ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

Rickshaw-walaরিকশা (রিক্সা) চড়েনি এমন মানুষ এদেশে পাওয়া যাবেনা নিশ্চয়ই ৷ গ্রামে, গঞ্জে, হাট বাজারে, দেশের আনাচেকানাচে সর্বত্র রিকশা ৷ কোন একসময় আমিও নারায়নগঞ্জ শহরে রিকশা চালিয়ে দিনাতিপাৎ করেছি, অভাব আর বেকারত্বের কারণে ৷ যখন রিকশা চালাতাম তখন ভাবতাম, এই দেহ চালিত বাহনটির আবিষ্কারক কে? কে এই যানবাহন’টি এই দেশে আনলেন? নিজের প্রশ্ন, নিজের কাছেই থেমে যেত ৷ কেন’না, তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যম তখন খুব’ই কম ছিল, কম্পিউটারের নামও তখন বেশি একটা শোনা যেত না, যদিও বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার আসে ১৯৬৪ সালে৷ সেই কম্পিউটার ছিল শুধু বড়-বড় অফিস আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ৷ মোবাইল’তো নাই বললেও চলে ৷ মোবাইল ফোনের প্রথম বাণিজ্যিক সংরক্ষণ বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে ৷ ফোনটির নাম ছিল মোটরোলা ডায়না টিএসি ৮০০০ এক্স (DynaTAC 8000x)৷ এই মোটরোলা কোম্পানিতে কর্মরত ডাঃ মার্টিন কুপার এবং জন ফ্রান্সিস মিচেল কে প্রথম মোবাইল ফোনের উদ্ভাবকের মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে, এর মূলে ছিলেন ডাঃ মার্টিন কুপার ৷ তাঁরা ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে প্রথম সফল ভাবে একটি প্রায় ১(এক কেজি) ওজনের হাতে ধরা ফোনের মাধ্যমে কল করে কথা বলতে সক্ষম হয় ৷ আর বাংলাদেশে মোবাইল ফোন প্রথম চালু হয় ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে ৷ হাচিশন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড ( এইসবিটিএল) ঢাকা শহরে AMPS মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোন সেবা শুরু করে ৷ আর আমার ভাববার সময়টা তখন যত সম্ভব ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি হবে, যখন আদর্শ কটন মিলস থেকে আমরা নগর খানপুরে আসি ৷ আমি যেই মহাজনের রিকশা চালাতাম ওনাকেও জিজ্ঞাসা করেছি, মহাজন’ এই রিকশা কে আবিষ্কার করেছে? মহাজন বললো এত কিছুর খবর রাখে কে রে!! বুঝলাম, মহাজনও পারলো না ৷ এখন তথ্যপ্রযুক্তির ডিজিটাল যুগ, সব তথ্য হাতের মুঠোতে’ই থাকে ২৪ ঘন্টা ৷ রিকশা দেহ চালিত ত্রিচক্রযান, শুধু এশীয়া মহাদেশেই এর বিস্তার নয় ৷ এটি বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন চীন, জাপান, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, মালোশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, কম্বোডিয়া সহ ইউরোপীয় অঞ্চলেও দেখা যায় ৷ এর মধ্যে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে বেশি প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী বাহন ৷ আবার একেক দেশে একেক রকম গঠন,আকার ও তৈরির দিক থেকে পার্থক্য দেখা যায় ৷ রিকশা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত ৷ চীনে এটিকে ‘সানলুঞ্ছে’, কম্বোডিয়ায় ‘সীক্লো’, মালোশিয়ায় ‘বেকা’, ফ্রান্সে ‘স্লাইকো’, আর ইউরোপীয় অঞ্চলে এটি পেডিক্যাব নামে পরিচিত ৷

আগেকার সময় জাপানের মত ধনী দেশেও রিকশা ছিল, তখনকার সময় জাপানের রিকশা গুলো তিন চাকার ছিল না, সেগুলে দুই চাকার ঠেলাগাড়ির মত ছিল ৷ একজন মানুষ সেটা টেনে নিয়ে যাত্রিকে গন্তব্যে পৌ্ঁছাতো, বিনিময়ে মিলতো সীমিত পারিশ্রমিক ৷ এধরণের রিকশা কে হাতে টানা রিকশা ও বলতো অনেকে ৷ দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে এর গঠন, আকারও বদলে যায় ৷ বর্তমানে বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারী সংযোজন করার মাধ্যমে যন্ত্রচালিত রিকশা ও তৈরি করে ফেলেছে এই রিকশা কে ৷ বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতে এই যন্ত্রচালিত রিকশা হুঁ হুঁ করে বেড়ে’ই চলছে দিন দিন ৷ তবে এই বাংলা রিকশা শব্দটি এসেছে জাপানী জিনরিকশা (জিন= মানুষ রিকি= শক্তি, শা=বাহন) শব্দটি থেকে, যার আভিধানিক অর্থ হলো মনুষ্যবাহিত বাহন ৷ ইতিহাসে জানা যায়, পালকির বিকল্প হিসেবে ১৮৬৫ সালের প্রথম কে এর উদ্ভাবন করেছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে ৷ সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য মতটি হলো, জোনাথন স্কোবি নামে একজন মার্কিন মিশনারি ১৮৬৯ সালে রিকশা উদ্ভাবন করেন ৷ স্কোবি থাকতেন জাপানের সিমলায় ৷ ১৯০০ সালে রিকশা তৈরি হয় কলকাতায় শুধু মালপত্র বহনের জন্য ৷ ১৯১৪ সালে কলকাতা পৌরসভা রিকশায় যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দেয় ৷ ততদিনে মিয়ানমারের রেঙ্গুনেও রিকশা জনপ্রিয় হয়ে উঠে ৷ শোনা যায় ১৯১৯ সালে রেঙ্গুন থেকে রিকশা আসে চট্রগ্রামে, তবে ঢাকায় রিকশা চট্রগ্রাম থেকে আসেনি, এসেছে কলকাতা থেকে ৷ ইতিহাসে জানা যায়, নারায়নগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় রিকশা নিয়ে আনেন ৷ দক্ষিণ এসিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতেও প্রচুর রিকশা দেখা যায়, ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ধরণের পরিবহন ব্যবস্থাকে “অমানবিক” আখ্যা দিয়ে হাতে টানা রিকশা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনে ৷ ১৯২০-এর দশকে সুদূর পূর্বের আদলে ভারতেও ‘সাইকেল রিকশা প্রবর্তিত হয় ৷ এগুলি আকারে ট্রাইসাইকেলের তুলনায় বড়, পিছনে উঁচু সিটে দুজন মানুষ বসার ব্যবস্থা থাকে এবং সামনের প্যাডেলে একজন বসে রিকশা টানে ৷ ২০০০-এর দশকে কোন কোন শহরে যানজট সৃষ্টির জন্য রিকশা নিষিদ্ধ ঘোষিও হয় ৷ যদিও দূষণহীন যান হিসেবে রিকশা রেখে দেওয়ার পক্ষে’ই মত প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা ৷ আমাদের বাংলাদেশে রিকশা একটি বহুল ব্যবহৃত পুরোনো যানবাহন ৷ এদেশর আনাচেকানাচে রয়েছে রিকশা ৷ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের রিকশা রাজধানী নামেও পরিচিতি লাভ করেছে ৷ ঢাকা শহরে রোজ ৪.০০.০০০টি রিকশা চলাচল করে ৷

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য মতে, ঢাকায় কমপক্ষে পাঁচ লক্ষাধিক রিকশা চলাচল করে এবং ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষ’ই রিকশায় চড়ে ৷ ২০১৫ সালের গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রকাশনায় এ সম্প্রর্কিত একটি বিশ্বরেকর্ড অন্তভুক্ত করা হয় ৷ তবে কলকাতা থেকে আমদানীকৃত ভিন্ন ধরনের রিকশা ১৯৩০ (মতান্তরে ১৯৩১) সাল থেকে চলতে শুরু করে ৷ এইসব রিকশার পিছনে থাকে রিকশাচিত্র চিত্রকলার নানারকমের আর্ট করা টিনের ধাতব প্লেট, খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করতে সক্ষম ৷ সাধারণত ভারত বাংলাদেশের রিকশার পিছনের টিনের প্লেটে, হুডে এবং ছোট ছোট অনুষঙ্গে এই বিশেষ চিত্রকলা লক্ষ করা যায় ৷ এই রিকশাচিত্রে সমাজের, দেশের গ্রামবাংলার, চলচিত্রের, নানাবিধ পণ্যের বিজ্ঞাপন সহ এক সাবলীল চিত্র তুলে ধরা হয় ৷ মূলত এটি রিকশার একটা “ডেকোরেশন” বলা হয়, যা ছাড়া রিকশার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না ৷ অতচ এই বিশেষ চিত্রকলার জন্য নেই কোন আলাদা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা, একেবারে দেশজ কুটিরশিল্পের মতই শিল্পীরা স্বপ্নণোদিত হয়ে শিখে থাকেন, এবং নিজেদের কল্পনা থেকেই এঁকে থাকেন এসব চিত্র ৷ বাংলাদেশে রিকশাচিত্র প্রচলিত হয় ১৯৫০ সাল থেকে ৷ এর আগে এরকম রিকশাচিত্র চোখে পরেনি কারোর ৷ আগেকার সময় রিকশায় যাত্রীদের নিরাপদের জন্য কোন মাথাব্যথা ছিল না, যেমন ছিল’না রিকশার পিছনের বাম্পার, যা চলন্ত অবস্থায় পিছন থেকে ধাক্কা হজম করতে সক্ষম হয়, যাত্রীও থাকে নিরাপদে ৷ ছিলনা আবার হুড, যা থাকলে ছোট শিশুরা ধরে বসে থাকতে পারে অনাহাসে ৷ বর্তমানকালে সবই আছে রিকশায়, কিছুদিনের মধ্যে ট্রিংট্রিং বেলবাটির শব্দ আর শোনা যাবে’না, সব রিকশাতে’ই থাকবে বৈদ্যুতিক হর্ণ ৷ অধিক হারে এই রিকশা বেড়ে যাওয়াতে শহরের রাস্তাগুলোতে অতিমাত্রায় যানজট দেখা যায় ৷ এই যানজটের কারনে ঢাকার অনেক ভিআইপি সড়কে রিকশা চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে ৷ তবুও বাড়ছে এই রিকশার জনপ্রিয়তা ৷ রিকশার জনপ্রিয়তা ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয় বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে,যেখানে বাংলাদেশের রিকশায় করে মাঠে উপস্থিত হন অংশগ্রহণকারী দলগুলোর দলপতিরা ৷ পাশাপাশি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে আগত অতিথিদের বরণে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশে ৭টি রিকশা পাশাপাশি বসিয়ে পিছনে WELCOME-এর প্রতিটি হরফ আলাদা আলাদাভাবে লিখে স্বাগত জানানো হয় ৷ এছাড়া ঐবছর বিশ্বকাপকে উপলক্ষ করে ‘সিএনএন’গো ওয়েবসাইট প্রকাশ করে ঢাকার দশটি বিষয়ের বর্ণনামূলক প্রতিবেদন, যে দশটি বিষয় দিয়ে চেনা যাবে ঢাকাকে, যার তৃতীয়টি’ই ছিল রিকশা বা রিকশাচিত্র ৷ তবে কালের পরিবর্তনে রিকশাও পরিবর্তন হচ্ছে দিন-দিন, আগেকার সময় তিন কিলোমিটার রাস্তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগতো ৩০ মিনিট, আর এখন লাগছে মাত্র ১৪-১৫ মিনিট ৷

প্যাডেল রিকশা এখন যান্ত্রিক রিকশা ৷ দেশের প্রায় সব জেলা শহরগুলোতে আগেকার দেহচালিত পেডেল রিকশা দিন-দিন’ই কমে যাচ্ছে, বাড়ছে যান্ত্রিক রিকশা ৷ দেশের বিভিন্ন শহরের তুলনায় নারায়নগঞ্জে এর বিস্তার সবচেয়ে বেশি ৷ শত প্রতিকূলতা থাকা সত্বেও বলবো এসব ক্ষুদ্রকায় যানবাহন দেশের আংশিক বেকারত্বের অভিষাপ থেকে কিছু মানুষকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে ৷ যেমন আমিও একজন, যখন কোন চাকরি থাকে’না তখন’ই রিকশা হয় জীবিকা সন্ধানের একমাত্র সম্বল ৷ প্রিয় পাঠক ও আমার সগব্লগার ভাই-বোনেরা, আমি রিকশা চালিয়েছি বলে আমাকে আপনারা ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে দেখবে’না ৷ কোন চাকরি না’থাকলে এখনো কোন আত্মীয়-স্বজনের শরণাপন্ন হই’না, নিজে যাই পারি তাই করে সংসার চালাই, তাই সময় সময় বহুবিধ কাজের সঙ্গে নিজকে জরাতে হয় ৷ আর নিজের জীবনের সত্য ঘটনা প্রকাশের পর যদি হাজার লোকের কাছে ঘৃণিত হই দুঃখ নেই ৷ কারণ: নিজের জীবনের কাছে, নিজের মনের কাছে আমি সত্যবাদী ৷ হ্যাঁ এখন মূল কথায় আসা যাক: এখন নারায়নগঞ্জ শহরের কথা’ই ধরা যাক, প্রতিদিন যদি (২০০০০) বিশহাজার রিকশা, অটোবাইক শহরের আনাচেকানাচে চলাচল করে জীবিকা নির্বাহ করে, তবে এই (২০০০০) বিশহাজার চালকের প্রতি পরিবারে তিনজন করে সদস্য থাকলে মোট সদ্স্য সংখ্যা দাড়ায় (৬০০০০) হাজার ৷ এই ২০০০০ হাজার রিকশা চালক রিকশা চালিয়ে যদি এই (৬০০০০) লোকের ভরণপোষণ জোগাড় করতে পারে তা’হলে দেশের জন্যও ভাল ৷ IMG_20160529_184642

তাই বলা যায় এই রিকশা চালকেরা আমাদের অর্থনীতিতে ঘূর্ণায়মান এবং কিছুটা পরিমাণ হলেও পরিবেশ কার্বন মুক্ত করছে ৷ তাই এই ঐতিহ্যবাহী ত্রিচক্রযান রিকশাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা আমাদের’ই দায়িত্ব ৷ বেঁচে থাকুক ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ত্রিচক্রযান রিকশা ৷ রিকশা হোক জাতীয় বাহন ৷
(তথ্য সংগ্রহ উইকিপিডিয়া, ছবি সংগ্রহ গুগল)

slide