ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমরা হাঁটি-হাঁটি পা’ পা’ করে বড় হয়েছি, ব্যক্তিবিশেষ কমবেশি লেখাপড়াও শিখেছি ৷ কর্মফলে ধনী-গরিবও বনেছি, পূর্বপুরুষদের বংশ অনুসারে কেউ রাজা জমিদারও হয়েছি, এই ভবের মাঝে৷ বিয়ে করেছি, সংসার করছি কেউ কেউ ৷ কেউ আবার থেকে যাই চিরকুমার হয়ে ৷ কেউ সন্তান জন্ম দিচ্ছি, কেউ’বা আবার নিঃসন্তান (আঁটকুড়ো) হয়ে থাকতে হয় ৷ বিয়ে করার পর যখন একটি সন্তানের আগমন ঘটে, তখন আনন্দের আর শেষ থাকে না ৷ ক্ষণিকের আনন্দের চেয়ে চিন্তাই থাকে বেশি, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ৷ মেয়ে সন্তান হলে তো চিন্তার আর অন্ত নাই, লেখাপড়া, বিয়েস্বাদি নিয়ে একেবারে মহাচিন্তা ৷ আমরা সবাই সন্তানের লেখাপড়া নিয়েই বেশি দুঃচিন্তায় থাকি, কোন স্কুলে পড়াব, কোন কলেজে পড়াব, কতটুকু পর্যন্ত পড়াতে পারব ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে ৷ আমরা শুধু আমাদের ইচ্ছার প্রতিফল ঘটাতে চাই, আমাদের আদরের সন্তানের উপর দিয়ে ৷ কিন্তু আমার ইচ্ছাটাকে আমার সন্তান প্রধান্য দিচ্ছে কি? আমরা কিন্তু একটুও ভেবে দেখছি না ৷ যেমন: আমার ইচ্ছা ছিল, আমার ছেলেকে “ভকেশনাল” থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করাব ৷ আমার ছেলের কিন্তু ইচ্ছা ছিল না ৷ ওর ইচ্ছা ছিল জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করার, হয়েছেও তাই ৷ আমার ছেলে অষ্টমশ্রেণি পাস করার পর, আমি ছেলেকে প্রায় জোরপূর্বক ভকেশনালে ভর্তি করিয়ে দেই ৷ ছেলে নিরুপায় হয়ে ভর্তি হয়েছে ঠিক, কিন্তু বেশি দিন ভকেশনালে পড়েনি ৷ শুধু SSC পর্যন্তই পড়েছে কোনরকম ভাবে, পরে ভর্তি হয় নিজের ইচ্ছায় নারায়নগঞ্জ কলেজে ৷ আমার ইচ্ছা ছিল সরকারি তোলারাম কলেজে পড়ানোর জন্য ৷ কিন্তু না ছেলের এক কথা, ও সরকারি কলেজে পড়বে না ৷ সরকারি কলেজে আড্ডা বেশি হয়, রাজনীতি দল করতে হয়, রাজনীতি না করলে তো একেবারেই টার্গেটে থাকতে হয়, ছেলে আমাকে বুঝাল ৷ শেষ অবধি ওর ইচ্ছাই বাস্তবায়ন করলো ৷ আমার মত কেউ আবার ছেলে-মেয়েকে পড়াতে চায় মাদ্রাসায়, কেউ বা ইসলামিক কলেজে, কেউ আবার ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে ৷ কিন্তু ছেলে-মেয়ের অভিমত কী? তাঁদের পছন্দের কলেজ কোনটা, তাঁরা কোথায় লেখাপড়া করতে আগ্রহী ৷ আমরা অভিভাবকরা তাঁদের মতামত নিতে একেবারেই নারাজ ৷ অনেক গুণধর ব্যক্তিদের বলতে শোনা যায়, সন্তানের আবার অভিমত কী? ওকি বুঝে? আমার যেখানে পছন্দসই সেখানেই পড়বে ৷

