ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 
IMAG1504_1

আমার অফিসের সামনের মহল্লার একটা বাড়ির সাইটে এই বাচ্চা দুটো। অপেক্ষা শুধু মায়ের জন্য। কখন মা আসবে, আর কখন দুধ পান করবে। কেউ সামনে গেলেই ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকে। ওরা মনে করে, এই যেন আমাদের মা এসেছে।

এই প্রাণিগুলো পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের কাছে অবহেলিত। এদের মধ্যে নামমাত্র কিছু উঁচু গোত্রের অল্পসংখ্যক প্রাণী থাকে আদরে। আর সবই থাকে অনাদরে আর অবহেলায়। এই প্রাণীটির নাম কুকুর। আমরা অনেকেই সোজা কথায় কুত্তা বলে ডাকি। এদের ইংরাজিতে কি যেন বলে? তা লিখে আমি সবাইকে ছোট করতে চাই না। কারণ, এগুলোর ইংরেজি শব্দ লিখবার শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার নেই। শুধু জানি এগুলো কুকুর, কথা বলতে পারে না। কথা না বলতে পাড়লেও, এরা মানুষের চোখ এবং হাতের ইশারা সবই বুঝে। বুঝে না শুধু বেঈমানি। থাকে না কোনও মিথ্যা প্রচারণায়। এদের মতন আরও অনেক-অনেক প্রাণি-ই আছে, আজও আমাদের কাছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য। এদের নিয়ে আমি কোও গবেষণা করছি না। আর এদের নিয়ে গবেষণা পর্যালোচনা করার মতন ডিগ্রিও আমার নেই। গবেষণা করার অভিজ্ঞতা ছাড়া, কুকুর বিড়াল নিয়ে কোনও গবেষণা করা যায় না। যদিও করি, তা হলে সাহায্য নিতে হবে বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিল গুগল অথবা উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ার। এসব সাইটের তথ্য নিয়ে কিছু লিখলে আবার সেই লেখা ব্লগে প্রকাশ হবে না। কেননা, এসব তথ্যানুসন্ধান সাইটগুলোর লিংক সংযোজন আমি করতে পারি না, তাই। তাই শুধু এদের নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছি মাত্র।

এরা গৃহপালিত প্রাণী গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ভেড়ার মতন গৃহপতি পশু নায়। তবু অনেক গৃহস্থ শখ করে এদের আদর করে বাড়িতে রাখে। শুনেছি কুকুর নাকি সবসময় গৃহস্তের মঙ্গলকামনাই করে থাকে। এ বিষয়ে আমার মা বলতেন, “কুকুর সবসময় কামনা করে গৃহস্তের উন্নতি হোক, আমি কুকুর তিনবেলা ভাতের মাড় (ফেন) পাবো।” মা আরও বলতেন, “কুকুর বিড়াল হলো বাড়িঘরের লক্ষ্মী। এসব প্রাণী বাড়িতে না থাকলে, বাড়ির শোভাই থাকে না।”

আমি ছোটবেলায় দেখেছি, মা শখ করে একটা বিড়াল পোষতেন। বিড়ালটি ছিল সাদা রঙের। আমার বড়দিদিরা বিড়ালটিকে সবসময় জামা পড়িয়ে রাখতেন। গলায় পড়িয়ে দিতেন, লাল মুতির মালা। বিড়ালটি আমার মা এনেছিলেন, এক ঠাকুরবাড়ি থেকে। মা আদর করে সেই বিড়ালটির নামও রেখেছিলেন, মনি। বিড়ালটি এতই পোষ মেনেছিল যে, আমার মায়ের প্রায় সব কথাই ও বুঝত। মনি বলে ডাক দিতে দেরি, ওর আর কাছে আসতে দেরি হতো না। রান্নাঘরের সবকিছু খোলা থাকলেও, ভুলেও বিড়ালটি কিছু ছুঁয়ে দেখত না। শীতের রাতে আমাদের পোশা বিড়ালটি আমাদের সাথে ঘুমাত। অনেক সময় বিড়ালটি নাকের ডাকের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যেত। সে-যে কি শব্দ! ঘুরর ঘুরর, যেন এক হাপাঁনি রুগীর নাকের ডাক। আমার মা আমাদের বাড়িতে কুকুরও পোষত। তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে চোর-ডাকাতের উপদ্রব বেশি ছিল, তাই। কুকুরের ডিউটিই ছিল, দিনেরাতে বাড়ি পাহারা দেওয়া। রাতেরবেলা গাছের একটা শুকনো পাতা ঝরে পড়লেও, ঘেউঘেউ করে উঠত। আজও চোখে ভাসে আমার মায়ের সেই কুকুর বিড়াল পোষার দৃশ্যগুলো।

