ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

সময়টা তখন ১৯৭৪ সাল, চারদিকে শুধু অভাব। থাকি নারায়াণগঞ্জ বন্দর থানাধীন আদর্শ কটন মিলস্‌ এ। আমি তখন পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র, স্কুল ছুটির পর খাওয়া-দাওয়া করে সোজা চলে যেতাম মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে। তখন ঘরে ঘরে এত টেলিভিসন ছিল না, এত মোবাইল ফোন ছিল না। একটা ওয়ান ব্যান্ডের রেডিও সোনার হরিণ। যার কাছে একটা রেডিও ছিল, সে ছিল সবার আদরের নন্দন। তার সমাদর সর্বত্র সবজাগায়, রেডিও থাকতো আমাদের বয়সের বড় যারা তাদের কছে। আদর্শ কটন মিলের এরিয়ার মধ্যে মাত্র একজনের কাছে ছিল এই রেডিও।

মাঠের এক কোনে বসে রেডিও চালু করে দিতো আমরা সমবয়সী সবাই গোল করে বসে সেই রেডিওর গান শুনতাম। গান শুনতাম আর মনে মনে ভাবতাম, যদি একটা রেডিও কিনতে পারতাম কি মজা না হতো! তখন শুধু স্বপ্নই দেখতাম, আর সারারাত ভাবতাম একদিন বড় হয়ে একটা রেডিও কিনবো। রেডিও কিনে গান শুনবো, আমিও শুনবো মাকে শুনাবো, দাদাকে আর দিদিকেও শুনাবো রেডিওর গান। তারপর আসলো টেলিভিশন, পুরো লক্ষণখোলা এলাকায় আদর্শ কটন মিলেই ছিল একটা সাদাকালো টেলিভিশন। এই টেলিভিশন দেখা নিয়ে কতনা মারামারি হতো তা লিখে শেষ করা যাবে না, নিজেও মার খেয়েছি বিস্তর।

img_20161225_1130262
এমনি করে দিন-মাস-বছর যেতে যেতে একদিন বড় হলাম, নিজেও কয়েকটা রেডিও কিনে নষ্টও করে ফেলেছি। ১৯৮৬ সালে বিয়ে করেছি, ১৯৮৯ সালে এক মেয়ে হলো, তারপর ১৯৯১ সালে এক ছেলে জন্ম নিল, ছেলে ইন্টার পাস করেই তার মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তখনকার সময়ের একটা সিটিসেল হুয়াইহু মোবাইল কিনে নিলো। ছেলের হাতে মোবাইল দেখে কিছু না বলতে পারলেও খুব লজ্জায় পরেছিলাম তখন। কারণ; লোকে বলবে বাপের নাই কিছু, ছেলের হাতে মোবাইল! এই ভেবে বহু কষ্ট করে ২০০৭ সালে নিজেই একটা নোকিয়া মোবাইল কিনে ফেলি। দাম মাত্র ৩৬০০ টাকা। আমার ছেলেটা ওই হুয়াইহু মোবাইল বেশিদিন ব্যবহার করে নাই, কারণ; ওটা কমদাম ছিল তাই। সে আবার নোকিয়া c3 মোবাইল কিনল ৯৫০০ টাকায়।

সেই মোবাইলও ছেলেটায় বেশিদিন ব্যবহার না করেই ইহকালের মায়া-মমতা ত্যাগ করে পরলোক গমন করে ২০১১ সালের ২০ জুলাই। সেই মোবাইলটা দিয়েই আমার ইন্টারনেটে হাতেখড়ি। ২০১৫ সালের কোন একসময় বিডিনিউজ ব্লগে আমার প্রথম লেখা। ছেলের মোবাইলটা দিয়ে বিডিনিউজ ব্লগে বাংলা লেখায় খুব কষ্ট হতো, তাই কয়েক জনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে ২০১৫ সালের শেষ দিকে একটা সিম্ফোনি মোবাইল কিনি শুধু ব্লগে লেখার জন্য। সেই মোবাইল দিয়েও ব্লগে খুব দ্রুত লিখতে পাড়ছিলাম না, তাই আরেকটা মোবাইল কিনলাম htc দাম পড়েছিলো ২৯৯০০ টাকা। htc মোবাইলটাও বর্তমানে একরকম নষ্ট, লিখতে সমস্যা হয়। কিন্তু ব্লগে লিখার খুব ইচ্ছা আমার, যা লিখে শেষ করা যাবে না। বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম ধারকর্জ করে একটা ল্যাপটপ কিনবো বিডিনিউজ ব্লগে লেখার জন্য।

img_20161225_1143282

গত ডিসেম্বরের ৭ তারিখ রাত ৩ টায় আমাদের বিডিনিউজ ব্লগের সম্মানিত ব্লগার/লেখক সুকান্ত দাদা’র সাথে ফেসবুকে মেসেসে আলাপ হচ্ছিল, সম্মানিত সুকান্ত দাদা বলছিলেন, দাদা আমি দেশে আসছি সাথে আপনার জন্য কী আনতে পারি বলুন! আমি দাদাকে বললাম, দাদা, আমার কিছুই লাগবেনা আপনি দেশে আসুন দেখা হবে আশীর্বাদ নিবো তাই হবে দাদা, এর বেশি কিছু নয়। সম্মানিত দাদা বললেন, না দাদা বলুন আপনার শখ কী? আমি বললাম, দাদা আমার একটা শখ ছিল ল্যাপটপ এর, তা আমি সেই শখ পূরণ করে ফেলবো অচিরেই। দাদা বললেন কীভাবে? বললাম দাদা, আমি নিজে কিছু টাকা জমা করেছি আর কিছু দিয়ে পুরানো একটা ল্যাপটপ কেনার চেষ্টা করছি। দাদা বললেন তা কত টাকার মত জমিয়েছেন? বললাম তা হবে হাজার দশেক। দাদা বললেন আচ্ছা ঠিক আছে শুনলাম, তবে পুরানো জিনিস ভাল হয়না দাদা, টাকা আরও জমাতে থাকুন দেখি কী করা যায়। এই বলেই সুকান্ত দাদার সাথে কথা শেষ।

গত ২৫ ডিসেম্বর রোজ রবিবার,আমার গুরু মহাগুরু সকাল ১১টায় অফিসে এসে হাজির হল। সঙ্গে করে আনলেন একটা অমূল্য সম্পদ ল্যাপটপ! আমি বুঝতে পারিনি ওটা কি? যখন জানলাম ওটা ল্যাপটপ, আর ওটা আমার জন্যই এনেছেন তখন তো আমি খুশিতে আত্মহারা! গুরু, মহাগুরু ল্যাপটপটা আমার হাতে উঠিয়ে দিয়ে কিছু আদেশ উপদেশ দিলেন, লেখার নিয়ম বলে দিলেন, আশীর্বাদ করলেন। গুরু, মহাগুরুর আশীর্বাদ নিয়ে তাঁদের দেয়া ল্যাপটপ দিয়ে আজ প্রথম লেখা আমার বিডিনিউজ ব্লগে দিলাম।

এটা কোন লেখা নয়। এটা আমার দেবতা “ত্রিনাথ” দেবের আশীর্বাদ নেওয়া। সাথে বিডিনিউজ ব্লগের সবার আশীর্বাদ কামনা করছি। আমি প্রার্থণা করছি, এই ল্যাপটপ এর লেখার প্রতিটি অক্ষর যেন হয় আমার গুরু, মহাগুরুর চোখের জ্যোতি।