ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

স্টেশনের বাইরে গিয়ে চা-বিস্কুট নিয়ে খাচ্ছি, এমন সময় ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। ট্রেনের হুইসেল শুনে আমার বুকের ভেতরে কামড়াকামড়ি শুরু করে দিল। কখন আমি স্টেশনের ভেতরে যাব, সেই চিন্তায় আমার চা-বিস্কুট খাওয়া শেষ। ঝটপট দোকানদারকে চা-বিস্কুটের দাম দিয়ে দৌড়ে চলে আসলাম, স্টেশনের ভেতরে। ভেতরে আসার পর কানাই বলল, “কী খেয়েছিস? এতো ঝটপট চলে এলি যে?”

কানাইর কথা শুনে আমি বললাম, “আ-রে ভাই, আমি-তো ট্রেনের হুইসেল শুনে চলে এলাম। তুই একবার বলেছিস, ইলেক্ট্রিক ট্রেন, হুইসেল দিতে দেরি ছুটতে দেরি নেই। সেই কথায় আমি কোনোরকম খেয়ে দৌড়ে চলে এলাম।” কানাই হেসে বলল, “ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরায়ে সামনে নিয়ে লাগাবে, তারপর ট্রেন ছাড়বে। ট্রেন ছাড়ার আগে মাইকেও বলে দিবে। আর মাইকে বলা কথাগুলো বাইরে থেকেও শোনা যায়। এখন চল, ট্রেনে ওঠে সবাই বসে পড়ি।”

কানাইর দু’বোন সহ ট্রেনের ভেতরে গিয়ে বসলাম। আমি নাম শুনেছি ইলেক্ট্রিক ট্রেন, কিন্তু কোনও দিন চড়ে দেখেনি। শুনেছিলাম রেলগাড়ি বা ট্রেন, যা ১৯০০ সালের প্রথমদিকে ভারতবর্ষে আবির্ভাব হয়েছিল। তখনকার সময়ে পাথর কয়লা দ্বারা এই রেলগাড়ি চালানো হতো। এতে ছিল ব্যয়বহুল খরচ, এরপর খরচ বাঁচাতে রেল ইঞ্জিনকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তরিত করা হয়। একসময় পরিবেশবাদীরা পরিবেশ দূষণ হচ্ছে বলে, রেলগাড়ির ধূয়াকে দায়ী করে। তারা মতপ্রকাশ করেন, ‘পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে হলে, ইঞ্জিন থেকে বাইর হওয়া ধূয়া বন্ধ করা জরুরি।’ তাদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আবিষ্কার করা হয় বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন। তবে এখনও বিদ্যুতের পাশাপাশি ডিজেল চালিত ইঞ্জিনও ভারতে আছে। যা দূরপাল্লায় যাতায়াতের ট্রেনগুলোতে একের ভেতর দুইরকমের ইঞ্জিন থাকে। শুনেছি আমাদের বাংলাদেশেও কোনও একসময় চালু হবে বৈদ্যুতিক ট্রেন। আর মেট্রো ট্রেন তো প্রায় হয়েই যাচ্ছে।

আমার এই প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেনে চড়া। ট্রেনের বগিগুলো অনেক চওড়া, দুইপাশে বসার লম্বা চেয়ারেরমত টেবিল। মাঝখানে খালি জায়গা, খালি জায়গার উপরে আছে সারি সারি হাতা। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীগণ এই হাতায় ধরেই গন্তব্যে পৌঁছায়। এটি চিল বনগাঁ টু শিয়ালদা রাতের শেষ ট্রেন, তাই যাত্রী সীমিত। পুরো বগিতে কানাইর দু’বোন-সহ আমরা যাত্রী চিলাম, ৭/৮ জন। ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল, এবার হয়ত ট্রেন ছাড়ছে।

