ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

নোয়াখালী থেকে আমরা এসে সপরিবারে যেখানে স্থায়ী বসবাস করতাম, সেই জায়গা হলো নরায়নগঞ্জের বন্দর থানাধীন লক্ষনখোলা আদর্শ কটন মিল্ স ৷ আমার বড়দা’র চাকরির সুবাদে’ই আদর্শ কটন মিলের ভিতরে শ্রমিক কর্মকারী কলোনিতে থাকা ৷ একসময় আদর্শ কটন মিল বিক্রী করে দেয় সরকার ৷ সেই সাথে বাবার মৃত্যু, আর বড়দা’র চাকরি নাই ৷ আদর্শ কটন মিলেও আর থাকা যাচ্ছে না, চাকরি নাই তো থাকবো কীভাবে? আদর্শ কটন মিল থেকে সপরিবারে চলে এলাম শীতলক্ষা নদীর পশ্চিম পাড়ে বরফকল নগর খাঁনপুরে ৷ আমাদের পরিবারে মোট সদস্য ছিলাম সাতজন, মা, বড়দা, বৌদি, আমার এক বড়দিদি, এক ভাতিজা এক ভাতিজি ৷ বাসা-ভাড়া মাসে তিন’শ টাকা, পানি, বিদ্যুত্‌, গ্যাস সব কিছু ওই তিন’শ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ৷ সে সময়টা ছিল ১৯৮১ ইংরেজী সালের শেষ দিকের ৷ সে সময় তিন’শ টাকার অনেক মূল্য, তখন প্রতি সের চাউলের মূল্য ছিলো ৫/= টাকা ৷ নগর খাঁনপুরে আমরা নতুন ভাড়াটিয়া, কারো সাথে তেমন কোন পরিচয় তখনো হয়ে উঠেনি ৷ আমি সারাদিন আদর্শ কটন মিলে রাজযোগালি কাজ করে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরতাম ৷ বড়দা সারাদিন কাজের খোঁজে থাকতো ব্যস্ত, পরপর তিনদিন পর্যন্ত ছিল বড়দা’র এই ব্যস্ততা, চারদিনের মাথায় বড়দা নারায়নগঞ্জের হাজীগঞ্জের সায়েম টেক্সটাইল্ মিলে কাজ পায় ৷ তখন আমাদের দেশে টেক্সটাইল্ মিলের অবস্থা জয়জয়কার ৷ নতুন পলিস্টার সূতার আগমন, তা্ঁতের কারিগরের খুব অভাব চলছিল তখন ৷ একগজ কাপড়ে মালিকের ইনকাম হতো ১৭/১৮ টাকা ৷ বড়দা সপ্তাহে কাজের মজুরি পেতো ২০০/২৫০ টাকা, আমি যোগালি কাজ করে পেতাম ১২৫/১৫০ টাকা, এই দিয়ে সংসার চলতো কোন রকমে ৷ বড়দা কাজ পাওয়ার সুবাদে আমার আর নগর খাঁনপুর হতে আদর্শ কটন মিলে যতে ইচ্ছে করে না ৷

আমার মা বলতেন, কিরে কাজ না করলে তো সংসার চলবে কী ভাবে? আমি মা’কে বলতাম মা, এত দূর যেতে আর ভালো লাগেনা বড়দা’কে বলে আমাকে টেক্সটাইল্ মিলে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হতো, মা বললেন আচ্ছা নিমাই আসুক বলবো ৷ দাদা রাতে যখন বাসায় আসলো তখন মা বললো নিতাই তো এত দূরে কাজ করতে যেতে চায় না, তুই যদি পারিস তাহলে ওর জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করে দে ৷ দাদা বললো মিলে আলাপ দিয়ে রেখেছি কদিন দেরি হবে, ওকে বলেন যে কাজে আছে সে কাজটা আপাতত কিছু দিনের জন্য করতে ৷ মা বললো ওতো আর সেখানে যাবেই না, সাপ কথা জানিয়ে দিয়েছে ৷ দাদা আর কোন কথা বললো না, পরদিন দাদা মিলের মালিকের সাথে আলাপ করে বাসা ফিরে মা’কে বললো ওকে বলবেন আগামীকাল আমার সাথে মিলে যেতে ৷ পরদিন সকালবেলা দাদার সাতে মিলে গেলাম, দাদা আমাকে বললো তুই আমার সাথে তাঁতের কাজ শিখবি, আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে ৷ এমনি করে তিন-চারদিন দেখলাম, তারপরে তা্ঁতের কাজ পেলাম ৷ খুব ভালো ভাবেই কাজ করতে লাগলাম, কোন কোন সপ্তাহে দাদার সমান-সমান রোজগার হয়ে যায় ৷ বাহিরে বন্ধুও হয়ে গেলো অনেক, দিনের ডিউটি হলো রাত আট’টার পরে বন্ধুদের সাথে জমে আড্ডা, সে আড্ডা রাত বারটা অবধি চলে ৷ আস্তে আস্তে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলাম, সে সময় নগর খাঁনপুর মহল্লায় প্রায়’ই চুরি হতো, কিন্তু একদিনও চোর ধরা পরতো না, চোরের উপদ্রব