ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

photo

আমরা খুবই আত্মহংকারি ও হিংসুক, আবার খুবই কৃপণ ও দয়ালু টাইপের মানুষ ৷ আমরা মানুষকে নিন্দাও করি আবার যাকে নিন্দা করি তার চরণে মিনতি দিতেও দ্বিধাবোধ করিনা ৷ কারণ: বলতে গেলে এর বহুবিধ কারণ চোখে পড়ে, মনেও পড়ে ৷ মনে পড়ে আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা নিম্নবর্ণের সম্প্রদায় হরিজন সম্প্রদায়ের কথা, মানে সুইপার বা মেথর ৷ তাদের গায়ের ছোঁয়া পর্যন্ত আমরা সহ্য করি না, বা করতে পারতামও না, তাঁরা সমাজের নিছু কাজ করে বিধায় ৷ অথচ তাদের ছাড়া বাঁচার উপায় নাই, চলার উপায় নাই, তারপরেও তাদের করি আমরা ঘৃণা ৷ যখন গলায় কাঁটা বিঁধে তখন তাদের শরণাপন্ন হই, কতনা তোষামোদ আর আকুতি মিনতি ৷ একদিন আগে যে তাদের ঘৃণা করলাম তাঁরা কিন্তু সেটা মনেও রাখেনি, হাসিখুসিতেই আমার বিপদ উদ্ধার করে দিলেন ৷ প্রমাণ হলো তাঁরাই মানুষ, তাঁরাই মহান ৷

images

এদেশের সম্মানিত মুসলমান ভাইয়েরা সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানধর্মাবলম্বী মানুষের দিকেও আড়চোখে তাকায় ৷ নিন্দা করতেও কম করেনা সময় সময় ৷ খ্রীষ্টানদের বলে বে-দ্বীন আর হিন্দু বৌদ্ধদের বলে মালাউন চাড়াল ৷ বহিঃবিশ্বে যে-কোন দেশে, যে-কোন জায়গায় ধর্ম অবমাননা বা আল-কুরআন অবমাননা হলেই শুরু হয় সংখ্যালঘুদের ওপর প্রহার অত্যাচার, মন্দির ভাঙ্গা আর গির্জা ভাঙ্গা ৷ ভাংচুর করা হয় পূজার মন্ডপের প্রতিমা বা দেবদেবীর বিগ্রহ, এসব করেই আবার একসময় নিরব হয়ে যায় ৷ রাশিয়া, আমেরিকা দ্বারা কোন মুসলিম দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই শুরু হয় হৈ-হাল্লা আর বিভোধ গাওয়া ৷ প্রচার করা শুরু করে দেয় ইহুদী, নাসারা, বে-দ্বীনদের সব কিছু বর্জন কর, সব পণ্য বর্জন কর, বিধর্মীদের দেশছাড়া কর, ইত্যাদি ইত্যাদি শ্লোগানে হয়ে উঠে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ ৷

images-1

সেই সময়েও দেখা যায় কেউ ইহুদী আর অমুসলিমদের দেশ আমেরিকা, লন্ডন, ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য সকাল-বিকাল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে দুহাত তুলে ফরিয়াদ করতে ৷ লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে ফেলে ওইসব ইহুদী নাসারা বে-দ্বীনদের দেশে যাওয়ার জন্য ৷ বহু আরাধনার পর যদি কেউ আমেরিকার ভিসা পেয়ে আমেরিকা যায়, আমেরিকা কিন্তু তাকে কোন সময়ই বলে না যে, তুমি আমার দেশের পণ্য বর্জনের আন্দোলনকারীর অন্যতম প্রতিনিধি, তুমি আমাদের দেশে আসলে কেন? তুমি তোমার দেশে ফেরৎ চলে যাও ৷ তা কিন্তু তাঁরা কখনোই করে না, ফেরৎ ও পাঠায় না ৷ বোঝা যায় তাঁরাই মানুষ, তাঁরাই মহান ৷

