ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

একজন মানসিক রোগির তৈরি করা একটি গেইম আজ সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে তুলেছে। ইউটিউবে আর অনলাইন পত্রিকা ঘেঁটে বোঝা যায় যে এটি আসলে কোনও গেইমই নয়। এটি হলো অনলাইনে একটি কমিউনিটি গ্রুপ- একটা ওয়েবসাইট মাত্র। এই ওয়েবসাইটের কমিউনিটি গ্রুপ বর্তমানে সারা বিশ্বব্যাপী। মনে হয় সাইটটি ফেসবুকের মতন একটা যোগাযোগ মাধ্যম। শোনা যায় গেইমটিতে সাইন আপ না করা পর্যন্ত আর প্রবেশ করা যায় না। সাইন আপ বা রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, তাদের শর্ত মেনে। শুনেছি রেজিস্ট্রেশন করাটাও নাকি এক বিরাট কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মানে অনেক পরিশ্রম আর অনেক চেষ্টার পর রেজিস্ট্রেশন করতে হয়।

আবার তাদের শর্ত মেনে রেজিস্ট্রেশন করার পর, সেখান থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে পারে না। সাইটটিতে নিবন্ধিত হওয়ার পরই ব্লু-হোয়েল গেইম সাইটে হয়ে যায় গ্রুপ সদস্য। শুরু হয় একের পর এক ধাপগুলো অতিক্রম করার পালা। খেলাটার শেষ ধাপ না-কি ৫০তম ধাপ। খেলার বিজয়ী হিসেবে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা আসে, স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা। শরীর শিউরে ওঠার কথা, কি অমানবিক নিষ্ঠুর খেলা এটি! সাইটটিতে কিছু সংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে চলে খেলার প্রতিযোগিতা।

আসলে আমার ধারনা মতে সাইটটিতে কোনও খেলাই নেই। আছে শুধু মেসেজের মাধ্যমে মনের ভাব আদানপ্রদান করা। আর আছে খেলাটি পরিচালনায় নিয়োজিত থাকা একজন এডমিন-এর আদেশ-নির্দেশাদি। সেই নির্দেশগুলো পালন করে থাকে রেজিস্টার হওয়া খেলোয়াড়বৃন্দ। কিন্তু কেন অপরের আর অজানার প্রতি আমাদের এতো উদাসী ভাব? যেখানে নিজের পিতা-মাতার কথাই অনেক তরুণ-তরুণী ঠিকমত শোনে না। সেখানে অপরিচিত একটা শব্দ তরঙ্গে মেতে ওঠা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। আগেকার মানুষ শিক্ষাদীক্ষায় ছিল কম, বোকা মানুষের হার ছিল বেশি। আর আমরা পা রেখাছি ডিজিটাল যুগে, শিক্ষার হার আগের তুলনায় অনেক বেশি। তারপরও একজন অপরিচিত লোকের কথায় কেন আমরা পাগল হয়ে যাই তা আমার এই ক্ষুদ্র মগজে আসে না। যাক সে কথা, এবার খেলাটির ইতিহাসের দিকে তাকাই।

গেইমটির ইতিহাস:
জানা যায় খেলাটির জন্ম রাশিয়ায়, জন্মদাতা ২২ বছরের তরুণ ‘ফিলিপ বুদেইকিন’। খেলাটি শুরু করেছিল, ২০১৩ সালের কোনও এক সময়ে। ‘ফিলিপ বুদেইকিন’ ছিলেন একজন প্রাক্তন মনোবিজ্ঞানের ছাত্র। শোনা যায় তিনি নাকি ছিলেন, একজন মানসিক রোগি। তার উদ্দেশ্য ছিল, যেসব তরুণ-তরুণী প্রতিনিয়ত আত্মহত্যার কথা ভাবে; তাদের জন্য একটা সুন্দর ব্যবস্থা করে দেওয়া। যাতে নিজেরাই নিজেদের জিবন বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। কারণ, যেসব তরুণ-তরুণী আত্মহত্যা নিয়ে মানসিকভাবে ভুগে, তারা কোনদিন এই সমাজের জন্য কিছুই করতে পারবে না। তাদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নাই, তারা সমাজের জঞ্জাল। সমাজ থেকে এই জঞ্জাল মুক্ত করতেই নাকি এই খেলা তৈরি করেছে, ‘ফিলিফ বুদেইকিন’। গেইমটির নাম রাখা রেখেছে (bule whale) বাংলায় ‘নীল তিমি’।

