ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমি যখন কিশোর বয়সে, তখন আমার চেয়ে বয়সে যারা বড়, তাঁরা যখন বিয়ে করতেন, তখন তাঁদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেতাম। তাঁদের বিয়ের বরযাত্রী সহ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিমন্ত্রনের আওতার মধ্যেই থাকতাম তাঁদের সাথে। তখন নিজে একদিন বিয়ে করবো বা করতে হবে সেই চিন্তাও করতাম, বিয়ে কোথায় করবো, কেমন মেয়েকে বিয়ে করবো এমন চিন্তাটাই বেশি করতাম। ভাবতাম বিয়ে যদি করতেই হয়, তবে গরীবের মেয়েই বিয়ে করবো একটু সুখে থাকার জন্য, করেছিও তাই। বিয়ে করেছি ১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিক্রমপুর তালতলায় এক গরীব পরিবারের ময়েকে। বিয়ে করার দুইবছর আগে একটা গরীবের মেয়েকে ভালো লেগেছিল, কিন্তু পুরোপুরি ভাবে ভালোবাসতে পারি নাই বিধায়, শেষমেশ নিজ হাতেই ওই মেয়েকে অন্যজনের হাতে তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছিলাম। সেই মেয়েটাকে ভালো লাগার গল্পটা এর আগে বিডিনিউজ ব্লগে লিখেছিলাম, শিরোনামটা ছিল “এক বিকেলের ভালো লাগা সারাজীবনের স্মৃতি। এর দুইবছর পরেই আমি বিয়ে করেছি সেই প্রেমপিরিতি করেই। বিয়ে পরবর্তী সময়ে ভালোই ছিলাম, এখনো ভালো আছি, একজন গরীব মানুষের মেয়ে বিয়ে করে। সংসারিক, ধার্মিক, স্বামীর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা সবই আছে পরিপূর্ণ ভাবে।

বিয়ের দুই/আড়াই বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে এক মেয়ের জনক হয়ে গেলাম, আবার ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি আরেকটি পুত্র সন্তানের জনক হলাম। চাকরি করি টেক্সটাইল মিলে দেশের বিভিন্ন জেলায়, যেখানে যেখানে টেক্সটাইল মিলস্‌ আছে সেসব জায়গায়। এভাবে দিন আর বছর যেতেযেতে মেয়ে এসএসসি পাস করার পর, একসময় মেয়ে বিয়ে দিলাম সেই ফরিদপুর গোপালগঞ্জ। ছেলে কেবল এসএসসি পাস করে ইন্টারে ভর্তি হবে, ছেলেটায় ভর্তি হতে চায় ‘নারায়ণগঞ্জ কলেজে’ যেখানে ভর্তি ফি ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা, যা তখন আমার দ্বারা কোন মতেই সম্ভব ছিলো না। তবু ছেলের ইচ্ছাতো পূরণ করতেই হবে! আদরের একমাত্র সন্তান ছিল বলে ওর আবদারও ছিল অনেক, যা একবার চাইতো সেটা সে আদায় করেই ছাড়তো। সেই আবদারের মধ্যে ছিল ওর এই কলেজে ভর্তির ব্যাপারটাও, ভর্তি না করলে আর পড়বেই না। কিন্তু ভর্তির জন্য এত টাকা পাবো কোথায়? গেল কিছুদিন আগে মেয়ে বিয়ে দিয়ে একেবারে শূন্যের কোঠায়! তারমধ্যে ছেলের ভর্তির ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা। মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর নিজেরও কাজ নাই, বেকার হয়ে ঘুরছি, কোথাও কাজ জোগার করতে পারছি না। আমিও তখন বেকার, কোথাও কাজ জোগাড় করতে না পেড়ে দিনমুজুরের কাজ করি। তখন নিরুপায় হয়ে স্ত্রীর একমাত্র সম্বল একজোড়া কানের রিং বিক্রি করলাম ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা। সেই টাকা দিয়ে ছেলেকে শহরের ‘নারায়ণগঞ্জ কলেজে ভর্তি করলাম, ছেলেও মহাখুশি, কিন্তু কলেজের পোষাক? তাতেও লাগবে ৭/৮ ‘শ’ টাকা। সেই পোশাকও দিলাম ছেলের মায়ের একমাসের বেতনের টাকা দিয়ে। কলেজে আসা-যাওয়া যথারীতি ঠিকঠাক ভাবেই হছে, গোদনাইল থেকে নারায়ণগঞ্জ আসা-যাওয়ার জন্য ভারা দিতাম ১০/১৫ টাকা, কোনদিন আরও বেশি।