বাড়তেই লাগলো ৷ একদিন মহল্লার সব মুরব্বিরা আমাদের বললো, শুনো বাবা সকল’রা তোমরাতো জান মহল্লায় প্রতিদিন চুরি হয়,অার তোমরাতো এমনিতেই রাত বারটা,একটা পর্যন্ত সজাগ থাকো, পারলে মহল্লা পাহারা দাও ৷ আমরা তোমাদের জন্য প্রতি ঘর থেকে দুই টাকা করে দিবো তোমাদের রাতের টিপিনের খরছ ৷ আমরা সবাই মিলে বুদ্ধি করে রাজি হয়ে গেলাম ৷ যেদিন কথা সেদিন থেকে রাতে ডিউটি শুরু করে দিলাম ৷ আমাদের হেড কোয়ার্টার পুকুরপাড়ে একটা চার তলা বাড়ির ছাদ ৷ ওই ছাদে উঠলে পুড়ো নগর খাঁনপুর দেখা যেত, ভাবলাম চোর ধরার উপযুক্ত স্থান এটি ৷ রাতে সবার কাজকর্ম সেরে আমরা আট-দশজন বন্ধু চা, চিনি, আদা, লেবু আর চা বানানোর জন্য কেরোসিনের স্টোপ নিয়ে উঠতাম ছাদে ৷ গ্রামের মুরব্বিরা টসলাইট দিয়েছে দু’টি, যাতে চোর ধরতে সুবিধা হয় ৷ এই দায়িত্ব পাওয়ার সুবাদে রাতে মহল্লার নারিকেল, পেয়ারা, আম, জাম, যা কিছু আছে সব আমাদের আয়ত্তে ৷ আমরাই রক্ষণা-বেক্ষণার মালিক, সব শেষ ৷ রাত পোহালেই শুনা যেত নারিকেল নাই, আম গাছে আম নাই ইত্যাদি ইত্যাদি ৷

ক’দিন পর মহল্লার মুরব্বি’রা আমাদের ডেকে বললেন শুনো বাবা সকল’রা, তোমাদের দায়িত্ব দিলাম চোর ধরতে, চোর ধরাতো দূরের কথা আরো দেখছি সর্বনাশ হয়েছে ৷ বললাম কাকা, আমরা’তো চেষ্টার ত্রুটিবিচ্যুতি করছি না, শেষ রাতে যখন আমরা ঘুমাই তখন হয়তো চোর এসে এই কাজ গুলো করে ৷ তবে কথা দিলাম চোর আমরা ধরবোই ধরবো, দোয়া রাখবেন আমাদের প্রতি ৷ মুরব্বিদের মানিয়ে দিলাম, এখন থেকে গাছের দিকে নজর একটু কম দেই আমরা সকালে ৷ আমাদের সাথে থাকা এক বন্ধুর একটা টেপ রেকর্ডার ছিলো, মহল্লায় ওর খুব চাহিদা ৷ যেকোন বিয়ে-সাদির অনুষ্ঠানে, যেকোন পূজা-অর্চনায় ওকে সবার দরকার শুধু টেপ রেকর্ডারের জন্য ৷ আমাদের কাছেও ওর খুব চাহিদা, ওর টেপ না হলে আর পাহারা হবেনা ৷ এমন প্রায় ২০/২৫ দিন পাহারা দেওয়া হয়ে গেলো, চোর ধরা তো হচ্ছে না, বরং চুরি হচ্ছে’ই, কারো’না কারোর বাড়িতে ৷ চুরিতো হবেই, কারণ আমরা তো ভূয়া পাহারাদা, তবে আমরা আবার খুবই সত’চোর ছিলাম এটা সত্য কথা, গাছের ফল ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আমরা ফিরেও তাকাতাম না ৷ সারা রাত টেপের গান শুনি, আর চা পান করি, আর আধা ঘন্টা পরপর জোরে একটা হামাগুড়ি মারতাম, ঐ সাবধান আমরা আছি, খবরদার এইভাবে ৷ এই হামাগুড়িতে কি আর চোর মহাশয়েরা কথা শুনে? সময় সময় চোরেরাও বলতো ঐ সাবধান আমরা আছি ৷ আমরা নিজেরা নিজেরা বলা-বলি করতাম, কিরে কি ব্যাপার, এমন করে আমাদের মত করে কে বলে ঐ সাবধান আমরা আছি ৷ দৌড়ে গিয়ে দেখতাম, কাউকে আর পেতাম না ৷ নগর খাঁনপুরে মোট বাড়িওয়ালার সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৩৫টি ৷ পাহারার জন্য ঘর প্রতি দৈনিক দুই টাকা করে দিতে হয় আমাদের চা বিস্কুটের খরচ বাবদ ৷ কিন্তু ২০/২৫ দিন গত হয়ে যাচ্ছে চোর ধরতে পারছি না, আর একটা টাকাও কেউ দিচ্ছে না আমাদের ৷ এটা একটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্য ৷ এদিকে আস্তে আস্তে সব বাড়িওয়ালা ক্ষেপতে শুরু করলো ৷ দু’একজন মুরব্বি মাঝে-মাঝে বলতো,প্রায় এক মাস ঘনাচ্ছে, চোর ধরতে পাড়ছিস না, তো পহারা দিয়ে আর কী হবে ৷ তখন আমরা সবাই একটা বুদ্ধি করলাম আজ রাতে চোর ধরতেই হবে, যে করে হোক ৷ বুদ্ধিটা হলো সবাই তো রাতে ঘুমিয়ে থাকে, ঘরের বাহিরে যা পাওয়া যাবে,সব এক সাথে একটা বস্তায় ভরতে হবে !

