ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমার বড় দাদার সাথে টেক্সটাইল মিলে তাঁতের কাজ শিখে কাজ করছিলাম৷ সময়টা ছিল ১৯৮৪ ইংরাজী৷ কিছুদিন কাজ করার পর রাত জাগা কাজ আর ভালো লাগছিলনা। বড় দাদাকে বললাম, বড় দাদা বিষয়টি মাথায় রেখে মিলের ম্যানেজারের সাথে আলাপ আলোচনা করে আমাকে রিচিং (ড্রয়ারম্যান) এর কাজ দেয়৷ এই কাজে রাতের কোন ডিউটি নেই শুধুই দিনের কাজ৷ তখন আমারা নারায়ণগঞ্জের নন্দিপাড়ায় বাসাভাড়া করে থাকতাম আমরা সবাই৷ সংসারে ছয়’জন সদস্য আমরা৷ সংসার চলাতেন বড় দাদা, প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার বেতন পেতাম, বেতন পেয়ে অল্পকিছু টাকা নিজের কাছে রেখে বাকী টাকা বড় দাদার কাছে বুঝিয়ে দিতাম৷ বেতন পেতাম সপ্তাহ ৩৫০-৪০০টাকা৷ তখনকার সময় আমার দুইতিন’জন বন্ধু ছিল খুবই কাছের৷ বন্ধু দু’জনের মুদি ব্যবসা, মিলের কাজ শেষে করে আগে ওদের সাথে দেখা করে বাসায় যেতাম৷

এমনভাবে চলতে চলতে দূর্গাপূজা সমাগত, কদিন পরেই শুরু হবে দূর্গোৎসব৷ বন্ধুদের সাথে কথা হলো পূজায় একা কোথাও যেতে পারবোনা, তাদের সাথে থাকতে হবে৷ আর কি করা, থাকতে তো হবেই, না থাকার উপায় নাই৷ দূর্গোৎসব শুরু হয়ে তিনদিন অতিবাহিত হলো। রাত পোহালেই বিজয়া দশমীর প্রস্তুতি৷ বিজয়া দশমীর দিন বিকালবেলা ঢাকঢোলের বাদ্যে মুখরিত চারদিক, বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ আর যুবক যুবতীদের নাচের সাথে যেন আমার মা দূর্গোতীনাশিনীও নাচতে লাগল৷ আর মা দূর্গোতীনাশিনীর নাচ হলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত লাইট দ্বারা, হরেকরকম লাইট জ্বলছে নিবছে। এর কারণে দেখা যায় প্রতিটি মূর্তিই যেন বাদ্যযন্ত্রে আওয়াজের সাথে সাথে নাচছে৷ বন্ধুদের দিকে খেয়ল করলাম, তারাও নাচছে, তবে কারো হুঁশ বলতে কিছু নেই৷ তারা সবাই বেহুঁশ৷ ওদের কাছে আমার আগে থেকে নিষধ ছিল যে, আমি তোদের সাথে থাকবো ঠিক, তবে বেহুঁশ হবোনা, আর বেহুঁশ হওয়ার জন্য কোন অনুরোধও চলবেনা৷

আর এরকম বেহুঁশ ঈদে, বড়দিনে, বৌদ্যপূর্ণিমা সহ সব ধর্মাবলম্বীদের বড় বড় উৎসবের উৎসাহে হয়ে থাকে অহরহ৷ আর এই বেহুঁশ হলো কী দিয়ে সেটাও বলে দেই, (মদ্যপান)৷ যারা জীবনে মদ্যপান করেনাই এই প্রথম করলো, তারা এই প্রথম মাদকের উপর হাত রাখলো৷ যাক সেসব কথা,তবে বেহুঁশের কারণটা মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে অনবরত৷ আর ভাবছিলাম ওদের সাথে চললে আমার বিপদ আসন্ন৷ তারপর বিজয়া’দশমীর পরদিন থেকে আর তাদের সাথে দেখা বা কথা বলা থেকেও বিরত থাকলাম দীর্ঘদিন৷ টেক্সটাইল মিলে কাজ করি একটা হেলপার নিয়ে, বেতন দিতে হয়না, শুধু কাজ শেখানোর কথা৷ কাজ শেখার পর ওর মা-বাবার সাথে আলাপ আলোচনা করে বেতন দেওয়া হবে৷ মাসখানেক পরই বেতন ধরলাম মাসে ১০০/=টাকা৷ ছেলেটা মহাখুশি, তারপর দু’তিন মাস যাওয়ার পর একদিন দেখি ছেলেটা ওর দু’জন বন্ধুর সাথে ধূমপান করছে! আমি দেখলাম, ভাবলাম, একপ্রকার চিন্তায়ও পরলাম৷ চিন্তা করতে লাগলাম এই ১০-১২বছরের ছেলেটা আজ সিগারেট জাতীয় নেশায় আসক্ত? ক’দিন পরে কী হবে?

এসব চিন্তার আবির্ভাব ঘটে ছেলেটাকে যখন প্রাতঃকালে ডিউটির ঠিক আগমুহূর্তে দেখি তখন৷ কদিনপরে আর জিজ্ঞেস না করে পারলামনা৷ প্রশ্ন করলাম তোকে সেদিন দেখলাম সিগারেট টানতে! তোর আরো দু’জন বন্ধু সাথে ছিল, ওরা কারা? জবাবে বললো কইনাতো ওস্তাদ, এইডা আবার কী কন ওস্তাদ৷ আমনে আমারে দেহেন নাই, কারে না কারে দেখকা অহনে আমারে কইতাছেন৷ আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে, আমারওতো ভুল হতে পারে৷ কয়েক মাস পর ও আমার কাজ ছেড়ে দিয়ে মটর মেকারের কাজ নেয়৷ আমি ছেলেটার খবর নেই মাঝেমাঝে৷ ওর বাবা দিন’মজুরের কাজ করে৷ ছেলেটা পাঁচ ভাই’বোনদের মধ্যে সবার ছোট, বছরদুয়েক পর জানতে পারলাম ছলেটা এখন গাঁজাও সেবন করে অহরহ৷ শুনে খুব কষ্ট পেলাম, দুঃখ পেলাম৷ তারপর কেটে গেল অনেক বছর, কোন একসময় বিয়েও করে ফেললো ছলেটা৷ দুই সন্তানের পিতা, কোন কাজ করেনা, স্ত্রীর রোজগারের উপর নির্ভর৷

Madok-300x200

দংশহোক আমাদের সমাজ থেকে দেশ থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা৷মুক্তি পাক আমাদের যুবসমাজ৷

একদিন আমি রাস্তাদিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম হটাৎ কানে শব্দতরঙ্গ বেজে উটল৷ ওস্তাদ ও ওস্তাদ শনেন, আমি তাকালাম ওরদিকে,দেখি ছেলেটা রাস্তার পার্শ্বে ড্রেনের মধ্যে দাঁড়ানো, আমি চুপকরে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম৷ ও আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো আরে ওস্তাদ এখনতো চিনতেননা, আমি ওমুকে চিনছেন? আমি বললাম উঠে সামনে আসো৷ সামনে আসলো, দেখলাম দুইপায়ে আর দুহাতে ময়লায় একাকার৷ জানতে চাইলাম এই অবস্থা কেন? সরল ভাবে জবাব দিল ছেলেটা, বললো নেশায় শেষ হইয়া গেছি ওস্তাদ৷ ছেলটার কথা শুনে আমার কান্না আসতে লাগল৷ আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম ছেলেটাকে৷ জিজ্ঞেস করলাম ড্রেনের মধ্য কী কাজ? ছেলেটা বলল আরে ওস্তাদ এই ড্রেনের মধ্যে অনেক জিনিস পাওয়া যায়৷ হারাদিন ড্রেনেরতুনে লোয়ালংকর বিচরাইয়া ভাংগারু দোকানে লইয়া যাই৷ তারপর এই গুলো বেচ্চা নিজের খরচ চালাই৷ নিজের লাগে এক দেরশ টাকা৷এই এক দেরশ টাকা ওর নিজের’ই লাগে৷ অনেকক্ষণ পর বললাম, তোমার বাবা-মা বেঁচে আছে? উত্তর দিল না৷ একটু নীরবতা অবলম্বন করে বললাম হাত পা ধুয়ে আসো,তারপর শুনবো সবকথা৷ হাত পা ধুয়ে আসার পর নিকটবর্তী এক চা দোকানে নিয়ে গেলাম ছলেটাকে৷ জানতে চাইলাম বিয়ে করেছ? জবাবে বলল হ্যাঁ ওস্তাদ করছি, তয় বউ সুবিধার না৷ বললাম কেন? ও বলল আরে ওস্তাদ চাকরি করেতো আমারে দামদেয়না বুঝলেন, আবার নেশপানি করিতো ইল্যাইগা,বুঝেনাই ওস্তাদ৷ আবার কয় মইরা’যা তুই মইরা’যা৷

জানতে চাইলাম ছেলে পেলে কতজন, বললো দুইজন, একছেলে একমেয়ে, আরে ওস্তাদ ঘরের হগল্তে চায় আমি মইরা যাইনা কে৷ আমি আর ওর কথা শুনতে চাইলামনা, নিজের কাছে খারাপ লাগছিলো৷ আমি একশত টাকা ওর হাতে দিয়ে ওর কাছথেকে বিদায় নিলাম,বললাম পরে দেখা হবে৷ ও জিজ্ঞেস করছিলো অহন কী কাজ করেন ওস্তাদ! শুধু বললাম পরে বলবো, এখন যাই৷ হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম, সেদিনের একটা তরতাজা একটা ছেলে আজ নেশার কারণে আজ সকলের ঘৃণার পাত্র৷ পরিবারের সবাই চায় ওর মৃত্যু৷ কদিন পরপর থানা পুলিশের বিরক্তি, জাগায় জাগায় চুরিচামারি, ধরা পরলেতো মারের আর অন্ত নাই৷ এসব নানাবিধ যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে চায় ওর গোটা পরিবারবর্গ৷ এরকম অপমান অপদস্থতার কারণে ওর বড় ভাই সহ পরিবারের সবাই পুলিশেও দিয়েছিল কয়েকবার৷ যতদিন জেল হাজতে থাকে ততদিন একটু শান্তি, জেল থেকে ফিরলেই শুরু হয় এই নেশাখোরের নেশার উপদ্রব৷ আর শুধু ও কেন,এমন লক্ষলক্ষ নেশাগ্রস্ত মানুষ আছে আমাদের দেশে৷ এইসব নেশাগ্রস্ত লোকে’ই নানা’রকমের অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়৷ওদেকে নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে যেকোন অপরাধজনিত কাজ করানো যায় খুবই সহজে৷ হচ্ছেও তাই, দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনেও দেখা যায় এসব নেশাগ্রস্ত হিরোইনছিদের ভূমিকা৷ গাড়িপোড়ানো, গাড়িভাংচুর, পেট্রলবোমা নিক্ষেপ সহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড৷ এসব নেশাগ্রস্ত মানুষগুলো এক সময়তো ভাল ছিল, তাদের মন মানসিকতাও ভাল ছিল৷ তারা ভুল বশতঃ নেশার জগতে যাওয়ার কারণেই আজ তাদের এই অবস্থা৷

প্রশ্ন করা যেতে পারে এই নেশার জগতের বাদশারা কে বা কাহারা? এই নেশার জগতের বাদশা হলো আমাদের সমাজেরই একশ্রেণীর অসাধু ব্যক্তি, যারা মাদক ব্যবসায়ী৷ যেসব এলাকায় এসব মাদক ব্যবসায়ীদের বসবাস সেসব এলাকার সন্মানীত জনসাধারণও জানে কারা মাদব্যবসায়ী৷ কিন্তু বলার সাহস পায়না, সাহস পায়না এই কারণে, তাদের পিছনে আছে বড় ব্যক্তিবর্গ৷ তাদের ছত্রছায়ায় দিব্বি করে যাচ্ছে এই মরণাস্ত্র মাদকের ব্যবসা৷ শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে সন্মানিত পুলিশ বাহিনী টহলগাড়ি থামিয়ে মানুষ ডেকেডেকে তল্লাশী চালিয়ে শুধু খুঁজে গাঁজার পোটলা বা ফেন্সিডিলের বোতল৷ এইরকম তল্লাশীতে গাঁজা ফেন্সিডিল সহ ধরাও পড়ে অনেক মানুষ৷ তাদের হয়তো থানায় নিয়ে যায়,না হয় কিছু টাকা বকশিস পেলেই ছড়ে দেওয়া হয় ধন্যবাদ জানিয়ে৷ পুলিশের তরফ থেকে বলা হয় ধন্যবাদ আবার দেখা হবে৷ অথচ ধরা পড়া মানুষদের পুলিশ জিজ্ঞেস করেনা যে,এসব দ্রব্যাদি কোথায় থেকে পেলে? চলো দেখি কে সে এই মরণাস্ত্রের ব্যবসায়ী৷ কিন্তু না সেটা হচ্ছেনা, সেরকম হলেতো তাদের ইনকাম শেষ৷ পুলিশের এরকম টহল তল্লাশীতে আমার প্রায়ই পড়তে হয়, অফিসে যেতে বাসায় ফিরতে রাস্তাঘাটে সবসময় সবখানে৷

