ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

patuakhali-pic-01

খবরের পাতায় দেখলাম, আমাদের দেশের মির্জাগঞ্জের ঝালকাঠির একটা গ্রামের ছোট্ট ছেলে ঝালকাঠি হতে খরস্রোতা পায়রা নদী পাড়ি দিয়ে মির্জাগঞ্জে আসা-যাওয়ার সময় ভীষণ ভয় পেয়ে যেত ৷ সেই ভয় থেকেই নিজের ইচ্ছায় পায়রা নদীর উপর একটা সেতু নির্মাণের জন্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাকযোগে একটি চিঠি প্রেরণ করে ৷ ছোট্ট ছেলেটির মত এমন কোন একসময় আমিও ভয় পেতাম পদ্মা-মেঘনা নদী পাড়ি দেওয়ার সময়, আমার ভয়ের কাহিনী আগে বলে নেই, তারপর ঝালকাঠির শীর্ষেন্দু’র কথা বলছি ৷

প্রিয় পাঠক, আমার গ্রামের বাড়ি ছিল নোয়াখালী, বাবা আর বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ ৷ বাবা এবং বড়দাদা’র চাকরির সুবাদে ছোটবেলায় মা’ বাবার সাথে মাঝেমাঝে নারায়ণগঞ্জ আসা হতো ৷ তখন আমার বয়স ছিল ৭ থেকে ৮ বছর, আর তখনকার সময়টা ছিল দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে ৷ আসা-যাওয়ার রুট ছিল নোয়াখালীর বজরা রেলস্টেশন হতে চাঁদপুর, চাঁদপুর হতে লঞ্চ বা স্টীমারে নারায়ণগঞ্জ ৷ আসা-যাওয়ার সময় রেলগাড়িতে খুব ভালে লাগতো, ভাল লাগার কারণ হলো, রেলগাড়িতে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে আমার মা’ মজার মজার খাবার কিনে দিতেন ৷ চাঁদপুর থেকে যখন লঞ্চে উঠতাম নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে, তখন আর ভাল লাগত না, নদীর উত্তাল তরঙ্গের ঢেউ দেখলেই পিলে চমকে যেত৷

আমি রেলগাড়ি থেকে নামার আগেই বায়না ধরতাম লঞ্চে করে যাব না, লঞ্চে ভয় হয়, মা’ বুঝতেন যে, আমি ভয় পাচ্ছি পদ্মা আর মেঘনা নদীর ঢেউ দেখে ৷ মা’ আমাকে শান্তনা দিতেন কিছু হবেনা, তুমি আমার কোলে-কাখেই থাকবে সবসময়, ভয় কিসের! সেই শান্তনায়ও ভয় যেত না মন থেকে ৷ লঞ্চ যখন পদ্মা নদী দিয়ে যেত তখন মনে হতো এই বুঝি লঞ্চ ডুবে গেল, মা’ আমাকে মায়ের আঁচলের ভিতরেই রাখতো সারাক্ষণ ৷ নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল এসে পৌঁছার সাথে সাথেই মন থেকে ভয় যেত, তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ নারায়ণগঞ্জ এসেছি, তখনকার সময় তখনকার দিনে নারায়ণগঞ্জকে মনে হতো সিঙ্গাপুর ৷
patuakhali-pic-03

জানা যায়,এমনই এক নদী পারাপারে খরস্রোতা নদীর ঢেউ দেখে আর স্রোত দেখে পিলে চমকে গিয়েছিল, আমাদের দেশের পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছোট ছেলের ৷ ছেলেটির নাম: শীর্ষেন্দু, গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি, থাকে মির্জাগঞ্জ, গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসার সময় পায়রা নদী পাড়ি দিতে হয় নৌকায় বা ট্রলারে করে ৷ ট্রলারে বা নৌকায় করে শীর্ষেন্দু যখন মা’ বাবার সাথে পায়রা নদী পাড়ি দিতো তখনই শীর্ষেন্দুর অবস্থা হতো আমার মত ৷

শীর্ষেন্দু তখন তাঁর প্রাণপ্রিয় মা’ বাবার কথাই ভাবতো, শীর্ষেন্দু ভাবতো যদি এখন ট্রলার বা নৌকাখানি ডুবে যায় তাহলে আমি আমার মা’ বাবাকে আর পাবো না ৷ শীর্ষেন্দু চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, একটু হলেও শীর্ষেন্দু এখন বুঝের হয়েছে, প্রতিদিন বাসায় লেখাপড়ার শেষে অন্য ছেলেদের মত সেও টিভি দেখে ৷ বাংলাদেশে বর্ষার শুরুতেই বহু নদীতে লঞ্চ বা ট্রলার ডুবির খবর দেখতে পায়, নৌকায় বা ট্রলারে যাওয়া-আসার সময় টিভিতে দেখা ওইসব দৃশ্যগুলি শীর্ষেন্দুর মনে পড়ে যায় ভীষণ ভাবে ৷ তখনই শীর্ষেন্দু ভয়ে কাঁপতে থাকে মায়ের আঁচল ধরে আর বাবার হত ধরে ৷ ওইসব ভাবনায় ভাবিত হয়ে, মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর উপর একটি ব্রিজ নির্মানের দাবিতে, শীর্ষেন্দু গত ১৫ অগাস্ট ২০১৬ইং আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিজ হস্তে একটি চিঠি লেখে ৷ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নামে চিঠি লিখে পোস্টের মাধ্যমে চিঠিখানা পোস্ট করে দেয়, শীর্ষেন্দু কখনো ভাবতেও পারেনি আমার এই ক্ষুদ্র চিঠিখানা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ হবে, শীর্ষেন্দু কখনোই ভাবতে পারেনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরার লেখা চিঠিখানার উত্তর দিবে ৷ ওইসব ভাবনা শীর্ষেন্দুর ভাবনাই রয়ে গেল, বাস্তবে আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেই ছোট ছেলের একটি ব্রিজের দাবি সংবলিত চিঠিখানার উত্তর দিলেন গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ইং তারিখে ৷ সেই চিঠিখানা পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের হাতে পৌঁছায় ২০ই সেপ্টেম্বর ৷ যা হয়ে গেল এক নতুন ইতিহাস ৷

