ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমি একটা সমিতির অফিসে চাকরি করে আসছি তা ৬/৭ বছর ধরে, সমিতিটা হলো, ক্ষুদ্র ঋণদান সমিতি। এখানে শুধু ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়া হয়, ব্যবসায়ী দোকানদার ছাড়া এখানে কাউকে ঋণ দেওয়া হয় না। আমার চাকরিটা হলো, সমিতির অফিস পরিচালনা করা আর দোকানে-দোকানে গিয়ে সেই ঋণের টাকা আদায় করা। আমি প্রতিদিন সকালবেলা থাকি অফিসে আর বিকালবেলা থাকি মার্কেটের দোকাকে-দোকানে; তা রাত ১০টা পর্যন্ত চলে অামার ডিউটি। সমিতির অফিস আমার বাসা থেকে একটু দূরে বিধায় সময়-সময় রিকশা চড়ে অফিসে যাই, যদি কোনো জরুরী কাজ থাকে, না হয় পায়ে হেঁটেই চলে যাই।

এই আসা-যাওয়ার পথিমধ্যেই টহলরত অবস্থায় থাকে অামাদের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তাঁরা সন্দেহ করে রাস্তায় চলাচল করা মানুষদের থামিয়ে দাঁড় করিয়ে সর্বাঙ্গ তল্লাশি চালায়। এরকম তল্লাশি করে তাঁরা কী পায় আর কী পায় না, তা জানার আমার দরকার নেই, তবে তাদের এই তল্লাশিতে প্রায় সময় আমি নিজেও পড়ে যাই আসা-যাওয়ার সময়। গত কয়েকদিন অাগে এমন এক পুলিশি তল্লাশিতে পড়েছিলাম। সেই তল্লাশিতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০মিনিট, তাও রাস্তার মাঝখানে অনেক লোকের সামনে। এত মানুষের সামনে রাস্তার মাঝখানে যখন আমাকে তল্লাশি করছে, তখন আমি মাটিকে বলেছিলাম, মাটি তুমি ফেটে দুইভাগ হও, আমি তোমার ভেতরে ঢুকে পড়ি। মাটি সেদিন আমার ডাকে সাড়া দেয় নাই, ফাঁক হয় নাই, আমি আর মাটির ভিতরে ঢুকতে পারি নাই।

02_Police_281213

সেদিন বাসা থেকে বের হয়ে পরিচিত একটা রিকশা নিয়ে রওনা ২নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলে হরিনাম সংকীর্তনে, আমি প্রতি বছরই সেখানে যাই হরিনাম সংকীর্তনের কিছু ছবি আর ভিডিও করার জন্য, সেদিনও গেয়েছিলাম সেই কারণে। সেখানে গিয়ে কিছু ছবি তুললাম আর একটা ভিডিও করলাম, যা করেছি শুধু বিডিনিউজ ব্লগে একটা পোস্ট লিখে জানানোর জন্য, করেছিও তাই। সেইদিন বিডিনিউজ ব্লগে একটা পোস্ট লিখেছি, পোস্টের শিরোনাম ছিল দুই নম্বর ঢাকেশ্বরি দেব মন্দিরে শেষ হলো ২৪ প্রহর ব্যাপী শ্রীশ্রী তারকব্রহ্ম হরিনাম মহাযজ্ঞ’

যাই হোক, ঢাকেশ্বরী মিলস্‌ থেকে ফেরার পথে একটা চা’দোকানে রিকশাওয়ালা সহ বসে এক কাপ চা’ পান করে গেলাম চিত্তরঞ্জন গুদারাঘাট। সেখানে গেলাম একটা দোকানে আমার অফিসের পাওনা টাকা আদায় করতে, এরমধ্যেই গুদারার যাত্রীগণ ঘাটের জমা দিয়ে যারযার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে কেউ রিকশায় কেউ পায়ে হেঁটে।

আমিও টাকা আদায় করে যাত্রীদের সাথে সাথে রিকশা নিয়ে সামনের দিকে আগ্রসর হচ্ছি, একটু পথ এগুতেই দেখি সিদ্ধিরগঞ্জ থানার টহল পুলিশ লেগুনা যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। এই টহল ডিউটিতে কতজন পুলিশ সদস্য ছিল তা আমার জানা নাই, তবে দেখেছি দুই-তিনজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্র কাঁধে করে। বন্দর থানাধীন চৌরাপাড়া গুদারাঘাট পার হয়ে আসতে হয় চিত্তরঞ্জন গুদারাঘাট, এই গুদারা পার হয়ে সামনে যেতেই পথিমধ্যেই পরতে হয় সাধারণ মানুষের পুলিশ হয়রানিতে। আর সেই হয়রানির শিকার সেদিন আমিও হলাম, আক্রান্ত হলাম পুলিশের বেসামাল আচরণে। মাঝে মাঝে এমন হয়রানির শিকার হয়ে থাকি, তবে সেদিনের হয়রানিটা ছিলো খুবই দুঃখজনক।

সেদিন যা হয়েছিল:

আমি রিকশায় বসে নিজের মোবাইলে ব্লগের পোস্টগুলি দেখছি আর সামনের দিকে তাকাচ্ছি, লেগুনার সামনে যেতেই ডাক পড়ল আমার।
পুলিশ- এই রিকশা রাখ! নামেন, নামেন।
-রিকশা থেকে নামলাম।
পুলিশ- কী করেন? কোথায় থেকে আসলেন? কোথায় যাবেন?
-বললাম, লক্ষ্মীনারায়ণ বাজারে একটা সমিতির অফিসে চাকরি করি।
পুলিশ-পকেটে কী? এই কথা বলতে দেরী শরীর তল্লাশি করতে আর দেরী করলো না।
-বারবার বলছি দেখুন, আমি একটা সমিতির ম্যানেজার, লক্ষ্মীনারায়ণ বাজারে আমার অফিস