বাংলাদেশর ডিজেল ট্রেনও স্টেশন থেকে ছাড়ার আগে হুইসেল দেয়। কিন্তু ট্রেনের হুইসেল শুনেও দৌড়ে আসে ট্রেনে ওঠা সম্ভব হয়। ভারতের বৈদ্যুতিক ট্রেনের বেলায় তা-আর সম্ভব নয়। হুইসেল দেওয়ার সাথে সাথেই শোঁ, মানেট্রেন আর দেখা যাচ্ছে না। ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে, আমি বসে আছি কানাইর পাশে। দু’বোন সিটের এককোণে বসা, ট্রেন একটা স্টেশনে থামল। ট্রেন ছাড়ার আগে আমাদের বগিতে উঠল তিনজন ফেরিওয়ালা। একজন বাদাম, আরেকজন আপেল, অপরজন চানাচুর।

কানাই ওর দু’বোনকে জিজ্ঞেস করল, “এই তোরা কি বাদাম খাবি? না আপেল খাবি?” দু’বোন বলল, “বাদাম খাব।” আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই কিছু খাবি?” আমি বললাম, “না, এখন কিছু খাব না।”

ওরা বাদাম কিনে খাচ্ছে, আমার মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। মনটা খারাপ করেই একা একা বসে অনেককিছুই ভাবছি। রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ, ১৪০০ বঙ্গাব্দ। ওরা সবাই বাংলাদেশে। আমি কী করলাম, ওরাই-বা-কী করবে? আমার চিন্তাভাবনার যেন শেষ নাই। কেন আসলাম, কোথায় যাব, কী করবো? এমন হাজার প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর মেলে না, চিন্তায় আমার মনটাকে ভাবিয়ে দিচ্ছে বারবার।

ভাবনার এক ফাঁকে কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “কানাই, আমরা কোথায় গিয়ে নামবো রে?” কানাই বলল, “আমরা এখন প্রথমে দমদম যাব। ওখানে আমার এক বন্ধু থাকে, তার বাসায় আজকের রাতটা থাকব। কাল সকালে আবার ট্রেনে করে যাব শিয়ালদা। এই গাড়িতে করে যদি শিয়ালদা যাই, তবে রাত হয়ে যাবে প্রায় ৩ টা। এতো রাতে দু’বোনকে সাথে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, সমস্যা হতে পারে। তাই আজ রাতটা দমদম বন্ধুর বাসাই থাকব।” আমি বললাম, “এখন-তো রাত ১১টার মতো বাজে, দমদম পৌঁছতে কয়টা বাজবে?” কানাই জবাব দিল, “রাত ১২টার মতো বাজতে পারে।”

কানাইর কথাই ঠিক হলো, রাত ১২টা দশমিনিটের সময় ট্রেন দমদম পৌঁছাল। দু’বোনকে নিয়ে আমরা ট্রেন থেকে নামলাম। দমদম স্টেশনটা তখন নিস্তব্ধ, কোনও মানুষ নাই। ভারতের মানুষ এমনিতেই অনেক হিসাব করে চলে, বাইরে বেশি রাত করে না। সবাই চলে নিজের ধান্ধায়, কী করবে আর কীভাবে চলবে এসব নিয়ে। বাংলাদেশের মতো অযথা রাস্তাঘাটে, হাট-বাজারে আড্ডা দেয় না। আর এখন-তো রাত ১২ টারও বেশি, তাই জনশূন্য। ট্রেন থেকে যেই কয়জন যাত্রী নামল, সেই কয়জন মানুষেও ক্ষণিকের জন্য। যাত্রীরা যার-যার গন্তব্যে চলে গেলে স্টেশনে আর কোনও মানুষই থাকবে না।

