ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

images-28
“চিতার আগুন”

অনেকদিন যাবৎ শরীর খুব খারাপ যাচ্ছে, কেয়ার করছি না ৷ একদিন আমি নিজেকে খুব অসুস্থতাবোধ করছি, ছিলাম কর্মক্ষেত্রে, অসুস্থতার কারণে তাড়াতাড়ি করে একটা রিকশা চড়ে বাসায় ফিরলাম ৷ বাসায় আসার পরপর’ই গিন্নি বললো, কী হয়েছে তোমার? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? বললাম, আমার কিছু হয়নি, আমি শুধু একটু ঘুমাতে চাই ৷ তবু যেন গিন্নিকে বোঝাতে পারছি না যে, আমার কিছু হয়নি ৷ গিন্নি তাড়াতাড়ি করে খাটের উপর উত্তর মুখি করে আমাকে শুইয়ে দিল, গিন্নির হৈচৈ দেখে পাড়াপড়শী, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই আমার বাসায় এসে হাজির হয়ে গেল ৷ মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিলাম অনেক দূরে, ওকেও খবর পৌছে দিল, মেয়ে বাচ্চাকাচ্চা আর স্বামী নিয়ে চলে আসলো আমাকে দেখতে ৷ আমাকে ধরে ওরা কাঁদছে, আদরের নাতিন দুটো আমার শরীরের উপর উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদছে, দাদু দাদু বলে ৷

আমি খাটে শুয়ে ঘুমাচ্ছি, আমার চোখ দুটো পাথর হলেও কান দুটো খোলা আছে, মাঝে মাঝে পাথর চোখের দৃষ্টিতে সবাইকে দেখছি ৷ আমি কথা বলতে পারছি না, চোখ মেলে কাউকে দেখতে পারছি না, কে কী বলছে সবই শুনতে পারছি, কিন্তু কথার উত্তর দিতে পারছি না ৷ গিন্নি কাঁদছে, পুত্র- কন্না, ও যারা আমাকে খুব ভালোবাসতো তাঁরাও কাঁদছে ৷ কান্নাকাটির শব্ধ আমার কর্ণপাত হচ্ছে ঠিক, তোমরা আমার জন্য কান্নাকাটি করো ‘না’ এটা বলতে পারছি না ৷ হাত উঠিয়ে যে, ইশারা দিয়ে কিছু নির্দেশ দিবো সেটাও পারছি না ৷ যেন মনে হচ্ছে আমার সমস্ত শরীর অঙ্গহীন হয়ে পরেছে, আমার কোন অঙ্গই নাই, আছে শুধু প্রাণপাখিটা, সেও ছটফট করছে আমার অবশ হওয়া অঙ্গহীন দেহ থেকে বের হওয়ার জন্য ৷ কেউ আমার মুখ জোর করে ফাঁক করে মুখে জল দিচ্ছে ৷ আমি তাদের দেওয়া জল গিলছি, মুখে জল দেওয়ার সময় কেউ কেউ নামও বলছে, আমি এমুক আমি তেমুক ৷ কিন্তু আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছি আজ তাঁরা আমাকে নিয়ে এত ব্যস্ত কেন? কী ব্যাপার? আমার তো কিছুই হয়নি , তাহলে সবাই কাঁদছে কেন? কেউ আবার মাপও চাইছে আমার হাত ধরে ৷ কেউ আবার আমার দেনা-পাওনা নিয়েও কথা বলছে আমার গিন্নির সাথে, কোথায় কী আছে, কোন ব্যাংকে জমানো কত টাকা আছে এসব বিষয় নিয়ে ৷ আবার ঘরের বাহিরে থেকে বলতে শোনা যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি করো বেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কাজ সেরে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে ৷ কিসের কাজ? কেন এত তাড়াতাড়ি? তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, কোথায় যাবে তাঁরা, কাকেই বা নিয়ে যাবে ৷

বুঝতে পারছি আমি, আমাকে যেন কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাঁরা ৷ অনেকক্ষণ পরে মনে হলো কোথায় যেন আমাকে রাখলো ৷ আমার এই ঘুমন্ত অবস্থায় ওরা সবাই মিলে আমাকে স্নান করাচ্ছে কেন? আমি তাঁদের বলছিলাম যে, তোমরা আমাকে স্নান করাচ্ছো কেন? কিন্তু কেউ আমার কথা শুনছে না ৷ স্নান করানোর পরে আমাকে নতুন কাপড় পড়াচ্ছে, কি আশ্চর্য! কোথায় যাব নতুন কাপড় পড়ে? কিছুক্ষণ পরে আমার অঙ্গহীন দেহটায় তৈল মালিশ করছে, ঘি ঢেলে দিচ্ছে, চন্দন বাটা গায়ে মাখছে ৷ তারপর ওরা আমার অবশ হওয়া দেহখানা যেন একসময় চন্দনকাষ্ঠের স্তুপের উরপ রেখে দিল ৷ ভাবছি আজ আমার জন্য তাদের এত আদর কেন? অন্যদিন তো কেউ আমার জন্য এত আদর দেখায় নাই, আজকে আমাকে নিয়ে এত ব্যস্ত কেন সবাই? পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ দ্বারা আমার বড় ছেলে পাট- খড়ির মশাল জ্বালিয়ে আমার চারিদিক ঘুরছে কেন? কী করবে এই জ্বালিত পাট-খড়ির মশাল দিয়ে? আমি শুনতে পারছি হরিনাম সংকীর্তনে ধ্বনি ৷ কেউ বলছে হরি বলা বোল হরি ৷ কিছুক্ষণ পর মনে হলো আমার অবশ হওয়া অঙ্গহীন দেহটা খসে খসে পরছ, প্রাণপাখিটা ছটফট করছে আমার কাছ থেকে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার জন্য ৷ শেষমেষ প্রাণপাখিটা আমার কাছ থেকে চির বিদায় নিয়ে কোথায যেন চলে গেল ৷ এখন আর কেউ নেই, শুধুই একা ৷

ছবি সংগ্রহ: গুগল,