ছয়মাস ক্লাস করার পর ছেলের আর ভালো লাগেনা কলেজে যেতে, আবার সে যেখান থেকে এসএসসি পাস করেছে ঠিক সেই কলেজে পড়াশোনা করবে, এটাও এখন ছেলের ইচ্ছ। আগের কলেজ ছিল গোদনাইল পাঠানটুলী ভকেশনাল টেকনিকাল স্কুল এন্ড কলেজ। কি আর করা, করলাম আবার সেখানে ভর্তি, আশা ছিল এয়ার কন্ডিশনার এন্ড রিফ্রিজারেটর ডিপ্লোমা ইন একটা সার্টিফিকেট হয়তো ছেলেটায় পাবে। কিন্তু তাও জুটেনি ছেলের ভাগ্যে, ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর মাসখানেক আগেই ছেলেটা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে, ঢাকায় একটা দোকানে চাকরি নিয়ে কাজ শুরু করে দিল, যা আমার ছিলো একেবারেই অজানা। আমি তখন নরসিংদী মাধবদীতে একটা টেক্সটাইল মিলে চাকরি করি, নারায়াণগঞ্জ আসি মাসে একবার শুধু একদিনের জন্য। লেখাপড়া ছেড়ে ঢাকার দোকানে চাকরি করার দুইমাস পর আমি জানতে পারলাম যে, ছেলে আমার লেখাপড়া ছেড়ে এক দোকানের কর্মচারী সেজে বসে আছে ভাগ্যবঞ্চিত এক জীবনের সিংহাসনে। ব্যাপারটা যখন জানতে পারলাম, তখন আমি রাগে প্রায় তিনমাস নারায়ণগঞ্জ আসিনি, গিন্নির বহু কান্নাকাটির পর মনের দুঃখ মনে রেখে সংসারের টানে আবার নারায়ণগঞ্জ আসি।

নারায়ণগঞ্জ এসে দেখি, সেই চাকরিও ছেলেটা ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে সে বেকার হয়ে ঘুরছে। এর কিছুদিন পর ২০১১ সালে মহল্লায় গড়ে ওঠা একটা নীট গার্মেন্টস্‌ এ চাকরির ব্যবস্থা করে ফেলে ছেলে নিজেনিজে-ই, ডিউটিও করছে ঠিকঠাক মত। ছেলের ডিউটির নমুনা দেখে ভাবলাম, ছেলেটা যদি এভাবে ঠিকঠাক মত চাকরিটা করে, তবে আগামী দুই-তিন বছর পর ছেলেটাকে বিয়ে করাব জাঁকজমক ভাবে। কিন্তু হাঁয়! ক’দিন যেতে না যেতেই ভেঙ্গে পড়ল আমার সেই স্বপ্নে গড়া কাঁচের স্বর্গ। মনে পড়ে সেই দিনগুলির কথা, মনে পড়ে আমার সেই হতভাগা ছেলের কথা। সেই ২০১১ সালের ২০ জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত একটি রাতও আমি ঘুমাতে পারছিনা। রাতে ঘুমাতে গেলেই শুধু ওকেই দেখি চোখের সামনে, যেন সামনে দাঁড়িয়ে কত কিছু আবদার করছে আমার কাছে। ও যেন বলছে, বাবা আমাকে এটা দাও, বাবা আমাকে ওটা দাও, আরও কত কী? তা আর লিখে শেষ করা যাবে না। লিখে শেষ করা যাবে না সেদিনের ঘটনাবলি, তবু কিছু লিখে যেতে চাই, কিছু লেখা স্মৃতি করে রেখে যেতে চাই বিডিনিউজ ২৪ ডট কম ব্লগের পাতায়। কারণ; এই বিডিনিউজ ২৪ ডট কম ব্লগ হলো আমার আত্মা, প্রিয় ব্লগার হলো আমার ভাই/বোন। এই ব্লগ থেকে আমি অনেক পেয়েছি, সেই পাওয়া আমার কাছে আকাশ ছোঁয়া, তাই আমার জীবনের সবকিছুই আমার প্রিয় সহ-ব্লগারদের জানাতে চাই।

