ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

পৃথিবীতে মানুষ জন্ম নেওয়ার পর, বয়স যখন আট বছর হয়, তখন থেকে একটু-আধটু বুঝতে পারে সব শিশুরা’ই ৷ তখন হয়তো লেখাপড়ার দিক দিয়ে তৃতীয় বা চুতুর্থ শ্রেণিতেই থাকে সব শিশুরা ৷ খুব ছোটবেলা থকেই সব শিশুরাই বুঝতে পারে আমি কোন ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি, আমার ধর্মের নাম কী? হিন্দু না মুসলিম, বৈদ্ধ না খ্রিষ্টান। সনাতন ধর্মের শিশুরা, মা-বাবার সাথে মন্দির বা কোন পূজা অনুষ্ঠানে গিয়ে শিখে নিজ ধর্মের নিয়ম কানুনগুলি ৷ যেমন: মন্দিরে গিয়ে কী করতে হবে, বড়দের কীভাবে ভক্তি দিতে হবে ৷ মুসলমান শিশুরাও তাদের বাবার সাথে মসজিদে, ঈদের নামাজে গিয়ে শিখে ইসলাম ধর্মের নিয়ম কানুন৷ ইসলাম ধর্মের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই মক্তবে, মাদ্রাসায় গিয়ে ধর্মশিক্ষা শুরু করে ৷ বৈদ্ধ ও খ্রীষ্টধর্মের শিশুরা ঠিক একই কৌশলে ধর্মশিক্ষা শুরু করে ৷ তখন থেকেই নিজ ধর্মের প্রতি ভালবাসা, আর অন্যের ধর্মের প্রতি ঘৃণা অনিহা জন্ম নেয় কিছু-কিছু শিশুদের মাঝে, তবে সব শিশুদের বেলায় তা হয় না ৷ যেসব শিশু অন্যের ধর্মের প্রতি এরকম ঘৃণা নিয়ে বড় হতে থাকে, তাঁরাই একদিক অন্য ধর্মের লোকদের উপর আঘাত হানে ৷ তাঁরা মনে করে থাকে, আমার ধর্মই সেরা ধর্ম, আমরা’ই পৃথিবীর সেরা মানুষ, আমার ধর্মের লোক ছাড়া অন্য কোন ধর্মের লোক এই পৃথিবীতে থাকার অধিকার নেই, আর অন্য কোন ধর্ম’ই থাকতে পারবেনা ৷

কেজি ওয়ানে পড়ুয়া একটা মুসলমান শিশুকে যদি বলি, চলো আমাদের বাসায়! তোমাকে আনেক আনেক চিড়া-মুড়ি, লারু-সন্দেশ দেব৷ অনেক শিশুর প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়, না যাবো না, তোমরা হিন্দু৷ তোমরা নামাজ পড় না, তোমরা রোজা রাখ না, তোমরা মুসলমান হতে পার না? মুসলমান না হলে বেহেস্ত পাবে না, দোযগে যাবে৷ আর একটা হিন্দু শিশুকে যদি কোন মুসলমান ব্যক্তি বলে, চলো আমার সাথে আমাদের বাড়িতে ৷ অনেক হিন্দু শিশুকেও ওইরকম অনিহা প্রকাশ করতে দেখা যায় ৷ এসব শিশু কিশোররা’ই একদিক বড় হয়ে চরমপন্হী, মৌলবাদী হয়ে উঠে, তখন আর তাদের থামানো যায় না ৷ তাদের মনোভাব থাকে ধর্মের প্রতি, আর পরলোকগমনের পর স্বর্গবাসরে দিকে ৷ তাদের ধারণা এই দুনিয়াদারি ক্ষণিকের, পরলোকালের দুনিয়া চিরদিনের ৷ এই পরলোকালের অজানা সুখভোগের আশায় বিভোর হয়ে অন্য ধর্মের মানুষদের হত্যা করতে তাঁরা দীধা করে না ৷ বর্তমানকালে এই চরমপন্হী বা মৌলবাদ শুধু ইসলাম ধর্মের লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, হিন্দু,বৈদ্ধ, খ্রীষ্টান, ইহুদিদের মধ্যেও চরমপন্হী বা মৌলবাদ লক্ষ করা যায় ৷

এখানে বিশাল ভারতের কিছু “হিন্দু মৌলবাদী সংঘঠনের নাম উল্লেখ করা যায় ৷ এসব “হিন্দু মৌলবাদ” বা “চরমপন্হী” দলগুলি বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় রাজনীতি দল হিসেবে নিবন্ধনকৃত ৷ “হিন্দু মৌলবাদ” এই হিন্দু মৌলবাদ বিষয় শ্রেণিতে অন্তর্গত, ১| গৈরিক সন্ত্রাস, ২| বজরং দল, ৩| রাষ্ট্রীয় সয়ংসেবক সঙ্ঘ, ৪| শিব সেনা, ৫| শ্রী রাম সেনা ৷ বাংলাদেশেও ওইরকম কতগুলি ইসলামিক ধল আছে, যা বর্তমানে নিষিদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে৷ এসব দলীয় সদস্য’রা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে নিজ দেশেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটায়ে থাকে, যার কারণে নিজ ধর্মের লোকদেরও জীবন দিতে হয় ওইসব দাঙ্গাহাঙ্গামায় ৷ তাঁরা নিজেদের মত করে ধর্ম পরিচালনা করতে বড় বড় মাজার, মন্দির, গির্জায়, তীর্থস্থানেও হামলা চালাতে দ্বিধা করে না ৷ তাদের বিশ্বাস, অন্য ধর্মের কর্মকাণ্ডে বাঁধা দিলেই স্বর্গরাজা (ভগবান) খুশি হবেন, অতপরঃ তাঁরা স্বর্গবাসি হবেন ৷

এরা প্রথম থেকেই খুব ধর্মনিষ্ঠ হয়ে থাকে, ধর্মের কথা ছাড়া এঁদের কোন কথাই ভালো লাগেনা, যারা ধর্মানুগত তাঁদের সাথে এঁরা চলতে ভালবাসে৷ এঁরা সংঘবদ্ধভাবে চলতে ভালবাসে, দুই-চার-পাঁচজন একসাথে ঘুরঘুরে মানুষদের ধর্মবাক্য শুনাইয়ে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলতে চেষ্টা করে ৷ যেমন: নিয়মিত পূজা-অর্চনা, ধর্মগ্রন্থ বই পড়তে উপদেশ দিয়ে থাকে, অন্য ধর্মের লোকদের সাথে চলাফেরা করতেও বারণ করে থাকে ৷ এভাবে তাঁরা ধর্মপ্রচার করতে থাকে, আর ভাবতে থাকে যদি পৃথিবীর সকল ধর্মের লোকদের নিজ ধর্মে আনতে পারতাম, তাহলে আমি সৃষ্টিকর্তাকে লাভ করতে পারতাম, অতপরঃ আমি স্বর্গবাসি হতাম ৷ এরকম ভাবতে ভাবতে, তাঁরা আস্তে আস্তে, তাঁদের সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি করে ফেলে, যা একসময় একটা সংঘবদ্ধ দলে পরিণত হয়ে যায় ৷ তখনই শুরু হয়, যেখানে বিধর্মী সেখানেই প্রতিহত বা সংঘর্ষ ৷ ধর্মঅবমাননা এঁদের একেবারেই সহ্য হয় না, এজন্য তাঁরা নিজ ধর্মের লোকদেরও ছাড় দিতে নারাজ, এজন্যই কেউ করে মন্দির ভাংচুর, কেউ করে মসজিদ, মাজার ভাংচুর, কেউ করে আবার মানুষ হত্যা, প্রতিশোধ নিতেই চালায় গুপ্তহামলা বাঁধায় দাঙ্গা ৷ এমনটা বর্তমানে সারা বিশ্বেই হচ্ছে, এটাকে বলা হয়ে থাকে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ৷

ভারতের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ কামী সংগঠন বা এর সদস্যদের দ্বারা সংঘঠিত সহিংসতা ঘটে থাকে অহরহ৷ এঁরা ধর্ম নিয়ে একে অপরের সহিত সংঘর্ষে জরিয়ে পড়ে, যা একসময় এই সংঘর্ষেকে দাঙ্গা বা ধর্মীয় দাঙ্গা নামে অবিহিত করা হয় ৷ এঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবি নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে, যার খেসারত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদেরও দিতে হয় মাঝেমাঝে৷ যা হয়েছিল ১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর, বাংলাদেশের সমস্ত জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন ৷ বর্তমানেও একটা তুচ্ছ দাবি নিয়ে সংঘর্ষের পায়তারা করছে, গোহত্যা নিরোধ প্রসঙ্গ নিয়ে ৷

গেল কিছুদিন আগে, আমাদের বাংলাদেশে গুলশানে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসি হামালার ঘটনাও একরকম, গুলশান ঘটনায় শুধু অন্য ধর্মের লোক’ই প্রাণ হারায় নাই, যারা ধর্মপ্রচারের নামে বা পরকালের সুখভোগের লোভে হামলা চালিয়েছে, তাঁরা নিজেদের ধর্মের লোকদেরও হত্যা করা থেকেও বিরত থাকে নাই ৷ তারপর আবার পবিত্র ঈদুল-ফিতর এর দিনে শোলাকিয়ায় হামলা, সেই হামলার লক্ষ ছিল পুরো ঈদগাহ্‌ ময়দান ৷ ঈদের নামাজ তো শুধু ইসলাম ধর্মের লোকেরাই অাদায় করে থাকে, তাহলে একজন মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমানের ওপর হামলা কেন? এতেই বোঝা যায় যে, সেখানেও তাঁদের মতের বিরোধী কিছু ছিল ৷

ছেলে বা মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে তাঁদের জন্য ৷ ছেলেটার আচার-আচরণ কেমন হচ্ছে তা কেবল মা-বাবাই বেশি টের পাবার কথা, তাঁদের কথাবার্তায় বোঝা যাবে তাঁদের মনোভাব কী? কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সাথে বেশি সময় দিচ্ছে, কোন ধরণের বই-পুস্তক বেশি পরছে, তার অনুসারী বন্ধু-বান্ধবরা’ই কেমন, পাড়াপড়শী মুসলমান, হিন্দু, বৈদ্ধ, খ্রীষ্টানদের প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া কেমন, গ্রাম থেকে শহরে লেখাপড়া করতে এসে কী করছে, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে একটু খেয়াল করলেই ছেলে-মেয়েদের পরকালের চিন্তা থেকে একটু সরিয়ে আনা যায় ৷ তাঁদের বোঝাতে হবে, ধর্মের চিন্তা তোমার করতে হবে না, যিনি এত শখ করে এই বিশ্ববহ্মান্ড সৃষ্টি করেছেন, তিনি’ই তার ধর্ম রক্ষা করবে ৷ তিনি আমার মালিক, তোমার মালিক, সকল ধর্মের প্রভু তিনি, ধর্ম রক্ষার দায়িত্বও তার ৷ আমরা শুধু কর্মের ফল ভোগ করব, আর তার উপসনা করব ৷

পরকালের চিন্তা করে, এহকালে মা-বাবাকে অশান্তিতে রেখে, মানুষ হত্যা করে, পরকালের সুখভোগের মানে কী? পরকাল থেকে ফিরে এসে এহকালে তার বর্ণনা দাও ৷