ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

গর্ভধারিণী মায়ের গর্ভ হতে যখন ভূমিষ্ঠ হলাম, তখন সমাজে পরিচিতির জন্য আমার একটা নাম রাখা হয় ৷ তা হয় আবার অনেক ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৷ সেই নামেই ছোট থেকে বড় হতে থাকি এই দুনিয়ার বুকে, মানুষের সমাজে ৷ বড় হয়ে লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষিত হয়ে সেই নামের করছি অপব্যবহার, রাখছি মনগড়া ছদ্মনাম ৷

আমাদের হিন্দুধর্মের নিয়ম অনুযায়ী জন্মের ছয়দিনের দিন বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুর নাম রাখা হয় ৷ অনুষ্ঠানটির নাম “ছয়ষষ্টি” (৬ষষ্টি) ৷ এই অনুষ্ঠানটি শিশুর পিতা-মাতা, ভাই-বোন, কাকা-কাকী, মামা-মামী, দাদু-দিদিমা, ঠাকুরদাদা-ঠাকুরমা সহ, পড়াপ্রতিবেশীরা করে থাকেন ৷ এই অনুষ্ঠানটি রাতে হয়ে থাকে ৷ বিকালবেলা থেকেই অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকে সবাই ৷ শিশুটির জন্য কে কী নাম রাখবে, দিনভর থাকে সেই আলোচনায় সবাই ব্যস্ত ৷ বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হয়, তখন শুরু হয় অনুষ্ঠানের সূচনা ৷ নতুন একটা ঘটের প্রয়োজন হয়, ঘটে থাকবে গঙ্গারজল ৷ সেই ঘটের উপর থাকবে একটা আম্রপ্রল্লভ, যা পাঁচটি পাত যুক্ত একটা আম্রপ্রল্লভ ৷ সাথে থাকবে ফুল-তুলসি, ধানদূর্বা, আর থাকবে মাটির তৈরি ছোট বাটির মত প্রদীপ জ্বালানোর জন্য মুচি (প্রদীপ) ৷ থাকবে নাম লেখার জন্য কাগজ-কলম৷ আগেকার সময় কাগজ-কলমের খুবই দাম ছিল বিধায়, কলাপাতা অথবা তালপাতা রাখা হতো ৷ এখন আর সেই আগেকার সময় নয়, এখন কাগজ-কলম রাখা হয়৷ যতগুলি নাম হবে, ততগুলি কাগজের টুকরা হবে ৷ এক-একটা টুকরায় একজনের রাখা এক নাম লেখা থাকবে সেই কাগজের টুকরায় ৷ আর থাকবে যতগুলি নাম ততগুলি মাটির প্রদীপ, যা ঘী দিয়ে জ্বালানো হবে ৷ শিশুর প্রথম নামটাই গর্ভধারিণী মা’রাখবে, পরে রাখবে শিশুর পিতা ৷ একটা কাগজের টুকরায় একটা নাম লিখে, সেই কাগজের টুকরা জল ভর্তি ঘটের সামনে মাটিতে রেখে, সেই টুকরার উপরে ঘী প্রদীপ’টা রেখে জ্বালিয়ে দিবে ৷ এভাবে শিশুরটির আত্মীয়স্বজন সহ পাড়াপড়শীর রাখা নাম শতকের উপরেও ছাড়িয়ে যায় ৷ যেমন হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের বেলায়, যা হয়েছিল একশ আট নাম ৷ এভাবে ঘটের সামনে নামের প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে রেখে দেওয়া হবে ৷ এই প্রদীপগুলি জ্বলতেই থাকবে ৷ জ্বলতে জ্বলতে একের পর এক নিভতে থাকবে ৷ যেই নামের প্রদীপটা সব প্রদীপ নেভার পরও জ্বলবে, সেই প্রদীপের নিচের কাগজে লেখা নামই শিশুটার জন্য রাখা হবে ৷ ওই নামই হবে, শিশুর ডাক নাম ৷ যেমন: “নিতাই” “হারাধন” “সুকান্ত” “রণজিৎ” ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ এই হল হিন্দুধর্মে শিশুর জন্মের ছয়ষষ্টি (৬ষষ্টি) ৷ তারপরে হয় শিশুটিকে শুদ্ধ করে ঘরে তোলার অনুষ্ঠান ৷ আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ করতে হয়, তা হল, শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হবে, তা কখনো পারিবারের মূলঘরে হবে না ৷ হবে বাড়ির ঘরের একটা বারান্দায়, অথবা ঘরের পাশে আলাদা একটা ঘরে ৷ এই ঘরটাকে হিন্দুধর্মে বলে “ছটিঘর” যা একমাস পর্যন্ত শিশুকে নিয়ে গর্ভধারিণী মা’ই থাকবে ওই ঘরে, শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ৷ একমাসের দিন পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ দ্বারা শুদ্ধ হয়ে মূলঘরে উঠতে হয় ৷

কেউ কেউ আবার একুশদিনেও করে থাকে ৷ এই অনুষ্ঠানটির নাম “ছটি উঠানো” গোত্র বিশেষ অন্য নামও হতে পাড়ে ৷

প্রিয় পাঠক, এই ছয়ষষ্টির বিবরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হল, সুন্দর একটা নামের অপব্যবহার করা ও ছদ্মনাম ব্যবহার প্রসঙ্গে ৷ প্রিয় পাঠক, আমি জন্মগ্রহণ করার পর, আমার পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শী এত আনন্দ উল্লাস করে একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমার একটা নাম রাখল ৷ এখন আমি বড় হয়ে, লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষিত হয়ে সেই সুন্দর নামটাকে লুকিয়ে রেখে, মানুষের মাঝে ছদ্মনামে পরিচয় দিচ্ছি, বা হচ্ছি ৷ এটা কি আমি ঠিক করছি? মোটেও ঠিক করছি না ৷ আমি প্রতারণা করছি নিজে নিজের সাথে, নিজের পিতা-মাতার সাথে ৷

