ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

 

30f75d0c8cd7cb75821eb8e9e17171a9
লোকমুখে শোনা যায়, হাতের রেখা নাকি অনেক কথা বলে দেয়। কেউ বিশ্বাসী, কেউ আবার এটাকে ধান্ধাবাজি বলেও উড়িয়ে দেয়। তবে ভারতে এই জ্যোতিষবিদ্যাকে খুব বিশ্বাস করে থাকে। আমাদের দেশেও বিশ্বাস করে, তবে ওখানকার মতো নয়। আমিও এ বিষয়ে তেমন বিশ্বাসী হতে পারছি না। তবুও অনেক ক্ষেত্রে জ্যোতিষীদের কথাগুলো হুবহু মিলে যায়। আমার হাত দেখে যেমনটা বলেছিলেন, ভারতের এক জ্যোতিষী।

আমি একবার আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে ভারত গিয়েছিলাম। যাওয়াটা ছিল হঠাৎ একজনের কথায় বিশ্বাসী হয়ে। আমার বিশ্বাস ছিল ভারত গেলেই, জীবন থেকে দারিদ্রতা মুছে ফেলতে পারব। কিন্তু না, পারিনি। আবার নিঃস্ব হয়ে আমাকে দেশের মাটিতেই ফিরে আসতে হল। তবে এই আসা যাওয়ার মাঝখানের কিছুদিন কাটিয়েছি আমার বড়দির বাড়িতে। কিছুদিন মানে প্রায় দেড় বছরের মতন। এসময়ে আমি খুব কষ্টও করেছি আমার বড়দির বাড়িতে। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে, ভাগিনাদের সাথে গাড়ির গ্যারেজে কাজ করতাম। একদিন আমি নিজেকে অসুস্থবোধ মনে করছিলাম। সেদিন আর কাজে যাইনি, বাসায় শুয়ে রইলাম।

দুপুরবেলা বড়দির বাড়িতে এক জ্যোতিষীর আগমন। দিদি খুব সমাদর করে জ্যোতিষীকে বসতে দিলেন। জ্যোতিষী বসলেন, আশেপাশের আরও অনেক মাহিলা-পুরুষ জড়ো হলেন। এক-এক করে জ্যোতিষীকে সবাই হাত দেখাচ্ছে। জ্যোতিষী হাত দেখে শোনাছেন, যার যার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতবাণী। বাড়িতে হৈচৈ শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। দেখি, বাড়ির উঠানে এক ব্রাহ্মণ বসে আছে। এমন সময় আমার বড়দিদি আমাকে দেখে বলছে, ‘তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে আয়। তোর হাতখানা জ্যোতিষীকে দেখাব।’

দিদির কথামত একটু তাড়াতাড়ি করেই হাত-মুখ ধুলাম। এরপর হাত-মুখ মুছে জ্যোতিষীর সামনে গিয়ে বসলাম। আমার সামনে আমার বড়দিদিও বসা। দিদি আমাকে বলল, ‘হাতখানা পণ্ডিতবাবুকে দেখা, দেখি তোর ভাগ্যে কী আছে। এতো কষ্ট করছিস, মনে হয় কোনও রাহুর দশা তোর উপর ভর করছে। এখন তোর হাতের রেখা দেখে পণ্ডিত বাবু সব ঠিকঠিক বলে দিবে।’

দিদির কথা শুনে আমি আমার বামহাতখানা জ্যোতিষীর সামনে সোজা করে ধরলাম। আমার বামহাত দেখে জ্যোতিষী রাগ করে বলল, ‘তুমি বামহাত দিলে কেন? ডানহাত বের করো।’ জ্যোতিষীর কথা শুনে আমি বললাম, ‘বাম হাত কার, আর ডান হাত কার?’ জ্যোতিষী ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘তর্ক কম করো। যা জাননা, তা নিয়ে তর্কযুদ্ধ করো না। পুরুষের বামহাত অলক্ষ্মী, বুঝলে? ডানহাত বের করো।’