‘নীল তিমি’ নাম রাখার পেছনেও একটা যুক্তিও দেখা যায়। যুক্তি হলো শোনা যায় একসময় নাকি, নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল‍্যান্ডে কিছুসংখ্যক নীল তিমি তীরে ওঠে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে তিমিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল আত্মাহুতি দেওয়া। তীরে উঠেছে হয়ত অভিমান করে, না হয় খাদ্যাভাবে অতিষ্ঠ হয়ে। যাই হোক,পরে তিমিগুলোকে মানুষ সমুদ্রজলে ভাসিয়ে দিলেও নাকি বারবার ওরা তীরে ওঠে আসে। তা থেকে মানূষ বুঝে নিয়েছিল, তিমিগুলো স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিতে চায়। ওই ঘটনাকে অনুসরণ করেই মনোবিজ্ঞানী ‘ফিলিপ বুহেইকিন’ খেলাটির নাম রাখে ‘নীল তিমি’। স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি বা আত্মহত্যা করাই এই খেলার মূল লক্ষ্য। ভয়ংকর এক নাম (bule whale) ‘নীল তিমি’। খেলার ধাপ থাকে ৫০টি, সময় অতিক্রম করে ৫০ দিন বা তারও বেশি। চূড়ান্ত বিজয়ী পুরস্কার গ্রহণ করে, নিজের জীবন দিয়ে।

maxresdefault-1-701x394

 

আবার খেলাটিও নাকি ভয়ংকর। খেলোয়াড় যখন খেলার সাইটে থাকে, তখন কিনা ভূতের ছায়াছবির ভয়ংকর শব্দ তরঙ্গ কানে আসে। খেলা চলে আর শব্দের তালেতালে খেলার এডমিনের সাথে কথাও চলে। এই ভয়ংকর মরণ খেলায় আসক্ত এখন ভারত-সহ আমাদের বাংলাদেশও। গোয়েন্দারা না-কি জানতে পেরেছেন, ৫০ দিনের এই গোটা সময়ে খেলোয়াড়দের বোঝানো হয় দুনিয়ার নেতিবাচক দিক সম্পর্কে। এক কথায় ব্রেন ওয়াশ করে ফেলা হয়। খেলোয়াড়দের বোঝানো হয়, জীবনে বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই। এই কথাটি কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এরপর খেলার ৫০তম ধাপে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, নিজের জীবন খতম করে দিতে। এমনও শোনা যায়, ৫০তম ধাপ অতিক্রম করা অনেকেই আত্মাহুতি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তখন কিনা খেলোয়াড়ের পিতা-মাতাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এসব আদেশ নির্দেশ হুমকি ধমকি দেওয়া হয়, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপের মতো জনপ্রিয় স্যোশাল প্লাটফর্ম থেকে।

আমার দেখা ও ভাবনা:
আমি নিজে এই খেলাটি কখনো খেলে দেখিনি। জানিও না এর নিয়মকানুন। শুধু লোকমুখে শোনা আর বিভিন্ন অনলাইন ভিত্তিক পত্রপত্রিকা ঘেঁটে জানা। আমি ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে নিয়মিত একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। অথচ এই গেইম বা খেলাটির খবর নজরে আসে গত কয়েকদিন আগে। রাজধানীর ধানমণ্ডির মেধাবী ছাত্রী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার আত্মহত্যার খবরের মধ্যদিয়ে। খবরটা দেখতে পাই গত ১০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের অনলাইন নিউজ যুগান্তরে। শুধু আমি একা শুনবো কেন? শুনেছে এই বঙ্গদেশের সকলেই। যা পত্রপত্রিকা আর টিভি নিউজেও প্রকাশ। এরপর আমার কৌতুহল সৃষ্টি হয়, খেলা বিষয়ে কিছু জানতে। দেশের নামকরা কয়েকটা অনলাইল ভিত্তিক নিউজ পড়ে বিস্তারিত জানলাম।

