ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার প্রিয় ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্মানিত লেখকবৃন্দ কেমন আছেন? আশা করি মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সবাই ভালো আছেন। আমিও আমার গুরু-মহাগুরু ও আপনাদের আশীর্বাদে একপ্রকার ভালো আছি। প্রিয় পাঠক ও লেখকবৃন্দ, আমি কিছুদিন আগে ব্লগে একটা লেখা পোস্ট করেছিলাম। পোস্টখানার শিরোনাম ছিল, জোকার সোলেমান ও তার সুস্বাদু মিষ্টি পান। যা ব্লগে প্রকাশ পেয়েছিল, গত ০৬ নভেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে।

লেখনীতে ছিল, একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলার কাহিনী মাত্র। সেই লেখনী পড়ে কয়েকজন সম্মানিত লেখকবৃন্দ, নিজেদের ব্যক্তিগত মতামতও ব্যক্ত করেছেন। সেই মতামতের মধ্যে একজন হলেন, আমার শ্রদ্ধেয় প্রিয় লেখক, সম্মানিত সুকান্ত কুমার সাহা। সম্মানিত সুকান্ত দাদার মন্তব্যটা ছিল এরকম:
আপনি ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত যেসব পেশায় নিয়োজিত ছিলেন- তা এক এক করে সিরিয়াল করে লিখেন তো দেখি? বর্ণনার দরকার নেই; শুধু পেশাগুলোর নাম লিখুন! দেখি কেমন দাঁড়ায়>>>

প্রত্যুত্তরে আমার মন্তব্য ছিল:
তা হলেতো একটা ছোট করে ব্লগ লিখে সবাইকে জানাতে হয় দাদা। এতে আপনার অনুমিত একান্ত কাম্য দাদা। এ বিষয়ে আমি সদা প্রস্তুত আছি।

একজন ব্যক্তির সম্বন্ধে জনার আগ্রহ সবার থাকে বা থাকাটাও স্বাভাবিক। সম্মানিত সুকান্ত কুমার সাহা দাদা আমার কাছে জানতে চেয়েছে। এখন আমি যদি না জানিয়ে আমার জীবনকাহিনী গোপন রাখি, তাহলে হবে অন্যায়। সেই অন্যায় আমি করতে পারি না, করবোও না। আর আমার জীবনবৃত্তান্ত আমি কোনদিন গোপন রাখিনি, আর রাখবোও না। এই প্রিয় ব্লগে, ২০১৫ সাল থেকে আমি শুধু আমার জীবনী-ই লিখেছি। আজ নতুন করে আবার আমার জীবনকাহিনীসহ, জীবনের কাজের তালিকাও সবার মাঝে শেয়ার করছি। তাই সম্মানিত সুকান্ত কুমার সাহার মন্তব্যের জের ধরেই আমার আজকের এই লেখা, প্রিয় পাঠক ও লেখকবৃন্দ।

আমি আমার এই গরিব জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। সময়সময় অনেক সাজে আমাকে সাজতেও হয়েছে। আবার অনেক কাজেও নিয়োজিত থেকেছিলাম, জীবন বাঁচানোর তাগিদে। সেসব কাজের একটা তালিকা আমার এই লেখায়, আপনাদের কাছে তুলে ধরলাম, সম্মানিত পাঠক ও লেখকবৃন্দ।

আমি ছোটবেলা থেকেই এক অভাবি সংসারের মানুষ। আমরা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালী থেকে সপরিবারে চলে আসি নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড় আদর্শ কটন মিলস্-এ ছিল, আমাদের স্থায়ী বসবাস। আমার বাবা চাকরি করতেন, চিত্তরঞ্জন কটন মিলস্-এ। আর বড়দাদা করতেন আদর্শ কটন মিলে। বড়দার চাকরির সুবাদেই, আমাদের আদর্শ কটন মিলস্-এ থাকা। নোয়াখালী থেকে আসার পর, আমি লক্ষণখোলা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেনিতে ভর্তি হই। কিন্তু স্কুলে পড়ারমত চতুর্থ শ্রেণির কোনও বই আমার ছিল না। আমার দুঃখিনী মা মিলের একজনের কাছ থেকে একসেট পুরাতন বই আমাকে সংগ্রহ করে দিলেন। চতুর্থ শ্রেণির সেই পুরাতন বইগুলো ছিল বেশিরভাগই ছিঁড়া, যা পড়ার মতো ছিল না। তারপরেও আমি সেই বই পড়তাম, বই নিয়ে স্কুলে যেতাম। বাৎসরিক পরীক্ষায় ভাল নাম্বার নিয়ে পাস করলাম। পাস করে আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ পেলাম। কিন্তু সমস্যা শুধু পাঠ্যবই, আর স্কুলে যাবারমত পোশাকের।