বত

মাদক ব্যবসায়ী নিপাত যাক,যুবসমাজ মুক্তি পাক৷

একদিন আমি যে অফিসে চাকরি করি সেই অফিস থেকে বাজারের নৈশপ্রহরীকে সাথে নিয়ে যাচ্ছিলাম বাসায়, বাসার সামনে দাড়ানো ছিল একটা পুলিশের টহলগাড়ি৷ সামনে যেতেই ডাক পড়ল আমার, সামনে গেলাম, জিজ্ঞেস করলো কোথা থেকে আসলাম? উত্তরে আমি বললাম অফিস থেকে, তারা বললো রিকশা থেকে নামেন, আমি সাদরে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে রিকশা থেকে নামলাম৷ শুরুহয় আমার দেহ তল্লাশী, আমার সাথে ছিল তিন পেকেট কমদামী সিগারেট, কিছু টাকা ও ব্যবহার করা মোবাইল সেটখানা৷ মোবাইল সেট খানা তাদের খুব পছন্দ হয়েছিল, সেটখানা আর তাদের হাতথেকে আমার হাতে আসছেনা৷ আর সাথে পাওয়া তিনপেকেট কমদামী সিগারেট খুলে তন্নতন্ন করে ভেঙ্গেচুরে একাকার৷ কুকুর যেমন ময়লাযুক্ত স্থানে নাকদিয়ে শুঁকে তেমন করে তারা আমার সিগারেট গুলো শুঁকতে লাগলো৷ আমার প্রতি সন্মানিত পুলিশ ভাইদের প্রশ্ন, কী করেন, কোথায় থাকেন, তিনপেকেট সিগারেট কেন, এত দামী মোবাইল সেট কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ লজ্জার কথা লজ্জার সাথে লেখতে হয়, সন্মানিত পুলিশ ভাইয়েরা আমাকে প্রায় নেংটা করে তল্লাশী করলো৷ তারপর রিকশার গদির নিচেকার দিকে শুরুহলো তাদের তল্লাশী৷ প্রায় আধাঘন্টা সময়ব্যয়, তারপর মোবাইলসেট খানা ওলটপালট করে দেখে অতিকষ্টে আমার কাছে হস্থান্তর করলো৷ তারপর আমি বাসায় গেলাম৷ এই হলো আমাদের দেশের সন্মানিত পুলিশবাহিনীর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অভিযান৷

মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মান্থলি করা মাসহারা, আর আমাদের উপর তল্লাশী৷ আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যদি আমাদের দেশের সন্মানিত পুলিশ বাহিনী ইচ্ছা করে যে ১২ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশের যত মাদকব্যবসায়ী আছে তাদের ধরে আইনের আওতায় আনবো তাই তারা পারবে নিশ্চিত৷ আর যদি বলে ধরবো তো ছাড়বোনা তাহলে প্রমাণ হবে আমাদের দেশের সন্মানিত পুলিশ বাহিনী সত্যই জনগণের বন্ধু৷ কোর্ট কাছারির উকিল মোক্তারগণ যদি ওয়াদা করে যে সবার বেলায় জামিন হবে, মাদক ব্যবসায়ীদের বেলায় নয়৷ তবেই সেদিন আমাদের দেশের যুবসমাজ যারা মাদকের নেশায় নেশাগ্রস্ত তারা নেশার দ্রব্যাদি কিনতেও পারবেনা, আর সেবনও করতে পারবেনা৷ আর সেদিন থেকে একটা মাদকাসক্ত সন্তানের জন্য যন্ত্রণায় জ্বলেপুড়ে মরবেনা আমাদের দেশের কোন পরিবার, আর বোঝা হয়েও থাকবনা আমার মায়ের আদরের সন্তানেরা৷