বর্তমানে আমার কোনও বাড়িঘর নেই। থাকি পরের বাড়িতে ভাড়া, যাকে বলে ভাড়াটিয়া। ভাড়াটিয়া কথা ইংরাজিতে কি যেন বলে? তা বিশ্ববিখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগল ট্রান্সলেটে বাংলা অনুবাদ করলে, একটা শব্দ পাওয়া যায়। কী পাওয়া যায়? তা আর আমি লিখলাম না। কেন লিখলাম না? লিখলে কেউ হয়ত আমাকে বলবে, “আপনার কোনও একাডেমিক শিক্ষা নেই; এই শব্দ কোত্থেকে সংগ্রহ করেছেন।” আরও হয়ত বলবে, “অন্য সাইট থেকে সংগ্রহ করা বা অন্যের লেখা থেকে শব্দ চুরি করা থেকে বিরত থাকুন।” তাই ভাড়াটিয়াকে ইংরাজিতে না বলে, আঞ্চলিক ভাষাই বলতে হয়, ‘ভাড়াইট্টা’। পরের বাড়িতে ভাড়া থাকলেও আমার নজর শুধু কুকুর বিড়ালে দিকেই বেশি। একটা বিড়ালছানা দেখলেই, ও-কে কোলেকাঁখে নিতে মন চায়। সুযোগ পেলে নেইও অনেক সময়। তারজন্য ঘরের গিন্নির বকুনিও খেতে হয়। কারণ, আমরা হিন্দুরা আচার জানি না, অথচ বিচার জানি বেশি। ছিছি, রামরাম, হায় ঠাকুর, হায় ঠাকুর ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার সমসময় গিন্নি বলে, “নিজে পায় না জায়গা, কুত্তা আনে বাগা।” এসব কথা গুনলে নিজের মনটাই খারাপ হয়ে যায়। পরের বাড়িতে থাকি বলে, আদর করে একটা ছোট প্রাণীকে ঘরে রাখতে পারবো না? এটা আমি মেনে নিতে পারি না। তবু শখ আহ্লাদ মাটি করে, বাধ্য হয়েই মেনে নিতে হয়।

আমি বর্তমানে থাকি, নারায়ণগঞ্জের সিটি ১০ নং ওয়ার্ডের একটা মহল্লায়। যেই বাড়িতে থাকি সেটা অনেক বড়বাড়ি, বাড়িতে ১৪টি ভাড়াটিয়া। বাড়ির ভেতরে দুপাশে লম্বালম্বি করে তৈরি করা ভাড়াটিয়েদের ঘর। মাঝখানে উঠোন। খোলামেলা ও সুন্দর পরিবেশ। আর সবই হিন্দু ফ্যামিলি। মুসলমান কোনও ভাড়াটিয়া নেই। বাসা থেকে আমার কর্মস্থলে যেতে রিকশা ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। অফিসের সামনেই একটা মহল্লা। নাম গোদনাইল রসূলবাগ। হঠাৎ এই মহল্লায় কেউ গেলে বুঝে নিবে যে, এখানে মনে হয় বাড়ি-বাড়িই কুকুর পোষে। মহল্লায় অনেক কুকুর বা কুত্তা। থাকে রাস্তার ধারে বা কোনও দোকানের নিচে। প্রতিবছরই ভাদ্র-আশ্বিন আর কার্তিক মাসে কুকুর বাচ্চা প্রসব করে। তখন পুরো মল্লায়ই শুধু কুকুরের ছোটছোট বাচ্চা। এসব কুকুর বা কুত্তার বাচ্চাগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব হয় না। তখন মহল্লার অনেক শিশু এদের দেখভাল করার জন্য প্রস্তুত থাকে। কেউ কুকুরের বাচ্চাগুলোর গলায় রশি বেঁধে টানে। কেউ কোলেপিঠে করে ঘুরে।

এসব দেখে আমরও শখ হয় বাচ্চাগুলোকে কোলেকাঁখে নিতে। যেমনটা নিয়েছিলাম সেই ছোটবেলায়। কিন্তু পারি না লোকলজ্জায়। আর মানুষের নানারকম কথার কারণে। তবুও থেমে থাকার পাত্র আমি নই। একদিন একট্য সাদা কুকুরের বাচ্চা নিয়ে গেলাম বাসায়। বাচ্চাটি ছিল খুবই সুন্দর, দেখতে বিদেশি কুকুরের মতো। বাসায় নেওয়ার সাথে সাথেই ঘটে গেল হট্টগোল আর গণ্ডগোল। আমরা হিন্দু বলে কথা! ধর্মের আচারবিচারের আর শেষ নেই। কারোর ঘরে যেতে পারবে না। কারোর শরীরে ঘেঁষাও লাগতে পারবে না। কারণ, কুকুর বা কুত্তা তাই এদের প্রতি যেত ঘৃণা। তারপরেও আমি থামছি না। চলছে বাচ্চাটিকে সুন্দরভাবে রাখার কাজ। করে ফেললাম, রাতেরবেলা বাচ্চাটি রাখার নির্দিষ্ট স্থান। আর বাচ্চাটির গোসলের জন্য সেম্পু-সহ গলার বেল্ট আর ঘণ্টা কিনে ফেললাম। কুত্তার বাচ্চাটির নামও রাখে দিলাম, ধলু। বাচ্চাটিকে রাখার জন্য অনুমিত নিলাম, স্বয়ং বাড়িওয়ালার কাছ থেকে। আমাকে আর ঠেকায় কে? শুরু করে দিলাম এর পরিচর্যা। আর সময় অসময় এর দেখাশুনা।
IMG_20150907_123739_1