বই কিনে পড়তাম পুরানা বই। আর জামা-পেন্ট হলো, তখনকার দিনের গাউনের। যা ঢাকা সদরঘাটে কারিকরি পাওয়া যেত। পায়ে জুতা থাকতো সেন্ডেল নামের একজোড়া জুতো। তাও কোনও সময় থাকত, আবার থাকত না। প্রাইমারি পাস করলাম, হাই স্কুলে যাবার সুযোগ হলো। বহু কষ্ট করে সবার পরে আমি ভর্তি হলাম। তখন ভর্তি ফি ছিল মাত্র ১০ টাকা। এই ১০ টাকাতো সেসময়ের জন্য ছিল অনেককিছু। যার কারণেই হাই স্কুলে ভর্তি হতে আমার এতো দেরি। সেসময় খাতা কলমের খরচ আমাকেই জোগাড় করতে হতো। আমি প্রতিদিন সকালবিকাল, আদর্শ কটন মিলের সামনে বাদাম বিক্রি করতাম। স্কুল বন্ধের দিনে মাঝেমাঝে রাজ যোগালির কাজও করতাম। তখন একদিনের রাজ যোগালির কাজের মূল্য ছিল ৮ টাকা। এভাবেই চলতে থাকল আমার স্কুল জীবন।

আমার বাবা চিত্তরঞ্জন মিলের আউট অফ সাইট কেলেন্ডারে চাকরি করতেন। হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা আমার বাবা এক্সিডেন্ট। কেলেন্ডার মেশিনের চাপে বাবার ডানহাতের চারটে আঙুল চেপ্টা হয়ে যায়। বাবা তখন বাৎসরিক রুগী হয়ে ঘরে শুয়ে শুয়ে কাতরায়। এই অসুখে দীর্ঘ একবছর ভুগে, শেষমেশ বাবা পরলোক গমন করে। সংসার চলে বড়দা’র সীমিত বেতনের টাকায়। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত দুই বোন। দেখা দেয় আমার লেখাপড়ার অনিশ্চয়তা। একদিন ১২ টাকা দৈনিক মুজুরিতে চলে গেলাম, চট্টগ্রামে। কাজটা ছিল রাজ যোগালির কাজ।

সেখান থেকে আবার কন্ট্রাক্ট্ররের সাথে চলে গেলাম কক্সবাজার হয়ে মহেশখালী। কাজ করতে হবে ১৩ কিলোমিটার একটা রোড মেরামতের কাজ। আমার সাথে যাওয়া সাথী ছিল দুইজন। ওরাও ছিল আদর্শ কটন মিলের বসবাসকারী বাসিন্দা। মহেশখালীতে বৃষ্টিপাত খুবই বেশি হয়। এমন দিন বাদ নেই যে, আজ বৃষ্টি হয়নি বা হবে না। সপ্তাহের পুরো সাতদিনই বৃষ্টি, তাও থেমে থেমে। আমাদের হলো দৈনিক মুজুরিতে কাজ। কাজ হলে টাকা, কাজ না হলে মুজুরি নেই। সেখানে প্রায় এক থেকে দেড়মাস খুবই কষ্ট করলাম, খেয়ে না খেয়ে। এরপর মহেশখালীর একটা লবণের মিলে গিয়ে যোগাযোগ করলাম। তিনজনেই মিলেমিশে গেলাম, কাজ করার জন্য। কাজ রেডি, দৈনিক মুজুরি ২৫ টাকা। কিন্তু কাজ করাটা হলো দুরূহ ব্যাপার। কারণ, লবণের জলে শরীরে ঘাঁ হয়ে যায়। পুরো সপ্তাহ কাজ করা যায় না। তবু থামলাম না, রাজি হয়ে গেলাম।