সবাই স্টেশনের বাইরে এলো, আমি এদিক-ওদিক দেখছি, চা-দোকান আছে কি না। নাই, কোথাও কোনও চা-দোকান এতো রাতে খোলা নাই। নাই কোনও রিকশা বা ভ্যানগাড়িও। দমদম স্টেশন থেকে কানাইর বন্ধুর বাড়ি দুই কিলোমিটারের পথ। সাথে তিনচারটা বড়-বড় ব্যাগ। সেই সন্ধ্যার পর থেকেই টেনশন আর হাঁটা। আমার শরীর একরকম ক্লান্ত হয়ে পরছে। কিছু বলতেও পারছি না যে, আমি খুবই ক্লান্ত অনুভব করছি। কী আর করা! দুই কিলোমিটার পথ খুব কষ্ট করে হেঁটে, কানাইর বন্ধুর বাসায় পৌঁছালাম। ভারতের বাড়ি, হিসেবি মানুষের দেশ। ভাই আর বন্ধু, অসময়ে কেউ কারোর জন্য মাথা ঘামায় না। নিজের আপন বোনও ভাইকে দুইদিন জায়গা দিতে চায় না। কোনও লোকের বাড়িতে একবেলা খাবার যেমন-তেমন, পরের বেলাই হিসাব।

কানাইর বন্ধুর বাড়ির গেইটের সামনে গিয়ে সবাই দাঁড়ালাম। কানাইর বন্ধুটির নাম, প্রদীপ। কানাই বন্ধুর নাম ধরেই অনেক ডাকল, সাড়াশব্দ নাই। অনেকক্ষণ ডাকার পর, বন্ধুটি চোখ মুছতে-মুছতে গেইটে আসল।
জিজ্ঞেস করল, ‘কী-রে, এতো রাতে?’ কানাই বলল, ‘বাংলাদেশ থেকে এলাম, যেতে হবে শিয়ালদা। কিন্তু শিয়ালদা পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে, তাই তোদের বাড়ি এলাম।’

প্রদীপ জিজ্ঞেস করল, ‘সাথে ওরা কারা?’ কানাই আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ও-আমার বন্ধু আর আমার ছোট দুই বোন।’ কথা বলতে-বলতেই প্রদীপ বাড়ির গেইট খুলছে। এমন সময় প্রদীপের বৃদ্ধ মা সামনে এসে প্রদীপকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রদীপ, কে আসলো রে? এতো রাতে কোত্থেকে?’ মায়ের কথায় প্রদীপ জবাব দিল, ‘মা, আমার বন্ধু কানাই, দু’বোন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আজকের রাতটা আমাদের এখানে থাকবে ওরা, কাল চলে যাবে।’

প্রদীপের মা বললেন, ‘আয় ওদের ভেতরে নিয়ে আয়। রাত অনেক হয়েছে, ওরা কী বাইরে থেকে খাওয়া দাওয়া সেরে এসেছে? না আমার কিছু করতে হবে? আমার শরীরটাও ক’দিন যাবত বেশি একটা ভালো যাচ্ছে না। আয় আয় ভেতরে, আয় শিগগির।’

প্রদীপ আগে, আমরা চারজন পেছনে-পেছনে যাচ্ছি বাড়ির ভেতরে। বিশাল ঘর, পুরানো বিল্ডিং, দেয়ালের চারদিক নক্সা করা কারুকার্য। ঘরের ভেতরে সুবিশাল আয়তাকার অতিথিশালা আর চারদিক দামী চেয়ার বসানো। দেয়ালে নানা রঙের ছবি টানানো রয়েছে। আমাদের সাথে নেওয়া ব্যাগগুলো মেজেতে রেখে সবাই বসলাম। প্রদীপের মা একটা প্লেটে করে কিছু বিস্কুট নিয়ে আসলেন, অতিথিশালায়।

বিস্কুটগুলো সামনে দিয়ে বললেন, ‘খাও বাবা সকল, এতো রাতে আর কোনও ঝামেলা করবো না। এগুলো খেয়ে শুয়ে পড়ো, সকালের খাবার খেয়ে তোমরা যাবে।’

কানাই বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে মাসিমা, আমরা হাত মুখ ধুয়ে তারপর খাব। আর সকালবেলাও আমাদের জন্য আপনার কিছু করতে হবে না। আমাদের খুব ভোরবেলা রওনা দিতে হবে।’