পায়রা নদীর উপর ব্রিজের দাবিতে শীর্ষেন্দু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখেছে ৷ “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সালাম ও শুভেচ্ছা নিবেন ৷ আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক ৷ নাম শীর্ষেন্দু বিশ্বাস, পিতা বিশ্বজিৎ বিশ্বাস, মাতা শীলা রাণী সন্নামত ৷ আমি পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ৷ আমার দাদু অবিনাস সন্নামত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ৷ “আমি আপনার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদৎবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলাম ৷ আমি আপনার পিতার শৈশবকাল রচনা লিখে তৃতীয় স্থান অধিকার করি ৷
“আমার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি ৷ আমাদের মির্জাগঞ্জ নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় ৷ এ নদীতে পচণ্ড ঢেউ, মানুষ ভয় পায় ৷ কখনও নৌকা ডুবে যায়, কখনও ডুবে ট্রলার ৷ এতে আমার থেকে ছোট ভাই বোন তাদের মা বাবাকে হারাতে হয়, আমি আমার মা বাবাকে পচণ্ড ভালবাসি, তাদের আমি হারাতে চাই না ৷ তাই আপনার কাছে একটাই অনুরোধ যে, আপনি মির্জাগঞ্জ নদীতে ব্রিজের ব্যবস্থা করুন ৷ তা যদি আপনি পারেন তাহলে আমাদের জন্য একটু কষ্ট করে এই ব্রিজ তৈরির ব্যবস্থা করুন ৷

patuakhali-pic-06

”মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উত্তর:
“স্নেহের শীর্ষেন্দু, তুমি শুধু দেশের সাধারণ নাগরিক নও, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং দেশেকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার অগ্রজ সৈনিক ৷ আমি জানি পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার পায়রা নদীটি অত্যন্ত খরস্রোতা ৷

”নিজের পিতামাতাসহ অন্যান্য পরিবারদের নিয়ে সচেতনতা আমাকে মুগ্ধ করেছে ৷ আমি বুঝতে পারি তোমার বীর মুক্তিযোদ্ধা দাদুর প্রভাব রয়েছে তোমার ওপর ৷ মির্জাগঞ্জের পায়রা নদীতে সেতু নির্মান করা হবে বলে তোমাকে আশ্বস্ত করছি ৷

ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই ভালবাসা থেকে নতুন এক ইতিহাস জন্ম হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৷ মানুষের প্রতি আপনার এই ভালবাসা যেন আজীবন বহাল থাকে ৷ একটা ছোট ছেলের চিঠির জবাব দিয়ে আপনি সারা বিশ্বকে জাগিয়ে তুলেছেন এক নতুন ভাবে ৷ আপনার দেয়া প্রতিশ্রুতিতে ছোট ছেলে শীর্ষেন্দু সহ পুরো মির্জাগঞ্জবাসি আজ আনন্দের জোয়ারে ভাসছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী৷ মির্জাগঞ্জবাসির আনন্দের সাথে আমরা সকল বাংলাদেশের নাগরিকও আনন্দিত, আরো আনন্দিত হবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যেদিন শীর্ষেন্দুকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে ৷ আশা করি শীর্ষেন্দুকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অচিরেই বাস্তবায়িত হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৷ মানুষের প্রতি এমন ভালবাসা আপনার কাছ থেকে আমরা সবসময় কামনা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৷ আপনার হাতেই জেগে উঠুক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপ্নের সোনার বাংলাদেশ ৷

পরিশেষে শীর্ষেন্দু বিশ্বাসকে ধন্যবাদ জানাই, প্রিয় শীর্ষেন্দু, তুমি মির্জাগঞ্জের অহংকার, তুমি এই দেশের অহংকার, তুমি বাংলাদেশের সমস্ত কিশোরদের গৌরব ৷ বাংলাদেশের প্রতিটি ছোট শিশুই যেন তোমার মত এক হৃদয়বান শীর্ষেন্দু হয়ে উঠে ৷ বড় হয়ে যেন দেশ ও দশের সেবায় নিয়োজিত থাকে সর্বক্ষণ ৷ এই কামানায় রইলাম ৷

ছবি সংগ্রহ: বিডিনিউজ২৪ থেকে ৷