ওইসব ঘাও-টাও-এর কথা চিন্তা না করে, জাকেরিয়া সল্টে গিয়ে কাজে যোগদান করলাম। তখনকার সময় প্রতি সের লবণের মূল্য ছিল মাত্র ২৫ পয়সা (চার আনা)। আমাদের কাজ ছিল লবণ ওয়াস-কেরাস করা। মানে হলো সোজা কথায়, লবণ ধুয়ে পরিষ্কার করা। আর লবণকে সুজির মতন মিহি করা। তখকার দিনে বর্তমান যুগের এতো উন্নতমানের লবণের মিল ছিল না। ওইসব সনাতন পদ্ধতিগত মিলের লবণই সবাই ব্যবহার করতো। লবণ চাষিদের কাছ থেকে মাটিমাখা মোটা লবণ আসতো মিলে। সেই মোটা লবণ আমরা ওয়াস-কেরাস করে চিকন মিহি করতাম। মোটা লবণ ধুতে ধুতে এমনিতেই চিকন হয়ে যায়। তারপর ওই লবণ বস্তাবন্দী করে মিল মালিক বাজারে সাপ্লাই করে দেয়।

এভাবে অতিবাহিত হলো আমার লবণের মিলে কাজ, আর মহেশখালীতে দুইবছর। দেড় বছরের মাথায়, সাথে যাওয়া দুইজন নারায়ণগঞ্জ চলে আসে। থেকে যাই আমি অধম। কারণ, আমার কাছে সেদিন আসার ভাড়ার টাকা ছিল না, তাই। এরমধ্যে মিল কর্তৃপক্ষ মিল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। কারণ, আমাদের ওয়াস করা লবণ আর বাজারে বিক্রি হচ্ছিল না, তাই। কাজ নেই, মুজুরি নেই, খাবার নেই। হাতখরচ করার মতো একটা কানাকড়িও সময়তে সাথে থাকে না। মিল মালিক শুধু দিনে দুইবেলা খাবার দেয়, তাও শুধু ডালভাত।

এদিকে আমার মা চলে আসা দুইজনের কাছে লবণের মিলের কাজের বর্ণনা শুনলেন। ওইসব শুলে আমার দুঃখিনী মায়ের চোখের জলে বুক ভাসে। তখন আদর্শ কটন মিলেরও দুরবস্থা, মিল বন্ধ হয়ে গেল। বড়দা সার্ভিসের কিছু টাকা পাওনা ছাড়া, আর কোনও সম্বল তখন আমাদের ছিল না। তখন নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া ছিল মাত্র ২২ টাকা। আর ঢাকা কমলাপুর থেকে ২০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে বাসে কক্সবাজারের ভাড়া ছিল মাত্র ১০ টাকা। আর কক্সবাজার থেকে ট্রলারে মহেশখালীর ভাড়া ছিল মাত্র ২ টাকা।

মায়ের কান্নাকাটি আর আমার বড়দা সহ্য করতে পারেননি। আমার বড়দা কিছু টাকা ধারকর্জ করে একদিন মহেশখালী আসে। যেদিন আমার বড়দা মহেশখালী আসে, সেদিনই আমি সহ আরও অনেকেই চলে আসি চট্টগ্রামে। আমার সাথে দুইজন লোক ছিল। তাদের বাড়ি ছিল ঘোড়াশালের কোনও এক জায়গায়। খুবই ভালো লোক ছিল তারা। আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো করে দেখত। কারণ হলো, ওই দুইজন লেখাপড়া জানতো না তাই। আমি লেখাপড়া জানতাম, চিঠি লিখে দিতে পারতাম। তাই আমি ওদের সবাইর কাছে ছিলাম প্রিয়। চট্টগ্রাম এসেই, ওই দুজন পোর্টের মালামাল কেয়ার করার কাজ নিয়ে নিল। ওরা দুজন আগে এখানেই কাজ করতো। তাই ওদের সব জায়গা ও সব কাজ সম্পর্কে জানা ছিল।

