ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

IMG_20160629_172113~2
মাঝি মোঃ আবু মিয়া
IMG_20160629_172127~2
শীতলক্ষ্যায় শুধু কচুরিপানা আর কচুরিপানা
IMG_20160629_172223~2
খুব কষ্ট করে নৌকায় যাত্রী বহন করে নিয়ে চলছে মাঝি আবু মিয়া ৷

কোনো একসময়ের খরস্রোতা নদী এই শীতলক্ষ্যা, সূক্ষ্মে মৌসুমে থাকে মরা এক খালের মত,যেন হাসপাতে পড়ে থাকা এক রুগীর মত ৷ পানি কম থাকার কারণে দেখা যায় যেন শুকিয়ে কঙ্কালের মত হয়ে গেছে শীতলক্ষা ৷ তার উপর অজস্র গড়ে উঠা কাপড় রং করার ডাইং ইন্ডাজট্রিজের নির্গত কেমিক্যালের দুষিত পানির আঘাত ৷

শীতলক্ষ্যা আঘাত করা মানে পুরো নারায়নগঞ্জবাসিকেই আঘাত করা ৷ কেন’না এই পানি পান করেই নারায়নগঞ্জবাসি বেঁচে থাকে বছরের পর বছর ৷ এই বিষাক্ত কেমিক্যালের মিশ্রিত পানি শোধন করার জন্য জাপানের তৈরি সু-বিশাল একটা পানি শোধনাগার আছে নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইলে ৷

এত কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি শোধন করতেও হিমশিম খায় ঐ অত্যাধুনিক শোধনাগার ৷ পর্যাপ্ত পরিমান মেডিসিন ব্যবহার করেও সুস্থধারায় পানি শোধন হয় না ৷ কাজেই পানিতে সেই কেমিক্যালের গন্ধ থেকেই যায় নিয়মিত ভাবে ৷ নিরুপায় হয়ে সেই পানি পান করেই চলছে নারায়নগঞ্জবাসি ৷ সেই বিষাক্ত কেমিক্যালের আঘাতের একটু অবসান ঘটে বর্ষাকালে যখন অহরহ জোয়ার-ভাটা থাকে ৷

তখন ভরপুর জোয়ারের পানির কারণে সেই বিষাক্ত কেমিক্যালের কালো কুচকুচে পানি ততটা দেখা যায় না, গন্ধ কিন্তু ঠিক’ই থেকে যায় ৷ এখন সেই বর্ষাকাল, জোয়ার-ভাটার মৌসুম ৷ নদীর দুপাড়ে আছে বহু খালের সংযোগ, বর্ষাকালে এসব খাল যখন জোয়ারের পানিতে ভরে যায়, তখন খালে জমে থাকা কচুরিপানাগুলো ভাটির টানে আস্তে আস্তে নদীতে প্রবেশ করতে থাকে ৷

নদীর দু‘পাড়ে জেলেরা মাছ শিকারের জন্য বাঁশ-মূলি দিয়ে যে ঘোর বা চাক তৈরি করে রাখে, সেই ঘোরের বাঁশ-মূলির মধ্যে কচুরিপানাগুলে আটকে থাকে দিনের পর দিন ৷ এই আটকে থাকা অবস্থায় কচুরিপানাগুলে বংশবৃদ্ধি করে থাকে প্রতিনিয়ত, যা একটা কচুরিপানা এক রাতে সাতটি কচুরিপানা জন্ম দেয় ৷

এভাবে বাড়তে থাকে কচুরিপানা যা একসময় পুরো নদীটিকেই আয়ত্তে নিয়ে নেয় কচুরিপানায় ৷ আবার বিভিন্ন খাল-বিল-ডোবা-নালা হতে খাল সংলগ্ন এলাকাবাসি এই খালের কচুরিপানাগুলো ঠেলে-ঠেলে নদীতে ভাসিয়ে দেয়, যার কারণে দীর্ঘ কয়েকদিন যাবৎ শীতলক্ষা নদীর দুপাড়ের মানুষ পারাপার হওয়ার ঘাটগুলে’ই অকেজো হয়ে পরেছে ৷

যান্ত্রিক চালিত একটা ট্রলার’ই পারাপার হতে হিমশিম খাচ্ছে এই কচুরিপানার জন্য ৷ আর খেটে খাওয়া দিনমজুর নৌকার মাঝিদের অবস্থাতো আরো সংকটাপন্ন ৷

প্রিয় পাঠক, ছবিতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে একটা মাঝি শত চেষ্টা করেও তাঁর নৌকাটিকে ঘাটে ভিড়াইতে পারছে না ৷ নৌকার দাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন দাদা ! জবাবে মাঝি বললেন, কেমন থাকবো সেটা নিজেই তো দেখতে পারছেন ৷ সারাদিনে চার-পাঁচটা টিপ মারলেই জান শেষ হয়ে যায়, তারপর নৌকা বন্ধ করে বাড়ি চলে যাই আর আসি না ঘাটের সামনে, বললেন একজন নৌকার মাঝি, নাম মোঃ আবু মি, নৌকা চালায় নারায়নগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন চিত্তরঞ্জন কটন মিলস গুদারাঘাটে ৷

এই কচুরিপানার আক্রমণের আগে একজন মাঝির দৈনিক আয় হতো তিনশ থেকে চারশ টাকা আরাম আয়সে, এখন কচুরিপানা ঠেলে রোজগার আগের মত, কিন্তু জীবন শেষ হয়ে যায় এপার থেকে ওপারে যেত’ই ৷ বড় বড় তেলের জাহাজ, বালুবাহী ট্রলারকেও ধীর গতীতে যেতে দেখা যায় ৷

সময় সময় এই কচুরিপানা ট্রলারের পাখায় আটকে যায়, এই আটকে যাওয়ার কারণে নদীর মাঝপথে ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়, তখন যাত্রীদের পরতে হয় বিড়ম্বনায় ৷

কচুরিপানার এত ভয়াবহ আক্রমণ আগে কখনই কেউ দেখেনি এই শীতলক্ষ্যা নদীতে ৷ কচুরিপানায় যেন জিম্মি করে রেখেছে এই শীতলক্ষ্যা নদীটিকে ৷ জানিনা শীতলক্ষ্যা নদী কতদিন জিম্মি হয়ে থাকে এই কচুরিপানার কাছে ৷