ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

আমি ১৯৭১ দেখেছি, আমি সেই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধও দেখেছি, আমি স্বাধীনতাও দেখেছি। আমি আমার মা-বাবার মুখে শুনেছি তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার কথা। এখনো মনে পড়ে সেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের কথা।

img_20161210_1132292

১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালী নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।

আমি তখন ৮ বছরের এক নাবালক শিশু। বাবা আর আমার বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ, বাবা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ বর্তমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইল চিত্তরঞ্জন কটন মিলে, আর বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন লক্ষণখোলা আদর্শ কটন মিলে। আমার মা আর তিন বোন সহ থাকতাম নোয়াখালী বজরা রেলস্টেশনের পশ্চিমে মাহাতাবপুর গ্রামে, আমাদের বাড়িতে। তখনকার সময় ঘরে-ঘরে এত রেডিও টেলিভিশন ছিলো না, পুরো একটা গ্রামে বিত্তশালী কোন ব্যক্তির বাড়িতে হয়তো একটা রেডিও থাকতো, টেলিভিশন তো ছিল স্বপ্নের সোনার হরিণ!

আমাদের মাহাতাবপুর গ্রামে একজনের বাড়িতে ছিল ওয়ান বেন্ডের একটা রেডিও, বাড়িটার নাম ছিল বড়বাড়ি। খবরের সময় হলে সারা গ্রামের মানুষ ওই বড়বাড়িতে ভীড় জমাতো খবর শোনার জন্য। মায়ের সাথে আমি আর আমার তিন বড়দিদিও যেতাম খবর শুনতে। শুনতাম পঁচিশে মার্চের কাল রাতের ভয়াবহ ঘটনার কথা, শুনতাম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বাঙালী পুলিশ হত্যা ও গ্রেফতারের কথা। লোক মুখে শুনতাম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সহ দেশের বহু জেলা শহরে জ্বালাও পোড়াও এর কথা। আমার অভাগিনী মায়ের চোখে তখন ঘুম ছিল না, উদরে ক্ষুধা ছিল না, মুখে হাসি ছিল না, কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখ নদীতে আর জল ছিল না।

স্বামী আর সন্তানের জন্য মায়ের কান্নাকাটি আর থামছিল না, পাগলের মত হয়ে আমার মা জননী শুধুই ঘুরে বেড়াতেন স্বামী সন্তানের খবর জানার জন্য। এদিকে ঘরে খাবার নেই, টাক-পয়সা কিছু নেই, তখনকার সময় গ্রামের স্বচ্ছল স্বাবলম্বী গৃহস্থদের বাড়িতে গিয়েও দুই কৌটা চাউল হাওলাৎ পাওয়া যেত না, তাদের কাছে থাকলেও দিত না, কারণ আমার বাবা আর বড়দার কোন খোঁজখবর নেই তাই। এভাবে না খেয়ে, অনাহারের মধ্যেই দিন কাটতে লাগলো আমাদের।

যুদ্ধ শুরু হবার পর কেটে গেল দুই মাস। ১৯৭১ সালের মে মাসের দিকে আমার বাবা সহকর্মীদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে, বহু কষ্ট করে বাড়িতে আসে। বড়দা শরণার্থী হয়ে চলে গেল ভারতে। তবু বাবার আগমনে মায়ের কান্নাকাটি দূর হলো, স্বামীকে পেয়ে সন্তান হারা ব্যথা বুকে চাঁপা দিয়ে এই হট্টগোলের মাঝেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো।

বহু কষ্ট করে এক পাড়াপড়শী মুসলমান ব্যক্তির কাছে বাড়ি বন্ধক রেখে কিছু টাকা নিয়ে মুড়ির ব্যবসা শুরু করলো আমাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য। এর মধ্যে আমার জেঠামশাই বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বসালো গ্রামটাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। আমার জেঠামশাই ছিলেন তৎকালী পাকিস্তান সরকারের রিটায়ার্ড পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য। আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যার পর বসতো মুক্তিবাহিনীদের পরিকল্পনার আসর, কোথায় কীভাবে কী করবে? মুক্তিবাহিনীরা এসব নিয়ে শলাপরামর্শ করতেন আমার জেঠামশাই’র সাথে। আমি তখন খুবই ছোট, সেসব শলাপরামর্শের সময় আমি বসে থাকতাম বাড়ির উঠানের মাঝখানে, সবার সম্মুখে।

শলাপরামর্শ চলাকালীন সময়ে মা-জেঠীমা লাল চা করতো মুক্তিবাহিনীদের জন্য। আমি পরিবেশন করতাম তাদের মাঝে।  মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা চা পান করতেন, আর জেঠামশাইর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। এভাবে চলতে থাকলো।

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে আর লক্ষ মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অবশেষে বিজয় অর্জিত হলো, পাকহানাদার বাহিনী পরাস্ত হলো, আল-বদর রাজাকার বাহিনীর শত কুচক্র শলাপরামর্শ ধূলিসাৎ হলো, বাংলাদেশ নামে একটি দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেলো, বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটলো সারাবিশ্বে।

আমরা বিজয় দেখেছি, বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা স্বাধীনতা দেখেছি, আজো স্বাধীনতা পাইনি। আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি,  মুক্তিযোদ্ধাদের আজো সম্মান করতে শিখিনি! আমরা একটি বাংলাদেশ পেয়েছি,  আজো বাংলাদেশি হতে পারিনি! আমি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি, আজো রাষ্ট্রকে ভালোবাসতে শিখিনি!