ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে নারায়ণগঞ্জ জেলা অবস্থিত ৷ এই নারায়ণগঞ্জ শহরটির বুক চিরে বয়ে গেছে কোন এক সময়ের খরস্রোতা শীতলক্ষ্যা নদী ৷ শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড় ও পশ্চিমপাড় নিয়েই নারায়ণগঞ্জ শহর, যা একসময়ের প্রাচ্যের ডান্ডি নামে খ্যাত ৷ ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই শহরটি ঐতিহ্য আর সুনাম নিয়েই আজ অবধি, বিশ্বের হাজার কোটি মানুষের হৃদয়ে ছবি হয়ে আছে এই শীতলক্ষ্যা নদীর জন্য ৷ সেই শীতলক্ষ্যা নদীটি আজ মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে কাতরাচ্ছে ডাইং গার্মেন্টস এর নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যালের পানির আঘাতে ৷ সাথে কাতরাচ্ছি আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী। কারণ, এই শীতলক্ষ্যার পানি পান করেই আমাদের জীবনধারণ করতে হয় বছরের পর বছর ৷
img_20161102_1720052

গার্মেন্টস হতে বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি নির্গত হয়ে বয়ে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদীতে ৷

শুনেছি পানির অপর নাম জীবন, বর্তমানে এই কথাটির বিপরীত দিকটা হলো, পানির অপর নাম মরণ ৷ কারণ, এই শীতলক্ষ্যার পানি পান করেই বেঁচে থাকতে হয় নারায়ণগঞ্জবাসীকে ৷ যেখানে কোন এক সময়ের খরস্রোতা নদী শীতলক্ষ্যাই মৃত্যুর মুখে, সেখানে মানুষ বাঁচে কী করে? বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর দু‘পাড়ে গড়ে ওঠা শত-শত অত্যাধুনিক নীট গার্মেন্টস এর সুবিশাল বিশাল ডাইং কালার প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিজ ৷ এসব শত-শত নিট ডাইং ইন্ডাষ্ট্রিজে কাপড় কালার করার জন্য যে সমস্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, তা বিষাক্ত সাপের বিষের চেয়েও বিষাক্ত ৷ লোক মুখে শোনা যায়, বিষাক্ত সাপের বিষও মানুষ শোধন আর সাধনা করে পান করে বেঁচে থাকে অনেক অনেক বছর ৷ যারা এই বিষাক্ত সাপের বিষ সাধন-শোধন করে পান করে, তাঁরাও পারবে না এই শীতলক্ষ্যার পানি পান করতে, তাঁদেরও হবে নির্ঘাত মৃত্যু ৷ কেন না, এই কেমিক্যালের পানির আঘাতে মাছ, গাছ সবই মরে সাফ হয়ে যায় ১০-১২ ঘন্টার ব্যবধানে। আর আমরা তো স্রষ্টার প্রেরিত রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ ৷ শোধন করা এই বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি পান করে আমরাও মরছি-ভুগছি দিনের পর দিন। মরছে আমাদের নতুন আগত প্রজন্ম। ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানাবিধ পেটেরপীড়ায় ভুগছি আমরা ও আমাদের সন্তানেরা ৷
img_20161027_1231012

গোদনাইল আজিম মার্কেট সংলগ্ন খাল দিয়ে শীতলক্ষ্যায় যাচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি

যেসব খালবিল আর ডোবা-নালা দিয়ে ডাইং এর নির্গত কেমিক্যালের পানি বাহির হয়ে আসে,  দেখা যায় কেমিক্যালের গ্যাসে খালবিলের দু’পাড়ের জংলা গাছগাছড়াগুলো  পুড়ে ছাই হয়ে গেছে৷ এসব খালবিলে আগেকার সময় থাকত কতরকম মাছ, ব্যাঙ, কাছিম, কাঁকড়া, দেশিয় সাপ, গুইসাপ আরো কত কী। এখন কিছুই নেই এই কেমিক্যালের নির্গত পানির কারণে ৷ সময় সময় দেখা যার খালবিলে থাকা গুইসাপগুলি এই কেমিক্যালের পানির গ্যাস সহ্য করতে না পেড়ে রাস্তা ওঠে লোকালয়ে চলে আসে নিরুপায় হয়ে ৷
img_20161115_170531