আমার ছেলের বেলায় যা হয়েছিল, ভকেশনাল থেকে SSC পাস করার পর, আমি এবং আমার পরিবার (স্ত্রী) মিলে, আবার ভকেশনালের এক শিক্ষকের কাছ থেকে বুদ্ধি নিয়ে, ছেলেকে ভকেশনাল ভর্তি করে দেই ৷ ঘটনা হলো ২০০৭ সালের ৷ বহু কষ্ট করে হাওলাৎ-বরাত করে ২৫০০/=টাকা খরচ করে ভর্তি করি, কিন্তু ফল হলো বিপরীত ৷ দুইমাসও ছেলেটা আর ভকেশনালে ক্লাস করল না, ছেলের একটাই কথা, আমাকে ওই কলেজে ভর্তি করতে না পাড়লে আমি আর পড়বই না ৷ কী আর করা, সেই ভকেশনাল থেকে আবার মার্কসিট বাহির করে, পূনরায় ছেলেকে ওর পছন্দের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেই ৷ ছেলে খুব খুশি মহাখুশি, রীতিমত কলেজে যায়, লেখাপড়ায়ও ভাল ৷ ছেলেকে ভকেশনালে ভর্তি করার আগে আমাকে একজন গুনীব্যক্তি বলেছিলেন, বাবু আপনার ছেলের মতামত নিয়েই ওকে কলেজে ভর্তি করবেন ৷ আমি ওই ব্যক্তির কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, ছেলের মতামতের ব্যাপারটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন ৷ ওইব্যক্তি আমাকে বলল, আপনার ছেলে যেই কলেজে পড়তে চায়, তাকে সেই কলেজেই ভর্তি করাবেন, অন্যথায় পস্তাইবেন ৷

যখন পস্তাইলাম, তখন বুঝলাম, ওইব্যক্তি তো ঠিক কতাটাই বলেছিল ৷ আগোই যদি ছেলের ইচ্ছাটাকে প্রধান্য দিতাম, তাহলে ছেলের জন্যও ভাল হতো, টাকাও বাঁচত ৷ সন্তানের ইচ্ছার প্রতি আমরা কেউ নজর দেই না, তাদের ইচ্ছাটাকে আমরা অনেকে তুচ্ছ মনে করি ৷ কিন্তু তাদের ইচ্ছাই বয়ে আনবে তাদের সফতলা, কারণ ইচ্ছাই শক্তি, ইচ্ছাই সাধনা ৷ ছেলে-মেয়েদের ইচ্ছাটা কী সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে ৷ তার ইচ্ছায় কি সর্বনাশ ডেকে আনবে? না কি মঙ্গল বয়ে আনবে? সেদিকেও সবার খেয়াল রাখা উচিত ৷ যেমন: ছেলের ইচ্ছা মাদ্রাসায় পড়বে, ভাল কথা, ওই মাদ্রাসার শিক্ষার মান কতটুকু সেটাও আমাদের খতিয়ে দেখা উচিত ৷ ছেলের ইচ্ছা ডাক্তারি পড়বে, কিন্তু ডাক্তারি পড়ানোর মত তো আমার ক্ষমতা নাই ৷ ছেলেকে বা মেয়েকে বুঝাতে হবে, অবশ্যই তাঁরা বুঝবে, মেনেও নিবে ৷ যদি তাঁর ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা থাকে, তাকে পড়তে হবে পরিশ্রম করে, নানান প্রতিকূলতা প্রতিহত করে ৷ কথায় আছে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, ইচ্ছাতেই হয় বিশ্ব জয় ৷

ইচ্ছা হলো, ঘুড়ি উড়ানো ৷ ঘুড়ি ছারা পেটের ভাত হজম হয় না, এক জমিদারের ছেলের ৷ জমিদারের জমিদারির বাহাদুরির কথা কি আর বলে শেষ করা যায়? কী না আছে জমিদারের ৷ তারপরেও অভাব থেকে যায় রাজা বাদশাদেরও ৷ অভাব ছাড়া মানূষ পাওয়া দায় ৷ কারো ধনের অভাব, কারো মনের অভাব, কারো বাড়ির অভাব, কারো আবার গাড়ির অভাব ৷ জমিদারের অভাব শুধু একটি মাত্র ছেলের লেখাপড়া হচ্ছে না ৷

