ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

এই দেশে আমরা সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী ৷ আমারা হিন্দুরা সংখ্যায় কম বিধায়, আমরা সংখ্যালঘু, অমুসলিম, বেদ্বীন, মালা-উন, চাড়াল ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ আমরা যুগ-যুগ ধরে নির্যাতিত হয়ে আসছি, এদেশের কিছু সংখ্যক সম্মানিত মুসলিম ভাইদের হাতে। কখনো নির্বাচনের কারণে, কখনো আল-কুরান অবমাননার কারণে, কখনো বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণে, নির্যাতিত হয়ে আসছি সেই ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হয়ে অদ্যপর্যন্ত ৷ পঞ্চাশের গণহত্যা বা পঞ্চাশের বরিশাল দাঙ্গা ৷ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ, বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের চালিত বিরামহীন ধারাবাহিক একটি গণহত্যা। এই গণহত্যায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর নিয়োজিত ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং পাকিস্তানি পুলিশ, প্যরা মিলিটারী বাহিনী। তারা ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নির্যাতন, অপহরণ, চালায়। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস জুরে এই গণহত্যা চালাতে থাকে। একেবারে শেষ করতে পারেনি আমাদের, হয়তো আমাদের হিন্দু পরিবারের কিছু লোক হারিয়েছি, কিছু মা বোনদের ইজ্জত হারিয়েছি, কিছু ঘরবাড়ি খুইয়েছি। এর আগের ১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর দাঙ্গা বা গণহত্যা ছিল ইতিহাসের এক জগণ্যতম বর্বরতা ৷

১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের নোয়াখালী দাঙ্গা ৷ হামলার ধরন ছিল হত্যাযজ্ঞ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। সেই দাঙ্গায়’ও শেষ করতে পারেনি আমাদের, আজও বেঁচে আছি আমরা। এই নোয়াখালীর দাঙ্গায়ও আমাদের হিন্দু পরিবারের কিছু সদস্য হারিয়েছি, হয়তো আমার কিছু ভাই-বোনদের জোরপূর্বক মুসলিম ভাইদের দলে টেনে নিয়েছে, হয়তো ৫০০০০-১০০০০০ ভাই বোন হারিয়েছি, তাতে কী হয়েছে? বেঁচে’তো আছি আমরা! গেল ১৯৪৬ সাল, গেল ১৯৫০ সাল, তারপর আবার শুরু হলো ১৯৬৪ সালের হিন্দু মুসলিম রায়ট। সেই রায়টের জন্ম ১৯৬৩ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর ভারতের শ্রীনগরে অবস্থিত হজরতবাল দরগা শরীফের সংরক্ষিত নবী হজরত মুহম্মদের(সঃ) মাথার চুল চুরি হয়ে যায়। এজন্য ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে আব্দুল হাই নামে ইসলামিক বোর্ডের উপদেষ্টা কমিটির একজন সদস্য পূ্ব-পাকিস্তানের সকল অমুসলিমদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেয়। তার’ই ধাবাহিকতায় ১৯৬৪ সালের হিন্দু মুসলিম রায়ট শুরু হয়। রায়ট হয়ে গেল, দাঙ্গা শেষ হলো, আবার হিন্দু মুসলিম মিলেমিশে পোড়া ঘর পোড়া বাড়ি সাজিয়ে যখন বসবাস করতে শুরু করলাম ঠিক তখন’ই শুরু হয় আবার ১৯৭১ সালের গণহত্যা। এই গণহত্যা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ মাস থেকে, পরিসমাপ্তি ঘটে ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। দীর্ঘ নয় মাসে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ও বহু মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীনতা। আমরা মনে করেছিলাম স্বাধীনতা পেয়েছি, স্বাধীন ভাবে থাকবো, স্বাধীন ভাবে বসবাস করবো, হিন্দু মুসলিম মিলেমিশে থাকবো। কিন্তু না, পারছি না, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী যেমন খুঁজেছিল ইঁদুর কাহা, তেমনি এখনো খুঁজছে আমাদের। আমাদের সব হিন্দুদের ধর্মান্তর করতে পারলে বা এদেশ থেকে বিতারিত করতে পারলেই যেন শান্তি। কিন্তু কেন? কিসের আশায় এই হীন পদক্ষেপ? বলতে শোনা যায়, আমাদের মত কিছু অমুসলিমকে মুসলিম করতে পারলে নাকি বেহেশতে যেতে পারবে। একটা অমুসলিম মেয়েকে জোরপূর্বক হোক বা আপসে হোক ধর্মান্তর করতে পারলেই পুড়ো পরিবারের জন্য বেহেশত রেডি। তার জন্য’ই আমাদের উপর এত নির্যাতন, এত হামলা ৷

