ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

p20171105-185828 জোকার সেজে পানের থালা হাতে, আমার অফিসের সামনে জোকার সোলেমান।

জীবিকার সন্ধানে মানুষ কতরকম চেষ্টা করে! কেউ সাজে ভিখারি, কেউ সাজে ফকির-সাধু। কাউকে আবার বিকলাঙ্গও সাজতে দেখা যায়। সমসময় কেউ পাগল সেজেও মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু চায়। কিন্তু কেউ কি দেখেছেন, কাউকে জোকার সেজে জীবিকা নির্বাহ করতে? কেউ হয়ত দেখেছেন, আবার অনেকেই হয়ত দেখেননি। আমি আজকে আপনাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিব, একজন জোকারের সাথে।

তিনি চিত্রজগতের টেলিসামাদ বা প্রয়াত কৌতুকাভিনেতা দিলদারের মতো জোকার নয়। তবে একবার ‘লাভ হিস্টরি’ নামের এক ছায়াছবিতে সাইট জোকার ছিলেন। এ-ই ছিল তার জীবনে চলচ্চিত্রে জোকারী অভিনয় করা। চলচ্চিত্রে জোকারী অভিনয় করার অনেক শখ ছিল তার। কিন্তু আর কখনো কোনও চলচ্চিত্রে, তিনি অভিনয় করার সুযোগ পাননি। ঢাকা বিএফডিসি গেইটের সামনে, বহুবার তিনি গিয়েছিলেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি, হয়েছে শুধু তার অর্থনাশ।

চলচ্চিত্রে সুযোগ না পেলেও তার কোনও দুঃখ নেই। তবু থেমে নেই তার জোকারীবানা। নেই তার মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কোনও কৃপণতা। কোনও কাজ না থাকলেও, তিনি জোকারের পোষাক পড়েই ঘর থেকে বের হয়। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে সবখানেই চলে তার জোকারী। তার জোকারী দেখে মানুষ হাসে, আনন্দ পায়, এটাই তার বড় আনন্দ। আর সবাই তাকে জোকার বলে ডাকে, তাতেই তিনি খুশি।

বলতে পারেন, ‘তবে তিনি কে এবং নামটা-ই-বা কি?’ তিনি হলেন, আমাদের নারায়ণগঞ্জ সিটির ‘তল্লা’ এলাকার, একজন জোকার। নাম মোহাম্মদ সোলেমান, জোকারী যার পেশা। স্থায়ীভাবে বসবাস, নারায়ণগঞ্জ সিটির তল্লা এলাকায়। কোনও একসময় সোলেমানের বাবার ভিটেমাটি ছিল, এখন নেই। যা আছে, তা কোনোএক ভূমিদস্যু তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল করে খাচ্ছে। জোকার সোলেমান এখন বউবেটি নিয়ে পরের বাড়ি ভাড়া থাকে। জীবিকা নির্বাহ শুধু জোকার সেজে, নেচে-গেয়ে কিছু করা।

জোকার সোলেমানকে দেখা যায়, কোনও নির্বাচনী প্রচারে। তা-ও মিছিলে থাকা সবার আগে। কখনো কোনও পণ্যসামগ্রীর প্রচারের গাড়ির উপরে। কখনো সাজে ঝালমুড়িওয়ালা, কখনো সাজে চানাচুরওয়ালা। জীবন বাঁচানোর তাগিদে বহু সাজে সজ্জিত হয়েছিল, জোকার সোলেমান। ওইসব আর জোকার সোলেমানের কাছে ভালো লাগে না। সবাই তাকে ব্যবহার করে, বিনিময় দেয় সামান্য। যার নির্বাচনী প্রচার করেছিল, নির্বাচনে পাশ করে আর সোলমানকে চেনে না। তাই এবার জোকার সোলেমান সেজেছে, সুস্বাদু মিষ্টি পানওয়ালা। প্রতি খিলি মিষ্টিপান, মাত্র ৫ টাকা। পানের খিলিগুলো নিজ হাতে বানিয়ে, একটা থালায় সাজিয়ে বের হয় মহল্লায়। নিয়ম করে একেকদিন, একেক মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়। বিক্রি করে জোকারী পোশাক পড়ে। গলায় থাকে মোটা চেইন, তার সাথে ঝুলানো থাকে ঘড়ির লকেট। থাকে মানুষকে গান শোনানোর জন্য, মাইকের মাউথ বা স্পিকার। দুপায়ে বাধা থাকে নর্তকীদের মতন, ঘুংগুর। জ্যকার সোলেমান রাস্তা দিয়ে হাটলেই, বেজে ওঠে ঘুংগুরের শব্দ। তখন সবাই বুঝতে পারে, জোকার সোলেমান হেঁটে যাচ্ছে।

p20171105-185802 জোকারী পোশাক পড়ে একটা প্রাইমারি স্কুলের সামনে। গান শোনাচ্ছে স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের।

 

পোশাকটা তৈরি করেছে, নিজের মনোমত করে। হরেকরকম রঙিন কাপড়ের মাঝে কুচি দেওয়া তৈরি পোশাক। হাতে মিষ্টিপানের বড় থালা, আর সাথে তার জোকারী নাচ। আবার মাঝেমধ্যে নাচের সাথে জোকারী গানও গায়। গলার কন্ঠও দারুণ মিষ্টি, সবাই তার গান মন দিয়ে শোনে। বেশিরভাগ গানগুলো গেয়ে থাকে, কৌতুকাভিনেতাদের গাওয়া গান। প্রতিদিন ২০০টি পানের খিলি বানিয়ে, থালায় ভরে বের হয়। যে ব্যক্তি তার কাছ থেকে একটা পান কিনবে, তাকেই তিনি একটি গান শোনাবে। খরিদ্দার নাচতে বললে, জোকার সোলেমান নাচবে গাইবে। এখানে জোকার সোলেমানের নাচগানের একটা ভিডিও দেখুন।

সারাদিনের অর্ধেকবেলায় তার তৈরি করা মিষ্টি পানের খিলিগুলো সবই বিক্রি হয়ে যায়। বিকালবেলা খালি থালা হাতে নিয়ে নাচতে-নাচতে ফিরে বাড়ি। সাথে নিয়ে আসে সংসারে থাকা বউবেটির জন্য খাদ্যসামগ্রী। চালডাল, আটা লবণ-সহ তরিতরকারি। গত কয়েকদিন আগে আমার অফিসের সামনে জোকার সোলামানের সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছেন?’ জবাবে জোকার সোলমান বললেন, ‘ভালো আছি, পান খাবেন?’ বললাম, হ্যা খাবো।

জোকার সোলেমান পান দিতে-দিতে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাচ্চাকাচ্চা কয়জন?

জোকার সোলেমান বললেন, দুই মেয়ে, এক ছেলে। মাইয়া দুইডা বড়, আর ছেলেডা ছোড।

এরপর একটা পান আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, খাইয়া দেহেন না বাবু, খুব মাজা। একটা খেলেই, আরেকটা খাইতে মন চাইবো।
এই কথা বলেই, শুরু করে দিলো তার নাচ, আর গান। ‘দিওয়ানা বানাইয়া, খাইছে মোরে গিল্লা। এখন আমি কোথায় যামু হায়_হায় গো…।’

জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন ছায়াছবির গান? উত্তরে জোকার সোলেমান বলল, ক্যান, টেলিসামাদের ‘মতি মহল’ ছায়াছবি দেহেন নাই?
বললাম, ‘দেখেছি, তবে গানের কথাগুলো ছিল ভিন্ন। এখন যে গানটা গাইলেন, এটা কি আপনার নিজের বানানো গান?’
জোকার সোলেমান বললেন, হ বাবু হ, এইডা আমি বানাইয়া গাইছি। ক্যান, ভালো লাগে নাই? আমি হেসে বললাম, সত্যি ভালো গেলেছে, আপনার গান আর নাচ।

পানের দাম দেওয়ার জন্য তার হাতে ১০ টাকার একটা নোট দিলাম। জোকার সোলেমান, আমাকে ৫ টাকা ফেরৎ দিতে চাইলেন। আমি বললাম, এই ৫ টাকা রেখে দেন। সময়মত এক কাপ চা পান করে নিবেন। জোকার সোকেমান বললেন, আরেকটা পান দেই?

আমি বললাম, আপনার পানের দাম ৫ টাকা, আর আপনার নাচগান দেখার মূল্য ৫ টাকা।
জোকার সোলেমান বললেন, না বাবু, এ তো আমার ব্যবসার পুঁজি। নাচগান না করলে মানুষ আমার মিষ্টিপান খাইতো না। এই লন, আপনের ৫ টাকা।

আমার বেশি দেওয়া ৫ টাকা, জোকার সোলেমান আর নেয়নি। জোকার সোলেমান কারও কাছে দান-দক্ষিণাও চায় না। কাউকে কাছেও ডাকে না। সবাই তার ঘুঙুরের ঝংকারে, তার সামনে আসে। যে ব্যক্তি পান খায় নাা, সেও একটা মিষ্টিপান কিনে খায়। কোনও খরিদ্দারের উপস্থিতি নাই, তাতে কী হয়েছে? একা একাই পানের থালা হাতে নিয়ে নাচতে শুরু করে। তখন আর খরিদ্দারের অভাব হয় না। সৎভাবে থেকে, মানুষকে আনন্দ দিয়ে যেটুকু পাবার, সেটুকুতেও সে মহা খুশি। মানুষের আনন্দই জোকার সোলেমানের আনন্দ। বেঁচে থাকুক জোকার সোলেমান, থেমে যেন না যায় তার জোকারী নাচগান। জয় হোক মেহনতি মানুষের।