ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

p20171116-035303 মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষ, সামনে দাঁড়িয়ে আছে বট খাদেম এজাজ মিয়া। বটগাছের নিচে দোকানটিও বট খাদেম এজাজ মিয়ার।

মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষ, একটা বটগাছের নাম। বটগাছটি নারায়ণগঞ্জ সিটি ১০ নং ওয়ার্ডের একটি পুকুরপাড়ে। পুকুরটি হলো বাংলাদেশ সমবায় শিল্প সংস্থা (সীঃ)-এর নিজস্ব পুকুর। আজ থেকে ১৮ বছর আগে দুইজন লোক দুইরকমের দুটি বটগাছ রোপণ করে। সময়টা ছিল ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি। দুটি বটগাছে মধ্যে একটা কাঁঠালি বট, অপরটি জিরা বট। জিরা বট হলো, যেই বটের পাতা পানের মত দেখতে। আর কাঁঠালি বটের পাতা হলো হুবহু কাঁঠাল পাতার মত।

যে দু’জন লোক গাছ দুটি রোপণ করেছিলেন তারা সম্পর্কে ছিলেন মামা-ভাগিনা। মামা রোপণ করেছিলেন, জিরা বটগাছ। আর ভাগিনা রোপণ করেছিলেন, কাঁঠালি বটগাছ। মামার নাম ছিল, আলেক মিয়া, আর ভাগিনার নাম হলো এজাজ মিয়া। সে থেকে এলাকার অনেকে এই বটগাছকে মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষ বা ববটগাছ বলে থাকে। আর এখন ভাগিনা এজাজ মিয়াকে সবাই বট খাদেম বা বট পাগলা বলে ডাকে ও চেনে।

গাছ দুটি যেদিন রোপণ করা হয় সেদিন গাছের সামনে একটি মিলাদের আয়োজন করা হয়। গাছ দুটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দু’হাত তুলে করা হয়, বিশেষ মোনাজাত। সেদিন কথা হয়েছিল, প্রতিবছর এই তারিখেই খোদাই শিন্নির আয়োজন করা হবে। ওইদিন অনেক মানুষের ভীড়ে আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি এই এলাকার একটা টেক্সটাইল মিলে চাকরি করতাম। টেক্সটাইল মিলটি ছিল এই বটগাছ থেকে কয়েক গজ দূরে। বটগাছ সংলগ্ন অনেক দোকানপাটও ওখানে ছিল, যা এখনও আছে। এই বটগাছ রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত এজাজ মিয়ারও একটা দোকান আগেও ছিল এখনও আছে। এজাজ মিয়ার দোকানের সাথেই বটগাছটি রোপণ করা হয়েছে। এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কাঁঠালি বটগাছটি।

প্রথম বছর আমরা সবাই মিলেমিশে জাঁকজমকভাবে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম। মিলাদের টাকা সংগ্রহ করেছি এলাকার অনেক দোকান আর ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। এর একবছর পর মামার রোপণ করা জিরা বটগাছটি মরে যায়। বেঁচে থাকে ভাগিনার রোপণ করা কাঁঠালি বটগাছটি।

p20171116-035333

এই সেই মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষ। গাছটির নিচেই বট খাদেম এজাজ মিয়ার দোকান। এখানেই প্রতিবছর ২৫ ফেব্রুয়ারি মিলাদ মাহফিল-সহ খোদাই শিন্নির আয়োজন করা হয়। সাথে পালাগান, আর জিকির আজকার।

ভাগিনার পরিচর্যায় ও দেখভালে দিনেদিনে গাছটি লাফিয়ে উঠতে থাকে। চারদিক ছড়াতে থাকে গাছটির লতা (শিকড়), আর ঢালা-প্রশাখা। কথামত প্রতিবছর গাছটির নিচে পালন করা হতো, খোদাই সিন্নি সহ মিলাদ মাহফিল। এর চার বছর পর ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মামা আলেক মিয়া চলে যায় পরপারে। এরপর থেকে বেঁচে যাওয়া কাঁঠালি বটগাছটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে ভাগিনা এজাজ মিয়া। এজাজ মিয়া গাছটির চারপাশে সুন্দর করে বেড়া দিয়ে রাখে। আর গাছের সামনে দিয়ে রাখে নানারকম ফুল ও ফলফলাদি। এজাজ মিয়ার বিশ্বাস, এসব ফল কাক-পক্ষীতে খেলেই হবে গাছের খাওয়া।

রাস্তার পাশে বটগাছ, পিছনে বিশাল পুকুর। গাছের সামনে দিয়ে হেঁটে যায় মানুষ। সুন্দর পরিপাটি নানান রঙের বেড়া দেখে, অনেকেই গাছটাকে ভক্তিও করে। অনেকে রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে নিয়ে যায়, গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা। কেউ আবার গাছের গোড়ায় নানারকম ফুল ও ফলফলারিও রেখে যায়। আবার সময়সময় অনেক মানুষ হাতজোড় করেও গাছের কাছে কিছু চায়। এভাবেই চলতে লাগলো, ভাগিনা এজাজ মিয়ার রোপণ করা বটগাছের জীবন ও খোদাই শিন্নির আয়োজন।

p20171116-035240 মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষের আশেপাশে হরেকরকমের খেলনার দোকান।

 

তবে এবার আর্থিক দুরাবস্থার কারণে, প্রতিবছরে মতো ফেব্রুয়ারি মাসে মিলাদ মাহফিল করা হয়নি। হয়েছে এই নভেম্বর মাসে। সুন্দর সুসম্পর্ক থাকার কারণে, এবারও দাওয়াতের কার্ড পেয়েছি। প্রতিবছর নিজের সামর্থ্য মতো কমবেশি কিছু সহযোগিতাও করে থাকি এবং অন্য জায়গা থেকেও বলে কয়ে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে দেই। কিন্তু এবার আর এজাজ মিয়ার বটবৃক্ষের জন্য কিছুই করা হলো না। করি করি দেই দিচ্ছি বলে আর দেওয়া হয়নি কিছুই। তবু থেমে থাকেনি এজাজ মিয়ার বটগাছের তলায় মিলাদ ও খোদাই শিন্নি। এবার এই মিলাদ ও খোদাই শিন্নি উপলক্ষে অনেক জায়গা থেকে হরেকরকম দোকানপাটও বসেছে এখানে। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন চলছিল তিনদিন। মাঝে একদিন পালাগানও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে এই বটগাছটি এলাকার মানুষের কাছে একটা সম্মানী গাছ। এজাজ মিয়াও বটগাছর খাদেম হতে পেরে খুবই গর্বিত। এজাজ মিয়ার বিশ্বাস, ঠিকমত বটগাছটাকে খেদমত করতে পাড়লেই একদিন তার ভাগ্য পাল্টে যাবে।

সেই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে এজাজ মিয়া বটগাছটি খেদমত করতে একটুও কৃপণতা দেখায় না। এই বটগাছের খেদমত করতে করতেই এখন এজাজ মিয়ার টাইটেল হয়েছে বট খাদেম। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সোজা চলে আসে বটগাছের নিচে। ঝরে পরা বটের পাতাগুলো কুড়িয়ে সেগুলো একজাগায় রেখে দেয়। তারপর বিকালবেলা সেই শুকনো পাতাগুলো পুকুরপাড়ের মাটিতে পুতে রাখে। একবার আমি এজাজ মিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বটগাছের পাতাগুলো কেন মাটিতে পুতে রাখা হয়? বট খাদেম এজাজ মিয়া আমার কথায় উত্তর দিলেন, ‘আমি বটের আদেশ রক্ষা করছি।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার আদেশ এবং কীভাবে?’ বট খাদেম বললেন, ‘বটগাছটি রোপণ করার একবছর পর আমি স্বপ্নে আদেশ পেয়েছি।’

বট খাদেম এজাজ মিয়ার কথা শুনেছি ঠিক, কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছি না। কেননা, মানুষ কিছু না পেলে তো প্রতিবছর এখানে আসতো না। খবর নিয়ে কিছু মানুষের কাছে জানা যায়, অনেকেই হাত পেতে কিছু চায়। না পেলে কি আর হাত পাতে? বিশ্বাস করে কেউ হয়ত পায়, কেউ হয়ত আবার পায় না। কিন্তু বট খাদেম এজাজ মিয়া হয়ত কিছু ঠিকই পেয়েছে। তাই বট খাদেম এজাজ মিয়াও থামছে না বটগাছের খেদমত করা থেকে। চলছেই বটগাছের জন্য তার খেদমত। এজাজ মিয়া চায়, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বটগাছের খেদমত করে যেতে। বিনিময়ে এজাজ মিয়া কী চায় জানি না। তবে যতটুকু জানি, এজাজ মিয়া চায় বটগাছটিকে ভালোবেসে মরতে। আর আমরা চাই, বেঁচে থাকুক মামা-ভাগিনা বটবৃক্ষ, বেঁচে থাকুক বট খাদেম এজাজ মিয়া।