ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
p20170917-023908

গোদনাইল চিত্তরঞ্জন কটন মিলস্ এর হরিসভা মন্দিরে তৈরি করা হচ্ছে দুর্গাদেবীর মূর্তি।

নারায়ণগঞ্জে চলছে আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। আগামি ১৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে শারদীয় দূর্গা পূজার মহালয়া। মহালয়ার পার্বণ শ্রাদ্ধের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। মহালয়ার হয়ে থাকে অমাবস্যা তিথিতে, তখন থাকে ঘোর অন্ধকার। মহাতেজের আলোয় সেই অমাবস্যা দূর হয়ে প্রতিষ্ঠা পায় শুভশক্তি। সেই থেকেই শুরু হয় দেবীপক্ষের সূচনা। দুর্গাপূজার দিন গণনা এ মহালয়া থেকে শুরু হয়। আর বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে মূল পূজা শুরু হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে।

এই শারদীয় দুর্গোৎসবটি হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। যা হয়ে থাকে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজাকে বলা হয় শারদীয়া দুর্গাপূজা। এটি বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষকের দুর্গাপূজাকে বলা হয় বাসন্তীপূজা। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের দুর্গা পূজা বা বাসন্তী পূজাটি অনেকের চোখে পড়ে না।

আগামি ২৬ সেপ্টেম্বর দেবীর দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মহাষষ্ঠী। চলবে একনাগাড়ে পাঁচদিনের জন্য শারদীয় দুর্গোৎসব। ২৭ সেপ্টেম্বর সপ্তমী, ২৮ সেপ্টেম্বর মহাষ্টমী, ও কুমারী পূজা, ২৯ সেপ্টেম্বর মহানবমী। ৩০ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে বিজয়াদশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই বর্ণিল উৎসব। এবার দেবী দুর্গা নৌকায় মর্ত্যলোকে আসবেন, যাবেন ঘোড়ায় চড়ে।

cox_1

দুর্গা পূজার কথা আসলেই আগে আসে কুমারী পূজার কথা। এই কুমারী পূজা হচ্ছে দুর্গা পূজারই একটা অংশ। এই কুমারী পূজাটি হয়ে থাকে নারায়ণগঞ্জের রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে। রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমটি শহরের মিশনপাড়াতে অবস্থিত। প্রতিবারের মতো এবারও রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা কুমারী মেযে়র পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই কুমারী পূজার প্রচলন ছিলো। যা শোনা যায় বুড়ো-বুড়ীদের কাছ থেকে। তবে আগের মতন বর্তমানে কুমারী পূজার প্রচলন তেমন নেই। যা আছে শুধু সারাদেশের রামকৃষ্ণ মিশনগুলোতে। প্রতিবছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল ১০টা হতে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এই কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা শেষে শুরু হয় পূজার্থী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ। পূজা পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের প্রধান মহারাজ।

মহারাজ বলেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দ শারদীয় দুর্গোৎসবে এই কুমারী পূজার প্রচলন করেন। নারী মানে মায়ের প্রতীক। তাই কুমারী পূজা মানে স্বয়ং মাকে পূজা করা’ পৃথিবীতে দেবী দুর্গাই সর্বশক্তিমান। তাকে লক্ষ্য করেই কুমারী পূজা করা হয়। একজন কুমারীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করাই হলো দুর্গাদেবীকে পূজা করা।

দুর্গা পূজার গ্রন্থের তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে জানা যায়, এক থেকে ১৬ বছর বয়সী কুমারীকে পূজা করা যায়। তবে ১০ বছরের কুমারী মেয়েকেই কুমারী পূজায় শাস্ত্রে বশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেখানে বয়স অনুসারে কুমারীর নামকরণও করা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের কুমারী মেয়ের জন্য আলাদা আলাদা নামও রয়েছে শাস্ত্রে।

যেমন:
☛ এক বছরের কন্যা — সন্ধ্যা
☛ দুই বছরের কন্যা — সরস্বতী
☛ তিন বছরের কন্যা — ত্রিধামূর্তি
☛ চার বছরের কন্যা — কালিকা
☛ পাঁচ বছরের কন্যা — সুভগা
☛ ছয় বছরের কন্যা — উমা
☛ সাত বছরের কন্যা — মালিনী
☛ আট বছরের কন্যা — কুষ্ঠিকা
☛ নয় বছরের কন্যা — কালসন্দর্ভা
☛ দশ বছরের কন্যা — অপরাজিতা
☛ এগারো বছরের কন্যা — রূদ্রাণী
☛ বারো বছরের কন্যা — ভৈরবী
☛ তেরো বছরের কন্যা — মহালপ্তী
☛ চৌদ্দ বছরের কন্যা — পীঠনাযি়কা
☛ পনেরো বছরের কন্যা — ক্ষেত্রজ্ঞা
☛ ষোলো বছরের কন্যা — অন্নদা বা অম্বিকা

কুমারী পূজায় যে ধ্যান করতে হয়, ‘মা তুমি ত্রৈলোক্যসুন্দরী, কিন্তু আজ তুমি কালিকাস্বরূপে আমার সম্মুখে উপস্থিত। তুমি জ্ঞানরূপিণী, হাস্যময়ী, মঙ্গলদায়িনী।’
আর কুমারী পূজার যে প্রণাম মন্ত্র রয়েছে তার অর্থ- ‘মা, তুমি প্রসন্ন হলে আমাকে সৌভাগ্য দান করতে পারো। তুমি সকল প্রকারের সিদ্ধি আমাকে দান কর। তুমি স্বর্ণ, রৌপ্য, প্রবাল কত রকমের অলঙ্কারে অলঙ্কৃত হয়েছ। তুমিই সরস্বতী। আমি তোমাকে প্রণাম করি।’

এবার নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলায় ১৯০টি শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর হয়েছিল ১৯৪টি, এবার ৪টি কম। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ৬৭টি। বন্দর উপজেলা ২৫টি। সোনারগাঁ উপজেলায় ৩১টি। আড়াইহাজার উপজেলায় ২৬টি ও রূপগঞ্জ উপজেলায় ৪১টি পূজা মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন এলাকায় হবে ৭টি মণ্ডপে।

শারদীয় দূর্গাপূজা উপলক্ষে পুরোদমে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। ইতোমধ্যে চারুকারুর শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। রংতুলির কাজ যা বাকি আছে, তা শেষ সময়ের মধ্যেই হয়ে যাবে। এমনটাই আশা করছে প্রতিটি পূজা মণ্ডপের কর্তারা। চলছে রাস্তায়-রাস্তায় বিশাল-বিশাল তোরণ নির্মাণের কাজ।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন চিত্তরঞ্জন কটন মিলস্ হরিসভা মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে মূর্তি তৈরির কাজ। মন্দিরের পুরোহিত বলেন, ‘মঙ্গলবার মহালয়া মায়ের আগমনী বার্তা। দুর্গা মা দুষ্টের দমন ও মানুষের শান্তির জন্য আসবেন। মঙ্গলবার মহালয়া উপলক্ষ্যে সকালে পূজা মণ্ডপে পূজার ঘট বসবে। সারাদিন চণ্ডি-পাঠ হবে ও রাতে পূজা হবে।’ দেবী মায়ের আগমনী বার্তা উপলক্ষে সকাল থেকে শুরু হবে প্রার্থনা। বাজবে ঢাকঢোল আর শঙ্খ ধ্বনি, সাথে উলুধ্বনিও। রাতে শুরু হবে নাম সংকির্তন।

দুর্গাদেবীকে প্রণাম করার মন্ত্র:

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।।

অনুবাদ:

যে দেবী সর্বপ্রাণীতে শক্তিরূপে অধিষ্ঠিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।

শারদীয় দূর্গা পূজা – ২০১৭ ইং সময়সূচি।

☛ মহাপঞ্চম ২৫ সেপ্টেম্বর।
☛ মহাষষ্ঠী ২৬ সেপ্টেম্বর।
☛ মহাসপ্তমী ২৭ সেপ্টেম্বর।
☛ মহাঅষ্টমী ২৮ সেপ্টেম্বর।
☛ মহানবমী ২৯ সেপ্টেম্বর।
☛ বিজয়াদশমী ৩০ সেপ্টেম্বর।

আর এই পূজা উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বলে জানা যায়। যাতে করে কোনও ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা না ঘটতে পারে। নারায়ণগঞ্জে যাতে পূজা উদযাপন করতে কোনও ধরনের সমস্যা না হয়, সে ব্যাপারেও স্থানীয় প্রশাসন রাখবে সজাগ দৃষ্টি।