প্রদীপের মা শোবার ঘরে চলে গেলেন, প্রদীপ তখনও অতিথিশালায়। কানাইর সাথে শোফার একপাশে বসে ঘুমাচ্ছে।
কানাই প্রদীপকে জাগিয়ে বলল, “কি হলো রে প্রদীপ? ঘুমিয়ে পড়লি? আমরা কে কোথায় ঘুমাবো একটু বলে দে?”
প্রদীপ চোখ ঢলতে-ঢলতে শোফা থেকে ওঠে বলল, “ভেতরে আর জায়গা নেই যে। তোদের সবাইকে এখানেই ডলা-ডলি করে থাকতে হবে।”

এই কথা বলেই প্রদীপ আরেক ঘরে চলে গেল। অতিথিশালায় এখন শুধু আমরা চারজন ছাড়া কেউ নেই। পেটের খুদায় আর ঠিক থাকতে পারছি না। খুদা নিবারণের জন্য মাসিমার দেয়া বিস্কুটগুলো সবাই মিলেমিশে হজম করলাম। এখন ঘুমও পাচ্ছে, অতিথিশালায় তিনটে শোফা ছাড়া আর কোনও বিছানা-পত্র ছিল না। কানাই একটায়, আমি একটায় আর দু’বোন একটা শোফায় ঘুমিয়ে পড়লাম। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও আমার চোখে ঘুম নেই, শুধুই চিন্তা। ভারতের এমন কিচ্ছা-কাহিনী আমি বহু আগেই শুনেছি। এবার নিজ চোখে দেখার ভাগ্য হলো, যেমনটা কিছুক্ষণ আগেই দেখলাম।

বাংলাদেশে একজনের বাড়িতে কোনও অতিথি আসলে, কতনা সমাদর করে। অতিথির জন্য রাত আর দিন কোনও বিষয় নয়, অতিথিকে সমাদর করাটাই বড় বিষয়। আর এখানে রাত হয়েছে বলে যত যন্ত্রণা। কিছু খাও আর না খাও, সকালবেলা চলে যাও। আমি ভাবছি, যার কাছে যাব, সে যদি এমন করে, তা-হলে কোথায় যাব? কানাইর কাছেও ক’দিন থাকব। বড় দিদির বাড়ি গেলে, বড় দিদি যদি আমাকে দেখে বিরক্ত হয়? তা-হলে যাবো কোথায়? চাকরি যদি মনোমত না হয়, তা-হলে? এমন আরও অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকাল হল, সময় তখন ভোর ৫টা, সূর্য মামা তখনও উঁকি দেয়নি। অনেক রাতে ঘুমানো, সবাই তখনও ঘুমে বিভোর। সেসময় প্রদীপের মা এসে সবাইকে ডেকে বলছে, ‘ওঠো ওঠো-গো বাবা সকল, সকাল ৫টা বাজে। তোমরা যখন শিয়ালদা যাবে, সকাল পৌনে ছয়টার সময় একটা ট্রেন আছে। তাড়াতাড়ি ওঠো, ট্রেনটা ধরতে পারলে নিরিবিলি যেতে পারবে।’

প্রদীপের মায়ের কথা শুনে আমি ওঠে কানাইকে বলছি, ‘এই কানাই, তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নে। ছয়টা বাজতে আরো ৪৫ মিনিট বাকি আছে, ট্রেনটা হয়ত ধরতে পারব।’

কানাই কুরমুড়ি দিয়ে ওঠে ওর দু’বোনকে ঘুম থেকে ওঠাল। প্রদীপদের বাড়িতে আর কিছু খাওয়া হল না, চলে আসলাম দমদম রেলস্টেশনে। স্টেশনে এসে একটা চা-দোকানে সবাই চা-বিস্কুট খেয়ে সকালের নাস্তা সারলাম। এরপর কানাই তাড়াতাড়ি করে স্টেশনের ভেতরে গিয়ে চারটে টিকেট কিনল। ট্রেন আসার পর সবাই ট্রেনে গিয়ে বসলাম। ট্রেন শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছালো সকাল ৮টায়। শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে এসে একটা অটো রিজার্ভ নিয়ে নিলাম। অটো দিয়ে যাচ্ছি আর দেখছি সেখানকার ১৪০০ বঙ্গাব্দ, বর্ষবরণ উৎসব। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে-মোড়ে, মহল্লায়-মহল্লায় এখানে-সেখানে চলছে বর্ষবরণের আয়োজন। কোথাও-কোথাও বৈশাখী লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ। অটো চলল প্রায় ৩০ মিনিটের মতো, নামলাম বাঘ যতীন রেলস্টেশনের বিপরীতে এক মহল্লায়। সেখান থেকে একটু পায়ে হেটে গেলাম, কানাইর ভাড়া করা বাসায়।