রাত যখন ২ টা, তিনটা বাজবে, তখন বস্তাটা একজনে রাস্তার কোনায় রেখে চলে আসবে, আর আমরা চোর-চোর বলে চিৎকার করবো, আর লাঠি নিয়ে ছুটা- ছুটি করবো ৷ তারপরে দেখবো কী হয় ৷ পরদিন আমরা সব বন্ধু এক সাথে ছাদে উঠলাম, ছাদে উঠে সবাই টেপের গান শুনতে লাগলাম ৷ রাত যখন ২ টা বাজতে লাগলো তখন একজন করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাহিরের জিনিস সংগ্রহ করতে লাগলাম ৷ একমাত্র বাথরুমের পিতলে, আর সিলভারের বদনা ছাড়া কি আর কোন জিনিস বাহিরে রাখে? অন্য কোন মূল্যবান্‌ জিনিষ না পেয়ে বাথরুমের বদনা’ই বস্তার ভিতরে ঢুকাইতে থাকি ৷ কিছুক্ষণ পরে একজন বন্ধু বস্তাটা রাস্তার পাশে রেখে সোজা চলে এল আমাদের ডিউটির জায়গায় ৷ আর তখন’ই আমরা চোর-চোর বলে চিৎকার করতে থাকি ৷ আমাদের চিৎকারে সারা মহল্লার মানুষ একাকার হয়ে গেল, আমরাও লাঠি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে লাঘলাম এলোপাতাড়ি ভাবে ৷ আমাদের সাথে যোগ হলো সারা মহল্লার মানুষ, সবাইকে দেখালাম এই যে দেখুন কত বড় বস্তাটা নিয়ে যেতে লাগছিল ৷ সবাই দেখলো, আবার কেউ বললো হ্যাঁ হ্যাঁ আমার সামনে দিয়েই চোর বেটায় দৌড় দিয়ে গেছে, একটুর জন্য ধরতে পাড়লাম না ইস ৷ এক-এক জনের এক-এক রকম কথা শুরু হয়ে গেলো ৷ আমাদের সকলের আত্মীয় স্বজনরাও মহা খুশি ৷ যাই হোক এত রাতে চোরের উছিলায় ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাবে তো বদনা কোথায়? একটা বদনাও বাদ রাখিনাই, সব বদনা বস্তায় বন্দি ৷ আমরাও দিনের বেলা ছাড়া বদনা দিবোনা ৷ সকালবেলা যার-যার বদনা দেখে শুনে বুঝে নিবে জানিয়ে দিলাম ৷ এখন দেখা যায় কেউ বাথরুমে যাচ্ছে ঘরের বাটি নিয়ে, কেউ আবার বালতি নিয়ে, প্রকৃতির ডাক পড়লে’তো নিরুপায় ৷ এমনি করে হায়-হুতাশ করতে করতে সকাল হয়ে গেল, এখনতো আরো বিপদ, বাথরুমের চাপ সহ্য করা দায় ৷ দুই টাকা করে দেয় না পাহারার জন্য, এখন পা্ঁচ টাকা করে দিতে রাজি, তবু বদনা দে ৷ আর কী করা,আমরাও নিরুপায় হয়ে বস্তার বাঁধন খুলে দিলাম, যার যার বদনা বুঝে নিয়ে হলো শান্ত ৷ মজিদ খাঁনপুর, নগর খাঁনপুর সহ আশেপাশের মহল্লায় খবরটি ছড়িয়ে পড়লো, বদনার বস্তা রেখে চোর পালালো ৷ আসলে ভূয়া, শুধুই দুষ্টামি ৷