পুলিশ-পরিচয়পত্র দেখান! কার্ড আছে? এসব বলছে আর আমার সমস্ত দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তল্লাশি করছে। জামার কলার, পেন্টের নিচের পায়ের মুড়িভাঙ্গা জায়গা, জ্যাকেটের কোনাকাঞ্চি সহ পায়ের মুজা পর্যন্ত তল্লাশি। এটা ঠিক রাস্তার মাঝখানে, রাস্তার এপার ওপার মানুষ চলাচল বন্ধ, অনেক মানুষ তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আর হাসছে।
-আমি আমার সমিতির আদায় করা ডায়ারি আর সাথে থাকা সমিতির পাস বই দেখালাম।

পুলিশ- দূর-রাখেন আপনের এসব, জ্যাকেট দেখি, মোবাইলের ভেতরে কী আছে? -বললাম, দেখুন কী দেখবেন দেখুন।

পুলিশ- আমার এইচটিসি মোবাইলটা নেড়েচেড়ে মোবাইলের কাভার খুলে কাভার দেখে মোবাইলটা আবার আমার কাছে দিলো। শেষমেষ পেন্টের পকেটে হাত দিয়ে আমার আমদানি করা টাকাগুলো বাহির করে তাঁরা নাক দিয়ে শুকছে, শুকে আবার টাকাগুলি আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিলো । এরপর আমার কাছে থাকা আমার কোমড়ে বাঁধা মানিব্যাগ থেকে আমার জরুরী কাগজপত্রগুলি বাহির করে সেগুলিও নাক দিয়ে শুকে দেখে, এভাবে প্রায় ৩০মিনিট ধরে তাঁরা আমাকে তল্লাশি করে, কিছু না পেয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়।

সেখান থেকে আমি আমার অফিসে এসে আমার বসকে জানালাম পুলিশের তল্লাশির ঘটনাবলি, তাঁরা আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন, এবিষয়ে তাঁরা এলাকার মাতরদের জানাবেন। এরপর আমি আর কাউকে কিছু বলি নি, হরিনাম সংকীর্তনের পোস্টখানা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। পরদিন ফোন করে আমাদের ব্লগের লেখক ‘ফারদিন ফেরদৌস’ দাদা’র কাছে ফোন করে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ জানালাম, আরো জানালাম, আমাদের ব্লগের লেখক শফিক মিতুল দাদাকে। তারা আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি তাদের পরামর্শ মোতাবেক স্থানীয় মহিলা কমিশনারকে জানালাম, তিনি আমাকে বললেন কাউন্সিলর সাহেব দূরে এক স্থানে গেছেন, আসলে ওনার সাথে পরামর্শ করে আমরা পদক্ষেপ নিবো। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা জানিনা, হয়ত নিবে না, কারণ আনি তাদের এলাকার একজন ভাড়াটিয়া গরীব মানুষ তাই।

41_Security-Check_Police_Mo

প্রতীকী ছবি

যাই হোক এ ব্যাপারে আমি আর কারো কাছে কোনো বিচারও চাই না, নালিশও দিবো না, সম্মানিত পুলিশ সদস্যরা যা করেছে সেটা তাদের কর্তব্য পালন করেছে, দেশ সুরক্ষা রাখার জন্য এটাই তাদের কাজ এবং দায়িত্ব। তবে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে যে, পুলিশ এমন তল্লাশি করে কী খোঁজে? তারা কি খোঁজে গাঁজা আর হেরোইন? যদি গাঁজা আর হেরোইন খোঁজে, তাহলে নিরীহ মানুষের কাছে কেন?

অথচ যারা এই গাঁজা-হেরোইনের ব্যবসা যারা করে তাদের ধরে না কেন? যেখান থেকে গাঁজা আসে আর হেরোইনে আসে সেখানে তল্লাশি চালায় না কেন? যেখান থেকে মাদকদ্রব্য আসে, সেই পথ বন্ধ করে দেয় না কেন? পথের পথিকরা হাটবাজারে যাওয়ার পথে, কর্মজীবী শ্রমিকরা কাজে যাওয়ার পথে তাদের তল্লাশি করে কেন?

তারা যাদের তল্লাশি করে যদি গাঁজার পুটলি পায়, যার কাছে গাঁজা বা হেরোইনের পুটলি পেয়েছে তার কাছে খবর নেয় না কেন কোত্থেকে কার কাছ থেকে এই গাঁজা বা হেরোইনের পুটুলি এনেছে? সেই গাঁজার পুটলি সহ ধরা খাওয়া লোকটা নিয়েই তো সেখানে অভিযান চালিয়ে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে পারে। তা না করে তারা রাস্তাঘাটে অযথা নিরীহ মানুষদের ধরে এমনভাবে তল্লাশি করে যেন দু-একদিনের মধ্যেই এদেশ থেকে চিরতরে মাদকমুক্ত করে ফেলবে। যদি এভাবে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষকে তল্লাশি করে দেশকে মাদক মুক্ত করতে পারে, তাহলে আমরা একটি মাদক মুক্ত দেশে সুন্দর ভাবে বসবাস করতে পারবো। এখন থেকে একটি মাদকমুক্ত দেশ পাওয়ার আশায় রইলাম।