জ্যোতিষীর কথা শুনে আমি বললাম, ‘তাহলে বাম হাতটা কেটে ফেলে দেই? এই অলক্ষ্মী বামহাত আমি আমার দেহের সাথেই রাখব না।’ আমার কথা শুনে জ্যোতিষী আমার বড়দি কে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ভাইয়ের বাড়ি কোথায়?’ দিদি উত্তর দিলেন, বাংলাদেশ। জ্যোতিষী দু’হাত মাথায় দিয়ে বলছে, তাই তো বলি! এমন কথা কে বলতে পারে? জয়বাংলার লোক বলেই এমন কথা। আমি ঝটপট জ্যোতিষীর মাথা থেকে তার বাম হাতখানা টেনে নামাতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। জ্যোতিষী তার হাতখানা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন তাই।

সেসময় জ্যোতিষীর হাত নিয়ে টানাটানি দেখে সেখানকার অনেক মানুষ হাসতে লাগল। জ্যোতিষী আমাকে বলছে, তুমি আমার হাত ধরে টানছো কেন?

আমি বললাম, আপনি কিছুক্ষণ আগে আমাকে বললেন, বাম হাত অলক্ষ্মী। এখন দেখছি আপনি নিজেই অলক্ষ্মী বামহাত আপনার মূল্যবান মাথার উপরে রাখলেন। আমি মনে করেছি, আপনি মনের ভুলেই এই ভুল করেছেন। তাই আমি আপনার মাথা থেকে বামহাতখানা সরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম। এতে আপনার অমঙ্গল হতে পারে।

আমার কথা শুনে পণ্ডিত জ্যোতিষী আর কোনও কথা বলল না। শুধু হা করে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। জ্যোতিষীর সাথে আমার এমন ব্যবহার দেখে, বড়দিদি আমার ওপর একটু রাগও করলেন। তবে জ্যোতিষী কিন্তু মোটেও রাগ করেনি। তিনি সহজ সরলভেবে আমাকে বললেন, তোমার দু’হাত একসাথে পাশাপাশি রেখে জোড়া করে দেখাও। আমি জ্যোতিষীর কথামত আমার দুইহাত একসাথে পাশাপাশি করে জোড়া করলাম। এরপর জ্যোতিষীর সামনে রাখলাম।

জ্যোতিষী আমার জোড়া করা দু’হাত ধরে টেনেটুনে কি যেন দেখলেন। অনেকক্ষণ দেখার পর আমার হাত ছেড়ে দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার দিকে জ্যোতিষীর এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার বড়দিদি একটু ভয় পেলেন। বড়দি জ্যোতিষীকে জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখলেন পণ্ডিত বাবু? দিদির কথায় জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, আপনার ভাইয়ের হাত দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার দিদির প্রশ্ন, কেন, কী হয়েছে?

জ্যোতিষী বললেন, আপনার ভাই বড় ভাগ্যবান। এতোই ভাগ্যবান যে, আমি তা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম ন। দিদি বললেন, আমার ভাইয়ের বাংলাদেশেও কষ্ট, এখানে এসেও কষ্ট। আর আপনি বলছেন ভাগ্যবান? দিদির কথায় জ্যোতিষী বললেন, হ্যাঁ আপনার ভাই শত কষ্টের মাঝেও অতি ভাগ্যবান এবং সুখী। আপনার ভাই অর্ধচন্দ্র রেখার অধিকারী।

images আমার হাতেও ঠিক এরকম ‘অর্ধচন্দ্র’ রেখা অঙ্কিত। তবে এটি আমার নিজে হাত নয়। এই ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

তার হাতের তালুতে অর্ধচন্দ্র রেখা। এখানে উপস্থিত কারোর হাতে অর্ধচন্দ্র রেখা আছে কি না? সবাই দু’হাত পাশাপাশি রেখে জোড়া করে একটু দেখে নিন। জ্যোতিষীর কথা শুনে উপস্থিত সবাই তাদের দু’হাত পাশাপাশি রেখে জোড়া করলেন। সবাই এক এক করে জ্যোতিষীকে আবার দেখাতে লাগলেন। কিন্তু না, কারোর হাতেই অর্ধচন্দ্র রেখার সঠিক কোনও মিল নেই। যাও আছে, তা আমার হাতের রেখার মতন নয়। তারপর জ্যোতিষী আমার দু’হাত পাশাপাশি রেখে, জোড়া করে সবাইকে দেখালেন। আমার হাতের রেখা দেখে উপস্থিত সবাই তখন অবাক হয়ে গেলেন।

