ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

১৯৮৬ ইংরেজি সালে বিয়ে করেছি মাত্র, চাকরি করতাম নারায়নগঞ্জ ফতুল্লা থানাধীন কাঠেরপুল এলাকা ওয়েল টেক্সটাইল মিলে ৷ বিয়ে করার ঠিক তিন মাস যেতে না যেতেই য়দুর্ভাগ্য বসত করে বসলো আমার জীবনে ৷ দুর্ভাগ্যটা হলো, মিলের মালিক পক্ষ আর শ্রমিক পক্ষের বাদানুবাদের এক পর্যায় মিল বন্ধ করে দিয়েছে মালিক পক্ষ ৷

সময়টা বর্ষাকাল, বাসা ভাড়া করে থাকতাম নারায়নগঞ্জ শহরে নন্দিপড়ায়, বাসা ভাড়া ছিল ৩০০/=টাকা মত্র ৷ তাও মনে হতো মাথার বোঝা ৷ পকেটে টাকা না থাকলে এক টাকাও বিরাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, নিজের পকেট তখন থাকতো সবসময় শূন্য অবস্থায় ৷ মিল বন্ধ হবার সাতদিন পর্যন্ত সকাল-বিকাল মিলে যেতাম কাজের খবরের জন্য, কবে নাগাদ মিল চালু হচ্ছে, শ্রমিক পক্ষের লোক কী বললো, আর মালিক পক্ষের লোক কী বললো এগুলি শুনে আবার রাতে ঘরে ফিরতাম ৷ ঘরে নতুন বউ, তাকেও কিছু বুঝতে দেই না যে, মিল বন্ধ হয়ে গেছে, মিল বন্ধের খবরটা জানে শুধু আমার গর্ভধারিণী মা ৷ ঘরে আসার পর মা’ চুপিসারে ঢেকে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, মিল কি চালু হবে না? আমি মানুষের কাছ থেকে চাউল হাওলাৎ করতে-করতে অনেক হাওলাৎ করে ফেলেছি রে বাবা, আমি আর পারছি না যে ৷ মিল যদি আর নাইবা চলে, তবে অতিসত্তর অন্য একটা ব্যবস্থা কর, ঘরে নতুন বউ আমার, খুব লজ্জা হয় আমার, তুইতো আরো অনেক মিলে কাজ করেছিস, দেখ’না একটু চেষ্টা করে ! কোথাও কাজ পাছ কিনা ! না হয় বউ মা’কে কয়েকদিনের জন্য ওর বাপের বাড়ি রেখে আয়, কথাগুলো বললো আমার মা’ জননী ৷

মায়ের কথা শুনে, কাঁদা-কাঁদা স্বরে বললাম মা’ আর দুদিন দেখে তারপরে একটা ব্যবস্থা করবো, তূমি মা’ কোন চিন্তা করবেনা, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে ৷ এই বলে মা’কে শান্তনা দিলাম, কিন্তু কী করবো ! ভাবতে লাগলাম নিজের মনে ৷

প্রতিদিন ধার-কর্জ করে দশটাকা জোগাড় করে বেরুতাম কাজের সন্ধানে, ফিরতাম রাত বারোটায় ৷ যেখানেই যাই মিল বন্ধ বর্ষাকাল বিধায় ৷ একদিন পরেই ঘরের নতুন বউ (আমার স্ত্রী) টের পেলো যে, আমার কাজ নাই, মিল বন্ধ ৷ স্ত্রী নিজেই অমাকে বললো কাজ যখন নাই, তো আমাকে বাপের বাড়ি নিয়ে চলো, সেখানে আমি কিছুদিন থেকে আসি ৷ স্ত্রী বললো বাপের বাড়ি নিয়ে যেতে, কিন্তু সেখানে যেতেও তো গাড়িভাড়ার প্রয়োজন; পাবো কোথায় গাড়িভাড়ার টাকা? নিজের পকেট শূন্য হলে পরের পকেটও শূন্য থাকে, একথাটা আগেকার বুড়া-বুড়ি বলে গেছেন ৷

আমার মনের মত একজন বন্ধু ছিলো সম্মানিত মুসলিম সম্প্রদায়ের, ও আমার মত’ই গরিব , তবু বিষাল মনের অধিকারি ৷ নিজের পকেটে টাকা না থাকলেও অন্য কারো কাছ থেকে হাওলাৎ করেও আমাকে দিতো পকেট খরচ চলার জন্য, ওকে ধন্যবাদ জানাই আমার এই দুর্দিনে সহযোগিতা করার জন্য ৷ সেই প্রাণপ্রিয় বন্ধ এখনো বেঁচে অছে, এখনো ওর সাথে সু’সম্পর্ক অাছে অমার, দুজনকে একসাথে দেখলে লোকে বলে জোড়া কবুতর ৷ ওর কাছ থেকে ধার নিতে নিতে, প্রায় একশ টাকা হাওলাৎ করে ফেলেছি, যা এক মাথার বোঝা ৷

বর্ষা না যাওয়া পর্যন্ত কোথাও কাজও হবেনা আমার, তার উপর হাওলাৎ এর বোঝা ! বিষণ বিপদে পড়ে গেলাম আমি ৷ শশুর বাড়ি যেতেও লাগবে অন্ততঃ দুই’শ টাকা, কোথায় পাই, কী করি, শুধুই ভাবছি একা-একা ৷ সম্মানিত মুসলিম বন্ধুটার কাছেও পাবো না ! ওর কাজ নাই কিছুদিন যাবৎ ৷ হাতের আঙ্গুলের একটা সোনার আংটি ছিল আমার, ওজন ছিল চারআনা ৷ সেটা নিয়ে গেলাম এক পরিচিত লোকের কাছে বন্ধক রাখার জন্য, টাকার দরকার পাঁচশত টাকা ৷ যাওয়ার সাথে-সাথে’ই আংটির বিনিময়ে পাঁচশত টাকা জোগাড় হয়ে গেল, টাকা নিয়ে ঘরে আসলাম ৷ মায়ের কাছে তিনশত টাকা দিয়ে বললাম মা’ এই টাকা গুলো তুমি রাখ সংসারের খরচের জন্য, আর কাল সকালে তোমার বউমা’কে আমি তাঁর বাপের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে তোমার বউ’মা কিছুদিন থাকবে ৷ মা’ রাজি হয়ে বললেন মঙ্গল মত যাও, আর তুই কিন্তু দু’একদিনের বেশি সেখানে থাকিস না, কারণ: তাঁরাও তো আমাদের মত গরিব তাই ৷ মাকে বললাম ঠিক আছে মা’ তাই হবে, এই বলে মা’কে আসস্ত করলাম ৷

পরদিন রওনা দিলাম শশুরবাড়ি, শশুরবাড়ি একদিন থেকে, পরদিন আবার রওনা দিলাম নারায়নগঞ্জের উদ্দেশে ৷ মুসলিম বন্ধুটার সাথে আগে দেখা করলাম, পরে ঘরে ফিরলাম ৷ মা’ জিজ্ঞেস করলেন, বউ মা’কে ওর বাপের বাড়ি কী বলে বুঝিয়ে রেখে এলি ? বললাম অন্ততঃ বর্ষাকাল চলা পর্যন্ত সেখানে থাকবে ৷

পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভাবছি কী করবো, আর কী করা যায় ৷ ভাবতে ভাবতে মইলের দিকে রওনা দিলাম, মিলে কাউকে পাওয়া গেল না, সভাপতি, সেক্রেটারি কাউকে না পেয়ে পরিচিত একটা দোকানে বশলাম ৷ দোকানদার নিজগুণে এক কাপ চা বানিয়ে দিয়ে বললো মিল তো সহসা চালু হচ্ছে না দাদা, কী করবেন শুনি ৷ ভাবতে লাগলাম, কী জবাব দেই দোকানদারের কথার ! কোন উত্তর দিলাম না, সোজাসুজি উঠে চলে এলাম ৷ কাজের সন্ধানে আরো দুএক জায়গায় ঘুরে আসলাম, কোথাও কাজের কোন সন্ধান করতে পারলাম না ৷ সারা দিন ঘোরাঘুরি করে রাতে ফিরলাম নিজ ঘরে ৷ ঘরে একা একা ভাবছি, কী যে করি, সকালে যাবো রিকশা চালাতে, আবার ভাবছি, না’ লোকলজ্জা সামলানো যাবে না, কেব নতুন বিয়ে করলাম, শশুরবাড়ির কেউ যদি জেনে যায় তো মান-সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে ৷ আবার ভাবছি দূরছাই কে কী বললো তাতে আমার কী আসে যায়, পরিস্থিতি তো মোকাবিলা করতে হবে ! এসব ভেবেচিন্তে আর কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, কিছুতেই স্থির করতে পারছিনা কী করবো এই মুহুর্তে ৷ শুধুই ভাবছি ! বেকার জীবন এত কঠিন, এত নিষ্ঠুর, এত ভয়াবহ ৷ বেকার লোকদের কেউ ধার-কর্জও দিতে চায় না সহজে, সত্যি বেকার জীবন একটা অভিষাপ ৷ এসব ভাবতে ভাবতে কবি কামিনী রায়ে এর একটা কবিতা মনে পড়ে যায়, “করিতে পারিনা কাজ” ৷

করিতে পারি না কাজ’ সদা ভয় সদা লাজ’ সংসার সংকল্প সদা টলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
আড়ালে আড়ালে থাকি’ নীরবে আপনা ঢাকি’ সম্মুখে চরণ নাহী চলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
হৃদয়ে বুদবুদ মত’ উঠে চিন্তা শুভ কত’ মিশে যায় হৃদয়ের তলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি’ সযতনে শুখায়ে রাখি’ নিরমল নয়নের জলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
একটি স্নেহের কথা’ প্রশমিতে পারে ব্যথা’ চলে যাই উপেক্ষার ছলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
মৎস্য উদ্দেশ্য যবে’ এক সাথে মিলে সবে’ পারি না মিলিতে সেই দলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷
বিধাতা দেছেন প্রাণ’ থাকি সদা ম্রিয়মাণ’ শক্তি মরে ভীতির কবলে’ পাছে লোকে কিছু বলে ৷

কামিনী রায়ে’র কবিতার মত আমার জীবনটাও ঠিক তেমন মনে হতে লাগলো ৷ সেই রাতেই শক্তি সঞ্চয় করতে লাগলাম মনে মনে, ভাবলাম সকালবেলা মায়ের কাছেও কিছু বলবো না আমি কোথায় যাচ্ছি ৷ ঠিক তাই করলাম আমি, সকালবেলা সোজা চলে গেলাম আমার এক পরিচিত রিকশার মহাজনের কাছে ৷

মহাজন আমাকে দেখেই হতবাক হয়ে বললেন কী ব্যাপার বাবু, কী খবর ! বললাম বিস্তারিত, মহাজন শুনলেন আমার সব কথা ৷ বললেন রিকশা নিয়ে যাও কোন লজ্জা নাই, কাজ করে খাও ৷ মহাজনের কথায় আরো সাহস হলো আমার মনে, বাহির হয়ে গেলাম কোমড়ে গামছা বেঁধে রিকশা নিয়ে ৷

মেহানত করে সেদিন একশ টাকার মত কাজ করে ঘরে ফিরলাম কিছু কাঁচা বাজার সাথে নিয়ে ৷ তারপর দূর হয়ে গেল শূন্যতা, দূর হলো পিছনের লোকের কানাঘুষা কথা, পকেটেও কমবেশি টাকা থাকে সবসময় ৷ এর পর সবাই টাকা-পয়সা হাওলাৎ দেয়, ঢাক দেয়, কাছে বসতে দেয়, আর বেকার থাকলে কেউ জিগায় না ৷

তাই মনে মনে বলি, টাকা নাই যার, মরণ ভালো, বেকার’কে ঘৃণা করো ৷ কাজ করে জ্বালাও আলো ৷ এখনো মাঝে মাঝে যখন বেকারের কবলে পড়ি, তখন কামিনী রায়ের এই কবিতা’ই শুধু মনে পড়ে যায় ৷
পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি আমার মত কেউ যে এই বেকারের কবলে না পড়ে, এই প্রত্যাশা ৷