ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

আসলাম ফুলিয়া স্টেশনে, কানাই বুকিং-এ গিয়ে শিয়ালদার টিকিট নিল দুইটা। ওঠলাম ট্রেনে, রাত ১১টার সময় পৌঁছলাম শিয়ালদা স্টেশনে। এদিন বাসায় যেতে রাত হয়েছিল প্রায় ১ টা।

বাড়িওয়ালার ঘর বন্ধ, কানাইর দু’বোন রাতে বাড়িওয়ালাদের ঘরে থাকে। বোনদের সমবয়সী বাড়িওয়ালার একটা মেয়ে আছে, ওর সাথে। আমার পেটের খিদায় জান যায়, এখন খাব কী? ভাগ্যিস পকেটে ফুলিয়ার অর্ধেক পাউরুটি ছিল। না হয় আমার অবস্থা খুবই বেগতিক ছিল। দুইজনে হাত-মুখ ধুলাম, কানাইকে বললাম, কানাই, কী খাব রে?

কানাই জবাব দিল, ‘কী আর খাব! এখন দুইজনে দুই গ্লাস কুয়ার জল খেয়ে ঘুমিয়ে থাকি। খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে দোকানেই গিয়ে খাব।’ আমি হেসে বললাম, শুধু জল খাব কেন? সাথে পাউরুটিও খাব। কানাই বলল, ‘এতো রাতে তুই পাউরুটি পাবি কোথায়? একটা দোকানও খোলা নাই। আমার একটুও মনে নাই, না হয় সেদিনের মতো সাথে করে কিছু খাবার নিয়ে আসতাম।’

কানাইর কথা শেষ হতে না হতে আমি পকেট থেকে অর্ধেক পাউরুটি বাইর করলাম। রাখলাম, কানাইর সামনে, বিছানার উপরে। অর্ধেক পাউরুটি দেখে কানাই বলল, ‘সে-কী-রে? ফুলিয়ার পাউরুটি, পুরোটা খাইসনি? দেয় কদ্দুর, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।’ তা-ই হলো, অর্ধেক পাউরুটি থেকে অর্ধেক-অর্ধেক করে খেয়ে, দুইজনেই ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালবেলা ঘুম থেকে আমি একটু দেরি করে ওঠালাম, কানাই উঠেছে আমার আগে। এখানে আসার পর ও আর কাজে যায়নি। কানাই ভারতে মহল্লায়-মহল্লায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে। অনেকদিন পর আজ মহল্লায় যাবে বলে মনস্তাপ করেছে। ও সকালে বাইর হয়, আসে সন্ধ্যার পর। এতক্ষণ সময় আমি কী করবো, কোথায় যাব, এসব নিয়ে কানাই থাকে খুব চিন্তিত। আমি ঘুম থেকে ওঠেই দেখি কানাই ভ্যানগাড়িতে কাপড় ওঠাচ্ছে, মহল্লায় যাবার জন্য।
আমি বললাম, কী রে! কোথায় যাবি?
কানাই বলল, ‘অনেকদিন হলো মহল্লায় যাই না, তাই ভাবছি আজ মহল্লায় যাব। না গেলেও হয় না, হাত একেবারেই খালি।’
আমি বললাম, তা হলে আমাকেও সাথে নিয়ে যা, ঘুরে দেখে আসি তোর ব্যবসা।
কানাই বলল, না তুই বাসায় থাক, আমি তাড়াতাড়ি করেই বাসায় ফিরে আসব। যাচ্ছি শুধু কিছু বাকি টাকা আদায় করার উদ্দেশে, বিক্রি করার জন্য নয়। আমি বললাম, একটু দাঁড়া, আমি হাত-মুখ ধুয়ে নিই, তারপর একসাথে বের হবো।

তা-ই হলো, আমি হাত-মুখ ধোয়া পর্যন্ত কানাই রাস্তায় অপেক্ষা করছে। আমি সাধারণ বেশে বাসা থেকে বের হলাম, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কানাই।

সামনে যেতেই কানাই বলল, চল সামনের চা-দোকান থেকে তোকে চা-বিস্কুট খাইয়ে দেই। আবার কখন না কখন আসি, তার কী ঠিক আছে?’
আমি বললাম চল যাই, আমার এমনিতেই চায়ের খুব অভ্যাস।

