ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

p20171120-034556
আমরা সবাই মাতৃগর্ভ থেকে পুর্নাঙ্গ অবস্থায় জন্মেছি। এরমধ্যে অনেকেই জন্মেছে বিকলাঙ্গ হয়ে। আবার অনেকে পুর্নাঙ্গভাবে জন্মগ্রহণ করার পর, নানারকম রোগব্যাধির কারণেও বিকলাঙ্গ হয়ে পরে। যা আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির অনেক দেশেই দেখা যায়। এই বিকলাঙ্গ মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশেও কম নয়। এদের মধ্যে কারও হাত নেই, কারও পা নেই। কেউ আবার কুঁজো, কেউ আবার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। এসব বিকলাঙ্গ মানুষ নিজ পরিবার ও সমাজের কাছে এক বিরক্তিকর। কেউ কেউ তাদেরকে সমাজের ও মাথার বোজাও মনে করে থাকে। ভাগ্যদোষে কোনও পরিবারে যদি একজন বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী থাকে, তাহলে দেখা যায়; ওই পরিবারের সুখশান্তি প্রায় শেষ। অথচ এসব বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী আমাদের-ই আনন্দের ফসল। আমাদের শখের ফসল হয়েও, আজ তারা সমাজের কাছে ঘৃণিত অবহেলিত। কারণ, তারা বিকলাঙ্গ, অঙ্গহীন, প্রতিবন্ধী।

এরকম বিকলাঙ্গ বহু মানুষ বঙ্গদেশের ৬৪ গ্রাম ও সব জেলাশহরেই দেখা যায়। দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় ও অন্য জেলাশহর থেকে আগত বিকলাঙ্গ অনেক মানুষকে। তারাদের মধ্যে অনেকের সহায়সম্বল আছে, আবার অনেকের-ই নেই। যাদের সহায়সম্বল আছে, তাদের পরিবার পরিজনরা বিরক্তির মাঝেও তাদের দেখে। যাদের সহায়সম্বল নেই, তারা তাদের পরিবারপরিজনের কাছে ও সমাজের মানুষের কাছে সর্বাদাই অবহেলিত। তারা তাদের অবহেলিত জীবন বাঁচানোর তাগিদে, বিভিন্ন কলাকৌশল অবলম্বন করে। কেউ নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্য জেলাশহরে চলে যায়। শহর বন্দরে গিয়ে প্রথমে কোনও রেললাইনের পাশে, না হয় কোনও বস্তিতে আশ্রয় নেয়। এরপর জীবন বাঁচানোর জন্য শুরু করে দেয় ভিক্ষাবৃত্তি।

এমন একজন বিকলাঙ্গ অসহায় হলেন, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বাড়ি রংপুর, কাউনিয়া উপজেলার বানুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনিও জন্মলগ্ন থেকেই অঙ্গহীন। দুটি পা একেবারেই অবশ, আবার কুঁজো। বয়স আনুমানিক ২৭/২৮ বছর হবে। এখনও বিয়ে করেনি, থাকে ঢাকা মতিঝিল। ১০/১২ বছর বয়স থেকেই ঢাকা শহরে তা বসবাস। তার মুখের ভাষা ঢাকা নারায়ণগঞ্জের মতন, রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা ভুলেই গেছে। সপ্তাহের ৭ দিনে সাত জায়গায় তার ঘুরা। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ গোদনাইলে একদিন। মতিঝিল থেকে আদমজীগামী বাসে চড়ে আসে আদমজী। তারপর নারায়ণগঞ্জগামী অটো অথবা টেম্পো চড়ে চৌধুরী বাড়ি। গাড়ি থেকে নেমেই শুরু করে দেয় মানুষের কাছে হাত পেতে চাওয়া।

একদিন আমার অফিসের সামনে আসাদুজ্জামানের সাথে দেখা। দু’পা নেই, তবে কোনও গাড়ি বা অন্যকিছু ব্যবহার করে না। দুহাতে ভর দিয়েই চলে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার সন্তানাদি আছে?’