আমার সেই ধলু। এখন ধলু অনেক বড় হয়ে গেছে। থাকে আমার অফিসের সামনের মহল্লায়। আমি রোজ যেই রাস্তা দিয়ে অফিসে আসি, সেই রাস্তায় ও আমর জন্য অপেক্ষায় থাকে। সকালে ওকে অন্তত দুটি বিস্কুট না দিয়ে আর অফিসে যাওয়া যায় না। আমার ভালোবাসা ধলু আজও মনে রেখেছে। কিন্তু অনেক মানুষেই মনে রাখে না।

ছয় থেকে সাতদিনের মধ্যেই বাচ্চাটির চেহারা পালটে গেল। এখন যে কেউ দেখলেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এই বিদেশি কুত্তার বাচ্চাটি কোত্থেকে এনেছেন?’
আমি প্রশ্নকারী ব্যক্তিদের সাথে আর মিথ্যা বলতে পারিনি। সত্য কথাই বললাম, ‘এটা বিদেশি কুত্তার বাচ্চা না, এটা এদেশি।’ আমার কথা শুনে অনেকেই আমাকে বলছে, ‘এটা দাদা আমাকে দিয়ে দেন।’

আমি কারোর কথায় আর কান দিচ্ছি না। যতদিন রাখতে পারি ওকে নিজের হেফাজতেই রাখবো, এটা ছিল আমার সিদ্ধান্ত। খটকা বাঁধল বাড়ির ভাড়াটিয়াদের সাথে। আর নিজ ঘরের গিন্নির সাথে। এখন এই কুত্তার বাচ্চাটা নিয়ে, কারণে অকারণে প্রতিদিনই বাড়িতে ঝগড়া করতে হয়। এই ঝগড়াঝাঁটির কারণে, আমি ধলুকে আর আমার কছে রাখতে পারলাম না। কাউকে দিয়েও দিলাম না। যেখান থেকে এনেছি, একদিন ঠিক সেখানেই রিকশা করে নিয়ে গেলাম।

উদ্দেশ্য হলো ধলুর মায়ের কাছেই ধলুকে বুঝিয়ে দেওয়া। ধলুকে নিয়ে রিকশা চড়ে মহল্লায় আসতেই দেখি, ধলুর মা রাস্তার পাশে বসা। রিকশায় থাকতেই ধলু ওর মাকে দেখা মাত্রই কেও মেও শুরু করে দিল। ধলুর কেও মেও শুনে ওর মা আমার রিকশার সামনে এসে উপস্থিত। মা তার বাচ্চাকে চিনে ফেলেছে, এটা আমার বাচ্চা। আর কি থামানো যায়? ধলুর মা এক লাফেই আমার রিকশায় উঠে ধলুকে আদর করতে লাগল। আমি ধলুকে রিকশায় রেখেই রিকশা থেকে নেমে পড়লাম। অনেকক্ষণ মা আর বাচ্চাটির চাটাচাটি দেখলাম। এদের এই দৃশ্য দেখে রাস্তায় মানুষের জ্যাম লেগে গেল। ধলুর গলার বেল্ট থেকে লোহার চেইনটা খুলে দিলাম। মা আর বাচ্চাটি খেলতে খেলতে একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।

আমি আমার অফিসে চলে গেলাম। সেই ধলু এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তবুও ও আমাকে ঠিকই মনে রেখেছে। প্রায়ই অফিসে আসাযাওয়ার সময় ওর সাথে রাস্তায় দেখা হয়। আমাকে দেখলেই, ওকে একটা কিছু না দিয়ে আর আসা যায় না। সময়সময় আমার অজান্তেই, আমার অফিসের সামনে এসে বসে থাকে। অনেক সময় আমার সাথে আমার বাসা পর্যন্ত আসে। বসে থাকে আমার বাসার সামনে। দু’মুঠো খাবার দিলে খায়। খাবার খেয়ে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখে আবার চলে যায় ওর গন্তব্যে। তবু এরা মানুষের কাছে সবসময়ই অবহেলিত প্রাণী। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ওদের কাছে যেন অনেক মূল্যবান। ওরা কিছুতেই ভুলতে পারে না, ভুলেও না। ওদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা মনে রাখে। কিন্তু আমরা মনুষ হয়ে মানুষের ভালোবাসা ভুলে যাই। একে অপরের সাথে বেঈমানি ককরতেও দ্বিধাবোধ করি না। অথচ আমরা হলাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ!