ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

IMG_20160510_112308~2

ছবিটি নারায়নগঞ্জের গোদনাইল এলাকার নীট কনসার্ন সংলগ্ন কো-অপারেটিভ পুকুরপাড় হইতে তোলা ৷ ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন অসুস্থ রুগী শুয়ে আছে, আসলে এই মহিমা অসুস্থ নয় ৷ অসুস্থতার ভান করে শুয়ে আছে ৷ রাস্তা ফাঁকা থাকলে সাথের পুরুষমানুষটার সাথে কথা বলছে ৷ গাড়ি বা পথচারী আগমন টের পেলেই কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখছে, আর পুরুষমানুষটি হাত পেতে অর্থ চাইছে” দেশে এক শ্রেণির মানুষ আছে, যাদের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিক্ষা ৷ ভিখারির বা ভিক্ষা হলো বিনা পুঁজিতে একটা বিরাট লাভজনক ব্যবসা ৷ যার কোন আর্থিক ক্ষতিসাধন নাই, সব টুকুই লাভের অংশ ৷ অতি মুনাফার আরেক নাম হলো “ভিক্ষা”৷ ভিখারি বা ভিক্ষা কথাটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেবে এক শ্রেণির মানুষগুলোর চেহারা, তাদের কন্ঠে থাকবে এক আর্তনাদের সুর যা শুনলে মনভাব হয় কিছু দান করার ৷ এই মনভাব থেকেই আমারা দান বা ভিক্ষা দিচ্ছি, ভিখারিও হাত পেতে নিচ্ছে ৷ আসলে বিষয়টি আমরা একটু ভেবে দেখি’না এই আর্তনাদের কন্ঠের পিছনে কী আছে? যে মানুষটা ভিক্ষা চাইছে সে কী তার বাঁচার সম্ভাব্য সব উপায় বন্ধ হয়ে গেছে? উত্তর মিলবে “না”৷

বর্তমানে বেশির ভাগ ভিখারি তাদের ভিক্ষাবৃত্তি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে ৷ তাই ভিক্ষাবৃত্তি একটি লাভজনক পেশা ৷ যে পেশায় একটা টাকাও পুঁজি খাটাতে হয় না ৷ বিনা পরিশ্রমে, বিনা পুঁজিতে ব্যবসা ৷ শুধু নাটকের অভিনয় করতে পারলেই হলো ! আর কী লাগে? এই আয়কর বিহীন অর্থ উপার্জনের সাথে আছে আরো খাবার, পোষাক, জাকাত, ফেতরা আরো কত কী ৷ অনেকে আবার মানত করেও ভিখারিকে দাওয়াত করে খাওয়ায়, এটা ভিখারির জন্য একটা হাজিরা বোনাজ ৷ বর্তমানকালে গ্রমে-গঞ্জে, রাস্তঘাটে, আফিস-আদালতে, বাস টার্মিনালে, যানবাহনে ভিখারিদের উপদ্রব ক্রমশ বেড়েই চলছে ৷ অনেক সময় তারা প্রায় পথরোধ করে পথচারীদের বিব্রত করে থাকে ৷ কিছু ভিখারি নিশ্চিত ভিক্ষালাভের কৌশল হিসেবে নিজেদের বিকলাঙ্গ ও বিকৃত চেহারা দেখিয়ে রাস্তঘাটে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে ভিক্ষা তথা অর্থ সংগ্রহ করে থাকে ৷ এর মধ্যে অনেকে শিশুদের ব্যাবহার করে ৷ অধিক থেকে অধিকতর অর্থ উপার্জনের আশায় দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ভাড়া করে ব্যবহার করা হয় ৷ ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক সমস্যা ৷ অলসতা, লোভ, আর দরিদ্রতা এর অন্যতম কারণ ৷ ভিক্ষা করতে করতে এক সময় দরিদ্র ভিখারি একদি সচ্ছল ভিখারি হয়ে উঠে ৷ লক্ষ লক্ষ টাকা তাদের ব্যাংক ব্যালান্স হয়ে যায় ৷ এসব ভিখারিরা লোকের কাছে সুদের উপরও টাকা খাটায় ৷ অর্থ উপার্জনের সহজ পথ হিসাবে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় ৷অতচ ভিক্ষাবৃত্তি মানবতার এক চরম অবমাননা ৷ ভিক্ষাবৃত্তি কোন সম্মানজনক পেশা নয়, এটা জাতির জন্য একটা অভিষাপ ৷ তবু পৃথিবীর প্রায় দেশের মানুষের মধ্যেই ভিক্ষাবৃত্তির প্রবণতা লক্ষ করা যায় ৷ কিছু মানুষ প্রকৃতই শারীরক অক্ষমতার কারণে, অশক্ত বয়স্ক ও কর্মশক্তিহীন দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় সামাজিক সহযোগিতা না পেয়ে বা অন্য কোনো কাজ না পেয়ে বা কাজ করার ক্ষমতা না থাকার কারণে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে থাকে ৷ বেশির ভাগ ভিখারি’ই কর্মক্ষম, কাজ করতে বললে বা কাজ দিতে চাইলে তারা বিরক্ত প্রকাশ করে ভিক্ষা না নিয়েই চলে যায়, তারা মূলত অলস ও কর্মবিমুক ৷ এই ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে শুধু দরিদ্ররাই জরিত নয়, এর সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনও সম্পৃক্ত, তারা ভিক্ষুকদের ব্যবহার করে অর্থোপার্জন করে৷

