ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

imrangd_1342085810_1-image_794_125758 পাথর দেখেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়, হীরা, চুনি, পান্না, আকীক, শিলা, চুনা আরো কত কী ৷ স্রষ্টার সৃষ্টির প্রশংসা করে শেষ করা যায় না ৷ আকাশ, বাতাস, আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র, নদ-নদী, সাগর- মহাসাগর, পাহার-পর্বত আরো কত কী ৷ স্রষ্টার সৃষ্টির এগুলো সবাই দেখে, জানে ও এগলো সমন্ধে জ্ঞান অভিজ্ঞতাও আছে কম-বেশি সকলের ৷ স্রষ্টার সৃষ্টির এমন কিছু আশ্চর্য জিনিষ আছে নাম শুনলেই জানতে মন চায়, দেখতে ও মন চায় ৷ আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটিতে এমন বহু আশ্চর্য জিনিষ আছে তার মধ্যে একটি হলো “ভাসমান পাথর” ইতিহাসকে করে রেখেছে জাগরুক করে ৷ এই ভাসমান পাথরটি আমাদের পবিত্র স্থান সৌদি আরবে ৷ প্রাচীন বিশাল আকৃতির একটি পাথর রেয়েছে সৌদি আরবের আল-হাস্সা গ্রামে ৷ ঐতিহ্যবাহী এ পাথর খণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় ৷ পাথরটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাটি থকে ১১ সেন্টিমিটার শূন্যে ভেসে থাকে ৷ ইতিহাসে জানা যায়, একজন মুজাহিদকে এ পাথরের পাশে হত্যা করা হয় ৷ ঘটনাটি ছিল হৃদয়বিদারক ৷ নাম না জানা ওই মুজাহিদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এ পাথর খণ্ড ইতিহাসকে জাগরুক করে রেখেছে ৷ জানা যায় এই মুজাহিদ ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক ৷ সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ঠিক যে স্থানে মুজাহিদকে হত্যা করা হয়েছিল সেখানেই প্রতি বছর একই দিনে একই সময়ে পাথরটি প্রায় আধা ঘন্টা মাটি থেকে উপরে ভাসমান থাকে ৷ এই ভেসে থাকা পাথর খণ্ড দেখার জন্য দেশ-বিদেশের বহু মানুষ জড়ো হয় ৷ অত্যন্ত চমকপ্রদ এই পাথর খণ্ডটি ৷ আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখন এ ঘটনা ঘটে তখন পাথরটিতে লেগে থাকা তাজা রক্ত ভেজা দেখা যায় ৷ এবং উজ্জল হয়ে গাঢ় বর্ণ ধারণ করে ৷ স্থানীয়রা পাথরে লেগে থাকা এই রক্ত মোছার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু পরবর্তীতে আবার পাথরের গায়ে রক্ত দেখা যায় ৷ “সূত্র bd24live.com/২০১৫ জানুয়ারি” ৷