এদিকে আমার বড়দা মহেশখালীতে আমাকে না পেয়ে চলে আসে চট্টগ্রামে। আমাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে, মিলের দারোয়ানের কাছ থেকে। বড়দা চট্টগ্রাম এসে আমাকে খুঁজে বের করে। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, বড়দা’র সাথে চলে আসি নারায়ণগঞ্জে। বড়দা আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিল। কারণ হলো, মিল বন্ধ হয়ে গেলেও বেশ কয়েক বছর মিলের ভেতরে থাকা যাবে তাই। বড়দা সার্ভিসের টাকা উত্তোলন করলো। বছর খানেক সময় খুবই ভালো ছিলাম। যেই হাতের টাকা শেষ হলো, তখই বাধল খটকা। লেখাপড়া আমার ভাগ্য থেকে দূরে সরে চলে গেলো। আমি আদর্শ কটন মিলের একজনের পরিচিত ব্যক্তির সাথে চলে গেলাম, কাঠপট্টি কমলাঘাট। সেখানে এক বানিয়া দোকানে কাজে লেগে যাই। করলাম, মাসেক ছয়মাসের মতো। বানিয়া দোকান থেকে কাজ ছেড়ে লাগলাম তেলের মিলে। সেসময় এমনিতেই কমলাঘাট তেলের জন্য ছিল বাংলার বিখ্যাত। কমলাঘাট থেকে প্রায় ৮/৯ মাস পর আসলাম আদর্শ মিলে। আদর্শ মিলে এসেই মনটা ঘুরে গেল। আর যাওয়া হয়নি কমলাঘাট। এরপর মিলের বন্ধুদের সাথে মিশে গেলাম আড্ডায়। কাজ করি মিলের ভেতর যোগালি কাজ।

তখন আমি স্থায়ীভাবে হয়ে গেলাম, আদর্শ কটন মিলের রাজ যোগালি। মুজুরি সব যোগালিদের চেয়ে, আমার দুই টাকা বেশি। সবার মুজুরি ১০ টাকা, আর আমার মুজুরি ১২ টাকা। এর কারণ হলো, আমি ঢালাই মাল বানানোর জন্য ছিলাম নাম্বার ওয়ানে। আর একসাথে দুটি করে সিমেন্টের বস্তাও মাথায় করে নিতে পারতাম। এই করণেই আমার হাজিরা অন্যান্য যোগালির চেয়ে ২ টাকা বেশি ছিল। এরপর একসময় আদর্শ কটন মিল থেকে আমরা চলে আসি, শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়। বাসবাস শুরু করি নগর খাঁনপুর। এখানে এসে আদর্শ কটন মিলে যেতে আর ভালো লাগতো না। তাই নতুন করে শুরু করে দিলাম, চানাচুর বিক্রি করা। বিক্রি করতাম নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রেনে করে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত। মাঝেমাঝে ট্রেনে পান-বিড়ি-সিগারেটও বিক্রি করতাম। বাসা থেকে বিকালবেলা বের হয়ে যেতাম। সারারাত কমলাপুর স্টেশনেই থাকতাম। সকালবেলা ফিরতাম বাসায়। লাভের টাকা মায়ের কাছে বুঝিয়ে দিতাম, চালডাল কিনার জন্য। কারণ, আদর্শ কটন মিল থেকে আসার পর বড়দা বেকার। এভাবে জীবন চললো অনেকদিন।