কানাই-সহ চা-বিস্কুক খেলাম, কানাই চা-বিস্কুটের দাম দিয়ে রওয়ানা দিল মহল্লায়। আমি এখন একা এক কাঙাল মানুষ। এখানে এখন আর আমার ঘনিষ্ঠ পরিচিত কেউ নেই। কানার মহল্লায় যাবার পর আমার এখন কিছুই ভালো লাগছে না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। ভাবছি বাসায় না গিয়ে টাউনে যাই। কিন্তু টাউনের অলিগলিও আমার কাছে অপরিচিত। আবার ভাবছি, হোক অপরিচিত, তাতে কী হয়েছে? আমি চলবো আমার মতে, যেথায় খুশি সেথায় যাব। কিন্তু যাবো কোথায়? এখন সকাল মাত্র ১০টা বাজে। এসব ভাবতে-ভাবতে রাস্তা দিয়ে হাটছি একা-একা। এ সময় একটা অটোরিকশা (সিএনজি) এসে আমার সামনে দাঁড়াল।
আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন দাদা? ধর্মতলা যাবেন? আসেন।’

অটোরিকশার ভেতরে দুইজন যাত্রী বসা, তারাও হয়ত ধর্মতলাই যাবে। সেদিন কানাইর সাথে গিয়েছিলাম, তাড়াহুড়োর মধ্যে ভালো করে ঘুরে দেখা হয়নি। আজ আমি একা, সাথে টাকাও আছে, গেলে সমস্যা হবে না। মনটাও বেশি ভালো লাগছে না, দেশের কথা মনে পড়ছে। আমার বড়দিদির বাড়ি জলপাইগুড়ি জেলার বীরপাড়া। কীভাবে যেতে হয় তাও জানা নেই। এখানে যদি কাজের কোনও ব্যবস্থা না হয়, তা হলে তো বড়দিদির বাড়িতেই যাতে হবে। জলপাইগুড়ি বড়দিদির বাড়ি গেলে দিদি আমাকে চিনবে কি না? যদি না চিনে? যদি তার ওখানে আমাকে থাকতে না দেয়? তা হলে যাবো কোথায়?

এসব ভাবতে-ভাবতে একটু সময় হয়েছে। তাই অটোরিকশার ড্রাইভার আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কী দাদা, যাবেন?’ আমি বললাম, হ্যাঁ যাবো, আপনি গাড়ি নিয়ে কোথায় যাবেন? আমি কিন্তু ধর্মতলাই যাবো। ড্রাইভার বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ দাদা, আমিও ধর্মতলা পর্যন্তই শেষ। আসেন-আসেন গাড়িতে উঠুন।’

ওঠালাম অটোরিকশায়, গেলাম ধর্মতলায়। অটোরিকশা থেকে নেমে ড্রাইভারকে ভাড়া দিলাম ৬ টাকা। ধর্মতলা হলো কোলকাতা শহরের এক ব্যস্ততম জায়গা। এখান থেকেই ভারতের বিভিন্ন শহরে যাবার বাস সার্ভিস। রাস্তার পাশ দিয়ে হাটছি, দেখছি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। সামনেই একটা চা-স্টল, বসলাম সামনে থাকা একটা চেয়ারে।

দোকানদার জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবেন দাদা? চা বানিয়ে দিবো?’ আমি বললাম, হ্যাঁ দাদা, ভালো করে এক কাপ চা বানিয়ে দিন।
দোকানদার আমার দিকে বারবার তাকিয়ে-তাকিয়ে কি যেন ফলো করছে। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করছে না। চা বানিয়ে সামনে এনে দিয়ে বললেন, দাদা বাবুর বাড়ি কোথায়? কোথা-ই-বা যাবেন?

এসব বলেই দোকানদার আমার সামনে এসে বসল। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চা-পান করতেই, আবার বলল, কোথায় যাবেন? আমি বললাম, কোথাও যাবো না দাদা, এসেছি একটু ঘুরতে।

দোকানদারের দোকানে আমি ছাড়া তখন আর কোনও কাস্টমার ছিল না। দোকানদার আমাকে আবারও করলেন, আপনাকে দেখে ভারতের মানুষ বলে মনে হয় না। মনে হয় আপনি জয় বাংলার লোক। এখানে আপনার কে থাকে? আমিও জয় বাংলার লোক, আমাদের বাড়ি ছিল ফরিদপুর জেলায়। এখানে আমরা অনেক পুরানো, আমার জন্মও এই ভারতেই। জয়বাংলায় কোনও দিন যাওয়া হয় নাই। তাই জয় বাংলার লোক দেখলেই মনটা খাঁ-খাঁ করে ওঠে দাদা।

দোকানদারের কথাগুলো শুনে আমি বললাম, আমার বাড়ি ও দেশ, দুটোই বাংলাদেশে। এখানে এসেছি আমার এক বন্ধুর সাথে, একটা কাজের আশায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি দাদা, এবার দেশে ফিরে যাবার পালা। হয়ত দু’একদিনের মধ্যেই দেশে চলে যাব। তাই আপনাদের কোলকাতা শহরটা একটু ঘুরে দেখছি।
আমার কথা শুনে দোকানদার বলল, এখানে আপনার বন্ধু ছাড়া আর কেহ না-ই?
আমি বললাম, আছে দাদা, তা তো অনেক দূরে! সেই জলপাইগুড়ি। সেখানে আমার আপন বড়বোন থাকে। তবে দাদা, কীভাবে যে যেতে হয়, তাও আমার জানা নেই।
দোকানদার বললেন, ‘জলপাইগুড়ি? কীভাবে যাবেন? যেদিন যাবেন, সেদিন আমার সাথে দেখা করবেন। আমি আপনাকে জলপাইগুড়ির বাসে উঠিয়ে দিবো। এই তো জলপাইগুড়ি বাসস্ট্যান্ড দেখা যাচ্ছে। একটু সামনে গেলেই দেখবেন, উত্তরবঙ্গের সকল জেলায় যাওয়ার বাস।’

দোকানদারের কথা শুনে আমি হেসে বললাম, আচ্ছা দাদা, ঠিক আছে। আমি যেদিন জলপাইগুড়ি যাবো, সেই দিন আপনার সাথে দেখা করে যাবো। এই নিন, আপনার চা-সিগারেটের দাম রাখুন।
৫ টাকার একটা নোট হাতে দিতে গেলেই দোকানদার রাগ হয়ে আমাকে বললেন, ‘যান তো দাদা, জলপাইগুড়ি যেদিন যাবেন, সেদিন দিবেন। এখন এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করে যাবার সময় আবার চা পান করে যাবেন।’

দোকানদার চায়ের মূল্য আর নিল না, আমিও তাকে জোর করে দিতে পারলাম না। চলে গেলাম, উত্তরবঙ্গের বাসস্ট্যান্ডের সামনে। একটা টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানলাম, জলপাইগুড়ি বীরপাড়ার ভাড়া কত? ভাড়া ২৬০ টাকা। বীরপাড়া যেতে সময় লাগবে ২০ ঘণ্টার মতো। এখন আর আমার ভালো লাগছে না, শুধু বড়দিদির বাড়ি যাবার কল্পনাই দেখছি। এদিকে দুপুর হয়ে গেছে বহু আগেই, অথচ আমার খবর নাই। এই দিন ধর্মতলার অনেক জায়গায় ঘুরাঘুরি করেছি। তাই কখন যে দুপুরের সময় হয়ে গেছে, একটু খেয়ালও করিনি। আবার একটা অটোরিকশা করে বাঘা যতীন কানাইর বাসার সামনে এলাম। বাসায় গিয়ে কানাইর বোন পলিকে জিজ্ঞেস করলাম, কানাই কখন আসবে রে?

পলি বলল, ‘কখন যে আসে, তা কী ঠিক আছে? আপনি কোথায় গিয়েছিলেন দাদা? আপনাকে অনেক খুঁজেছি, মহল্লার প্রতিটা দোকানে। জিজ্ঞেসও করেছি, কেউ বলতে পারানি। আমরা আপনার জন্য খুবই চিন্তায় ছিলাম। কানাইদা কাপড় নিয়ে মহল্লায় যাবার সময় আপনার কথা বলে গিয়েছিল_আপনার দিকে লক্ষ্য রাখতে। লক্ষ্য তো দূরের কথা, আপনার পাত্তাই নাই। দুপুরে কী খেয়েছেন? মনে হয় কিছুই খাননি। এখন তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে আসেন, ভাত খাবেন।’

পালির কথা শুনে আমি বললাম, আমি বাইরে থেকে খেয়ে আসেছি। তোরা খেয়েছিস তো?
পলি বলল, ‘এখন বিকাল ৪ টা বাজতে লাগল দাদা, এখনও কি না খেয়ে থাকা যায়? আমরা আপনার বার চেয়ে-চেয়ে এই মাত্র খেলাম।’
আমি বললাম, বেশ করেছিস, আরও আগে খেয়ে নিতে পাড়তিস। আমার জন্য শুধু-শুধু কষ্ট করলি, ডলি খেয়েছে? ও এখন কোথায়?
পলি বলল, ‘ও খাওয়া-দাওয়া করে এখন ঘুমাচ্ছে।’
আমি বললাম, আমাকে তেলের শিশি আর শাবানটা একটু এনে দে, আমি স্নান করে একটু ঘুমাবো। কানাই আসলে আমাকে ডেকে দিবি।

পলি শাবান-সহ রেলের শিশি এনে দিল, আমি লেকে গেলাম স্নান করতে। কোলকাতা শহরে বেশি একটা পুকুর নাই, আছে মহল্লায়-মহল্লায় বিশাল-বিশাল লেক। সেখানকার মানুষেরা সবাই লেকে স্নান করে। মানুষের সুবিধার্থে সিটি কর্পোরেশন এই লেকগুলো তৈরি করে দিয়েছেন। আর বেশিভাগ মানুষের বাড়িতে কিছু না থাকলেও একটা কুয়া অবশ্যই থাকবে। বাসার প্রতিদিনের ধোয়ামোছার কাজ এই কুয়ার জলেই করে থাকে। আমি লেক থেকে স্নান করে এসে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলাম। শরীর খুব ক্লান্ত, সারাদিন গেল দুই কাপ চায়ের উপরে। না খেয়ে থেকেও বললাম, খেয়েছি। কারণ, বাড়িওয়ালী কেমন যেন বিরক্ত-বিরক্ত ভাব দেখায়, তাই। বিছানায় শরীরটাকে লেলিয়ে দেওয়ার সাথে-সাথেই ঘুমিয়ে পরলাম। কানাই মহল্লা থেকে এসেছে সন্ধ্যাবেলা। কানাই এসেই আমাকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠাল।
আমি ঘুম থেকে উঠে বললাম, কখন এসেছিস?

কানাই বলল, ‘এই-তো এলাম! তুই এতো সময় করে ঘুমাচ্ছিস যে? দুপুরে খেয়েছিস?’ আমি বললাম, হ্যাঁ খেয়েছি। তুই কোথায় খেয়েছিস? কী খেয়েছিস? কানাই বলল, ‘আমি মহল্লায় বেরুলে দুপুরে আর খাওয়া হয় না। এই সামান্য চা-বিস্কুট হলেই_হয়ে যায়। এর বেশি কিছু আর লাগে না।’ কানাই ওর ব্যবসার কাপড়গুলো এক সাইট করে রেখে স্নান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি বিছানা থেকে নেমে কুয়ায় গেলাম, হাত-মুখ ধুতে।

কানাই স্নান করে এসে জামাকাপড় পঢ়ে আমাকে বলল, ‘চল আমার সাথে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? কানাই বলল, ‘ধর্মতলা থেকে একটু ঘুরে আসি।’ আমি বললাম, আমিতো সকালে একবার ধর্মতলা গিয়েছিলাম। ঘুরেফিরে অনেককিছু দেখে এলাম, জেনেও এলাম।

আমার কথা শুনে কানাই জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেখে আসলি আর কী জেনে আসলি?’ আমি বললাম, আমার বড়দিদির বাড়ি জলপাইগুড়িতে কীভাবে যেতে হয়, তা-ও জেনে আসলাম। কানাই বলল, ‘বেশ করেছিস, আমার সাথে চল_আমি তোকে পুরো ধর্মতলা ঘুরাব।’

জামাকাপড় পড়ে কানাই-সহ গেলাম ধর্মতলা। অটোরিকশা থেকে নেমেই চা-দোকানদারের সাথে দেখা করলাম। কানাইকে বললাম, এই লোকের বাড়ি আমাদের দেশে ফরিদপুর। সকালে চা-দোকানদারের আপ্যায়নের কথাও বললাম কানাইর কাছে। এরপর গেলাম একটা হোটেলে, কিছু জল খাবার করার জন্য। কানাই সারাদিন বাইরে ছিল, ভাত খাওয়া হয় নাই। তাই এই সন্ধ্যায় হোটেলে ঢোকা।

চলবে…