সময়টা তখন ২০১১ সাল, আমার সংসারটা তখন অভাবের মধ্যেই ছিল। যাই হোক সেদিনের কথায় আসা যাক, সেদিন ছিল ২০জুলাই ২০১১ইং রোজ বুধবার। প্রতিদিনের মত ছেলেটা রাতের ডিউটি শেষ করে সকাল ৭টায় বাসায় ফিরেই ওর মায়ের কাছে ১০০ (একশত) চেয়েছিল, কী যেন একটা দরকারে। দুর্ভাগ্য, সেদিন আমাদের, স্বামী-স্ত্রী দুজনের কাছে ওইদিন পঞ্চাশটা টাকাও ছিল না যে, ছেলেটাকে দিবো। ছেলের মা’ ওইদিন পাড়ার অনেকের কাছেই গিয়েছিল ১০০(একশত) টাকা ধার ও পাওনা টাকার জন্য, কিন্তু কোথাও পায় নাই ১০০ (একশত) টাকা । আমিও দৌঁড়ে গিয়ে বাসার সামনে একটা দোকানে গিয়ে ১০০ (একশত) টাকা ধার চেয়েছিলাম, কিন্তু পাই নাই, ছেলেকে টাকা না দিয়েই আমরা দুজনে কাজে চলে গেলাম। আমি তখন কাজ করি ছোট একটা টেক্সটাইল মিলে, স্ত্রী কাজ করে বাসা থেকে একটু দূরে একটা ছোট গার্মেন্টস এ। দুপুর ১টা বাজে আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের-ই লান্সের সময়, স্ত্রীর কাজের জায়গাটা একটু দূরে বিধায় দুপুরের খাবার সে সাথে করেই নিয়ে যায়, দুপুরে আর আসেনা গার্মেন্টস্এ লান্স করে। লান্সের সময় হওয়ার আগেই আমি প্রতিদিন বাসায় ফিরি, লান্স করার জন্য। কিন্তু ভগবানের কি লীলা, সেদিন মিলে একটা জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সময় মত আর বাসায় ফেরা হলো না, ফিরেছি লান্সের সময় হওয়ার অনেক পর।

মিল থেকে দুপুর দেড়টায় বাহির হলাম লান্স করার উদ্দেশ্যে, আমার বাসা চিত্তরঞ্জন কটন মিলের আটপাড়া স্টাফ কোয়ার্টারে। বাসার একটু দূরে থাকতেই আমার ছেলের এক বন্ধু আমার সামনে এসেই বলল, কাকা এত দেরি করে ফিরলেন? বললাম মিলে কাজের খুব চাপ ছিল তাই দেরিতে ফিরলাম। কেন রে! কি হয়েছে? ছেলেটায় কিছুই বলছেনা আমার সাথে সাথে হাঁটছে। বাসার সামনে এসে দেখি আমার বাসার সামনে অনেক লোক, নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো বহু লোক। আমি এত লোক দেখে ভাবলাম, আমার ছেলেটা হয়তো কারো সাথে ঝগড়া করেছে, যার কারণে এত লোকের ভিড়। কিন্তু না, আমার ধারণাটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল, ঝগড়াঝাঁটি কিছুই হয়নি। ছেলেটা ওর মায়ের কাপর গলায় পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের এক কোণে, ওর পায়ের আঙ্গুলগুলো ঘরের মেঝেতে ঠেকানো। সেই দৃশ্যটা দেখলাম ঘরের বাহির থেকে, দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনদের ফাঁক দিয়ে। তখন দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন আমাকে দেখে সরে দাঁড়ায়, আমি হাতে থাকা ছাতা ফেলে দিয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরে প্রবেশ করি। ঘরের ভেতরে গিয়ে ছেলেকে আমার বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলছি, কেউ একটু আসেন আমি আমার ছেলেকে এখান থেকে নামাবো। কিন্তু কেউ আমার ডাক শুনছে না, সবাই শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আমি একা আমার ছেলেকে বাঁধ থেকে নামাতে পারছিনা, কেউ এসে আমাকে একটু সাহায্যও করছেনা, শুধু দেখছে আমি কি করছি। একটু পরে ছেলের এক বন্ধুর মা এসে আমাকে সাহায্য করলেন। ছেলেকে নামিয়ে ঘরের মেঝেতে শোয়ালাম, হাত-পা দেখছি, হাতের শিরা দেখছি, দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের বলছি, একটা ডাক্তার ডাকতে। কেউ যাচ্ছে না, সবাই যেন পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। একজনকে বললাম রতন ডাক্তারকে ডাকতে, রতন ডাক্তার এই আটপাড়াতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে অনেক বছর ধরে। এই ডাক্তারের সাথে আমার ছেলেরও খুব বন্ধুত্ব ছিল, ডাকতো রতন দা রতন দা বলে।