১৯৯০ সালে ভারতের অযোদ্ধার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের গুজবেও আমাদের উপর নির্যাতনের শেষ নাই। সে ঘটনায় ও আমাদের মা বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল, বহু ভাইয়ের প্রাণহানিও হয়েছিল, বহু বোনদের ধর্মান্তর করে বিবাহ করা হয়েছিল। এই সহিংসতার সময় আমি ঢাকা সদরঘাটের নদীর ওপারে কালিগঞ্জ রশিদ স্লিক টেক্সটাইল মিলে চাকরিরত অবস্থায় ছিলাম। সেই নির্যাতনের দৃশ্য আজো চোখের সামনে ভেসে উঠে ৷ তখন আমি আমার বাচ্ছাকাচ্চা নিয়ে এক হিন্দু বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, আমার মিলের মালিক ছিল মুসলমান, মালিক নিজে মিলে এসে ম্যানেজারকে নির্দেশ দিলেন আমার পরিবারবর্গ নিয়ে মিলের ভিতরে আশ্রয় নিতে ৷ তারপর সপরিবারে মিলের ভিতরে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যাই ৷ এর পর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বচনের পর আমিও দেশ ছাড়ার হুমকিতে পড়েছিলাম ৷ দেশ কিন্তু ছাড়িনি রয়ে’ই গেলাম ৷ সব কিছু উপেক্ষা করে এখনো বেঁচে আছি এদেশের মাটিতে ৷ এখনো চলছে আমাদের প্রতি, ও আমার ভাইয়ের প্রতি নির্যাতন, অত্যাচার, অবিচার ৷ গেল কদিন আগে নারায়নগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত শুক্রবার একদল লোক মারধর করে ৷ পরে স্থানীয় একজন সাংসদ সদস্য তাকে ক্ষিপ্ত জনগণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, সবার সামনে সেই শিক্ষককে কান ধরিয়ে উঠবস’ও করানো হয় ৷ শোনা যায়, সম্মানিত সংসদ সদস্য যদি সেখানে উপস্থিত না হতেন তখন অবস্থা আরো বেগতিক হতো ৷ বিক্ষুব্ধ জনতা ও বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ্‌ শুধু এভাবে লাঞ্ছিত করে’ই ক্ষেন্ত হয়নি, তাকে জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত করাও হয়েছিল ৷( তবে সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর এক বক্তব্যে জানা গেল যে, চাকরিচ্যুত বেআইনী ঘোষণা করে প্রধান শিক্ষককের চাকরি বহালের আদেশ দিয়েছে সরকার ৷ সেই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ্‌ বাতিলও করেছে ৷)৷ এর মূলকারণ ওই শিক্ষক সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় হওয়ার কারনে ৷ এই এলাকা আগে ছিল হিন্দু অধ্যষুত এলাকা, বর্তমানে আগেকার মত এই এলাকায় তেমন বেশি একটা হিন্দু নাই ৷ একজন শিক্ষক এই লাঞ্ছিত হওয়ার পিছনে কী কী কারণ থাকতে পারে, সে বিষয়ে তদন্তের দাবি রাখা যায় ৷ এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়েও গুটিচাল হতে পারে, এই শিক্ষকের সাথে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির কোন সদস্য বৃন্দের সাথে পূর্বশত্রুতা ছিল কি না? প্রধান শিক্ষকের সাথে স্থানীয় কোন মৌলবী মুন্সির কথা কাটাকাটি হয়েছিল কি না, ইত্যাদি বিষয়ে তদন্ত করলে’ই মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে আশা রাখি ৷ এদেশে যত লঞ্ছনার, শিকার আমরা হিন্দুরা’ই হচ্ছি যুগ-যুগ ধরে ৷ প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা, একটু ভেবে দেখুন!! কোথায় যাবো আমরা? আমরা’তো আপনাদের’ই একজন ভাই, পাড়াপড়শী ৷ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের সম্প্রদায়ের কত ভাই-বোনও তো রক্ত দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে হিন্দু মুসলিম সম্মিলিত ভাবে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছি ৷ সেই দিনগুলির কথা কি ভুলে গেলেন? একটু দয়া করুন, আমাদের বাঁচতে দিন ৷ দয়া করা’ই হলো স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ দান ৷