images-36

এমনই একজন বিধর্মী পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন আমেরিকার হোয়াইট প্লাইন নিউইয়র্ক শহরে, তাঁর জন্ম ১৪ মে, ১৯৮৪ইং সালে, বর্তমান বাসস্থান: পালো আল্টো ক্যালিফোর্নিয়ায় ৷ সম্মানিত ব্যক্তির নাম: মার্ক জুকারবার্গ ( Mark Elliot Zuckrberg ) তিনিই বর্তমান ‘ফেসবুক’ প্রতিষ্ঠাতা সংক্ষেপে ‘ফেবু’ নামে পরিচিত ৷ ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা করেন ২০০৪ইং সালে ৪ ফেব্রুয়ারি মাসে, সেই থেকে চলছে তো চলছেই স্বাদের ফেসবুক আর নিস্তার নেই ৷ বর্তমানে ফেসবুক এক মহাকিতাব, সব কাজের কাজী সেজে বসে আছে এই স্বাদের ফেসবুক ৷ ছোটবাবু-বড়বাবু, ছেলেমেয়ে, দাদা-দাদী, মামা-মামী, কাকা-কাকী, চাচা-চাচী, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, তালতভাই খালতভাই আর মামাতো ভাই সবাই ব্যবহার করে এই ‘ফেসবুক’ যা রেললাইনের ধারে ঝুপড়ি ঘরের ছেলেমেয়েরাও ব্যবহার করে ‘ফেসবুক’ ৷ এমনকি ক্লাশ ফোর ফাইভ এ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরাও এই ফেসবুকের শিষ্য ৷ গেল কয়েক মাস আগে আমাদের দেশে যে কোন একটা ঘটনায় ‘ফেসবুক’ সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করে, সেটা ছিল খুবই কম সময়ের জন্য ৷ এই বন্ধ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বহু আন্দোলনের জন্ম হয়, জন্ম হয়েছিল ‘ফেসবুক’ রক্ষা কমিটি ও বহু সংঘটন, ক’দিন চলছিলো সেই রক্ষাকারী সংঘটনের প্রতিবাদ, চলছিলো গুরুতর আন্দোলন ৷

images-58
আন্দোলনকারীরা আন্দোলন করনি ‘ফেসবুক’ বন্ধ করে দিতে, তখন আন্দোলনকারীরা বলেনি এই ইহুদী নাসারা আর বে-দ্বীনদের গড়া ‘ফেসবুক’ বন্ধ কর, আন্দোলনকারীরা বলেনি একজন খ্রীষ্টানের প্রতিষ্ঠান বন্ধ কর, বিদায় কর ৷ তাঁরা আন্দোলনকারীরা শুধু আন্দোলন করেছে ‘ফেসবুক’ চালু করার জন্য, প্রবাসীরাও বিদেশ থেকে আন্দোলন করেছে যা সবার’ই মনে আছে ৷ তাঁরা ভুলেই গিয়েছিল যে, এই ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা একজন ইহুদী নাসারা খ্রীষ্টান ৷ সেসময় এই আন্দোলনে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও ভীষণ চাপে পড়ে গিয়েছিল এই ‘ফেসবুক’ বন্ধ করে দেয়ার কারণে ৷ শেষ পর্যন্ত সরকার ‘ফেসবুক’ খুলে দিতেও বাধ্য হয় আন্দোলনের কারণে ৷ তখন সরকার যদি আর কিছুদিন ‘ফেসবুক’ বন্ধ করে রাখতো, তাহলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক ডজন ছেলেমেয়ে হয়তো আত্মহত্যাও করতো এই ‘ফেসবুক’ এর জন্য ৷

images-47

এখন কথা হলো, আমরা ইহুদী নাসারা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টানদের ভালবাসি না, কেউ আবার মুসলমানদের দেখতে পারে না, কেউ আবার মুসলমান আর হিন্দুদের দেখতে পারে না ৷ অথচ আমরা যাদের দেখতেও পারিনা, তাহলে বিধর্মীদের গড়া ফেসবুকের পাতায় লেখালিখি করি কী করে? আজকাল ফেসবুকের পতা যেই-সেই পাতা নয় ! ফেসবুকের পাতা এখন একটা মহাকিতাবের পাতা । আমাদের দেশে আরবি লেখাযুক্ত একটা কাগজের টুকরা যদি রাস্তায় কেউ দেখে, তাহলে সেই কাগজখানায় একটু পায়ের স্পর্শও লাগতে দেয় না আনেকে, গুনাহ হবে তাই ৷ হিন্দুধর্মাবলম্বীদেরও দেখা যায়, দেবদেবীদে ছবি সংবলিত কোন কাগজ রাস্তায় দেখলে সেটা তুলে নিয়ে, প্রণাম করে জলে ফেলে দেয় ৷ এমন সব ধর্মাবলম্বীরা যার যার ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ধর্মকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকে ৷ কেউ আবার এসব ধর্মীয় কাগজগুলোকে জলে অথবা নিজের পকেটে না রেখে সযত্নে চিরস্থায়ী করে ফেসবুকেই রেখে দিতে চায় ৷ তা জমা করে রাখতে পারেও অনেকে, রাস্তা থেকে সেই ধর্মীয় কাগজের টুকরার ছবিখানা ফেসবুকে আপলোড করতে পারলেই লাইক কমেন্টের অভাব থাকে না ৷ images-48

কারণ: ফেসবুক তো এখন একটা মহাকিতাব, এই কিতাব পৃথিবীর সকল ধর্মের কিতাব, সবকিছুর মহাপরিচালক ৷ এই কিতাব ছাড়া সারা দুনিয়ার যতপ্রকারের অনলাইন পত্রিকা আছে তা আর কেউ পড়বে না, পাঠক সংখ্যা থাকবে শূন্যের কোঠায় ৷ দুনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের বাণীও মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে না এই ফেসবুক ছাড়া ৷ এই ফেসবুকে আছে, হিন্দুদের রামায়ণের বাণী, জয়গীতার বাণী, বৌদ্ধধর্মের বাণী, পবিত্র আল-কুরআনের বাণী ৷ হিন্দুদের একটা দেবতার ছবি দিয়ে বলা হয় প্রণাম করুণ, লেখুন হরে কৃষ্ণ ৷ পবিত্র আল-কুরঅানের একটা আয়াত লিখে বলা হয়, কেউ ভুলেও এড়িয়ে যাবেন না, সবাই লেখুন আমিন ৷ কেউ আবার লিখে থাকে, এই লেখাটা বা এই পোস্টখানা অন্তত বিশ জনের মাঝে শেয়ার করুণ, আশা করি আজ রাতেই ভাল কিছু স্বপ্নে দেখবেন ৷ আরো বহুপ্রকার ধর্মীয় বাণী, ধর্মীয় তন্ত্রমন্ত্র সহ রাষ্ট্রীয় প্রধানদের খবরাখবর, চলছে লাইক আর কমেন্টের প্রতিযোগিতার বাহার, চলছে ধর্ম প্রচার ৷ আমরা যাদের বিধর্মী, ইহুদী, নাসারা, অমুসলিম বলে ঘৃণা করি, তাদের হাতে গড়া এই ফেসবুক পরিণত হয়েছে মহাকিতাবের একটা অংশ হিসেবে ৷ কিছু দিন আগেও দেখেছি সম্মানিত মুসলমান ভাইবেরাদার নামাজের আগে সারিবদ্ধ ভাবে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে, মানুষকে ডেকে নামাজ পড়ার জন্য অনুরোধ করতো ৷ এখন আর বেশি দেখা যায় না, দেখা যায় না, প্রাতঃকালে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হরির নাম সংকৃত্তন করতে ৷ হরির নাম হচ্ছে ফেসবুকে সকাল-বিকাল-সন্ধ্যায়, নামাজের আহ্বান জানানো হয় একজন বিধর্মীর গড়া ফেসবুকের পাতায় ৷

images-54

সেই জন্য ধন্যবাদ জানাই সম্মানিত মার্ক জুকারবার্গকে, মার্ক জুকারবার্গ এখন মহাপুরুষ মহাকারিকর ৷ সম্মানিত মার্ক জুকারবার্গ ইচ্ছা করলে বর্তমানে পৃথিবীর সকল সমস্যা সমাধান করে দিতে পারবে মুহুর্তের মধ্যে ৷ যেমন: বর্তমানে ভারত পাকিস্তানে যেই উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, সেই উত্তেজনা পরিস্থিতিও নিষ্পত্তি করে দিতে পারবে মার্ক জুকারবার্গ ৷ মার্ক জুকারবার্গ শুধু ঘোষণা দিবে যে, তোমরা দুই দেশ উত্তেজনা পরিহার যদি না কর, তবে তোমাদের দেশ থেকে আমি আমার ফেসবুকের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিব ৷ তখন হয়তো দেখা যাবে দুই দেশের উত্তেজনা পরিস্থিতির নিষ্পত্তি করতে আন্তর্জাতিক কোন কুটনৈতিক আলাপসালাপের প্রয়োজন হবে না, তার মীমাংসা দুই দেশের জনগণেই করে ফেলবে মুহুর্তের মধ্যে ৷ কারণ: এই মহাকিতাব ছাড়া কী জীবন চলবে? সবাই বলবে জগড়া চাই না, ফেসবুক চাই ৷ তাহলে আসুন, সকল হিংসা আর ধর্মীয় কলহ দূরে ফেলে দিয়ে পৃথিবী নামক গ্রহটিতে সবাই থাকি মিলেমিশে, যেমন মিলেমিশে আছি ফেসবুক নিয়ে, তেমনি ভাবে ৷ বেঁচে থাকার জন্য চাই সুন্দর একটা পৃথিবী, চাই সুন্দর সামাজিক যোগাযোগ ৷ তার জন্যই এই ফেসবুক অন্য কিছুর জন্য নয় ৷
জয় মার্ক জুকারবার্গ, জয় হোক ফেসবুকের ৷
ছবি সংগ্রহ: গুগল