এমন আরেকটি পাথর আমাদের দেশের জাফলং ভ্রমণকারীদের নজরেও পড়ে ৷ কিন্তু অনেকেই জানেনা পাথরটির মূল কাহিনী ৷ পাথরটি ঠিক ডাওকি ঝুলন্ত ব্রিজের বাম দিকে ডাওকি পাহাড়ের উপরে ৷ জাফলং বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি এলাকা ৷ জাফলং সিলেট শহর থেকে ৬২ কিঃ মিঃ উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ৷ এবং এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত ৷ এর পাশে ভারতের ডাওকি অঞ্চল ৷ ডাওকি অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ৷ মূলত পিয়াইন নদীর অববাহিকায় জাফলং অবস্থিত ৷ সিলেট জেলার জাফলং-তামাবিল-লালখান অঞ্চলে রয়েছে পাহাড়ি উত্তলভঙ্গ ৷ এই উত্তলভঙ্গে পাললিক শিলা প্রকটিত হয়ে আছে তাই ওখানে বেশ কয়েকবার ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৷ এই এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ৷ যার কারনে জাফলংকে বলা হয় প্রকৃতি কন্না ৷ আমি ১৯৮৭ ইংরেজী সালে যখন সিলেট ইনড্রাষ্ট্রিজ এলাকা গোটাটিকর কুশিয়ারা টেক্সটাইল্ স মিলে কাজ করতাম, তখন মিলের পাশে রাস্তায় বেরুলে চোখে পরতো ওই ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়৷ দেখা যেত যেন আকাশের কালো মেঘ, পাহাড় মনে হতো না ৷ সাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতাম, বন্ধু কালো মেঘের মত দেখা যায় ওই গুলো কী মেঘ? প্রশ্নের উত্তর পেতাম মেঘ নয় পাহাড় ! ওই জায়গার নাম জাফলং ৷ পাহাড়ের কথা শুনে এই পাহাড় দেখার ইচ্ছা জাগে মনে ভিতর ৷ ভাবতে লাগলাম যেভাবে হোক এই পাহাড় আমাকে দেখতেই হবে ৷ সামনে শুক্রবার আসতে দুদিন বাকি ৷ সাথের এক শ্রমিক বন্ধুকে বললাম তুমি শুক্রবার আমাকে ওই পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাবে, যাতায়াত খরচপত্র সব আমার ৷ ও রাজি হয়ে বললো আচ্ছা ঠিক আছে, তবে মিলের মাষ্টার যেন জানতে বা বুঝতে না পারে ৷ যে কথা সেই কাজ, শুক্রবার খুব ভোরবেলা মিলের বাবুর্চিকে কানে-কানে বললাম যে, আমরা দুজন জাফলং যাচ্ছি, দুপরবেলার খাওয়া আমরা মিলে খাবো না, আর বললাম আমরা যে জাফলং যাচ্ছি দাদা মাষ্টার যেন জানতে না পারে ৷ বাবুর্চি বললো ঠিক আছে দাদা যান ঘুরে দেখে আসেন ভালো লাগবে ৷ বাবুর্চিকে বলে মিল থেকে ভোরবেলা বাহির হলাম জাফলং এর উদ্দেশে ৷ তখন সিলেট হতে জাফলং এর বাস ভাড়া ছিল জনপ্রতি ২০ টাকা ৷ আমি সাথে করে টাকা নিলাম ৪৫০ টাকা, দুজনের খরচ নিজের একার উপর তাই একটু বেশি করেই টাকা নিয়ে নিলাম সাথে করে,যাতে রাস্তাঘাটে কোন প্রকার কষ্ট না হয় ৷ বাসে করে যেতে সময় লাগলো তিন ঘন্টা ৷ সকাল ১০/১১টায় আমরা জাফলং গিয়ে পৌঁছলাম ৷ বাস থেকে নেমে সোজাসুজি ছোটখাট একটা হোটের মত চা দোকানে ঢুকলাম কিছু খাবো বলে ৷ চা দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে সোজা চলে গেলাম যেখানে পাথর সংগ্রহ করে সেখানে ৷ এক টাকা দিয়ে গুদাড়া পাড় হয়ে গেলাম ঠিক মাঝখানে, সেখানে পাথর শ্রমিকরা পাথর তুলচ্ছিল ৷ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, ভালো লাগছিল, হটাৎ চোখ পড়লো ডাওকি জুলন্ত ব্রিজের দিকে, দখতে পেলাম একটা বিশালাকার পাথর যেন শূন্যের উপরে স্থির করে বসে আছে ৷