আবার ইউটিউবেও এ বিষয়ে বহু ভিডিও চোখে পড়ল। দেখলাম কীভাবে এই খেলা খেলতে হয় এবং খেললে কী হয়। জানলাম ৫০তম ধাপের আগেপাছে কী থাকে, এসব ভিডিও। এসব দেখে আর লেখা পড়ে রীতিমত অবাক হয়ে যাই। অবাক হলাম এই কারণে যে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় মৃত্যু এতো সস্তা কেন? অবাক হলাম খেলাটির আবিষ্কারক ফিলিপ বুদেইকিনকে নিয়েও। একটা মানসিক রুগী হয়েও কীভাবে মানুষের জিবন কেড়ে নেওয়ার কল তৈরি করে ফেললো? তার কথামত আজকের দুনিয়ার শতশত মানুষ স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিচ্ছে। এটা কি অবাক হবার কথা নয়? নিশ্চয় অবাক হওয়ার মতো। একজন মানসিক রুগীর কথায়, মুহূর্তেই সবাই মানসিক রুগী বনে যাচ্ছে।

আত্মহত্যা বা আত্মাহুতি এই দুনিয়া সৃষ্টিলগ্ন থেকেই চলছে। কেউ অপমানে, কেউ অভিমানে। আবার কেউ লজ্জা নিবারণের কারণে, কেউবা মনের ক্ষোভে। কেউ বিষপানে, কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়ে। আবার কেউ-কেউ ছাঁদ থেকে লাফিয়ে পড়ে, কেউ আবার চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাঁপ দিয়ে। কিন্তু কখনো শুনিনি একজন অপরিচিত লোকের আদেশে কেউ আত্মহত্যা করেছে। আমার স্ত্রী আমাকে খুবই ভালোবাসে, আমার অনুপস্থিতিতে সে নিজের খাবারও কখনো খায় না। এখন আমি যদি আমার স্ত্রীকে বলি, ‘তুমি যদি আমাকে সত্যিকার ভালোবাসো, তা হলে তুমি আত্মহত্যা করে আমাকে দেখাও।’ আমার ভালোবাসার মানুষটি কি আমার এই কথা রাখবে? একেবারেই না।

আবার কারোর আদরের সন্তান যদি তার পিতাকে বলে, ‘বাবা তুমি আমাকে যদি ভালোবাসো, তা হলে তুমি আত্মহত্যা করে আমাকে দেখাও।’ তখন আদরের সন্তানের কথায় কি পিতায় আত্মহত্যা করবে? কখনোই করবে না। পৃথিবীতে মানুষ মানুষের আদেশ-নির্দেশাদি শুনে, কিন্তু আত্মাহুতি দেওয়ার নির্দেশ কেউ মেনে নিবে না। তা-ই যদি হয়, তা হলে জীবনে যাকে দেখিনি তার কথায় কেন আমি আমার মূল্যবান জীবনটা শেষ করে দিবো? এসব ভাবতেও নিজেকে বোকা মনে হয়। আমি এই প্রথম শুনলাম, একজন অপরিচিত লোকের আদেশে আত্মহত্যার করার কথা।

এটা কী এমন খেলা, কী এমন শপথবাক্য। যা পাঠ করলেই একজন অপরিচিত লোকের নির্দেশ মেনে চলতে হয়? আর নিজের জীবন বিসর্জন দিতে হয়? পরের কথায় বা নির্দেশে কেন-ই-বা এই পথ অনুসরণ করে? উত্তর গুলো খুঁজতে গেলে নানাবিধ উত্তর মনের মাঝে সারিন্দার মতো বাজতে থাকে। মনে পড়ে আমার ছেলের কথা। আমার ছেলেও এই দুনিয়ার মায়ামমতা ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিল আত্মাহুতি। তবে সেসময় এই খেলার নামও ছিল না। তখনকার সময়টা ছিল ২০১১ সালের মাঝামাঝি। আর এই মরণ খেলার আবির্ভাব হয়েছিল ২০১৩ সালে। এখন যদি হতো, তা হলে আমি নিজেও এই মরণাস্ত্র ব্লু-হোয়েল খেলাকেই দায়ী করতাম। শুধু আমি কেন, এখন থেকে সারা দুনিয়ায় যদি কোনও অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে; তা হলে সবাই এই ব্লু-হোয়েল খেলাকেই দায়ী করবে। যাই হোক, আমি এই খেলা সম্পর্কে বেশকিছু অনুমান করতে পেরেছি_কেন এই আত্মহত্যা? সোজা কথায় খেলার পরিচালকদের কাছে ফেঁসে যাওয়া বা বিক্রি হয়ে যাওয়া।

তার মানে এই মরণ খেলায় শর্ত হলো, তোমাকে আমার আদেশ মানতে হবে। আদেশ মেনে চললে তোমাকে পুরস্কৃত করা হবে। সেই পুরস্কার হবে পৃথিবীর সেরা পুরস্কার। তুমি আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে, তুমি পাবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। এসব কথা শুনে খেলোয়াড় প্রথম ধাপেই লোভে পড়ে যায়। তখন উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী খেলোয়াড়দের মনে জাগে কৌতুহল। আর কৌতুহল থেকে নেশা, নেশা থেকেই হয়ে পড়ে নেশাগ্রস্ত। তখন খেলোয়াড়ের মনে-মনে আনন্দ আর মহানন্দ, স্বপ্ন দেখে রাজা বাদশাহ হবার।

আমার মনে হয়, এসব লোভ ব্লু-হোয়েল খেলার এডমিনরা খুবই সুন্দরভাবেই বুঝায়। যার কারণে অতি তাড়াতাড়ি খেলোয়াড়ের ব্রেন ওয়াস হয়ে যায়। তারপর চলে তাদের খেলা, শুরু হয় খেলোয়াড়কে বোকা বানানোর পালা। নির্দেশ আসতে থাকে একের পর এক। খেলোড়ারও যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলে, এডমিনের নির্দেশ রক্ষা করতে।
দ্বিতীয় ধাপে কিছু পরীক্ষা। যেমন, নিজের হাত কেটে নীল তিমির ছবি আঁকা। নিজের শরীর ব্লেড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেখানো-সহ আরও অনেককিছু।
তৃতীয় ধাপেও কিছু নির্দেশনা। যেমন, রাতের বেলায় একা-একা বাড়ির ছাদে যাওয়া। গভীর রাতে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাটা। মা-বাবার নির্দেশ অমান্য করে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা। ধারণা করা যায়, এসব নির্দেশ দিয়ে খেলোয়াড়কে সাহস বাড়িয়ে দেওয়া।
চতুর্থতম ধাপে কগেলোড়ারের কাছে কিছু চাওয়া। যেমন, খেলায় নিয়োজিত থাকা এডমিনদের কিছু চাওয়া পূরণ করতে গিয়েই, খেলোয়াড় ফেঁসে যায়। যা আর শত চেষ্টা করেও তাদের কাছ থেকে সরে থাকতে পারে না। সরতে চাইলেই বিপদ, না হয় কেলেঙ্কারি। কী চায় তারা?

তারা হয়ত চাইতে পারে খেলোয়াড়ের প্রেমিকার ছবি। চাইতে পারে মা-বাবা ভাইবোনের ও আত্মীয়স্বজনের ছবি। চায় মোবাইলের আইএমই (IMEI) নম্বর, চায় ব্যাংক একাউন্ট নম্বর-সহ আরও গোপনীয় অনেককিছু। খেলোয়ার মনের আনন্দে তার মূল্যবান জীবনের সবকিছুই তাদের মাঝে শেয়ার করে দেয়। জীবন হয়ে যায় শূন্য, পড়ে যায় মহা বিপদে, আর চিন্তায়। পরিত্রাণ পেতে মুক্তি চায়, পায় না। মুক্তির বদলে খেলোয়াড় পায় হুমকি-ধামকি। তখন খেলোয়াড়ের কাছে তার জীবনটাই এক জ্বালাময়ী হয়ে ওঠে। কলঙ্ক থেকে রেহাই পেতে বাধ্যতামূলক খেলোয়ার তখন আত্মহত্যাকেই বেছে নেয়।

আমার ধারণা, এই মরণব্যাধি খেলার ৫০তম ধাপের আগেই খেলোয়াড় আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু জীবন তো একটাই, সহজে কেউ এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায় না। বাধ্য হয়েই আত্মাহুতি বা আত্মহত্যার পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু কেন? মানুষ তো বাঘের সাথে লড়াই করেও দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে চায়। প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে মানুষ মানুষের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। আর একটা অনলাইন ভিত্তিক খেলা খেলে শিক্ষিত মেধাবী তরুণ তরুণীরা আত্মহত্যা করছে। তথ্যপ্রযুক্তির স্মার্টফোনে গেম খেলার পরিণতি এতটা ভয়ানক হতে পারে তা কজনে ভেবেছিল। কিন্তু এখন ভাবতে হচ্ছে, তা দেখতেও পারছে। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আতংকের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে (bule whale) ‘নীল তিমি’ খেলা। কেড়ে নিচ্ছে অনেক তরুণ-তরুণীর তাজা প্রাণ।

এসব শুনে বা দেখে বোঝা যায়, আমাদের বাংলাদেশেও এই খেলার একটা গ্রুপ আছে। তারা গোপনে বসে এই মরণ খেলাটি পরিচালনা করছে। বুঝা যায় এই কারণে যে, ফেসবুকে “bule whale” লিখে সার্চ করলেই, এর দেখা মেলে। এই “bule whale” game BD পেইজে ক্লিক করলেই বলা হয় জয়েন্ট গ্রুপ। কিন্তু আমি সেখানে ভয়ে ক্লিক করিনি, শুধু দেখেছি মাত্র। আবার বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগল প্লে’তে সার্চ করলেও এর আপ্লিকেশন দেখা যায়। আমি ওই আপ্লিকেশনও নিজের মোবাইলে বা ল্যাপটপে ইন্সটল করিনি। শুনেছি এই এপ্লিকেশন বা সফটওয়ার ইন্সটল করলে আর আনইন্সটল করা যায় না, তাই।

বলতে হয় আতঙ্কের পুরো নাম (bule whale) ‘নীল তিমি’ আত্মহত্যার খেলা। যেখানে একজন শিক্ষিত মেধাবী মানুষকে অতি সহজে বোকা বানিয়ে ফেলছে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায় খেলাটির পরিচালক। খেলাটি খেলতে খেলতে ব্যবহারকারীরা একসময় আসক্ত হয়ে পড়ে। নেশাগ্রস্ত একজন মানুষের মতো নেশায় বুদ হয়ে যায়। সে কারুণেই এক সময় আত্মহত্যা করতেও হৃদয় কাঁপছে না তাদের।
জানা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই মরণ খেলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা ইতিমধ্যে স্কুল কলেজ-সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণা চালাচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের এ খেলা থেকে বিরত রাখার জন্য নানাবিধ পন্থা অবলম্বন করছে। ভারতের মতো দেশর বিশেষজ্ঞরাও রীতিমত চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

যেখানে চিন্তিত হয়ে পড়ছে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা। সেখানে আমাদের বাংলাদেশের হাইকোর্ট ব্লু হোয়েল গেমটি বন্ধে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এতে বলা হয়, ‘ব্লু হোয়েলসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী এ জাতীয় সব গেমের লিংক কেন বন্ধ করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।’ তারপরেও গুগল প্লে স্টোরে আর বিভিন্ন সাইটে এই গেইমের আপ্লিকেশন দৃশ্যমান। ফেসবুকেও দেখা যায়।

কিন্তু এগুলো এখনো বন্ধ হয় না কেন? এই মরণঘাতী খেলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না কেন? আশা করি সরকার সময়মত এ বিষয়ে একটা পদক্ষেপ নিবেন। প্রচারণা চালাবেন, পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আর টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ রইল, বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে এই মরণ খেলার যাবতীয় সাইট বা এপ্লিকেশন সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিন। নাহয় আরও শিক্ষিত মেধাবী তরুণ-তরুণীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। আর দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিৎ, এই মরণঘাতী খেলার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। নিজের সন্তান নিজে দেখা, পাড়া-পড়শী তরুণ-তরুণীদের বুঝিয়ে বলা।

এই খেলা থেকে বিরত থাকতে হলে কী করতে হবে?

☛ প্রথমত চাই নিজের সচেতনতা। কেন আপনি অপরের কথায় বা নির্দেশনায় নিজের সাহস দেখাতে যাবেন? যাকে আপনি চেনেন না, জানেন না এমনকি কখনও দেখেননি; তার কথা শুনতে যাবেন কেন? জন্মদাতা পিতা আর গর্ভধারিণী মায়ের কথাই তো সময়সময় শোনেন না। তা হলে অপরিচিত অদৃশ্যমান একজনের কথায়, কেন নিজের জীবন অকালে বিলিয়ে দিবেন!

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে:
☛ আপনি যখন এন্ড্রয়েড মোবাইল বা ল্যাপটপে সক্রিয় থাকেন, তখন অজানা অচেনা অনেক লিংক সামনে এসে পড়বে। ওইসব লিংক দুষিত পানির মতো বিষাক্ত। মোবাইলের জন্যও ক্ষতিকারক, আবার ল্যাপটপের জন্যও ক্ষতিকর।
ওইধরনের কোনও লিংক আসলে সেগুলোকে এড়িয়ে চলুন। আর ইদানীংকালে তো ব্লু-হোয়েল যে কী? তাতো সকলের-ই জানা। তা থেকেও অন্তত ১০০ গজ দূরত্ব বজায় চলবেন। এই মরণ ফাঁদ ব্লু-হোয়েল খেলাটি বর্তমানে বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হতে চলছে, কিন্তু এর কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। এমনকি এই খেলার গ্রুপ লিডারদেরও শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাই বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, এই নিষিদ্ধ আর বিষাক্ত খেলা থেকে বিরত থাকুন।

☛ যারা এখনো ইন্টারনেট সম্পর্কে জানে না, বুঝে না, তারা হয়ত এ বিষয়ে অজ্ঞ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০/৮০ ভাগ মানুষেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। তারা তো বুঝেন, জানেন। তাদের উচিৎ সমাজের তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে, সব বয়সীদের মাঝে এই গেমের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে বলা। এই খেলা মরণ ফাঁদ, অনলাইনে নিষিদ্ধ খেলা_এসব বিষয়ে প্রচার করা।

খেলায় আসক্ত হয়ে পড়া ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কিছু কথা:
☛ যারা এখনো গোপনীয়তা অবলম্বন করে এই মরণ খেলা খেলছেন। যদি মনে করে থাকেন যে, আর কিছুদিন পরই আমি খেলায় বিজয়ী হয়ে যাবো। মানে আমাকে জীবন বিসর্জন দিতে হবে বা আপনিও নিজে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনুরোধ করে আর মিনতি করে বলছি, অপরের কথায় আপনার মূল্যবান জীবনটা শেষ করবেন না। আপনার জন্মদাতা পিতা আর গর্ভধারিণী মায়ের বুক খালি করবেন ননা। ওদের যন্ত্রণায় যদি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন, তা হলে দেরি না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়জিত পুলিশকে জানান। ধৈয্য ধরে লজ্জা আর কেলেঙ্কারকে তুচ্ছ মনে করে, নিজের সুন্দর জীবনটাকে রক্ষা করুন। সাতসমুদ্র তেরো নদীর পাড় থেকে হুমকি ধমকি দিয়ে আপনাকে কিছুই করতে পাড়বে না। নিজে বলতে না পড়লে বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতা নিন। আপনার এই মূল্যবান সিদ্ধান্তে আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জীবন রক্ষার সহায়ক হবে।

অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলছি:
☛ আপনার সন্তানের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন। খেয়াল রাখুন, সে অবসরে এন্ড্রয়েড মোবাইল দিয়ে কী করে? কোথায় কার সাথে বসে টাচস্ক্রীন মোবাইল টিপে। বন্ধুমহলে থাকা ভালো, থাকলে সমস্যা নেই। কারণ, এই সুইসাইড খেলাটা যে খেলে, সে একা একা বসেই খেলে। দেখার প্রয়োজন, সন্তান যাতে একা একা দীর্ঘসময় ধরে মোবাইল বা ল্যাপটপ না চালায়। আরো খেয়াল রাখবেন, নিজ ঘরে বেশি রাত পর্যন্ত যেন মোবাইল, ল্যাপটপ, বা পিসিতে বেশি সময় না কাটায়। মোবাইলে ও কম্পিউটারে অধিক সময়ে একাকী বসে থাকতে দেখলে, খেয়াল করুন সে কি করছে। সন্তানকে কখনও একাকী বেশি সময় থাকতে না দেয়া এবং এই সব খেলার কুফল সম্পর্কে বলা।

☛ আপনার সন্তানকে ভালোবাসতে ভুলবেন না। আপনার সন্তান আপনার ভবিষ্যৎ, দেশেরও ভবিষ্যৎ। সামান্য ব্যাপারে সন্তানের সাথে অযথা রাগারাগি পরিহার করুন। সামান্য একটু রাগ দেখানোর ফল, কুফলে পরিণত হতে পারে। সন্তানকে আদর দিয়ে যা করাতে পারবেন, রাগ দেখিয়ে তা করাতে পারবেন না। সন্তানদের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মানসিকতা সৃষ্টি করুন। যাতে করে তারা বুঝতে পারে, আত্মহত্যা করা বা নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করা অনেক বড় পাপের কাজ। আপনার সন্তান ও পরিবারের অন্য কোন সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কি না সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখুন। কেউ যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় থাকে, তবে তার সাথে খারাপ আচরণ না করে তার সাথে সঙ্গ দিন। আপনার সামান্য সময় আর একটুখানি ভালোবাসায় সন্তানের মনমানসিকতা পরিবর্তন হতে সাহায্য করবে।

সবশেষে:
বিভিন্ন ওয়েবসাইট ভিত্তিক তথ্যানুসন্ধান সাইট দেখে বুঝা যায়, এই ‘নীল তিমি’ নামক খেলাটি ভয়ংকর। এর সুফল বলতে কিছু নেই, আছে শুধু কুফল। কারণ, এই খেলাটির আবিষ্কারক হলেন একজন মানসিক রুগী। তার মন বলতে কিছু নেই, হৃদয় বলতেও কিছু নেই। তার প্রমাণ মেলে এই মরণঘাতী খেলা আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে। এমনিতেই একজন মানসিক রুগীর সাথে কথা বলা ঠিক নয়। কারণ, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ যে কোনও সময় খেপে যেতে পারে, তাই। জানা যায়, এই মানসিক রুগী ‘ফিলিপ বুদেইকিন’ একবার তার স্কুলে অপমানিত হয়েছিল। সেই অপমানে ক্ষিপ্ত হয়েই ‘ব্লু-হোয়েল’ বা ‘নীল তিমি’ নামের খেলাটি তৈরি করেছে। তা হলে আমরা আমাদের কৌতুহলী মন নিয়ে কেন এই খেলাটি খেলবো? এই মরণ ফাঁদ খেলার চেষ্টা না করাই ভালো। জেনে রাখা ভালো যে, কৌতুহল থেকেই নেশাতে পরিণত হয়। আর নেশাই হয়তো ডেকে আনতে পারে নির্ঘাত মৃত্যু।

অতএব, মিনতি করে বলছি, দয়া করে এই খেলাটি কেউ খেলবেন না; কাউকে খেলতেও দিবেন না। এর কুফল সম্পর্কে সবাইকে বুঝিয়ে বলুন। যাতে কেউ এই মরণ খেলা না খেলে।

এ বিষয়ে লেখাটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ধারণা থেকে লেখা।