বললেন, ‘আমি বিয়া-ই করি নাই, সন্তান থাকবো ক্যামনে?’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার মা-বাবা আছে?’
— বাবা নাই, মা আছে।
– আপনার বাড়ি কোথায়?
— রংপুর কাউনিয়া উপজেলার বানুপাড়া গ্রামে।

কাউনিয়া বলতে আমি শুনেছি, ঝাউনিয়া। খাতায় লিখছিলামও তা-ই। কিন্তু আসাদুজ্জামান, আমার লেখার দিকে ফলো করে বলছে, ‘ঝাউনিয়া না স্যার, কাউনিয়া কাউনিয়া।
আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আসাদুজ্জামানের দিকে থাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার লেখাপড়া কতটুকু?’

আসাদুজ্জামান মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার বেশি করতে পারি নাই, অল্প কদ্দুর করছি কোনোরকমে।’
বললাম’ ‘যাই করেছেন, তা কী স্কুলে গিয়ে? না কি নিজের ঘরে বসে?’
বললেন, ‘স্কুলে যাইতে পারি নাই, পায়ের লাইগা। যা হিগছি, তা আমার মার কাছেত্তে হিগছি। আমার মা একটু লেখাপড়া জনতো তো, হিল্লাইগা মা-ই আমারে শিখাইছে। আমি অহনে পেপারও পড়তে পারি, লেখতেও পারি।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ঢাকা শহরে কী করে এলেন?’
বললেন, আমার পরিচিত এক মামার লগে আইছি। তাও অনেক বছর হইছে।’
বললাম, ‘বিয়ে করেন না কেন?’
বললেন, ‘বিয়া করুম ক্যামনে! আমার কী বউ রাহনের ক্ষমতা আছে? কারোর মাইয়া কী আমার কাছে বিয়া দিবো? বিয়া করি নাই ভালা আছি। যা পাই, ঈদের মধ্যে বাড়ি যাইয়া মার কাছে দিয়া আহি।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘দৈনিক কত রোজগার করতে পারেন?’

বললেন, ‘তা হয়, দুই তিনশ টাকার মতন। সবাইতো আর দেয় না, চাইলে অনেক মাইনষে আবার দুরদুর করে। কেউ কয় মাপ করেন! আচ্ছা, বলেনতো স্যার, মানুষের কাছে চাইলে, মানুষ মাপ চায় কে? আমার মতন একজন লুলা মানুষকে দিতে পারলে দিবো, না দিতে পারলে নাই। এনো মাপ করনের কী আছে স্যার?’

অনেক বিরাট প্রশ্ন, উত্তর মেলা ভার। আমি নিজেও সময়সময় ঝটপট বলে ফেলি, মাপ করেন। আসলে কেন বলি? এখানে একজন বিকলাঙ্গ দরিদ্র মানুষের কাছে মাপ চাওয়ায় কী প্রয়োজন? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম। উত্তর পেলাম কোনও প্রয়োজন নেই।

সবার উদ্দেশে:
এসব অসহায় বিকলাঙ্গ ও প্রতিবন্ধী মানুষগুলো বাঁচতে চায়। আর বাঁচে থাকার জন্য আমাদের কাছে কিছু চাইতেই পারে। চলতে পারে না, অনেক কষ্ট করে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে কিছু চায়। কেউ দেয়, আবার অনেকেই দেয় না। অনেকে হাসিমুখে কিছু দেয়, অনেকে আবার কালামুখ করে তাদের কাছে মাপ চায়। কেউ আবার দুরদুর করে তাড়িয়েও দেয়। তা একেবারে অনুচিত বলে আমি মনে করি। তাদের আদর যদি কেউ না-ই-বা করতে পারে, অন্তত ঘৃণা না বা দুরদুর না করাই শ্রেয়। তারাও স্রষ্টার প্রেরিত সেরা জীব মানুষ। আমরাও সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। স্রষ্টার প্রেরিত সকল জীবের প্রতি সম্মান দেখানো-ই আমাদের উচিৎ। অঙ্গহীন বা বিকলাঙ্গ মানুষগুলো, সমাজ বা কারোর মাথার বোঝা নয়। কারোর ঘৃণার পাত্রও তারা কেউ নয়। তারা তাদের ভাগ্যের উপরেই ভর করে বেঁচে থাকে বা আছে। যেমন বেঁচে আছি, আমি বা আমরা নিজেরাও। সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই।