ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 
joutuk_0

সময়টা ছিল ১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি, চাকরি করতাম নারায়নগঞ্জের কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল মিলে ৷ সেই সময় আমাদের বাংলাদেশে পলিয়েস্টার সূতার নতুন আগমন, তখনকার সময় বাংলাদেশ বেতারেও এই পলিয়েস্টার সূতার গুনাগুন মানুষের কাছে তুলে ধরে প্রচার করতো ৷ তখনকার সময় আমাদের বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের লোকেরা বুঝতো যে পলিয়েস্টার সূতার কাপড় খুবই দামি সূতার তৈরি ৷ তাই এই সূতার কাপড়চোপড়ের দামও ছিল তুলনার চাইতে অনেক বেশি, তারপরেও লোকে এই পলিয়েস্টার সূতার কাপড়ের দিকে বেশি নজর দিতো বা খরিদ করতো ৷ তখন এই পলিয়েস্টার সূতা দিয়ে বেশি তৈরি হতো শার্টিং-শুটিং, অর্থাৎ শার্টের কাড়র আর ফুলপ্যান্টের কাপড় ৷ এই পলিয়েস্টার সূতার কাপড়ের দিকে মানুষ বেশি ঝোঁক থাকার কারণ ছিল এই জন্য যে, এই সূতার তৈরি কাপড়র সহজে ছিঁড়তো না বা পচতো না তাই ৷ যাক সে কথা, তখন কেবল টেক্সটাইলে নতুন কাজ শেখা, কাজের চাহিদাও প্রচুর, টেক্সটাইল মিলের অভাব ছিল না তখন ৷ জাগায়-জাগায় টেক্সটাইল মিল, গার্মেন্টস বলতে তো ছিলো’ই না ৷ এখন যেমন নারী-পুরুষ একসাথে মিলেমিশে কাজ করে, তখনো নারী-পুরুষ আমরা একসাথেই কাজ করতাম ৷ প্রথম আমি কাজ শিখেছিলাম তাঁতে, তাঁতের কাজটা আবার রাত জেগেও করতে হয় ৷ তারপরেও করেছিলাম প্রায় এক বছর, পরে আর রাত জেগে কাজ করতে ভাল লাগছিল না ৷ আস্তে-আস্তে শিখলাম দিনের বেলায় যেই কাজটার রীতি সেই কাজ “ড্রয়ারম্যান” ( রিচিংম্যান ) ৷ সবসময়ই দিনের কাজ এটা, রাতে এই কাজ করা যায় না, বা মালিকপক্ষ করতেও দেয় না, হিসাবে ভুল হয়ে যাবে তার কারণে ৷ এই কাজটা সম্পূর্ণ হিসাবের কাজ বিধায় কাজটার নাম রিচিং মানি হচ্ছে রিচার্জ করা ৷ যাই হোক, ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গেলে বহু লিখতে হয়, ব্যাখ্যা না দিয়ে তাই মূল কথায় আসি ৷ তখন আমার বয়স হবে আনুমানিক ২৪ বছর, বিয়ের বয়স তো মোটামুটি হয়েছে, তবুও মনে জাগে না যে, আমি বিয়ের উপযুক্ত হয়েছি ৷ কর্ম ক্ষেত্রে সমবয়সী যারা আছে তাঁরা সবাই আমাকে বিয়ে দিবে সেই প্যাঁচাল নিয়েই থাকে বারঘন্টা ৷ একজন বলে বাবু তোমাকে আমাদের দেশে বিয়ে করাবো, আরেক জন বলে বাবু তোমাকে আমাদের দেশে বিয়ে করাবো ৷ সবার এভাবে বলাটা স্বাভাবিক, কারণ বিয়ের উপযুক্ত তো হয়েছি, তাই ওরা বলছে, কেউ আবার বলে মেয়ের বাবা থেকে ১০০০০/=টাকাও যৌতুক হিসেবে লইয়ে দিবে ৷ ওদের কথায় আমি রাগ-ঘোঁস্যা করিনা, নিশ্চুপ থাকি ৷ কিন্তু আমার তো প্রতিজ্ঞা যে, বিয়ে করবো গরিবের মেয়ে, তা হবে যৌতুক বিহীন ৷ সৃষ্টিকর্তা কি আমার সেই আশা পূরণ করবে? তা সৃষ্টিকর্তাই জানে ৷ মিলে কাজটাও করি একটু মূল্যবান কাজ তাই ওদের এত গা’জ্বলা বা উঠেপড়ে লাগা ৷ এইভাবে কেটে গেল অনেকদিন, এর মধ্যে আমার একটা শারগেদ ছিল, ওর বাড়ি ছিল বিক্রমপুরে, নাম আবু কালাম ৷ সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর তা ও কিছুদিন পর ৷ ও আমাকে প্রায়ই বলতো ওস্তাদ, ঈদে আপনি আমাদের বাড়ি যাবেন? আপনি আমাদের বাড়ি গেলে খুব আনন্দ হবে, আর আমার মা-বাবাও বিষণ খুশি হবে ৷ এর কিছুদিন পর’ই ম্যানেজারের সাথে কাজ নিয়ে ঝগড়া বাঁধে আমার, আর কি ! সাথে-সাথেই চাকরি ছেড়ে দিলাম কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল মিল থেকে ৷ একদিন পর চাকরি নিলাম ফতুল্লা কাঠেরপুল ওয়েল টেক্স মিলে, বেতন ৫০০০/= টাকা ৷ তখনকার সময় ৫০০০/=টাকা বিরাট কিছু ৷ এখানে চাকরি করতে লাগলাম সুনামের সহিত, মিলের সকল শ্রমিকরা আমাকে সম্মান করত, কর্মক্ষেত্রে আমার উপদেশও সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করতো, কেউ অমান্য করতো না ৷ এভাবে কাজ করতে লাগলাম, ঈদ ও আর কিছুদিন পর অনুষ্ঠিত হবে, বাকী আছে ১৫ দিন ৷ কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল হতে আমার সারগেদ আবুল কালাম একদিন আমার কর্মস্থল ওয়েল টেক্সটাইলে এসে হাজির, বললো ঈদের বন্ধে ওস্তাদ আপনি আমাদের বাড়ি অবশ্যই যাবেন ৷ ওর উদ্দেশ্য একটাই, ওদের গ্রামের একটা মেয়ে দেখাবে, যদি পছন্দ হয়ে যায়, তাহলে বিয়ে হবে, বিয়ে হলেই ওর একটু সুনাম হবে আর কি ! ওর কথায় আমি সাঁয় দিলাম যে, যদি পারি তবে যাব তোদের বাড়ি ৷ ওকে বিদায় দিলাম একথা বলে ৷ ঈদের বন্ধ পেলাম পাঁচদিন, আমার সাথে বর্তমানে যেই হেলপার আছে ওর নাম কানাই লাল সাহা ৷ ঠিক ঈদের দিন মায়ের কাছে বলে ভোরবেলা কানাইকে নিয়ে রওনা দিলাম সেই বিক্রমপুরের উদ্দেশে ৷ এখনকার মত তখন এত হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না যে, ফোন করে জানিয়ে দেই কালাম আমি আসছি তোমাদের বাড়ি ৷ কিন্তু ফোন নাই বলে কি ! ফোনের চেয়ে দ্রুত ওর মন ! ও নিশ্চিত আমি আসছি ওদের বাড়ি ৷ কালাম ঠিক সকাল ১০ ঘটিকার সময় তালতলা সুবচনী বাজার লঞ্চঘাটে এসে হাজির হয়ে বসে আছে আমার আগমনের অপেক্ষায় ৷ আমরা নারায়নগঞ্জ ফতুল্লা লঞ্চঘাট থেকে সকাল ৮ ঘটিকার সময় লঞ্চে চড়ি সুবচনী যাওয়ার জন্য ৷ সুবচনী যেতে সময় লাগলো দুঘন্টা, লঞ্চ থেকে নামার সাথে সাথে কালাম এসেই আমাদের ব্যাগটা নিয়ে নিল ওর কাদে ৷ তখন ছিল এমুন’ই বর্ষাকাল, চারিদিক্‌ পানি আর পানি, নৌকা ছাড়া চলার কোন উপায় নাই ৷ ওর দিকে দেখি ওর মুখখানা শুখনো দেখাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলাম কালাম তুমি কতক্ষণ যাবৎ আমাদের অপেক্ষায় এখানে দাড়িয়ে আছ? ও বললো হবে তো প্রায় একঘন্টা ওস্তাদ ৷ আমি বুঝতে পারলাম ও বিরক্তি বোধ করছে ! ওকে আর কিছু বললাম না, শুধু বললাম চলো তোমাদের বাজারটা আগে ঘুরে দেখি, কি বলিস কানাই ! কানাই বললো হ্যাঁ চল বাজারও দেখা হবে, সেই সাথে কিছু জলপানও করা যাবে ৷ বাজারের ভিতরে ঢুকলাম, ঢুকতেই দেখি একটা মিষ্টির দোকান, আমি বললাম কানাই চল, যদি কিছু জলপান করতে ইচ্ছে হয় তবে এই দোকানেই করে নেই ! কানাই বললো হ্যাঁ তো ভালোই হয় ৷ তিনজন মিষ্টির দোকানে ঢুকলাম, তিনজনে জলখাবারের পর সাথে করে আরো ৪ কেজি মিষ্টি নিলাম কালামদের বাড়ির জন্য, বিল দিলাম তখনকার সময়ে ৪ কেজি মিষ্টি সহ ২৫০ টাকা ৷ কালাম তো এক প্রকার হতবাক ! ও বলতে লাগলো এত মিষ্টি নিলেন কেন ওস্তাদ? বললাম, জীবনে কোন দিন তোদের বাড়ি কি আর এসেছি ! এই প্রথম এলাম তাই ৷ তারপরে আবার ওকে জিজ্ঞেস করলাম তোর মা-বাবা কি পান খায়? ও বললো হ্যাঁ ওস্তাদ, কেন? ওকে কিছু না’বলে পানের দোকানে গেলাম, পান-সুপারি-জর্দা সহ ৫০ টাকার সদাই কিনলাম ৷ এবার বাড়ি যাওয়ার পালা, ঘাটে-ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে অনেক, কালামের নিজেদের পরিচিত নৌকাও আছে ঘাটে ৷ কালাম বললো আসেন ওস্তাদ ওই নৌকায় উঠেন, নৌকার মাঝি আমাদের নয়াবাড়ির গ্রামের ৷ লঞ্চ থেকে যেই ঘাটে নামলাম সেই ঘাটের নাম সুবচনী, সুবচনী হতে নয়াবাড়ির দূরত্ব হবে প্রায় এক কিলোমিটার ৷ নৌকায় গিয়ে বসলাম তিনজনে, নৌকার মাঝি কালামকে বললো, আরো লোক উঠাবে না কি? কালাম বললো না, আর কোন লোক উঠানোর দরকার নেই চাচা, নৌকা ছেড়ে দেন তাড়াতাড়ি ৷ নৌকার মাঝি নৌকা ছেড়ে দিলো, নৌকা চলছে ধীর গতিতে, মোট কথা একেবারে মাঝির আপন মনে চালাচ্ছে নৌকা ৷ আমারও বিষন ভাল লাগছিল, নৌকা চলছে সুদিের কৃষকের চাষ করা জমির উপর দিয়ে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে, আমরা যেন কোন এক অথৈ সাগর পাড়ি দিচ্ছি ৷ চারিদিক্‌ পানি আর পানি, হালকা বাতাসে মাঝে-মাঝে নদীর মত ঢেউও উকি মারে, নৌকা চলছে হেলে-ধুলে ৷ এক পর্যায় আমরা দুজন, কানাই আর আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা টেরও পাইনি ৷ প্রায় এভাবে আধা ঘন্টা নৌকা চলার পর কালাম আমাদে ডাকতে শুরু করে দিল, ওস্তাদ উঠেন উঠেন বলে ৷ ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি নৌকা একটা বাড়ির ঘাটে ছোট একটা আম গাছের সঙ্গে বাঁধা, তাকিয়ে দেখি হায় একি ! এত মানুষ নৌকার সামনে কেন? সব মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে আমাদের দুজনকে দেখছে ৷ শরম-শরম ভাব হচ্ছিল আমাদের দুজনের, নৌকা থেকে নামতে চাচ্ছিলাম না ৷ কালাম বার-বার বলছিল ওস্তাদ নামুন নৌকা থেকে, দেখুন না, আপনাদের দেখার জন্য কত মানুষ ভিড় করছে ! তারপরেও কেমন যেন লজ্জা-লজ্জা লাগছিল আমার কাছে, কানাই নৌকা থেকে নেমে উপরে উঠে দাঁড়াল ৷ আমি তখনো নৌকায়, কানাই বলল কিরে নাম ! তখন আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম নৌকা থেকে, নৌকা থেকে নামার পর মাঝিকে বললাম নৌকা ভাড়া কত দিতে হবে আপনাকে ! মাঝি বলল দেন চাচা যেত মন চায় আপনার ৷ মাঝিকে ৫০ টাকা হাতে দিতেই কালাম বলল, ৩৫ টাকা ফেরৎ দিন মাঝি চাচা ! আমি বুঝতে পেরেছি জনপ্রতি ৫ টাকা নৌকা ভাড়া ৷ মাঝি চাচাকে বললাম থাক আপনাকে আর টাকা ফেরৎ দিতে হবে না, ফেরতের টাকা দিয়ে আপনি কিছু খেয়ে নিবেন কেমন ! মাঝি চাচা খুব খুশি হয়ে নৌকার বাঁধন খুলে নৌকা নিয়ে চলে গেলেন ৷ আমরাও আস্তে-আস্তে হাটতে লাগলাম কালামের সাথে, ঘাট থেকে একটু দূরে কালামদের বাড়ি, মাঝ পথে পুকুর পাড়ে বড় একটা পাকা শিরিঘাট, খুবই সুন্দর ৷ আমরা হাঁটছি আমাদের আগে-পিচে ছোট-বড় অনেক লোকও হাঁটছে আমাদের সাথে, যেন নতুন জামাই যাচ্ছি শশুর বাড়ি ৷ সোজা কালামদের ঘরে গিয়ে উঠলাম কানাই আর আমি ৷ আমাদের আগমন উপলক্ষ্যে আগে থেকেই ঘর পরিপাটী করে সাজিয়ে রেখেছে ওরা, তাছাড়া ঈদের দিনে এমনিতেই ঘর-দুয়ার সাজিয়ে রাখে ধনী-গরিব সবাই ৷ তারপরেও নারায়নগঞ্জের মেহমান বলে কথা, তার উপর আবার কালামের ওস্তাদ ৷ ঘরের লোকজন সঙ্গে নিয়ে যাওয়া মিষ্টি, তাদের তৈরি করা সরবত, সেমাই সামনে এনে দিল খাওয়ার জন্য ৷ কালাম ও তাঁর ছোট বোন বলতে লাগল খাওয়া শুরু কের দিন, ভাতও রেডি করছি ৷ কানাই কানে-কানে বলল খাওয়া শুরু কর পেটে ক্ষুধা নিবারণ কর ! আস্তে-আস্তে খাচ্ছি দুজনে, কালামকে দিচ্ছি সাথে কালামের বোনকে দিচ্ছি ৷ এর মধ্যে কালামের মা এসে হাজির হল, কালামকে জিজ্ঞেস করলো কালাম তোর ওস্তাদ কে? কালাম তর্জনী দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল এই আমার ওস্তাদ ৷ কালামের মা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল বাবা তোমার কথা কালাম আরো বহুবার বলেছে, তুমি যে তাঁতের কাজ আমার ছেলেকে শিখিয়েছ, তাতে আমরা তোমার কাছে ঋণী ৷ যদি কালাম এই তাঁতের কাজ না শিখতো তবে আমাদের অবস্থা যে কী হতো তা বলা মুশকিল ৷ আমি বললাম না কাকী’মা না, আমি ওর জন্য কিছুই করতে পারি নাই, সব দয়ালের ইচ্ছায় হয়েছে, তিনি’ই সব ৷ এভাবে অনেক কথা হলো কাকী’মার সাথে, কথা বলতে বলতে ভাতের প্লেট আসতে লাগলো সামনে, আমি বললাম এগুলিতো এখন চলবে না কালাম, আরো পরে ভাত খাব এখন নয়, এখন চল বাহিরে ঘুরতে যাই ৷ কালাম বললো ঠিক আছে ওস্তাদ তাই হবে, তো আমাদের গ্রামেই ঘুরবেন? না কী নৌকা চড়ে অন্য গ্রামে ঘুরতে যাবেন ৷ বললাম আগে তোদের গ্রামটাই ঘুরে দেখি তারপরে না হয় অন্য গ্রামে যাবো ! এসব কথা বলতে বলতে কালামদের ঘর থেকে বাহির হয়ে ওই শিরিঘাটে গয়ে বসলাম তিনজনে, তখন এই পাকা ঘাটখানর কাহিনী বলতে লাগলো কালাম ৷ ঘাটখানা হলো এক হিন্দু ঘোষাই বাড়ির, নাম ছিল তাঁর সত্যগুরু ৷ সত্যগুরু এখন আর নেই, তাঁরা ১৯৬৪ সালের রায়টের সময় ভারত চলে যায়, যাওয়া আগে বর্তমানে যিনি আছে ওনাকে এই বাড়িটা দান করে গেছেন, বর্তমানে উনি’ই এই বাড়ির মালিক ৷ নাম নারায়ন সরকার, বহুদিন যাবৎ তিনি এই বাড়িতে এবং আমাদের সাথে বসবাস করে আসছেন ৷ শিরিঘাটে বসে কথা বলতে বলতে থালা-বাসন ধোয়ার জন্য একটা মেয়ে থালা-বাসন নিয়ে শিরিঘাটে আসলো ৷ কানাই আমাকে আঙ্গুল দিয়ে গুঁতাচ্ছে ময়েটাকে দেখার জন্য, কানাইকে কানে-কানে বললাম দেখিছি, খবর লও আমার পছন্দ হয়েছে ৷ কানাই কালামকে কানে-কানে বললো, কালাম ভাই কাম সারছে ! কালাম হাসতে হাসতে মেয়েটার নাম ধরে ডাকলো, মেয়েটা সামনে এসে বললো কালাম ভাই আমাকে ডাকছেন? কিসের জন্য বলুন ! কালাম বললো আরে তুমি যে কোন ক্লাশে পড় তা জানার জন্য, অন্য কিছু নয় ৷ ময়েটা বললো কালাম ভাই এবার আমি ক্লাশ ফাইভে পরীক্ষা দিবো ৷ এরপর থেকে সারা বিকাল এবং রাত দশটা পর্যন্ত এই ঘাটেই সময় কাটালাম ৷ গ্রামের অনেক মানুষ’ই আমাকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছে, উত্তর দিয়েছি, তাদের সাথেও কথা বলেছি ৷ পরদিন বিদায়ের পালা, ঘাটে গেলাম মেয়েটাকে দেখার জন্য, কালাম বুঝতে পেরে মেয়েটাকে ডাকলো ৷ কিছুই বললাম না শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে একটু দেখছিলাম, আমার অজান্তে এক সময় কানাই আর কালাম মেয়েটার মা’বাবার সাথে মোটামুটি আলাপও করেছে পরে জানতে পারলাম ৷ যাই হোক সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘাটে বাঁধা নৌকায় চড়ে সুবচনী লঞ্চঘাট আসলাম, কালাম আমাদের লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে, ঘাটে দাঁড়িয়ে রইল লঞ্চ ছাড়া পর্যন্ত ৷

nari_bondp joutuk

নারায়নগঞ্জ আসলাম, কানাই তো সারামুল্লুক জানিয়ে দিলো মেয়ে দেখে এলাম, মেয়ে পছন্দ হয়ছে, আমার মায়ের কাছেও বলেছে ৷ মা তো বিষণ চিন্তায়, আবার খুশিখুশি ভাব ৷ এভাবে ঘোষিত ঈদের বন্ধ শেষ হলে মিলে যাই কাজে যোগদানের জন্য ৷ মিলের সবার কাছেই কানাই বলেছে বাবু বিয়ে করবে বিক্রমপুর সুবচনী ৷ আমিও মিলের সেক্রেটারি সভাপতি সাহেবকে বললাম বিয়ে করবো অতি শিগ্‌গির, তো এডভান্স কিছু টাকার প্রয়োজন হতে পারে আমার, হেল্প করতে পারবেন কি? সেক্রেটারি সভাপতি বললো মালিকের কাছে ১০০০০/=টাকা এডভান্স চেয়ে একটা দরখাস্ত দিয়ে রাখেন বাকীটা আমরা দেখবো ৷ ঠিক তাই করলাম, মালিক পক্ষ বললো যখন বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হবো তখন বাবুর নামে ১০০০০/=টাকা এডভান্স মঞ্জুর করা হবে নিশ্চিত ৷ জানলাম সেক্রেটারি সভাপতির কাছ থেকে ৷ এভাবে কেটে গেল প্রায় ৭/৮ মাস, পোষ্টের মাধ্যমে মেয়েটার সাথে যোগাযোগ চলছিল আমার, একদি হটাত মেয়ের বাবা এসে হাজির ৷ আমার বড়দাদা তো একেবারে রেগে অস্থির, আর কি করা, অতিথিকে তো আর দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয়া যায় না ! সমাদর করে ঘরে তুলতেই হয়, রাতে কিল্লারপুল ফাইন টেক্সটাইল মিলে হবে বিয়ের কথাবার্তা ৷ কথাবার্তা হচ্ছে ফাইন টেক্সটাইলের ম্যানেজার ও সুবচনীর আরো চার-পাঁচজন তাঁতির সাথে আর আমার বড়দাদার সাথে ৷ মেয়ের বাবা দাদাকে মেয়ে দেখার জন্য অনুরোধ করলো, দাদা বললো ওর পছন্দ হয়েছে, আমাদের আর দেখার প্রয়োজন নাই ৷ দাবিদাওয়া কি? মেয়ের বাবার এক কথা, আমি গরিব মানুষ, আমার কিছু নাই, আর কিছু দিতেও পারবো না ৷ কথা কাটাকাটি চলছে দাদার সাথে, মিলের ম্যানেজারও দাদার পক্ষে কথা বলছে ৷ কিন্তু সমাধানে আসছেনা কেউ, আমি কালামকে ডাকলাম বাহিরে থেকে, কালামকে বললাম দাদা যেভাবে চায় ঠিক সেভাবে মেয়ের বাবাকে বলো রাজি হয়ে যেতে, পরে আমি দেখবো কী করা যায় ৷ কালাম বললো ওস্তাদ আপনার দাদাতো ৭০০০/=টাকা ক্যাশ চাচ্ছে ! মেয়ের বাবা ৩০০০/=টাকার বেশি আর পারবে না সাপ জানিয়ে দিয়ছে ৷ একটু পরেই দাদা বাহিরে এসে আমাকে সব জানালো, বারংবার জিজ্ঞেস করছে মেয়ে তোর পছন্দ হয়েছে? দাদার মুখে-মুখে তো আর কথা বলা যায় না ! মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম, দাদার বুঝতে আর দেরি হলো না ৷ দাদা আমাকে বললো তোর কাছে ক্যাশ কত টাকা আছে বলতো? বললাম ওয়েল টেক্সটাইল হতে ৭০০০/=টাকা এডভান্স মঞ্জুর করা আছে, তা বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হলেই দিবে, বলেছে আমার মিলের সেক্রেটারি সভাপতি ৷ দাদা একটু ভেবে বললো লোকটা গরিব, আমরাও গরিব তার ভিতরে এই সামান্য টাকা পয়সা নিয়ে দর কষাকষি করা আমার ঠিক হচ্ছেনা ৷ দাদা বললেন বিয়ে হবে ঠিকঠাক, তো মেয়ের বাবার এক টাকাও লাগবে না, শুধু যেই ক’জন বরযাত্রী যায় সেই খরচটা বহন করতে পারলেই হলো, নগদ কোন অর্থকরী মেয়ের বাবার লাগবেনা ৷ দাদা বললো তোর কিছু বলার আছে? আমি বললাম না দাদা, কিছুই বলার নেই আমার ৷ দাদা বললেন আমার কাছে অল্প কিছু টাকা আছে, সেই টাকা আর তোর এডভান্সের টাকা দিয়েই বিয়ে সম্পাদন হয়ে যাবে আশা করি ৷ যেকথা সেই কাজ, সব ঠিকঠাক, কোন স্বর্ণালঙ্কার নেই, কোন টাকাকড়ি নেই শুধু ৩০ জন বরযাত্রীর খাওয়াদাওয়ার খরচ যা যায়, সেটাই মেয়ের বাপের উপর আর কন্না সম্পাদনের পুরোহিতের খরচ দুপক্ষ বহন করবে ৷ দিন তারিখ সব ঠিকঠাক হয়ে গেল, পরদিন মেয়ের বাবা বাড়ি চলে গেলেন৷ আমি পরদিন মিলে গিয়ে সেক্রেটারি সভাপতিকে জানালাম বিস্তারিত, তাঁরা বললেন ঠিক আছে বাবু সব হয়ে যাবে কোন চিন্তা করবেন না ৷ যথারীতি সবই হলো, বরযাত্রী ৩০ জন সহ গেলাম সুবচনী, আনন্দও হয়েছে প্রচুর ৷ এভাবে বিয়ে করেছি যৌতুক ছাড়া ৷ সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ৩০০০/=টাকা ও নিজের বেতন ৫০০০/=টাকা সহ মোট ৮০০০/=টাকা ৷ সব টাকা নিয়েছিলাম মেয়ের বাবাকে একটু সহযোগিতা করার জন্য , করেছিও তাই ৷ পুরোহিতের কন্না সম্পাদনের টাকাও কানাই মারফত মেয়ের বাবাকে দিয়েছিলাম, দাদাকেও বুঝতে দেইনি ৷ যৌতুক না নিয়ে বিয়ে করছি বলেই আজ ভাল আছি ৷ কষ্টে আছি তাতে কি হয়েছে, সম্মানে আছি সবার কাছে, শশুরবাড়ির সবাই সম্মান আর ইজ্জতের চোখেই দেখে সবসময় ৷ তাই তাদের আশীর্বাদে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমার মেয়েও বিয়ে দিয়েছি যৌতুক বিহীন ৷ আমার ছেলে যখন একাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলা যে, ছেলে বিয়ে করাবো যৌতুক বিহীন, মেয়ের বাবাকে বিয়ে সম্পাদনের সমস্ত খরচের টাকা দিয়ে ছেলে বিয়ে করাবো ৷ আমার সেই আশা পূরণ না হতেই ছেলে ইহকালের সমস্ত মায়া-মমতা ত্যাগ করে পরলোকগমন করলো ৷ যাই হোক, বর্তমানে এই যৌতুকের কথা শুনলেই আমার শরীর শিউড়ে উঠে, ঘৃণা জন্মায় ওইসব যৌতুক ভিখারিদের প্রতি ৷ যাকে নিয়ে সংসার করবো, যে হবে আমার অর্ধাঙ্গিনী, তাঁর জন্মদাতা পিতার নিকট কীভাবে দরকষাকষি করে যৌতুক চায়? এভাবে যৌতুক না চেয়ে ভিক্ষা চাওয়া অনেক ভাল মনে করি আমি ৷ এই যৌতুক চাওয়া-নেওয়া-দেওয়া যদি আমাদের দেশের সরকার আইন করে বন্ধ করতো, তখন’ই এই যৌতুকের অভিষাপ থেকে আমাদের দেশের নিম্ন আয়ের গরিব শ্রেণির মানুষেরা এবটু মুক্তি পেতো ৷ যৌতুক মানি ভিক্ষা, যৌতুক মানি অভিষাপ, যৌতুক মানি কলঙ্ক ৷ বন্ধ হোক যৌতুক, মুক্তি পাক আমাদের দেশের গরিব সমাজ ৷ ( ছবি সংগ্রহ গুগল )