ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

p20170930-014647
প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগমন ঘটলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ব্যস্ততা শুরু হয়। ব্যস্ততা শুধু বাঙালি হিন্দুদের মাঝেই নয়, গোটা ভারতবর্ষের হিন্দুদের মাঝেই এই ব্যস্ততা। এটি সারাবিশ্বের বাঙালি হিন্দুদের সবচাইতে বড় উৎসব, প্রায় সপ্তাহব্যাপী স্থায়ী শারদীয়া দুর্গোৎসব। সবাই মেতে ওঠে শারদীয় আনন্দে, হাসি গানে জাগিয়ে তুলে সারাবিশ্বের হিন্দু সমাজকে। কিন্তু আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা ক’জনে জানি এর মর্মকথা? হাতে গোনা কিছুসংখ্যক পণ্ডিতগণ ছাড়া খুব কম মানুষেই জানি দুর্গাদেবীর আবির্ভাব তথ্য। আর পূজার বিজয়া দশমীর কাহিনী। বিজয়া দশমী সম্পর্কে শুধু জানি দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন বা প্রতিমা জলে ভাসিয়ে দেওয়া।

কোন বিজয়? কার বিজয়? কেন-ই-বা দশমী বলা হয়? অনেকেই জানি না এর মূলকথা। তা হলে জেনে রাখা ভাল যে, কিসের বিজয়, কার বিজয় আর কিসের দশমী। এসব না জানার কারণেই অনেক সমর দৈনন্দিন জীবন চলার মাঝে আমাদের অনেকের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই আজকে আমার এই লেখা শুধু দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী নিয়ে। কিন্তু দশমীর আগে তো দেবী দুর্গার পূজারাম্ভ হয়, কাজেই দুর্গাদেবীর আবির্ভাব নিয়ে আগে কিছু লিখতে হয়।

শ্রীশ্রীচণ্ডী ২য় ও ৩২ খণ্ড থেকে সংক্ষেপে বর্ণনা।

জানা যায় পূর্বকালে একসময় মহিষাসুর অসুরদের রাজা ছিলেন। তখন প্রায় একশ বৎসর দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে অসুরগণ দেবসৈন্যসমূহকে পরাজিত করে অধিপতি হয়। এরপর পরাজিত দেবতারা উপায়ান্তর না দেখে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব- এর শরণাপন্ন হয়। দেবগণ তাদের পরাজিত কাহিনী ও মহিষাসুরের দৌরাত্ম্যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব-এর কাছে গিয়ে বললেন, “হে প্রভু মহিষাসুরের শক্তি দেখে বুঝা যায় যে, সূর্য, ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র, যম, বরুণ-সহ সব দেবতাদের ক্ষমতা তাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের অত্যাচারে আমরা এখন আর দেবকুলে থাকতে পারছি না। তাই আমারা নিরুপায় হয়ে দেবকুল ছেড়ে পৃথিবীতে বিচরণ করছি। অসুরদের এই সমস্ত দৌরাত্ম্য আপনাদের কাছে জানালাম, আপনারা এর একটা বিহিত করুন।”

ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব দেবতাদের মুখে এসব কথা শুনে খুবই রেগে হলেন। রাগে তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব- এর শরীর থেকে মহাতেজ নির্গত হতে লাগল। তাদের সাথে অন্যান্য দেবতাদের শরীর থেকেও তেজ নির্গত হতে শুরু করলো। এভাবে সব দেবতাদের তেজে এক নারী দেবীমূর্তি ধারণ করলো। এরপর অসুরদের নিধন করার জন্য দেবীকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করলেন দেবতারা। দিলেন তাকে বহন করার জন্য বাহনও, যা দিয়েছে হিমালয়।

