রিয় পাঠকগণ, আমার এই স্মৃতিকথা আজ থেকে অনেক দিন আগের৷ চিঠির ভাষাগুলো হয়তো এর চাইতে একটু অন্যরকম ছিল৷ তবে আমার মায়ের কাছে চিঠি লিখেছি বাস্তব সত্য৷ সেই চিঠিখানা আমার মা জননী অতি যত্নপূর্বক আনেক বছর রেখেছেন৷ তারপর আরো অন্ততঃ চার পাঁচ মাস পর আমার বড়দাদা মায়ের কান্নাকাটি সইতে না পেড়ে কোন এক লোকের কাছ থেকে ২০০/=টাকা ধার করে সেই মহেশখালী হতে আমাকে নিয়ে আসে৷ এখনো জীবনের প্রথম চাকরির কথা মনে পড়ে, জীবন চলার প্রতিটি মুহূর্তে৷ এই মাঝখানে চার পাঁচ মাসের আরো বহু স্মৃতিকথা ছিল, আর লিখলাম না৷