ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

 

p20171007-034346
নাম গীতা রানী। থাকে একটা চারতলা ভবনের চিলেকোঠায়। চোখে দেখে ঝাপসা-ঝাপসা। কানেও শুনে কম, তবে শ্রবন প্রতিবন্ধী নয়। চোখের খুব সামনে গিয়ে কথা বলতে হয়। তা হলেই বুঝতে পারে কে কথা বলছে। নয়তো আর কাউকে চিনে না। দুটো পা-ই অবশ, হাটতে পারে না। যাকে বলে লুলা বা অঙ্গহীন। অথচ ছোট একটা শিশুর মতো পাছা ঘেঁষে চলে। থাকে গোদনাইল চিত্তরঞ্জন কটন মিলের দারোয়ান লাইনে। এখানে মিল কর্তৃপক্ষ দারোয়ানদের থাকার জন্য তৈরি করেছিল, একটা চারতলা ভবন। সেই চারতালা ভবনের চিলেকোঠা হলো গীতা রানীর আশ্রয়স্থল। দুই হাতে ভর দিয়ে চলতে-চলতে চারতলার চিলেকোঠায় ওঠে যায়। রাতে ঘুমায় না, পিঠে সমস্যার কারণে সারারাতই বসে থাকে। ‘ঘোড়া যে ভাবে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘমায়, ঠিক সে ভাবেই বসে-বসে ঘুমায়।’

ধারেকাছে দেখাশোনার কোনও আত্মীয়স্বজন নাই। চারতলা ভবনটিতে বর্তমানে যারা বসবাস করে, তারাই গীতা রানীর স্বজন। ঠিক ভোরবেলা নিজে-নিজেই চিলেকোঠা থেকে নিচে নেমে আসে। চারতলা ভবনের সামনেই হরি সভা মন্দির। মন্দিরের সামনেই রাস্তা। এই রাস্তাই হলো গীতা রানীর জীবিকা সংগ্রহের স্থান। চা, রুটি, বিস্কুট, ভাতমাছ-সহ সবই মানুষে দেয়। হাত পেতে সারাদিন বসে থাকে মন্দিরের সামনেই। পথচারী ও এলাকার মানুষ যে যা দেয়, তা-ই নেয়। সময়-সময় গুরুতর অসুস্থ হলে চারতলা ভবনের বসবাসকারীরাই ডাক্তার দেখায়। সারাদিন হাত পেতে যা পায়, তা-ই রেখে দেয়। আগামী দিনে মরণকালের কথা চিন্তা করে।

আজকাল কে কার জন্য কী করে? গীতা রানীর জন্য কি কেউ কিছু করবে? মনে হয় না। হয়ত করবে শেষ বিদায়ের কাজটুকু, এর বেশি কিছু নয়। সবাই নিজের ধান্ধায়ই থাকে মশগুল। পরের চিন্তায় রাতের গুম কেউ হারাম করতে চায় না। আপন ভাইও ভাইয়ের জন্য করে না। আর সে তো গীতা রানী! নাই খেতা-বালিশ, নাই কম্বল। নাই তার নিকটাত্মীয় আর স্বামী সন্তান।

এক সময় সবই ছিল গীতা রানীর। বাবার ছিল বিশাল আয়তকার বাড়ি-সহ চাষের জমি। তাও ডিএনডি বাঁধে ভেতরে। সেই পৈতৃক সম্পত্তিতে আজ বিশাল গার্মেন্টস, যা ভোগদখল করে অন্যে। হিন্দু ধর্মের মধ্যে বাবার সহায় সম্পত্তির মালিক হয় ছেলেরা। গীতা রানীর কোনও ভাই ছিল না, ছিল মাত্র দুই বোন। তাই আর পৈতৃক সম্পত্তির আশা করতে পারে না গীতা রানী। গীতা রানীর বিবাহ হয়েছিল ভালো ঘরে, স্বামীরও ছিল অনেক। ছিল বাড়ি, ছিল এক পুত্রসন্তান। গীতা রানী বিধবা হয়েছে বহু আগেই, আর ছেলেটি রয়েছে নিখোঁজ। ছেলেটির জন্য গীতা রানী অনেক কেঁদেছে। এখন আর কাঁদে না। তবে মনে আছে গীতা রানীর, ‘আমার একটি ছেলে আছে।’

কোনও দিন আসবে কি না, তা আর গীতা রানী জানে না। তাই ঝাপসা-ঝাপসা চোখে মানষের মুখের দিকে তাকায়। সামনে রাখা থালাতে কেউ কিছু দিতে গেলেই, ছেলের কথা জিজ্ঞেস করে। জানতে চায়, ‘আমার ছেলেটা কেমন আছে?’

উত্তর পায় না, পায় সামনে রাখা থালায় দুই টাকা বা তারও বেশি। ঈদ বা পূজাপার্বণে কেউ নতুন জামাকাপড় দিলেও নেয় না। বলে, ‘আমি আর ক’দিন বাছুম, এডি আমার লাগতো না। টেকা দে টেকা, মরলে খরচ লাগবো না?’ আরও বলে, ‘ওই হুন, আমি মরলে আমারে পুড়িছ না,  মাটি দিছ।’

এমন অনেক কথাই রাস্তায় বসে-বসে গীতা রানী বলতে থাকে। কেউ শোনে, কেউ শোনে না। স্বামী সন্তান হারিয়েও গীতা রানীর দুঃখ নেই। আছে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার আশা। যদি হারানো ছেলেটার দেখা পায়? সেই আশা। বর্তমানে গীতা রানীর প্রতিবেশী বলতে যারা আছে, সবাই অপর। চিকিৎসার দরকার হলে, আগে দেখে তার রোজগার করা কত আছে। তারপর ডাক্তার বা হাসপাতাল। ভাত খুবই কম খায়, খায় শুধু চা আর রুটি বিস্কুট। মৃত্যুর পর তাকে কী করতে হবে, তা আর এখন কেউ জানতে চায় না। এ বিষয়ে সবারই জানা হয়ে গেছে কী করতে হবে।

প্রতিটা ঈদ আদলেই দেখা করি গীতা রানীর সাথে। এমন অনেকেই দেখা করে, দেয়ও অনেক। অফিসে তার নাম লিপিবদ্ধ আছে। প্রতি ঈদে আর পূজায় গীতা রানীর জন্য ৪০০ টাকা করে বাজেট আছে। টাকা দেওয়া হয় ইনকিলাবের ভেতরে ভরে। ইনকিলাব হাতে পেলেই গীতা রানী বুঝতে পারে, কী আছে এর ভেতরে। কাউকে দেখতে দেয় না, যদি নিয়ে যায়! সারাদিনের রোজগার করা অনেক কয়েন হয়ে যায় গীতা রানীর। কয়েনগুলো চিলেকোঠায় ওঠার আগে বদল করে নেয়, চা-দোকান থেকে। ভাংতি বা রেজকি রাখে না, ঝামেলা বাড়ে। মানুষের দেওয়া অর্থকড়ি যে, কোথায় রাখে তা কেউ বলতে পারে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে গীতা রানী বলে, ‘মরণের সুম কমুনে। অহনে জাইন্না কী করবি? অহনই লইয়া জাবিগা?’

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, গীতা রানীর দৈনিক রোজগারের টাকা পরিচিত একজনের কাছে জমা থাকে। “জয়কালে ক্ষয় নাই, মরণকালে ঔষধ নাই।” এই ভেবে মরণকালের কিছু খরচের জন্য এই বর্তমান সঞ্চয়। এবার পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষেও ছিল গীতা রানীর জন্য একটা ইনকিলাব। সে দিন গীতা রানী মন্দিরের সামনে ছিল না। ছিল চারতলার চিলেকোঠায়। গীতা রানীকে না পেয়ে এক চা-দোকানে জিজ্ঞেস করলাম, গীতা রানীর কথা। দোকানদার বললেন, ‘গীতা মাসি উপ্রে আছে। কিছু দিবেন বাবু? দিলে দিয়া যান, আমি পরে যাইয়া দিয়া দিমু।’

আমি আর দোকানদারের কাছে গীতা রানীর ইনকিলাবটা দিলাম না। সোজা গিয়ে ওঠালাম চারতলার চিলেকোঠায়, যেখানে গীতা রানী বসে থাকে। ওপরে উঠে দেখলাম, লক্ষাধিক মাছির আনাগোনা। সাথে পায়খানা প্রস্রাবের দুর্গন্ধ। গীতা রানী যেখানে বসে-বসে ঘুমাচ্ছে, তার চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছেঁড়া কাপড়চোপড়। চারতলার ছাদে ওঠতেই চিলেকোঠা, তার নিচে চারতলায় থাকা দুই ফ্যামিলি। এক ফ্যামিলির ঘরের দরজায় টোকা দিলাম। এক মহিলা বাইর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাকে চান?’
বললাম, গীতা রানী কি অসুস্থ?
বললেন, ‘হ্যাঁ, কেন?’ তার জন্য আমার অফিস থেকে একটা ইনকিলাব আছে, তাই। দেখছি উনি ঘুমাচ্ছে, অনেকক্ষণ ডেকেছি কথা বলে না। তাই আপনাকে বিরক্ত করলাম। বললেন, ‘উনি কানে শোনে না, তাই আপনার ডাকে সাড়া দেয়নি। কাছে গিয়ে জোড়ে ডাক দিতে হবে, তা হলেই শুনবে।’ তা যাবো, তো আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করলে কি উত্তর পাবো? বললেন, ‘পাবেন না কেন? পাবেন, বলেন কী বলতে চান?’ বললাম, গীতা রানী যে এখানে আছে, তার চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ময়লা। এগুলো কি এভাবেই থাকে? না কি এই ময়লাগুলো পরিষ্কার করার মতো তার কোনও আত্মীয় আছে।

বললেন, ‘ওনার কোনও আত্মীয়স্বজন এখানে নেই। ওনার থাকার জায়গাটা প্রতিদিন আমরাই পরিষ্কার করিয়ে দেই। চারতলার আমরা দুই ফ্যামিলি সুইপার দিয়ে পরিষ্কার করাই। কারণ, ওনার পায়খানা প্রস্রাবের গন্ধে আমাদেরই থাকতে অসুবিধা হয়। তাই নিজেদের টাকা দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে রাখি।’

কতদিন যাবত উনি এখানে থাকে? বললেন, ‘তা অনেক বছর হবে। কেউ নেই ওনার, তাই আমাদের একটু কষ্ট হলেও কিছু বলি না। শুনেছি গীতা রানী বিরাট বড়লোকের মেয়ে ছিল। বাবার বাড়ি ছিল, এই চৌধুরী বাড়ির বন্ধু সিনেমাহলের পাশেই।’
জিজ্ঞেস করলাম, এখন তার মা-বাবা আর কোনও ভাইবেরাদর নেই?
বললেন, ‘না।’

জিজ্ঞেস করলাম, তাদের যেই জায়গা সম্পত্তি ছিল, এখন ওইগুলো কে ভোগদখল করে?
মহিলা বললেন, ‘শুনেছি তার বাবার সম্পত্তির উপরে এখন বিরাট গার্মেন্টস। গীতা রানীর কোনও ভাই ছিল না। তাই পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা করার মতন কেউ ছিল না। এখন পরে খায়।’

এসব কথা তো আমি আগেও শুনেছি, এখন মহিলার মুখে আবার শুনলাম। যাক ভালোই হলো, ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। জানলাম, গীতা রানীর আগে সবই ছিল।

মহিলার কথা শুনে ভালো লাগল। ভালো লাগার কারণ হলো, স্রষ্টার পৃথিবীতে মানুষের মন আছে। তবে সব মানুষের নেই, আছে স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষের। যা হাতে গোনা শতকরা কয়েক জন। ভালো লোকের বেশি দরকার কী? কম হলেও চলে। একটা স্কুলে হাজার শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষক থাকে হাতে গোনা কয়েকজন। যতো শিক্ষার্থী ততো যদি শিক্ষক থাকতো, তা হলে কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলতো? মোটেই না। যেখানে শিষ্যের চাইতে গুরু বেশি, সেখান শিক্ষার চাইতে ক্যাচাল বেশি। তাই গীতা রানীর জন্য পুরো চারতলার দুই ফ্যামিলিই যতেষ্ট।
গীতা রানীর সামনে গিয়ে হাত দিয়ে তার শরীরে স্পর্শ করতেই সজাগ দৃষ্টিতে তাকালো।
বলল, ‘কেডা, কিল্লাগা?’

ইনকিলাবটা গীতা রানীর হাতে দিয়ে বললাম, এর ভেতরে টাকা আছে। এই কথা বলতেই, গীতা রানী বলল, ‘জানি-জানি, তুই ত আরো দিছস। তোর দেওনের টেকাগুলা ভালা, কসকচা। কই কাম করছ? আইস মাঝে-মাঝে দেইখা যাইস। বাছুম না, বেশি দিন বাছুম না। মইরা যামু রে মইরা যামু।’

গীতা রানীর কথা শুনে মনে পড়ে গেল, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত ভগবানের উক্তি-
“জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ”

মৃত্যু তো মানুষের একদিন হবেই, যেহেতু জন্ম হয়েছে। জন্মগ্রহণ করলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যুর হাত হতে পরিত্রাণ লাভের উপায় নাই। অনবরত পরিবর্তনশীল নশ্বর সংসারে সকলই অনিশ্চিত, কেবল মৃত্যুই নিশ্চিত। ছায়া যেমন বস্তুর অনুগামী, মৃত্যুও তেমনি দেহীর সঙ্গী।

একদিন তো আমারও এই সুন্দর পৃথিবীর মায়ামমতা ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। যেমনটা চলে গেলেন, আমার মা-বাবা, ভাই-বোন-সহ আরও অনেকে।

গীতা রানীর হাতে ইনকিলাবটা দিয়ে চিলেকোঠা থেকে নিচে নেমে আসলাম। নিচে দাঁড়ানো আছে সেই মহিলা, গীতা রানীর দিকে চেয়ে-চেয়ে হাসছে। আর বলছে, ‘এই মাইরা যামু, মাইরা যামু শুনছি তো অনেক বছরই হলো। কই দশ বছর আগে যেমন দেখেছি, এখনো একইরকম। তার পরও বলে মাইরা যামু, মাইরা যামু।’

আমার দিকে চেয়ে মহিলা বলল, ‘খরচ করে না, সব জমায়। আরও মানুষে দেয়, কাপড় চোপড় দিলে বিরক্ত হয়। তাই এখন আর কেউ কাপড়চোপড় নিয়ে আসে না, দেয়ও না।’

মহিলার সাথে কথা বলতে-বলতে সময় হয়ে গেল অনেক। এবার আমার অফিসে আসার পালা। আসার আগে মহিলাকে বললাম, কী আর করবেন দিদি, একটু দেখে রাখবেন। আপনি পরের জন্য যা করবেন, তা নিজের জন্যই জমা থাকবে। একজন অসহায় মানুষের জন্য করছেন তো স্বয়ং দেবতার পূজাই করছেন। সামনে শারদীয় দুর্গোৎসব। আবার হয়ত আসা হবে গীতা রানীর চিলেকোঠায়। কিন্তু যাওয়া হয়নি, শারদীয় দুর্গোৎসবে। হঠাৎ বড়দাদার মৃত্যু, ঠিক দুর্গোৎসব শুরু হবার ৭ দিন আগে। তাই আর যাওয়া হয়নি। আবার হয়ত সামনের ঈদ-উল-ফিতরে যাওয়া হবে গীতা রানীর চিলেকোঠায়।