ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

বিয়ে করার দু’বছর পরই নতুন অতিথির আগমন। আমাদের কোলজুড়ে আসে একটি মেয়ে সন্তান। মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হলো অনিতা। কিন্তু তখনও অভাব আমার পিছু ছাড়ছে না। তখন আমার বেতন ছিল মাত্র ১৭০০ টাকা। তার উপরে আবার বাসা ভাড়া, খাওয়া খরচ। তবু চলছিল আমার অভাবের সংসার, খেয়ে না খেয়ে। তখন কাজ করি নারায়ণগঞ্জের কোনও এক কাপড়ের মিলে। ছোটখাটো কাপড়ের মিলের কাজ হল সিজন কাজ। যেমন বলা হয়; সিজন আর গড়সিজন। যত্রতত্র কাপড়ের মিল থাকলে, সেই কাজের কি মূল্য থাকে? থাকে না। এমনি করে কষ্টের সাথে যুদ্ধ করে কেটে গেল বছর দু’য়েক।

আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ‘কানাই’ থাকে ভারতের কোনও এক জেলাশহরে। কানাইকে কাপড়রের মিলের কাজ আমিই শিখিয়েছিলাম। কানাই মিলের কাজ শিখে বেশিদিন দেশে থাকে নাই। কানাই কাপড়ের মিলের কাজ ছেড়ে চলে যায় ভারতে। কানাই সেখানে গিয়ে স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করে। কানাই ভারত যাওয়ার পর, ওর বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও কানাই এদেশে আর আসেনি। তখন এই যুগের মোবাইল ফোন ছিল না, ছিল চিঠি প্রেরণের দিন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল ডাক বা পোস্ট। যেটির মাধ্যমে চিঠি আদানপ্রদান করা হতো। কানাইর সাথে যোগাযোগ ছিল শুধু চিঠির মাধ্যমে, মাসে না হয়, বছরে।

আমি দিন-দিন সংসারের অবনতি দেখে বেশি বেতনে অন্য মিলে কাজ নিলাম। কাপড়ের মিলটা হল ঢাকা সদরঘাটের ওপারে। জাগার নাম কালিগঞ্জ তেলঘাট, মিলের নাম রশিদ স্লিক। বেতন মোটামুটি ভাল, হেল্পার-সহ মাসে ৫০০০ টাকা। স্ত্রী বনিতাকে নিয়ে কালিগঞ্জেই ভাড়া বাসায় থাকতাম। এখানে থাকতেই আরেক সন্তানের মা হতে চলল বনিতা। এবার আমাদের নতুন মুখ_পুত্র সন্তান। আমি রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি শুধু সংসারে একটু সুখের জন্য। কিন্তু_তারপরও সেরে ওঠতে পারছি না, অভাব যেন আমার ওপর ভড় করে আছে।