গোদনাইল এসিআই ফার্মাসিউটিক্যাল এর দেয়া বিশুদ্ধ পানির জন্য জনসাধারণের ভিড় ৷

আগেকার সময় দেখা যেত বিদেশ থেকে আসা মালবাহী জাহাজগুলি মালামাল খালাস করে যাওয়ার সময় ট্যাঙ্কি ভরে এই শীতলক্ষ্যার বিশুদ্ধ পানি নিয়ে যেত চলার পথে পানির পিপাসা মেটানোর জন্য ৷ বিদেশিরা সপরিবারে বাংলাদেশে এসে ওই কক্সবাজার সুমদ্র সৈকতের লোনাপানিতে না গিয়ে, এই শীতলক্ষ্যায় চলে আসতো পরিবার-পরিজন নিয়ে ৷ ইংরেজরা স্পিড বোর্ডের পিছনে শক্ত রশি বেঁধে পায়ে লম্বা কাঠের জুতোর মত পড়ে পানির ওপরে রশি ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো, স্পিড বোর্ড চলতো ভীষণ জোড়ে, রশি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিও চলতো স্পিড বোর্ডের তালে তালে ৷ এখন সেই দৃশ্য শুধুই স্মৃতি, শুধু কেমিক্যালে পঁচা পানির কারণে ৷ আগেকার সময় এই শীতলক্ষ্যার পানি, দু’পাড়ের মা-বোনেরা সকাল-বিকাল কলস ভরে নিয়ে যেত পান করার জন্য ৷ এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। এখন মা-বোনেরা কলস নিয়ে ছুটে যায় কোথাও থাকা টিউবওয়েল (যাতাকল) এর পানি সংগ্রহের জন্য ৷ সকাল-বিকাল নদীর দু’পাড়ে দেখা যেত স্নান করার দৃশ্য, শীত মৌসুমে দেখা যেত রবিশস্য, দেখা যেত জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, এখন ওইসব কথা শুধুই এক রূপকথার কাহিনী ৷
img_20161115_165413

টিউবওয়েল (যাতাকল) থেকে বিশুদ্ধ পানি নিচ্ছে এক মহিলা ৷

বর্ষা মৌসুমে জেলেরা কিছু মাছ পেলেও শীত-বসন্ত ঋতুতে একটা তিতপুঁটিও পায় না এই ডাইং এর কালার করা কেমিক্যালের পানির কারণে ৷ রাতে দেখা যেত জেলেদের জাল ফেলার দৃশ্য, জালের ওপরে ভেসে থাকতো জ্বালানি প্রদীপ, যেন ছোট-বড় জাহাজগুলি এই জ্বলন্ত প্রদীপ দেখে জালের পাশ কেটে চলে যায় ৷ এখন সেই দৃশ্য মোটেই চোখে পড়ে না। জেলেরা চলে যায় যেখানে ডাইং কেমিক্যালের পানি নেই সেখানে ৷ জেলেরা মাছ ধরার জন্য চলে যায় রূপগঞ্জ ও মেঘনার মোহনায় আশেপাশের নদ নদী আর খালবিলে ৷ বছরের শুষ্ক মৌসুমে জেলেদের দুর্দিন আর অভাব অনটনের মধ্যে চলে তাঁদের সংসার। এসবের জন্য দায়ী শুধু এই কেমিক্যালের নির্গত বিষাক্ত পানি ৷
img_20161027_123031

গোদনাইল আজিম মার্কেট সংলগ্ন খাল, যা ছিল কোন একসময়ের শীতলক্ষ্যা হতে ঢাকা সদরঘাট পর্যন্ত নৌকা যোগাযোগ ৷ আসা-যাওয়া করতো যাত্রী ও নানাবিধ মালামাল ৷

এই কেমিক্যালের নির্গত বিষাক্ত পানিতে শুধু বনজ, পানিজ সম্পদই বিনষ্ট হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীও ৷ যারা শহরের প্রাণকেন্দ্রে আর শহরের আশেপাশে বসবাস করছে তারা সবাই ৷ ১৯৮৭-৮৮ সালে জাপানের তত্ত্বাবধানে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক তৈরি করা সুবিশাল পানি শোধনাগারেও এই বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি বিশুদ্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছে ৷ পর্যাপ্ত পরিমান বিশুদ্ধকরণ উপকরণ ব্যবহার করেও পানির দুর্গন্ধ দূর করতে পারে না। শোধিত পানিতেও সেই বিষাক্ত কেমিক্যালের নির্গত পানির দুর্গন্ধ থেকেই যায় ৷  পানি পান করার সময় মনে হয় যেন শীতলক্ষ্যার অপরিশোধিত বিষাক্ত পানিই পান করছি ৷ এই দুর্গতির কারণে বর্তমানে বহু বাড়ির মালিকগণ তাঁদের বাড়িতে টিউবওয়েল (যাতাকল) এর ব্যবস্থা করে ফেলেছে জীবনধারণের জন্য ৷ এখন কথা হলো যাদের টাকা আছে তাঁরা হয়তো টিউবওয়েল ((যাতাকল) বসিয়েছে, বা মিনারেল ওয়াটার বোতল কিনে দিন কাটাচ্ছে দিব্বি আরাম আয়েশে ৷ আর যাদের অর্থকরী নেই, তারা কী করবে? তারা এই বিষাক্ত পানি পান করেই রোগে-শোকে ভুগে মরতে বসবে পরিবার পরিজন নিয়ে ৷
img_20161102_1257222

ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক জাপানের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা পানি শোধনাগার ৷

এই পরিস্থিতি বহুদিনের। এই সমস্যা নতুন কোন সমস্যা নয় ৷ শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে যখন হাতেগোনা কয়েকটা নিট গার্মেন্টস গড়ে উঠেছিল তখন এমন অবস্থা ছিল না ৷ আস্তেআস্তে যখন শীতললক্ষ্যার দু’পাড়ে সমান তালে এই নিট গার্মেন্টস গড়ে উঠতে লাগলো তখন থেকেই শুরু হলো শীতলক্ষ্যার মরণব্যধি আর আমাদের এই দুরাবস্থা ৷ প্রশাসন থেকেও এর কোন প্রতিকার নেই, জবাবদিহিতাও নেই। এর ধারাবাহিতায় চলছে অনায়াসে বর্তমান গার্মেন্টসগুলি। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু না করেই গার্মেন্টস ডাইং এর নিচ দিয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় খালবিলে এই বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি ফেলানো চলছে৷ অথচ একটা কারখানা বা একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করার আগে থেকেই সরকারের নীতিমালা গ্রহণ করতে হয়, তারপরে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ আরম্ভ করে ৷ আমি মনে করি সেসব নীতিমালার মধ্যে এই বিষাক্ত কেমিক্যালের নির্গত পানির ব্যাপারেও একটা নীতিমালা রাখা হয়েছে, যেটা  পানি শোধনাগার (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট)৷ এই নীতিমালায় আছে, জনসাধারণে স্বার্থে ডাইং এর বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি শোধন করেই তা খালবিলে বা নদীতে ছাড়তে হবে, অন্যথায় হবে জেল জরিমানা ৷
img_20161028_124800

সূক্ষ্ম মৌসুমে শীতলক্ষ্যার দৃশ্য ৷

কিন্তু না, সরকারের কোন নীতিমালাই মানছে না বর্তমান নিট গার্মেন্টস বা ডাইং মালিকগণ, প্রশাসনও নিশ্চুপ, না দেখার ভান করে বসে আছে ৷ প্রশাসনের এই না দেখার ভানে মরছে শীতলক্ষ্যা নদী, মরছি আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী ৷ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছি আমরা ও আমাদের আগামীর প্রজন্মরা ৷ অনতিবিলম্বে প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ যদি নিট গার্মেন্টস ও ডাইং এর বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি শোধনের ওপর নজর না দেয়, তবে আমাদের আগামীর প্রজন্মরা হয়তো এই শীতলক্ষ্যার পঁচা পানি পান করে, কোন একসময় মেধাহীন আর বুদ্ধিহীন হয়ে পরবে নিশ্চিত ৷ এই অবস্থা থেকে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী বাঁচতে চাই, বন্ধ হোক নিট গার্মেন্টস ও ডাইং ইন্ডাষ্ট্রিজ এর বিষাক্ত কেমিক্যালের নির্গত পানি। সুস্থ থাকুক সবাই ৷ বাঁচুক পানিজ সম্পদ। বাঁচুক মানুষ ৷

ইতিমধ্যে কীভাবে খালবিল দিয়ে এই বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি নির্গত হচ্ছে, তার একটি সচিত্র ভিডিও আপলোড করা হয়েছে ৷ যা দেখলে যে কোন লোকের শরীর শিউরে উঠবে৷