আমি অবাক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম ৷ সামনে এক লোক সানপাপড়ি ও বুট ভাজা বিক্রী করছিল, লোকটির সামনে গেলাম দুজন মিলে ৷ দুটাকা করে বুটভাজা নিলাম লোকটির কাছ থেকে, বুটভাজা কেনার সুবাদে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা’জান ওটা কি দেখা যাচ্ছে? আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছিলাম চাচাকে ৷ চাচাতো রেগে বেগে একাকার , আমাদের বললেল তাড়াতাড়ি আঙ্গুলে কামড় দেন চাচা, না হয় বিপদ হবে ৷ আমরা দুজন বোকার মত নিজেদের আঙ্গুল নিজেরাই কামরাতে লাগলাম ৷ কিছু পর লোকটা বললো, আরে মিয়ারা আইছেন তো ঢাকা তুনে, বুঝবেন কি? এটা পাথর না, এটা একজন ওলি-য়াউলিয়া ছিলো বুঝলেন ! আমরা বললাম তার মানি? লোকটা আরো দু’তিনজন পাথর শ্রমিক ডাক দিলো, পাথর শ্রমিক দু’তিনজন আসলো আমাদের সামনে ৷ আমি একপ্রকার ভয় পাচ্ছিলাম, তখন আমি বুট বিক্রেতাকে বললাম থাক দাদা হয়েছে আমাদের আর জানতে হবেনা ৷ লোকটা বুঝতে পেরেছে আমরা ভয় পাচ্ছি, সামনে আসা পাথর শ্রমিকরা বললো কী হইছে, ডাকলা কে আমাগো? লোকটা বললো, ওই পাথরটা কিরে? পাথর শ্রমিকরা বললো কে কি হইছে? বুট বিক্রেতা বললো এই দুজন লোক জানতে চায় ৷ পাথর শ্রমিকরা বললো ও এই খবর! এইডাতো পাথর না ভাই, এইডা একজন ওলি-য়াউলিয়া ৷ রাইতে যাওন ধরছিলো হজ্ব করনের লাইগা, রাইত পোয়াইছে মতন এই জায়গাই রইয়া গেছে, রূপ ধরছে পাথরের বুঝলেন ৷ আমরা শুধুই শুনছিলাম কিছুই বললামনা ভয়ে ৷ আবার বলতে লাগলো, দেহেন না পাথরের মধ্যে বড় বড় গাতার দাগ ৷ আমরা বললাম কিসের দাগ ভাই? বললো ব্রিটিশ সরকার কামান দাগাইয়া এইডারে হালাইতে চাইছিলো, পারে নাই ৷ ওই গাতা দিয়া অহনো পানি বাইর অয় দেহেন না! আমরা বললাম হ্যাঁ দেখতে তো পাচ্ছি ঠিক তাই ৷ লোক গুলো বললো আরে ভাই কান্দে কান্দে বুঝলেন ৷ শুনলাম তাদের কথা গুলো, বুট বিক্রেতাকে বুটের দাম দিয়ে চলে আসলাম সোজা গন্তব্যের উদ্দেশে ৷ নদী পাড় হওয়ার সময় মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম এই পাথরটির কথা, মাঝিও একরকম কথাই বললো ৷ আরো বললো এই পাথরের ওখানে প্রতি বছর ওরশ হয়, ওরশের সময় তামাবিল ব্রর্ডার খোলা থাকে একদিনের জন্য ৷ আমাদের বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ ওই ওরশে যোগদান করে ৷ যা শুনলাম তা সত্য না মিথ্যা সেটা সৃষ্টিকর্তা জানে ৷ তারপর সোজা বাসষ্ট্যান্ড চলে এলাম বাস ধরার জন্য ৷ কারণ যেত রাত’ই হোক মিলে পৌঁছতে হবে, না’হয় সমস্যা হবে ৷ মিলের মাষ্টার খুবই রাগি লোক, হয়তো চাকরি’ই থাকবেনা ৷ সিলেট টাউনে পৌঁছলাম রাত আট’টায় ৷ মিলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত নয়টা বেজে গেল ৷ ঘুরে দেখে আসলাম জাফলং ও ডাওকি পাহাড়ের কালা পাথর ৷

slide

এই সেই কালা পাথর, জাফলং ভ্রমণকারীদের প্রথম নজরে পড়ে এই পাথরটি ৷ পাথরটার গায়ে অনেক গর্ত, যা বলা হয় কামানের গোলার দাগ ৷ ওই গর্তগুলো দিয়ে সর্বদা পানি পড়তে দেখা যায়, যেন পাথরটি কাঁদছে ৷