মুল্লুক জুরো বাহাদুরি, অতছ একটি সন্তানও নেই জমিদারের ৷ সৃষ্টিকর্তাকে বহু ডাকার পর, তার দয়ায় একটি পুত্রসন্তান পেয়েছে, তা-ও বার বছর পরে ৷ দেখতে দেখতেই ছেলেটার চার-পাঁচ বছর হয়ে গেল, কিন্তু বই পড়তে চায় না ৷ সারাদিন ঘুড়ি নিয়েই ব্যস্ত থাকে, পড়ার সময় কোথায়? ঘুড়ি উড়ানোও সহজ কাজ নয়, সবাই কি ঘুড়ি উড়াতে পারে? মোটেই না ৷ ঘুড়ি ছাড়া ছেলেটার মোটেই সময় কাটে না, জমিদারও আর কী করবে? একটি মাত্র সন্তান, ওর চাওয়াটাকেও তো সম্মতি দিতে হয় ৷ সন্ধ্যার পর জমিদার অনেক আদর যত্ন করে, ছেলেটাকে কোলে-কাঁখে তুলে, একটা আদর্শলিপি বই সামনে দেয় পড়ার জন্য ৷ বাবা, সোনা, লক্ষী পড় বাবা, তোমাকে আগামীকাল অনেক ঘুড়ি কিনে দিবো হাট থেকে ৷ ছেলে বলে, অনেক ঘুড়ি কিনে দিবে? তাহলে পড়ব, তুমি আমাকে পড়াও আমি পড়ি, আর শিখি ৷ পড় বাবা, আমি তোমাকে পড়াচ্ছি, আমি যা বলব, তুমি তা পড়বে ৷ সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি ৷ ছেলে পড়ছে, সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ঘুড়ী উড়ায়ে চলি ৷

জমিদার তো অবাক, বলে কী? আমি পড়ালাম কি? আর ছেলে পড়ে কী? সর্বনাশ ! ছেলের তো লেখাপড়া হবে না ৷ এখন উপায় কী? একদিন জমিদার এক শিক্ষকের সাথে আলাপ করল ৷ স্যার, আমার ছেলেটার তো লেখাপড়া হবেনা, এখন উপায় কী? ছেলে শুধু ঘুড়ী উড়ায় ! স্যার, আপনি কি পারবেন? আমার ছেলেটাকে মানুষ করতে? শিক্ষক বললেন, এটা তো একটা ব্যাপারই না ৷ তবে আমাকে কিছু টাকা দিতে হবে, ঘুড়ী কেনার জন্য ৷ জমিদার বলল, কত টাকা চাই আপনার বলুন ৷ শিক্ষক বলল, ১৪ টা ঘুড়ী কেনার মত টাকা হলেই হবে জমিদার বাবু ৷ জমিদার বাবু, তক্ষুণি একটাকা বাহির করে দিয়ে বলল, তো মাস্টার মশাই আপনি আমার বাড়িতে কখন যাবেন শুনি? মাষ্টারমহাশয় তখন বললেন, আমি আপনার বাড়িতে আগামীকাল সকালে যথারীতি পৌছে যাবে, কোনপ্রকার চিন্তা আপনি করবেন না ৷ তবে হ্যাঁ, আপনার ছেলেকে বলে রাখবেন যে, তোমার জন্য একজন ঘুড়ি উড়ানো মাষ্টার রেখেছি, মাষ্টার তোমাকে ঘুড়ি উড়ানো শিখাবে ৷

জমিদার বাবু বাড়ি এসে ছেলেকে ডাকল, ছেলে ঘুড়ি আর নাটাই নিয়ে বাবার সামনে এসে বলল, কী হয়েছে বাবা তাড়াতাড়ি বলো ৷ বাবা বলল, তুমি তো সারাদিন ঘুড়ি উড়াও, তো ঘুড়ি কাটাকাটি করতে পাড়? ছেলে বলল, না বাবা, আমি শুধু কাটাই খাই, কাটতে পাড়িনা ৷ বাবা বলল, তাহলে শুন, তোমার জন্য ঘুড়ি উড়ানোর একটা মাষ্টার রেখেছি, আগামীকাল সকালে তিনি আসবেন, তোমাকে ঘুড়ি উড়ানো শেখাতে ৷ মাষ্টারের কাছ থেকে ঘুড়ি উড়ানো শিখলে তুমি আর ঘুড়ি কাটা খাবে না, শুধু অন্যসব ঘুড়ি কেটে শেষ করে দিতে পাড়বে ৷ এই কথা শুনে ছেলে তো মহাখুশি, বাবাকে জিজ্ঞেস করল, কখন আসবে মাষ্টারমহাশয়? বাবা বলল, আগামীকাল সকালবেলা ৷ ছেলে আশায় রইল, রাতে আর ছেলেটার ঘুম হলো না ৷ স্বপ্নে দেখছে শুধু মাষ্টার আর মাষ্টার, আর কখন যে রাত পোহাবে, সেই আশায় ৷ রাত পোহালো, ভোর হলো, সেদিন ঘুব ভোরবেলা ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হয়ে রইল, মাষ্টারের কাছ থেকে ঘুড়ি উড়ানো শেখার জন্য ৷ আগেকার সময় জমিদারদের বাড়ি তৈরি হতো চারিদিক্‌ জলাশয়, মাঝখানে বাড়ি, আর থাকত একটি মাত্র সরুপথ ৷ এরকম হতো একমাত্র চোর-ডাকাতের ভয়ে ৷ জমিদারের অবুঝ ছেলেটা, সকালবেলা সেই সরুপথখানা অনুসরণ করে বসে আছে ঘুড়ির মাষ্টারের আগমনের আশায়, কখন আসবে সেই ঘুড়ির মাষ্টার ৷

দেখতে দেখতেই দেখতে পেল, একজন লোক অনেকগুলি ঘুড়ি হাতে করে বাড়ির দিকে আসছে ৷ ছেলেটার বুঝতে আর অসুবিধা হলো না, নিশ্চিত এই হলো ঘুড়ির মাষ্টার ৷ দৌড়ে গিয়ে মাষ্টারের চরণে প্রণাম দিয়ে বলল, দেন স্যার ঘুড়ি দেন ৷
মাষ্টারমহাশয়; হ্যাঁ দিচ্ছি তোমাকে ঘুড়ি, তবে একটু কাজ আছে ৷
ছেলে; বলুন স্যার কী কাজ করতে হবে?
মাষ্টারমহাশয়;তোমার কোন কাজ নেই, যা করার আমাকে করতে হবে ৷
ছেলে; তাহলে কাজ করেন তাড়াতাড়ি করে ৷
মাষ্টার; আগে সূতা মাড় করে নিতে হবে, তারপর ৷
ছেলে; সূতা আবার মাড় করতে হয় না কি?
মাষ্টার; হ্যাঁ হয়, তা তো তুমি জান না ৷ তার জন্যই তো তু ঘুড়ি কাটা খাচ্ছ!
ছেলে; হ্যাঁ স্যার, তাই তো!
মাষ্টার; নাটাই এনেছি, আগে সূতাগুলে নাটাইতে পেঁচাতে হবে ৷ তারপর মাড় জ্বাল দিয়ে, সেই মাড়ের সাথে কাঁচের গুড়ো মিশিয়ে, সেগুলি দিয়ে সূতা মাড় করতে হবে ৷
ছেলে; তাহলে স্যার, বাড়ির ভিতরে আসেন ৷ মাড় করার জন্য আমাদের এখানে অনেক চাকরবাকর আছে ৷ আপনি শুধু দেখিয়ে দিবেন ব্যাস ৷
মাষ্টার; ঠিক আছে চলো বাড়ির ভিতরে, তারপর দেখা যাবে ৷
ছেলে; হ্যাঁ স্যার, চলুন এক্ষণি ৷

মাষ্টার সহ বাড়ির ভিতরে গিয়ে, সূতা মাড় করে নাটাইতে সুতাগুলি পেঁচিয়ে নিল ৷ তারপর সাথে আনা ১৪ টি ঘুড়ি মাটিতে বিছাইয়ে রাখল ৷

ছেলে; দেন স্যার, বিস্ মিল্লাহ বলে, যাতে কাটা না খাই ৷
মাষ্টার; আরো কাজ আছে ৷
ছেলে; কী কাজ স্যার?
মাষ্টার; ঘুড়িতে তোমার নাম লিখতে হবে ৷
ছেলে; বলেন কী স্যার? ঘুড়িতে আবার নাম লেখতে হয়?
মাষ্টার; হ্যাঁ হয় তো! তোমার নামটা লেখ এই ঘুড়িতে ৷
ছেলে; আমি তো লেখতে জানি না স্যার ৷
মাষ্টার; তাহলে তো আমাকেই লিখতে হবে ৷ বলো মোমার নাম কী?
ছেলে; লেখেন স্যার, সোহাগ ৷