আমাদের দেশে অনেক সিন্ডিকেট আছে, তাদের ব্যবসা’ই ভিক্ষাবৃত্তির, তাদের আছে বহু ভিখারির প্রজেক্ট ৷ শুধু ভিখারি দিয়েই তাদের মূল্য ব্যবসা, প্রতিদিন সকালবেলা কে কোথায় বা কোন ষ্টেশনে বসবো, সেই রুটিন রাতেই ঠিক হয়ে থাকে ৷ বিভিন্ন রকমের ভিখারি তাদের কাছে আছে, যেমন: কানা ভিখারি, লুলা ভিখারি, আতুর ভিখারি, হাতকাটা ভিখারি, হাতভাঙ্গা ভিখারি, পা’ভাঙ্গা ভিখারি, ছেঁড়া জামা ভিখারি, অন্ধ ভিখারি, টুন্ডা ভিখারি, রোলার ভিখারি ( মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে যে ভিক্ষুক ভিক্ষা করে ), গ্রুপ ভিখারি,(৮/১০ জনের একটি দল) শিশু ভিখারি, গাড়ি ভিখারি,( গাড়িতে বসে থাকে যে ভিক্ষুক) সধবা ভিখারি, বিধবা ভিখারি, আগত ভিখারি ( স্বজনের খোঁজে শহরে এসে স্বজনকে না পেয়ে রাস্তঘাটে দেশে যাওয়ার ভাড়ার টাকা চাওয়া হয় এমন ) রুগী ভিখারি, (রোগ হয়েছে সিকিৎসার টাকা চাওয়া এমন ) লিফলেট ভিখারি, ( যানবাহনে যাত্রীদের হাতে হাতে লিফলেট বিতরণ করে অর্থ চাওয়া এমন ) ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ এই সব সিন্ডিকেটের কর্তারা বিভিন্ন জায়গায লোক ছড়িয়ে রাখে শিশুদের অপহরণ করার জন্য ৷ শিশুদের অপহরণ করে তাদের হাত-পা ভেঙ্গে বিকলাঙ্গ করে, কিম্বা চেহারা বিকৃত করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাদ্য করা হয় ৷ রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, বড় বড় মন্দির-মসজিদ যেখানে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে সেসব জায়গায় এই চক্রগুলো সক্রিয় থাকে ৷ ভিক্ষা করানোর জন্য তাদের নির্দিষ্ট জায়গা থাকে, একটা মার্কেটে দোকান বরাদ থাকে, তেমনি তাদের জায়গাও বরাদ্দ থাকে ৷ একটা দোকান বরাদ্দ নিতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, ভিক্ষাবৃত্তির জায়গা বরাদ্দ নিতে কোন অর্থের প্রয়োজন হয় না ৷ ক্ষমতা থাকলেই হয় ৷ এই সব চক্রের লোকেরা একজন ভিক্ষুক সারাদিনে ভিক্ষাবৃত্তি করে যা পায়, সিন্ডিকেট’রা সেখান থেকে অর্ধেকের চেয়েও বেশি নিয়ে নেয় ৷ ভিক্ষা সিন্ডিকেটের এরিয়ায় যদি অন্য কোন ভিক্ষুক ভিক্ষাবৃত্তি করে, আর যদি তাদের নজরে পড়ে, তাহলে ভিক্ষাবৃত্তির অর্ধেক তাদের দিতে হবে, না’হয়, তাদের দলে যোগদান করতে হবে ৷ এটা হলো ভিক্ষা সিন্ডিকেটদের নিজস্ব সংবিধান ৷ সিন্ডিকেট ছাড়া নিজ উদ্যোগেের ভিক্ষুকও বহু লোক দেখা যায় ৷ সময় সময় দেখা যায়, একটা বাচ্চা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিল, বলতে শোনা যায়, ভাই বাচ্ছার বাপ নাই, দয়া করে কিছু দিয়া যান ৷ আরো আছে বর্তমানে গার্মেন্ট্স ভিক্ষুক, মা, কিম্বা বোন গার্মেন্ট্ সে চাকরির ডিউটির ছুটির একটু আগমূহুর্তে গার্মেন্টসের গেইটের সামনে ছোট একটা বাচ্ছা এসে হাজির ৷ ছুটির পর ওই বাচ্ছাটা নিয়ে এক নীরব জায়গায় দাঁড়িয়ে থাক, আর পথচারীর কাছে বিপদের কথা বলে সাহায্য চায় ৷ এর মানি হলো গ্রাম থেকে এসেছি টাকা রোজগারের জন্য, যেভাবে হোক টাকা কামাই করাই হলো কাজের কাজ ৷

IMG_20160510_112410~2

এই ভিক্ষাবৃত্তির নাম হলো “ভান ধরা” ভিখারি ৷ শুয়ে আছে একজন অসুস্থ রুগীর মত, যানবাহন বা পথচারীর আগমনের টের পেলেই মাথায় কাপড় দিয়ে শুয়ে থাকে ৷ রাস্তা ফাঁকা থাকলে পুরুষমানুষটার সাথে ঠিকঠাক কথা বলছে ৷ এই হলো আমাদের চরিত্র ৷ ছবিটি আমাদের নারায়নগঞ্জের গোদনাইল নীট কনসার্ন সংলগ্ন কো-অপারেটিভ হইতে তোলা ৷

ভিক্ষা আদিকাল থেকেই প্রচলিত, ভিক্ষুক নাই এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না ৷ আগেকার সময় দরিদ্র ব্রাহ্মণ’রা ভিক্ষায় নিয়োজিত থাকতো, ভিক্ষা করতো ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে ৷ দাতার নিকট ভিক্ষা না পেলে অভিষাপ থেকে কেউ রেহাই পেত’না ৷ আর সেই অভিষাপ থেকে নিজিকে দূরে রাখার জন্য সরল নিরহ মানুষেরা ব্রাহ্মণরে অভিষাপের ভয়ে ব্রাহ্মণকে সমাদর করে ভিক্ষা দিতেন ৷ সেই প্রাচীন ইরানিরাও দেশ-বিদেশ ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতেন ৷ এখন আর সেই দিন নেই, তবু দিন দিন ভিক্ষুকও বাড়ছে, আমরাও ভিক্ষা দিচ্ছি ভিক্ষুকরাও ভিক্ষা নিচ্ছে ৷ ভিক্ষাবৃত্তি যুগে যুগে অবহেলিত ও ঘৃনিত হলেও এই পেশাকে উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে বিতাড়িত করা সম্ভ হচ্ছে না ৷ আর আমরাও এর অভিষাপ থেকে রেহাই পাচ্ছি না, লজ্জা থেকেও মুক্তি পাচ্ছি না ৷ গত জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে আমাদের বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী কড়া ভাষায় নির্দেশ দিয়েছিলেন এই ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করার জন্য ৷ তিনি এই ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ভিক্ষুক ও ছিন্নমূল মানুষদের সরকারের তরফ থেকে বিনা খরছে পূর্ণবাসনের কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী ৷ তিনি আরো বলেছেন যেখানে ভিক্ষুক দেখবেন সাথে সাথে সেই ভিক্ষুকের বিষয়-আষয় জেনে তার পূনর্বাসন ব্যবস্থা করবেন ৷ ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে আমাদের জাতীয় সংসদে একটি আইনও পাশ করেছে সরকার ৷ পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পথ-ঘাট থেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে পুরোপুরিভাবে মুছে দিতে চায় সরকার ৷ তাই ভিক্ষাবৃত্তিকে বেআইনী ঘোষণা করতে এবং এই প্রথাটিকে বন্ধ করতে সংসদে একটি বিলও পাশ করা হয়েছে ৷ অনুমোদিত আইনের বলে যে-কোনো ব্যক্তিকে ভিক্ষারত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হলে, তাকে একমাসের জন্য জেলে পাঠানো যেতে পারে ৷ এই আইন তাদের জন্যও প্রযোজ্য হবে, যারা কি না অসুস্থতার ভান করে বা প্রতিবন্ধী সেজে ভিক্ষা করে ৷ আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী মহোদয়ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের মধ্যে দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে দূর করে দেবে ৷ কারণ ভিক্ষাবৃত্তির নামে যারা প্রতারণা করছে বা ব্যবসার ফাঁদ পেতেছে তাদের চিহ্নিত ও নির্মূল করতে হবে, বলেছিলেন আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী ৷

আসলে ভিক্ষাবৃত্তি কোন পেশা নয়, এটাকে পেশা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না ৷ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মাস গেলেই এদের কারো রোজগার ১৫ হাজার আবার কারো ২৫ হাজারে গিয়েও পৌঁছায় ৷ এরা যে কাজটা করছে তা বিশ্বের প্রাচীনতম পেশা, ভিক্ষাবৃত্তি ৷ প্রাচীনকালে অন্ন-বস্ত্রের অভাব ছিলো বিধায়,দারিদ্র্যতার কারণে মানুষেরা ভিক্ষা করেছিল ৷ এখন তো প্রাচীনকালের মত নয়, এখন আমরা মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে সামনে পা রাখতে যাচ্ছি ৷ এখন আমরা এই পেশাটাকে মেনে নিতে পারি না ৷ এই ঘৃনিত পেশাটাকে নির্মূল করার দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও ৷ তার জন্য চাই আমাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা ৷