তারপর নগর খাঁনপুরের সমবয়সী বন্ধদের সহযোগিতায় শিখলাম রিকশা চালানো। চানাচুর আর পান-বিড়িতে লাভ বেশি হয় না। রিকশা চালাতে পাড়লে অনেক টাকা ইনকাম হয়, তাও নগদনারায়ণ। তাই শেষমেশ রিকশাকেই জীবনের সঙ্গী করে নিলাম। আমি নারায়ণগঞ্জ শহরে একটানা একাধারে দুইবছর রিকশা চালিয়েছি। তখন একবেলা রিকশা ভাড়া বাবদ মহাজনকে দিতে হতো ৭.৫০ টাকা। আর এখন মালিকদের একবেলা ভাড়া দিতে হয় ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। তখন আমার বড়দা এক টেক্সটাইল মিলে তাঁতের কাজ পেয়ে যায়। আমি অবসর মিলে গিয়ে বড়দার সাথে তাঁতের কাজ শিখতাম। তাঁতের কাজ শিখার পর, রিকশা চালানো ছেড়ে দেই। শুরু করে দিলাম তাঁতের কাজ করা।

সময়টা ছিল ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ, তখন এই ববঙ্গদেশে পলিয়েস্টার সূতার আগমন মাত্র। ১৯৮৬ সালের কোনও একসময়ে বিয়ে করলাম। বিয়ে করেছি, বড়লোকের খনি বিক্রমপুরে। আমি যেই মিলে কাজ করতাম, তা একসময় বন্ধ হয়ে যায়।

আমি থামলাম না, ভয়ও পেলাম না। বড় বোনের কাছ থেকে ১৫০০ টাকা ধার নিয়ে নামলাম লেইসফিতা ব্যবসায়। সাজলাম, আমি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা গোদনাইল এলাকার একজন লেইসফিতাওয়ালা। বছরখানেক খুব মন দিয়ে লেইসফিতার ব্যবসা করেছি। কিন্তু সংসারের অভাব দূর করতে পারিনি।

জীবন বাঁচাতে এবার শুরু করে দিলাম, ঝালমুড়ি বিক্রি করা। আমি এখন ঝালমুড়ি বিক্রেত বা ঝালমুড়িওয়ালা। অনেকদিন ঝালমুড়িওয়ালা সেজে সংসার চালিয়েছি। তারপর আর ভালো লাগে না, আবার শুরু করলাম তাঁতের কাজ। এই তাঁতের কাজ শিখে, দেশের বিভিন্ন শহরে আমি গিয়েছি। গিয়েছি ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম-সহ সিরাজগঞ্জ বেলকুচি, মুন্সিগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ বেলকুচি থানায় আমি অনেকদিন কাজ করেছি। তা তাঁতের কাজ নয়, কাজটা হলো তাঁত (উইভিং) ডিপার্টমেন্টের অন্য কাজ। কাজের নাম ড্রয়ার ম্যান বা হানা ‘ব’গাথা। যা ছিল সব তাঁতীদের কাছে সম্মানী। প্রাইভেট টেক্সটাইল মিলস্। নিশ্বাসের বিশ্বাস থাকলেও, চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই চাকরি না থাকলেও কোনও আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়ে ধরণা দিতাম না। বেকারও থাকতাম না, বেকার থাকতে পাড়তামও না। যেদিন চাকরি শেষ, সেদিনই কোমরে গামছা আর হাতে রিকশার হেন্ডেল। এভাবে চলছিল আমার অভাবের জীবন আর সংসার।

আমি টেক্সটাইল মিলে মানুষের লজ্জা নিবারণের বস্ত্র তৈর করেছি। অথচ সময়সময় নিজের অথবা নিজ পরিবারে সদস্যদের পড়নে কাপড় থকতো না। তাই ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই টেক্সটাইল বাদ দিয়ে যুক্ত হয়েছি, মাল্টিপারপাস সমিতির সাথে। এই মাল্টিপারপাস সমিতিভুক্ত ব্যবসার সাথে আমি এখনও যুক্ত আছি। তবে আমি নিজে এই ব্যবসার সাথে কোনও শেয়ারহোল্ডার নই। আমি শুধু চাকরি করে যাচ্ছি, মানে বেতনভোগী কর্মচারী। এ হলো আমার গরিব আর অভাবের জীবনের সাজের কাহিনী। তবে লেখা পড়ে হয়ত কেউ যোগবিয়োগে কাজের সংখ্যা মেলাতে পারবেন না। তাই আমি নিম্নে একটা তালিকা করে দিচ্ছি, যাতে সবাই শর্টকাটে এর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারেন।