মাষ্টার প্রথম ঘুড়টায় ছেলেটার নাম লেখলো সোহাগ ৷ নাম লেখার পর ৷ মাষ্টারমহাশয়, ছেলেটাকে বলল, নাও, এই ঘুড়িটা আগে উড়াও ৷ ছেলেটাতো খুশিতে টগ্‌বগে, তাড়াতাড়ি করে,ঘুড়িটি নিয়ে সূতার বাঁধল ৷
মাষ্টার; এই ঘুড়িটার নাম কী?
ছেলে; এটা আবার কী? ঘুড়ির আবার নাম বলতে হয়?
মাষ্টার; পৃথিবীতে সব জিনিসের একটা করে নাম আছে ৷ যেই জিনিসের নাম নাই, সেই জিনিসটা পৃথিবীতো নাই ৷
ছেলে; তাহলে স্যার, আপনি’ই বলেন ঘুড়িটার নাম কী?
মাষ্টার; ঘুড়িটার নাম সোহাগ ৷
ছেলে; ঘুড়িটা সূতার সাথে বেঁধে উড়িয়ে দিল প্রথম ঘুড়িটা ৷ ঘুড়িটার নাম ছিল, সোহাগ ৷ উড়াতে উরাতে সোহাগ নামের ঘুড়িটা কাটা খেল ৷ কাটা খাওয়ার পর, ছেলেটা মাষ্টারের কাছে আরো একটা ঘুড়ি চাইল ৷ তখন মাষ্টারমহাশয় ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো ৷
মাষ্টার; কোন ঘুড়িটা তুমি কাটা খেয়েছ?
ছেলে; স্যার, আমি আমার নামের ঘুড়িটা কাটা খেয়েছি, আমাকে আরেকটা ঘুড়ি দেন ৷
মাষ্টার; হ্যাঁ, দিব তো ৷ ওই ১৩ টি ঘুড়িই তোমার জন্য এনেছি ৷ ওখান থেকে লাইনের প্রথম ঘুড়িটা লও ৷
ছেলে; প্রথম ঘুড়িটা নিলো ৷
মাষ্টার; এই ঘুড়িটার নাম কী?
ছেলে; তা তো জানিনা স্যার!
মাষ্টার; দেখ, এই ঘুড়িটায় লেখা আছে “অ” ৷ তুমি একটা কাঠি নিয়ে মাটিতে ওই লেখাটার মত লেখ “অ”৷
ছেলে; একটা কাঠি নিয়ে মাটিতে হুবহু করে লিখলো “অ”৷ মাটিতে লেখার পর সেটাও উড়ায়ে দিল আকাশ পানে ৷ সেটাও কাটা খেল ৷ বলল, স্যার সব শেষ, আরেকটা ঘুড়ি দেন ৷
মাষ্টার; নিয়ে নাও, সব কয়টা ঘুড়িই তুমি উড়াবে ঠিক, তবে আগের মত মাটিতে নাম লিখে নিতে হবে

এভাবে স্বরবর্ণের সব কয়টা ঘুড়ি সেই দিন উড়ানো হলো ৷ আর মাষ্টারমহাশয় বলে দিলেন, রাতে ঘুড়িগুলির নাম লিখে রাখতে ৷ ছেলেটা ঠিক তাই করলো ৷ পরদিন আবার ব্যঞ্জনবর্ণের সব ঘুড়ি নিয়ে মাষ্টার হাজির হলেন ৷ আগের দিনের মত একই কায়দায় ব্যঞ্জনবর্ণও শিখানো হলো ৷ এভাবে ঘুড়ির মাঝে লিখে লিখে ঘুড়ি উড়ায়ে উড়ায়ে ছেলেটাকে স্কুলে নেওয়ার উপযুক্ত করে তুলল ৷ এই ঘুড়ি উড়ানোর মাঝেই ছেলেটার লেখাপড়া শুরু হলো ৷ একদিন ছেলেটা উচ্চশিক্ষিত হয়ে জমিদারের আশা এবং ইচ্ছা পূরণ করল ৷