আমি ছেলেকে কোলে নিয়ে কাঁদছি আর ডাক্তার ডাক্তার বলে ডাকছি, এমন সময় সেই রতন ডাক্তার এসে হাজির হলো আমার ঘরে। আমি সেই ডাক্তারকে বললাম, মামা দেখেন একটু দেখেন, আমার ছেলের কি হয়েছে? ও কথা বলছেনা কেন? আপনি একটু দেখেন মামা। ডাক্তার মামা ছেলের হাতের শিরা চাপ দিয়ে ধরে দেখলেন, ক্ষণিক পর বললেন মামা ওতো নেই। সাথে সাথে আমার স্ত্রীকে ফোন করলাম, তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় এসো তোমার ছেলেকে দেখে যাও। স্ত্রী বারবার জানতে চাইছে কি হয়েছে বলো, তুমি কাঁদছো কেন? বললাম তুমি আস তাড়াতাড়ি করে, তোমার ছেলেকে একটু আদর করে যাও। স্ত্রী তখন ওই গার্মেন্টস্-ই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। গার্মেন্টস্ এর লোকেরা আমার স্ত্রীকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে এলে শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। এমন সময় মিল থেকে হুকুম এলো, থানায় খবর দেয়া হয়েছে, লাশ যেন কোন অবস্থায়-ই শ্মশাণে না নেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর-ই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ আসল, পুলিশ এসেই আমার ঘরে ঢুকে লাশ দেখল, আমাকে জিজ্ঞেস করল যে, লাশ বাঁধ থেকে নামিয়েছে কে? আমি বললাম স্যার আমি নামিয়েছি। পুলিশ আমাকে আবার বলল, আপনি তো জানেন না, এসব লাশ নামানো ঠিক নয়, যা করার পুলিশেই করে থাকে। আমি পুলিশকে বললাম স্যার, আমার জায়গায় যদি এখন আপনি হতেন? তখন আপনি কী করতেন? তখন সম্মানিত পুলিশ অফিসার আর কোন কথা আমাকে বলেনি, শুধু কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল আপনার কাউকে সন্দেহ হয় কিনা? আমি বললাম না স্যার, আমারতো এমন কোন শত্রু নেই যে, আমি কাউকে সন্দেহ করবো। এরপর পুলিশ অফিসার পাড়াপড়শিদের অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছে, তাঁরাও উত্তর দিয়েছে।

খবর পেয়ে আমার আরো আত্মীয়স্বজন এলো, মহল্লার নেতা, ওয়ার্ড কমিশনার এলো। পুরো গোদনাইল এলাকা জানাজানি হয়ে গেল যে, নিতাই বাবুর ছেলে মারা গেছে, খবর পেয়ে হাজার খানেক মানুষ জড়ো হোয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। পুলিশ এখন লাশ নিয়ে যাবে পোস্টমর্টেমের জন্য। আমি আর আমার স্ত্রী পুলিশ অফিসারের পায়ে পড়ে কেঁদেকেঁদে বললাম স্যার দয়া করে লাশ নিবেন না, আমার ছেলেটাকে কাটাছেড়া করবেন না। পুলিশ আমাদের কোন কথাই শুনছে না। তখন ওয়ার্ড মহিলা কমিশনারের পায়ে গিয়ে ধরলাম, বললাম আপা আপনি আমার ছেলেটাকে থানায় নিতে দিবেন না, থানায় নিলে আমার ছেলেটাকে কেটেছিঁড়ে কলিজা-গুদ্দা রেখে দিবে, আপনি একটু পুলিশকে বুঝিয়ে বলেন। ওয়ার্ড কমিশনার আমার কথা শুনে পুলিশকে অনুরোধ করেছে কিন্তু পুলিশ কারো কথা শুনেনি, পুলিশ অফিসার বলছে দেখুন, এটা আমার চাকরি, কোন অবস্থায়-ই লাশ রাখতে পারবেন না। আগে লাশের ময়না তদন্ত হবে, পরে লাশ আপনারা যা করার করবেন। মৃত্যুর পরও ছেলেটাকে কাটাছেড়া থেকে রক্ষা করতে পারলাম না, লাশ নিয়ে গেল সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তখন সন্ধ্যা, লাশ ময়না তদন্ত হবে পরদিন, হয়তো নারায়ণগঞ্জ, না হয় ঢাকা মেডিক্যাল। থানা থেকে রতন ডাক্তার সহ ফিরলাম বাসায়, বাসায় এসে দেখি এখনো বহু মানুষ আমার ঘরে। সবাই আমার স্ত্রীকে সান্তনা দিচ্ছে, যা হবার হয়েছে কান্নাকাটি করবেন না, সব উপরওয়ালার ইচ্ছা। কি আর করবেন। পরদিন পোস্টমর্টেম করা হলো ঢাকা মেডিক্যাল, লাশ নিয়ে বাসায় এলো বিকেল ৪টায়। সন্ধ্যার পর লাশ নিয়ে গেল নারায়নগঞ্জ শ্মশাণঘাটে লাশ দাহ করার জন্য। শ্মশাণের কাজ সেরে আসলাম রাত ৪টায়, আসতে আসতে গাড়িতে বসে শুনলাম, ছেলের ওইদিন মৃত্যুর আগের কিছু ঘটনা।

নারায়ণগঞ্জ কলেজে থাকতেই আমাদের মহল্লার এক মেয়ের সাথে আমার ছেলের ছিল মধুর সম্পর্ক, যা আমরা কেহ জানতাম না, মেয়েটাও নারায়ণগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করতো। মেয়েটা আমার ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক বজায় রেখে আরেকটা ছেলের সাথে প্রেম করতো। এটা আমার ছেলে জানার পরই আমার ছেলে নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে চলে আসে। ওইদিন আমরা কাজে যাওয়ার পরপরই ওই মেয়ের সাথে এ বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এই কথা কাটাকাটির জের ধরেই ছেলেটার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত মাথায় ঢুকে যায়, শেষ অবধি ছেলেটা মৃত্যুকেই বরণ করে নিল নিজের ইচ্ছায়। এমন খবরে অনেক মানুষ আমাকে বলেছিল মেয়েটাকে ফাঁসিয়ে দিতে, কিন্তু আমি তা করি নাই। ভাবলাম ছেলে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের জন্য। ছেলেকে যখন আর পাওয়া যাবেনা, তখন আরেকজনের মাথায় বাড়ি দিয়ে কী হবে? সব কিছুই আমার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলাম, মেনে নিলাম। শেষমেশ পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটা চেয়েছিলাম, ছেলের মৃত্যুর রহস্যটা জানার জন্য। যেভাবে আমি লাশ নামিয়েছি, সেভাবে মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। দুই পা ছিল মাটিতে লাগানো, পায়ে ছিল একটা লুঙ্গী দিয়ে বাঁধা, ঘরের দরজা জানালা ছিল খোলা।

যাই হোক, তবু কাউকে আমি ফাঁসাতে চাই নাই, এখনো চাই না, শুধু বিধাতার কাছে বলেছিলাম, হে বিধাতা আপনার কাছে আমি নালিশ করলাম যে, কেউ যদি আমাকে নিঃস্ব করে থাকে, আপনি তাকে শান্তি মত রাখবেন। আমার মত নিঃস্ব আপনি আর কাউকে করবেন না হে প্রভু, সবই আপনার ইচ্ছা, আপনি ইচ্ছা করলে আমাকেও নিয়ে যেতে পারেন। ছেলের মৃত্যু হয়েছে আজ সাড়ে পাঁচবছর, এর মধ্যে বহুকিছু দেখেছি, বহুকিছু বুঝতেও পেরেছি। বহুবার সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গিয়েছি রতন ডাক্তারকে সাথে নিয়ে, ছেলের মৃত্যুর পোস্টমর্টেমের রিপোর্টের কাগজটার জন্য, আজ না কাল, কাল না পড়শু এভাবে সাড়ে পাঁচবছর পার হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রতন ডাক্তারও মৃত্যুবরণ করেছে হোন্ডা দুর্ঘটনায়। রতন ডাক্তার মৃত্যুর পর আমি আর আমার স্ত্রী কয়েকবার গিয়েছি থানায়, এখনো পেলাম না ছেলের পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট সার্টিফিকেটখানা, আর পাবো কবে? আমার মৃত্যুর আগে কি ছেলের মৃতুর রহস্যটা জেনে যেতে পারবো? হয়তো পারবো না, তবু অপেক্ষায় আছি।