১। বাদামওয়ালা
২। রাজ যোগালি
৩। বানিয়া দোকানের কর্মচারী
৪। তেলের মিল বা তেলের ঘানি বা তেলশ্রমিক
৫। রিকশাওয়ালা
৬। তাঁতী বা ঝোলা বা কারিকর
৭। ড্রয়ারম্যান, বা ‘ব’ গাথা, বা হানা ‘ব’ ওয়ালা
৮। পারউন্ডার (নলি ভরা) বা ববিন ভরার কাজ
৯। ওয়ার্পিং (ভীম) বানানো বা টানা পেছানো
১০। হোল্ডিং কাপড় মাপা বা কাপড় গজ কারা
১১। সহকারী মিস্ত্রি বা ফিটার
১২। সহকারী ডিজাইন মাস্টার
১৩। ঝালমুড়িওয়ালা
১৪। চানাচুরওয়ালা
১৫। পান-বিড়ি-সিগারেটওয়ালা
১৬। লেইসফিতাওয়ালা
১৭। বর্তামানে একটা সমিতির অফিসের ম্যানেজার
১৮। বিবরণ ছাড়া কাজগুলো:
☛ মিষ্টির দোকানে
☛ ভ্যানগাড়ি
☛ চা-দোকানের বয়
☛ পাটের প্রেস, ডেলি লেবার

প্রিয় পাঠক ও সম্মানিত লেখকবৃন্দ। আমার অসহায় গরিব জীবনের জন্য এই সংখ্যা খুবই সীমিত। আমাদের সমাজের চারিপাশে আমার মতন এমন আরও মানুষ আছে। তাদের কাজের সংখ্যা হয়ত আমার চেয়ে দ্বিগুণ হবে। আমি যা করেছি, তা শুধু এই দারিদ্র্য ভরা জীবন বাঁচানোর জন্যই করেছি। তবে জোকার সোলেমানের মতন কখনও জোকার সাজতে পারিনি। আর পারিনি কারও সাথে মিথ্যা ছলনা করতে। এটাই ছিল আমার জীবনের বড় ব্যর্থতা। কারণ, আমি হয়ত সত্যিকারের মেহনত করতে পারিনি। ঠিকমত মেহনত যদি করতেই পারতাম, তাহলে তো আমার আর অভাব থাকতো না। ছোটবেলায় পাঠ্যবইতে একটা কবিতা পড়েছিলাম। আজ সেই কবিতাটি মনে পড়ে গেল। যা পড়েছিলাম ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবইতে।

কবিতাটির নাম ছিল: নবীর শিক্ষা, লিখেছিলেন, কবি শেখ হাবিবুর রহমান।
কবিতাটির নিচের অংশটি নিম্নে লিখে সবাইকে জানালাম।

কহিলেন নবী, ‘যাও কাঠ কেটে খাও, দেখ খোদা করে কি-যে।’
সেদিন হইতে শ্রম সাধনায় ঢালিল ভিখারি প্রাণ,
বনের কাষ্ঠ বাজারে বেচিয়া দিন করে গুজরান।
অভাব তাহার রহিল না আর, হইল সে সুখী ভবে,
নবীর শিক্ষা ক’রো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে।

আমার শ্রদ্ধেয় প্রিয় লেখক সুকান্ত কুমার সাহাও প্রিয় পাঠক/লেখকবৃন্দ। আমি ছিলাম প্রকৃতপক্ষে বহু কাজের কাজী। কাজই আমার জীবনের একমাত্র সঙ্গী। তাই আমার করা কাজ নিয়েই আজকের এই লেখাটা লিখলাম। আশা করি আমার এই লেখনী পড়ে, কেউ আমাকে ঘৃণা করবেন না। আর যদি কেউ ঘৃণা করেই থাকেন, অন্তত আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত করবেন না। আপনাদের আশীর্বাদ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। আর লিখে যেতে চাই, আমার প্রিয় ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পাতায়।