প্রিয় পাঠক, বর্তমান ভার্চুয়াল জগতের তথ্যপ্রযুক্তির ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে এই সুন্দর নামের অপব্যবহার চলছে অহরহ ৷ নিজ নামের অপব্যবহার সবচাইতে বেশি দেখা যায়, আমাদের বর্তমান জীবনসঙ্গী ফেসবুকে ৷ তারপরে দেখা যায়, গুগল প্লাসে ৷ তারপরে আছে, টুইটারে ৷ মোট কথায়, পৃথিবীর ইন্টারনেট জগতের সবকয়টি সামাজিক সাইটে ৷ একটা দুষ্কৃতকারী লোক, প্রাণ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকে ৷ যা ব্যবহার করে থাকে, বর্তমানে জঙ্গিবাদের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাঁরা ৷ একজন লোকের আট-নয়টি নাম থাকে, যে সময় যেই স্থানে যাবে, সেই স্থানে একটা ছদ্মনাম ব্যবহার করে ৷ প্রিয় পাঠক, তাহলে দেখা যায়, আমরা ওইসব জঙ্গিদের দা’কুড়ালের ভয়ে একেবারেই কাতর হয়ে, নিজের সুন্দর নামখানাও পাল্টে দিচ্ছি ৷

বর্তমানে এই বিডিনিউজ ব্লগেও এর প্রবণতা বেশি লক্ষণীয় ৷ যা ভাবতেও অবাক লাগে, একজন ব্লগার, একজন লেখক, একজন সংবাদিক কী করে নিজের নামটাকে অপব্যবহার করে, বড়-বড় বুলি রেখে, এই ব্লগের পাতা লিখে যাচ্ছে ৷ সেসব সম্মানিত ব্লগার,লেখকদের লেখাও খুব প্রশংসনীয় ৷ অথচ নিজের আসল নামটা দিতে ভয় পায়, প্রোফাইলে নিজের ছবিখানা দিতেও ভয় পায় ৷

প্রিয় পাঠক, আমি নিজে একবার স্বাদের ফেসবুকে ছদ্মনাম আর ফেক ছবি ব্যবহার করেছিলাম, লোকের দেখাদেখি ৷ মাত্র একদিনের জন্য, মুহুর্তেই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল একটা ছদ্মনামে আর একটা ফেক ছবিতে ৷ নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল, নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল তখন ৷ নিজের মনকে নিজে প্রশ্ন করছিলাম যে, আমি কি চোর নাকি? আমি কি অপরাধি? আমি এর কিছুই না ৷ আমি হলাম বিশ্বপ্রতারক, বিশ্ববাটপার, না হয় আমার আসল নামটা থাকবে না কেন? যদি বলি নিরাপত্তাজনিত কারণে, তাহলে আগেই সতর্ক হয়ে যাই, যাতে নিরাপত্তার হুমকিতে পড়তে না হয় ! বিপদগামী কিছু যদি লিখে থাকি, তবে তো বিপদ হতেই পারে ৷

প্রিয় পাঠক, স্বাদের ফেসবুকে যদি কোন ছদ্মনাম দেখি, তবে সেই নামের সাথে আমি ব্যক্তিগত ভাবে কোন আদানপ্রদান করি না ৷ ভয় হয় নাম দেখলেই, আদানপ্রদানে যদি আবার কোন বিপদ হয় তাই ৷ পরিশেষে সম্মানিত ব্লগপোষক মহোদয়ের কাছে আমার একটা ছেট প্রশ্ন!! ব্লগটিম কী ভাবে এই ছদ্মনামগুলি রেজিস্টেশন সক্রিয় করেন? বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির জগতে পৃথিবীর সমস্ত তথ্য হাতের মুঠোয় থাকে ২৪ ঘন্টা ৷ আমার ইমেল আ্যড্রেস নিচ্ছে সঠিক, আমার ফোন নম্বর নিচ্ছে সঠিক, শুধুমাত্র আমার ডিসপ্লে নামটা সঠিক নিতে হিমশিম খাচ্ছেন কেন? তাহলে কী আপনিও বিপদজনক? আমার জানামতে বিপদজন বলতে শুধু ফেসবুক ৷

ফেসবুক যে কোন সময়, যে কোন মানুষের তথ্য ফাঁস করে দেয় ৷ ফেসবুকের তথ্য ফাঁসের জন্য আমাদের দেশেও বহু লোকের জেল জরিমানা হয়েছে বহুবার ৷ কিন্তু আমাদের বিডি নিউজ ব্লগ তো আর ফেসবুক নয়! বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র শান্তিপ্রিয়, সুশৃঙ্খল, স্বাধীন মত প্রকাশের জায়গা এই বিডি নিউজ ব্লগ ৷ আমরা মুক্তমানার কথা ভুলে যাইনি, এখন বর্তমানে মুক্তমানার নামও কেউ হয়তো মুখে আনে না, ওইসব ঝামেলার কারণে ৷ সবশেষে সম্মানিত ব্লগপোষক মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, ওইসব ছদ্মনাম ব্যবহারকারীদের আহ্বান জানান, যাতে সম্মানিত ছদ্মনাম ব্যবহারকারীগণ তাদের নিজ প্রোফাইলে, আসল নাম ও একটা আসল ছবি দিয়ে এই দেশের স্বনামধন্য ব্লগের সুনাম রক্ষায় সহায়তা করে ৷