একদিন বিকালবেলা হঠাৎ এক লোক রশিদ স্লিকে এসে আমার খোঁজ করে। আমি তখন মিলের বাইরে চা-দোকানে। চা-দোকানে বসা থাকতেই, মিলের দারোয়ান আমার সামনে উপস্থিত; সাথে আগত লোকটি। লোকটিকে আমি প্রথম চিনতেই পারছিলাম না।
মিলের দারোয়ান লোকটিকে বলছে, “এইযে বাবু।”
লোকটি আমাকে দেখেই হাসছে, কিছুই বলছে না। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটি বলছে, “কি রে, কেমন আছিস?”
আমি একটু থতমত খেয়ে জবাব দিলাম, “ভালো আছি! তো-আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।”
লোকটি শুধু হাসছে, হাসতে-হাসতে আমার সামনে এসে বসল। আমার সামনে বসেই জিজ্ঞেস করছে, “মাসিমা কেমন আছে? শুনেছি তোর মেয়ে হয়েছে! ওরা কেমন আছে?”
এতক্ষণে আমার হুশ হয়েছে! আমি বলছি, “আ-রে কানাই, তু-ই! কবে আসলি? আমি-তো এতক্ষণ তোকে চিনতেই পারছিলাম না।”
কানাই বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি, আমাকে দেখে তোর একটু চিনতে সমস্যা হচ্ছে। তাই আগে পরিচয় না দিয়ে সামনে এসে বসলাম।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোর বাচ্চাকাচ্চা কয়জন? বউকে সাথে নিয়ে এসেছিস?”
প্রত্যুত্তরে কানাই বলল, “আ-রে না, আমি-তো এখনও বিয়েই করিনি, বাচ্চা আসবে কোত্থেকে?”
আমি হেসে বললাম, “বলিস কী! তুই এখনও বিয়েই করিসনি? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। সত্যি করে বল!”
কানাই উত্তর দিল, “সত্যি বলছি! আমি এখনও বিয়ে করিনি।”
আমি এবার প্রসঙ্গ পাল্টে দিয়ে বলছি, “বল কবে এসেছিস? আর তুই জলপাইগুড়িতে মাঝেমধ্যে যাছ না কি? ওখানে আমার বড়দি থাকে।”
কানাই উত্তর দিল, “এই-তো, গতকাল সকালে এসে পৌঁছেছি। আর হ্যাঁ, জলপাইগুড়িতে আমি একবার গিয়েছিলাম, তা-ও একদিনের জন্য। যদি আগে জানতাম, তোর বড়দিদি জলপাইগুড়িতে থাকে; তো-অবশ্যই দেখা করতাম।”
আমি বললাম, “জলপাইগুড়ি যাবার ১৫ দিন আগে যদি একটা চিঠি দিয়ে জানাতে পারতিস, তা হলে বলে দিতাম; আমার বড়দি’র কথা।”
আমার কথা শুনে কানাই বলল, “যাক শুনেছি যখন, আবার কোনও একদিন যাওয়া যাবে।”
আমি কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার ঠিকানা কোত্থেকে সংগ্রহ করলি?”
কানাই বলল, “মহল্লায় এসেই, আগে তোর ঠিকানাটা সংগ্রহ করেছি। তারপর থেকে তোর কথা ভীষণ মনে পড়ে যায়। তাই কোনও দিকে না গিয়ে, সোজা তোর এখানে চলে এলাম।”
আমি হেসে বললাম, “বেশ করেছিস! আজ আমার এখানেই থাকবি। আমার বাসা সামনেই, এখান থেকে ৫০ গজ দূর হবে!”

আমি চা-দোকানদারকে আরও তিন কাপ চা দিতে বললাম, কানাই বলছিল ও-চা পান করবে না। আমার চাপের মুখে পড়ে ও-আর না করতে পারেনি। দারোয়ান চাচাও সামনে আছে, হয়ত একটু চায়ের জন্যই উনি অপেক্ষা করছিলেন। তিন কাপ চায়ের কথা শুনে এবার সামনে এসেই বসলেন। দারোয়ান চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “বাবু, লোকটি আপনার কী হয়?”
আমি বললাম, “আমার ছোট ভাই, ভারত থেকে এসেছে চাচা।”
দারোয়ান চাচা দাঁত বিহীন মুখে হাসি দিয়ে বললেন, “আমি ওনার কথা শুনেই বুঝতে পেরেছি, উনি এই দেশের না। কতো সুন্দর ভাষা! এই সুন্দর ভাষা জীবনেও শুনি নাই, বাবু।”

হোটেল-বয় চা এনে দিলেন, তিনজনে চা পান করলাম। দারোয়ান চাচার সিগারেটে অভ্যাস আছে, তা আমি আগেই জানি। তাই দারোয়ান চাচাকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে বললাম, “চাচা, এটা দিয়ে আপনি সাদা বাঁশি কিনে নিবেন।”
দারোয়ান চাচার বুঝতে আর অসুবিধা হল না যে, সাদা বাঁশি কী এবং কাকে বলে?
দারোয়ান চাচা পাঁচ টাকার কয়েনখানা নিয়ে হোটেল ত্যাগ করলেন। দারোয়ান চাচা চলে যাবার পর, কানাই আমাকে জিজ্ঞেস করল, “সাদা বাঁশি কী রে?”
আমি উত্তর দিলাম, “সিগারেট বুঝলি_সিগারেট।”
কানাই, “ওহ! আচ্ছা এবার বুঝেছি।”
আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম, কানাইকে বললাম, “চল মিলে যাই। মিলটা তোকে দেখিয়ে যাব বাসায়। বাসায় গেলে বাচ্চার মা খুব খুশি হবে। কতদিন পর তুই এলি! তোকে দেখামাত্রই চমকে উঠবে।”
কানাই বলল, “তাহলে যাওয়া যাক! আগে মিলে না বাসায়?”
আমি বললাম, “আগে মিলে যেতে হবে, মাস্টার বাবু থাকলে ওনার কাছে বলেকয়ে যাব।”