স্কুল জীবন থেকেই বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েদের প্রেম ভালবাসার আবির্ভাব ঘটে ৷ সেই প্রেম ভালবাসা কলেজ জীবন পর্যন্ত গড়ায় ৷ কারোরটা জানাজানি হয়, কারোরটা গোপনীয় থাকে ৷ জানাজানি হয়ে গেলে, আমরা অভিভাবকরা তাঁদের সেই প্রেম ভালবাসা সহজে মেনে নিতে পারি না ৷ তখন ঘটে যায় বিপত্তি, কেউ হয় দেবদাস, কেউ হয় পাগল, কেউ করে আত্মহত্যা, কেউ আবার চোখ বুঝে দুজনে মিলে, হয়ে যায় নিরুদ্দেশ ৷ এসব ঘটার আগে যদি আমরা অভিভাবকরা তাঁদের এই ইচ্ছাটাকে মেনে নিতে পারি, তবে আর এরকম ঘটনা ঘটে না ৷ এরকম আবার সব ছেলে-মেয়েদের বেলায় হয় না, এসবের সংখ্যা থাকে খুব কম ৷ বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েরাই মা’ বাবার কথা মত চলতে ভালবাসে ৷ এখানে যেসব ছেলে-মেয়েরা নিজের ইচ্ছাটাকে প্রধান্য বেশি দিয়ে থাকে, আমি সেসব ছেলে-মেয়েদের কথাটাই উত্থাপন করেছি মাত্র ৷

পরিশেষে একটা বাস্তব ঘটনা তুলে ধরা হলো ৷ ঘটনাটা, আমি যার চাকরি করি সেই মালিকের ছেলের ঘটনা ৷ ছেলেটা কেবল ২০১৪ সালে SSC পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে ৷ যেই স্কুল থেকে SSC পরীক্ষা দিয়েছে, সেই স্কুলের অষ্টমশ্রেণি পড়ুয়া মেয়ের সাথে ছিল তাঁর প্রেম ভালবাসা ৷ সেটা আর কেউ জানত না, গেল কয়েকদিন আগে হলো জানাজানি শুনাশুনি ৷ মেয়েরা গরিব, ছেলে এখানকার স্থানীয় ৷ ছেলের বাবা এবং মা’ কিছুতেই রাজি হচ্ছেনা বা মেনেও নিচ্ছেনা ৷ কিন্তু ছেলের এক কথা, জীবনে বিয়ে করতে হলে ওকেই করবো, দ্বিতয় কাউকে নয় ৷ ছেলের বাবার সোজাসুজি কথা, আমি এতে রাজি নই তুমি বাবা আমার বাড়ি থেকে বের হও ৷ ছেলে তো তাই করে বসলো ! সোজা মেয়েদের বাড়ি ৷ মেয়েকে বলছে চলো আমার সাথে, পাড়ি জমাই এক্ষণি ৷ মেয়ের মা’ টের পেয়ে লোক মারফত ছেলেকে আটকে দিয়ে, ছেলের বাবার কাছে খবর দেয় ৷ ছেলের বাবা যেতে নারাজ, অফিসে চুপচাপ বসে বসে কী যেন ভাবছে একা একা ৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে বস? বলুন আমার কাছে ৷ নিরুপায় হয়ে বলতে বাধ্য হলো ৷ শুনলাম সব কথা, আমার বসের ৷ আমি বুদ্ধি আর যুক্তি দিলাম, আপনার ছেলে যাকে নিয়ে ঘরসংসার করবে, তাকে তো আপনার ছেলের চাই ৷ আপনার একটি মাত্র ছেলে, আপনার মৃত্যুর পর সব সম্পত্তির মালিক আপনার ছেলের ৷ ওর ইচ্ছাটাকে মেনে নিন, ওযখন মেয়েটাকে ভালবেসেই ফেলেছে, তখন ওই মেয়ে ছাড়া ওর জীবনে আর শান্তি হবে না ৷ কাজেই এটা আপনার মেনে নেওয়া উচিত ৷ এরপর আমার বস এবং আমার বসের স্ত্রী মিলে, মেয়েদের বাড়ি গিয়ে, যৌতুক ছাড়া বিয়ের দিন তারিখ ঠিকঠাক করে আসে ৷ এখন ছেলেও মহাখুশি, মেয়েটাও মহাখুশি ৷ ইচ্ছা হলো মনের একটা আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা পূরণ না হলে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায় ৷ ইচ্ছাই শক্তি, ইচ্ছাই সাধনা