তখন দেবীর গর্জনে সমগ্র আকাশ পরিপূর্ণ হলো এবং ভীষণ প্রতিধ্বনি উঠতে লাগলো। তা দেখে উপস্থিত দেবগণ আনন্দে সিংহবাহিনীর জয়ধ্বনি করতে লাগলেন। অতঃপর সকল দেবতা তাকে ‘জয়া’ নাম প্রদান করে ভক্তিভরে নতদেহ হয়ে দেবীকে ভক্তি করলেন।

এরপর লঙ্কার রাবণ নিজের দুর্গতি নাশ হওয়ার জন্য দুর্গা নামে দুর্গাপূজা প্রথম করেছে। উদ্দেশ্য ছিল মনোবাসনা পূর্ণ হওয়া ও দুর্গতি দূর হওয়ার জন্য। তাই অনেকে দেবীদুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী বলেও ডাকে। আবার শী রামচন্দ্রও করেছে দুর্গাদেবীর পূজা, তাও মনোবাসনা পূর্ণের জন্যই করা। সেই থেকেই ধারাবাহিকভাবে আমাদের মর্তলোকে দেবী দুর্গার পূজা হয়ে আসছে। অনেক দেশে এই দুর্গতিনাশিনী বা দুর্গাদেবীর পূজা লগ্নে এক কুমারী মেয়েকেও মার্তৃরূপে পূজা করেন। সেই পূজাকে বলে থেকে কুমারীপূজা। এই পূজাটি দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে হয়ে থাকে।

বিজয়া দশমী কী বা কেন?

দুর্গা পূজার অন্ত চিহ্নিত হয় বিজয়া দশমীর মাধ্যম। পঞ্চমী থেকে নবমী পর্যন্ত মূল পূজা, দশমীতে বিজয়া দশমী। ভারত ও নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দিনটি নানাভাবে পালিত হয়ে থাকে। সে সাথে আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাশহরের আনাচেকানাচেও পালিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দিনটিকে ‘বিজয়া দশমী’ বলা হয় কেন? কোন ‘বিজয়’-কেই বা চিহ্নিত করে দিনটি?
af5e3c6689a61a842f11f9cb91dc151a-57fc59f8977a1
পুরাণে মহিষাসুর-বধ সংক্রান্ত কাহিনিতে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পরে দশম দিনে তার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। শ্রীশ্রীচণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে দেবী আবির্ভূতা হন, এবং শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর-বধ করেন। বিজয়া দশমী সেই বিজয়কেই চিহ্নিত করে। সেই থেকেই আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী সবাই জাঁকজমকভাবে অতি আনন্দে দশমী উদযাপন করি।

পরিশেষে দুর্গাপূজার পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার নিয়মের একটা অনলাইন লিংক দিলাম। যাদের প্রয়োজন হবে তারা লিঙ্কে ভিজিট করে দেখে নিবেন ও শিখে নিবেন।

মা’দূর্গাকে প্রণাম করার মন্ত্র”

“সর্ব মঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ
শরণ্যে ত্রাস্বকে গৌরী নারায়ণী
নমোহস্তুতে নমোঃ”

“দূর্গাপূজায় পুষ্পঅঞ্জলী দেয়ার মন্ত্র”

“ঔঁ জয়ন্তি মঙ্গলা কালী, ভদ্র কালী, কপালিনী
দূর্গা শিতা ক্ষমা ধত্রী, স্বাহা স্বধা নমস্তুতেঃ
এস-স্ব-চন্দন পুষ্প বিল্ব প্রত্রাঞ্জলী নম
ভগবতী দূর্গা দেবী নমহঃ”

“মা’দূর্গা’কে স্মরণ করা বা জাগ্রত করার মন্ত্র”

“ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মাতৃ রূপেন সংস্থিতা
ইয়া দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেন সংস্থিতা
ইয়া দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধি রূপেন সংস্থিতা
নমোস্তেসৌঃ নমোস্তেসৌঃ নমোস্তেসৌঃ
নমোঃ নমোঃ”

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
ঔঁ শান্তি, ঔঁ শান্তি, ঔঁ শান্তি।।