আমি হোটের চায়ের বিল দিয়ে, কানাইকে নিয়ে মিলে গেলাম। মিলে তখনও মাস্টার বাবু আসেনি, দায়িত্বে আছে ম্যানেজার। কানাই পুরো মিলটা ঘুরেফিরে দেখল। দেখা শেষে বলল, “চল এবার।”

আমি ম্যানেজারকে বলে কানাইকে নিয়ে বাসায় রওনা দিললাম। যেই বাড়িতে আমি ভাড়া থাকি, সেই বাড়ির গেইটের সামনে আমার স্ত্রী বনিতা দাঁড়িয়ে আছে। তার কোলে ছিল ছোট ছালেটি, যেটি কয়েক মাস আগে পৃথিবীর আলো দেখেছে। বনিতা কানাইকে দেখামাত্র চিনে ফেলেছে।

বনিতা জোর গলায়ই বলে ওঠল, “আ-রে কানাইদা, কেমন আছেন? কবে আসলেন? আগে জানান নাই কেন?”
কানাই হেসে বলল, “জানাই নাই তাতে কী হয়েছে বৌদি? খোঁজ নিয়ে তো চলে আসলাম।”
বনিতা বলল, “আসেন, গরিবের বাসায়।”
কানাই বলল, “আমরা সবাই গরিব বৌদি, বড়লোক আবার কে?”

কানাই-সহ সবাই বাসার ভেতরে গেলাম। আমি কোনোরকমভাবে ছোট একটা বাসায় থাকি। যেই বেতন পাই, তাতে হেল্পার-সহ সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। শুধু হেল্পার, সংসার কেন? সাথে দু’টি বাচ্চাও আছে। ওদের জন্য দুধ আর ঔষধে কী কম খরচ হয়? বুড়োদের চেয়ে বেশি খরচ হয় শিশুদের খরচ। তাই খুব কষ্টের মধ্যেই আমার সংসার চলছে। কানাই সংসারের সব বিত্তান্ত আমার স্ত্রীর বনিতার কাছ থেকে শুনল। বাসার অবস্থা দেখে কানাই বুঝতে পেরেছে, আমি কষ্টে আছি। কানাইকে চা-বিস্কুট দিয়ে রাতের খাবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, আমার স্ত্রী।
কানাই সেটা টের পেয়ে বলল, “বৌদি কষ্ট করে কিছু করার দরকার নাই, আমাকে নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে। মায়ের কাছে বলে আসিনি।”
কানাইর কথা শুনে বনিতা বলল, “তা কী হয় দাদা? এতদিন পরে এলেন, অথচ কিছু খাবেন না, তা হয় না। অন্তত রাতের খাবারটা সেরেই যেতে হবে।”
কানাই বলল, “না বৌদি আজ নয়, অন্যদিন আবার আসব। সে-দিন সবাই মিলে-মিশে দুপুরে একসাথে খাব। আর হ্যাঁ, আমি ভারতে থাকি, ওখানে কাপড়ের মিলের অভাব নাই। আমার ইচ্ছা, ও-কে আমার সাথে ভারতে নিয়ে যাব। ও-ওখানে মাসেক ছ’মাস থাকলেই, একটা লাইন করে নিতে পারবে। তার জন্য তোমাকে মাসেক ছ’মাস একটু কষ্ট করতে হবে।”
কানাইর কথা শুনে বনিতা বলল, “কানাইদা, কষ্টে আছি সেই বিয়ের পর থেকেই। আপনি যখন বলছেন, তাতে না হয় আর একটু কষ্টই করি!”
বনিতার কথা শুনে কানাই বলল, “হ্যাঁ বৌদি, একবার একটু কষ্ট করলেই হল। এরপর সুখের মুখ দেখতে পাবে। তবে এবার এসেছি যখন, ওকে আমি সাথে নিয়েই যাব। তুমি ওকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলো, আমি আর ১৫ দিন আছি।”