এই জায়গাটার নাম বাঘা যতীন কেন হলো তা কানাইর কাছে জানতে চাইলাম। জবাবে কানাই বলল, ‘এই বাঘা যতীনের বাড়ি ছিল আমাদের বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে। তার পিতার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মাতার নাম শরৎশশী। বাঘা যতীন শৈশব থেকেই শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। শুধুমাত্র একটি ছোরা দিয়ে তিনি একাই একটি বাঘকে হত্যা করতে সক্ষম হন বলে তাঁর নাম রটে যায়, বাঘা যতীন। এখানে থেকেই না-কি বাঘা যতীন, কোনও একসময় লেখাপড়া করতেন। তিনি ছিলেন একজন বাঙালি ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী নেতা। ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের সম্মুখ যুদ্ধে উড়িষ্যার বালেশ্বরে তিনি গুরুতর আহত হন। কিছুদিন বালাসোর হাসপাতালে থাকার পর অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর একসময় ভারত ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাঘা যতীন স্মরণে জায়গার নাম রাখা হয় বাঘা যতীন।’

এই বাঘা যতীন এলাকার কানাই এখন স্থায়ী বাসিন্দা, থাকে ব্যাচেলর। যেই বাড়িতে থাকে, সেই বাড়িওয়ালার ঘরেই কানাই খাওয়া-দাওয়া করে। কানাই থাকত একা, এখন সাথে আরও তিনজন দেখে বাড়িওয়ালার মাথায় হাত। এখন কানাইকে কিছু বলতেও পারছে না, আবার সইতেও পারছে না। আমি সেটা ভালো করে ফলো করছি, যখন খাবার খেতে যাই তখন।

সেখানে দুইদিন থাকার পর কানাইকে বললাম, ‘আমাকে রতন চক্রবর্তীর বাড়ি নিয়ে যা, এখানে তোর সমস্যা হচ্ছে।’

কানাই বলল, ‘যাব আরো দুইদিন পরে। আগে তোকে কোলকাতা শহরটা একটু ঘুরিয়ে দেখাই। ওখানে গেলে-তো আর সহা-শিগগির আসতে পারবি না। তাই কিছু সুন্দর-সুন্দর জায়গা দেখে যা, আর চিনেও যা।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তা-ই হবে।’

কানাইর কথায় আর অমত করেনি, দুইদিন কানাইর সাথে শুধু ঘোরাফেরা করলাম। এদিকে রতন চক্রবর্তীর স্ত্রীর ভারত আসার কথা, আমাকে সুন্দর একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কই! তিনিও আসছে না, কানাইও তার জন্যই অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষার মধ্যে কেটে গেল আরও দুইদিন। এর এক ফাঁকে আমি নিকটস্থ পোস্ট অফিস থেকে একটা চিঠির খাম কিনলাম। নিরিবিলি সময়ে চিঠি লিখে পাঠালাম, আমার স্ত্রীর কাছে। জানিয়ে দিলাম, আমি মঙ্গল মতো কলিকাতা পৌঁছেছি। চিঠি পাঠালাম এই কারণে যে, আমার জন্য যেন কোনও প্রকার চিন্তা না করে, তাই। এভাবে কেটে গেল আরও দুইদিন, আমার চিন্তাও বাড়তে লাগল।

চলবে…