এই কথা বলেই কানাই, আমার বাসা থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় নারায়ণগঞ্জ।
আমি আমার স্ত্রী বনিতাকে বললাম, “কানাই যে ভারত যাওয়ার কথা বলে গেল, এখন তোমার অভিমত কী?”
আমার স্ত্রী বলল, “তুমি যদি ভারত যাও, তবে-তো চাকরি, বাসা দুটোই ছাড়তে হবে।”
আমি বললাম, হ্যাঁ তা-তো ছাড়তেই হবে, তুমি মাসেক ছ’মাসের জন্য বাপের বাড়িতে থাকবে। ওখানে একটা ব্যবস্থা করে নিতে আমার বেশ একটা সময় লাগবে না। আমি মাসেক তিন-মাস পর এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”

অবলা নারী স্বামীর কথায় বিশ্বাসী, তাই স্বামীর কথায় অমত করেনি। স্বামী যে-ভাবে বলছে, তা-ই মেনে নিচ্ছে। কথা পাকাপাকি হয়ে গেল, চলছে বাসা ছড়ার প্রস্তুতি আর চাকরি ছাড়ার ঘোষণা। যেই কথা সেই কাজ, এখন শুধু ভারত যাবার পালা। কাজের অবসরে নিয়মিত কানাইর সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছি। পাসপোর্ট নাই, কানাই বলেছে সমস্যা হবে না। কানাইও পাসপোর্ট ছাড়াই দেশে এসেছে, কোনও সমস্যা হয় নাই। কানাইর সাথে ওর বিয়ের উপযুক্ত দুই বোনও যাবে। কারণ; এখানে ওদের বাবা নাই, একটা ভাই আছে; সে-ও পরের চাকরি করে খায়। তাই দুই বোনকে সাথে নিয়ে যাবে, বিয়ে-সাদি ভারতেই দিবে। ওখানে বাংলাদেশী মেয়েদের জন্য বরের অভাব হয় না, যা কানাইর মুখের কথা।

এদিকে কানাইর মা-বোন যেই মহল্লায় থাকে, সেখানকার এক লোকের বাড়ি আছে ভারতে। তা শুধু জানত মহল্লার লোক আর কানাই; জানতাম না আমি। অথচ ওই লোকটাকে আমি ভালো করেই চিনি ও জানি। ভারতে ওই লোকটার বাড়ি আছে, কিন্তু_বাড়ি পাহারা দেবার মতো লোক নাই। কানাই সেই লোকের সাথে আলাপ করল, আমার কথা। আমার কথা শুনে বাড়ির মালিক সাথে-সাথে রাজি হয়ে যায়। কারণ; আমাকে লোকটির স্ত্রীও ভালো করে চিনে।

সেই সংবাদ নিয়ে এক ফাঁকে কানাই আমার কাছে আসে।
আমার কাছে এসে কানাই বলল, “শুন, রতন চক্রবর্তীকে-তো ভালো করে চিনিস। তার একটা বাড়ি আছে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশপরগনা জেলার ফুলিয়ায়। সেখানে অনেক টেক্সটাইল মিল আছে, তা মানে প্রতি ঘরে-ঘরেই তাঁত। আমি রতনদা’র সাথে কথা পাকাপাকি করে এসেছি, তুই তার বাড়িতেই থাকবি। তার বাড়িতে থেকে খেয়ে একটা কাজের ব্যবস্থা করে নিবি।”
আমি বললাম, “তুই যেটা ভালো মনে করিস তাই হবে, তোর মতের বাইরে আমার কোনও মত নাই।”
কানাই বলল, “তুই আমার শুধু বন্ধু না, ভাইয়ের চেয়েও অনেক বেশি। আমি চাইব না যে, তোর কোনও সমস্যা হোক। তুই-তো ভালো কাজ জানিস, সেখানে গেলে তুই হয়ে যাবি টেক্সটাইলের গুরু। ভালো একটা মিলে লাগিয়ে দিতে পারলে, তোর নাগাল আর পায় কে? তখন রতন চক্রবর্তীর বাড়িতে থাকলে_থাকবি, না-থাকলে নাই।”
আমি কানাইর কথা শুনে বললাম, “ঠিক আছে তা-ই হবে। তো যাইবি কবে?”
কানাই বলল, “এই-তো সামনের রবিবার! তুই রেডি আছিস তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ আমি পুরোপুরিভাবে রেডি আছি। চাকরি ছেড়েছি আজ তিনদিন হল, ও-দেরকেও শশুড়বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি বর্তমানে থাকছি বড়দা’র বাসায়।”
কানাই আমার কথা শুনে বলল, “ঠিক আছে, আর কোনও টেনশন নাই, এবার যাবার পালা।”

চলবে…