সেদিন জ্যোতিষীর সবার উদ্দেশ্যে বলা কথাগুলো ছিল এরকম:

‘ওর দুই হাত পাশাপাশি জোড়া করলে যে অর্ধচন্দ্র তৈরি হচ্ছে, সেটি কেমন। এবার আপনাদের নিজের হাত নিজে দেখে নিন। দুই হাতের তালু পাশাপাশি রাখুন। দেখুন দুই হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের ঠিক নীচ থেকে একটি রেখা, তর্জনির দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সেই রেখাটি মধ্যমা ও তর্জনির মধ্যবর্তী জায়গায় কিছুটা উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। এবার পাশপাশি দু’টি হাতের তালু রেখে দেখুন একটি অর্ধচন্দ্র তৈরি হয়ে গেছে। যা আকাশে থাকা একটি পূর্ণ চাঁদের অর্ধেক। এটাকেই বলে সৌভাগ্যের রেখা অর্ধচন্দ্র। সকলেরই কমবেশি অর্ধচন্দ্র তৈরি হবে। কিন্তু সেটি ঠিক কেমন হয়েছে, তার উপরে নির্ভর করছে, আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আর তার সঙ্গে মিশে আছে আপনার ভাগ্য। তবে এই বাংলাদেশী লোকটার হাতের রেখাই সঠিক অর্ধচন্দ্র রেখা। তিনি সত্যি একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। শত দুঃখকষ্টের মাঝেও তিনি সুখী।’

এবার আমার কিছু দেখা ও শোনা কথায় আসা যাক। লোকে এবং জ্যোতিষীরা বলে, হাতের রেখা দেখে ভাগ্য জানা যায়। এটা ভারতের হাতের রেখা বিশ্লেষণ একটা পদ্ধতি। যা অনেক আগে আমাদের দেশেও ছিল, এখনও আছে। আগেকার সময় কারোর সন্তানাদি ভূমিষ্ঠ হবার সময়, লগ্ন, তিথি কাগজে বা ডায়রিতে লিখে রাখত। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের ২১ দিনের মাথায় বা ৩০ দিনে, জ্যোতিষীকে বাড়িতে আনতো। তখন সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার তিথি লগ্ন দেখে, জ্যোতিষী দলিলের মতো একটা কাগজ লিখে দিত। কাগজে লেখা থাকত ভূমিষ্ঠ হবার লগ্ন অনুসারে নাম, রাশি ও তার ভবিষ্যদ্বাণী। এই কাগজ বা দলিলটাকে বলা হতো করকুষ্টি। আগে আমাদের হিন্দু সমাজে এই করকুষ্টি দেখেই ছেলেমেয়েদের বিয়ে হতো।

কথিত আছে, ‘জাতে জাতে না মিললে বিয়ে হয় না।’ হ্যাঁ আগেকার সময়ে তা হতোও না। এই করকুষ্ঠি আবার জ্যোতিষী দিয়েই মেলানো হতো। করকুষ্ঠি দেখে জ্যোতিষী বলে দিত, বিয়ের পর তাদের সাংসারিক জীবন কেমন যাবে। সন্তানাদি ক’জন হবে। ছেলেমেয়ের উভয়ের জাত, রাশি, গোত্রের মিল না থাকলে আর বিয়ে হতো না। বর্তমানে এই রীতি এখন আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। তবে ভারতের কিছু কিছু ধনাঢ্য পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এই রীতি অনেকে অনুসরণ করে আবার কেউ করেও না। তবে আমারা ভাইবোন মিলে ছ’জন ছিলাম। আমাদের সকলের এই করকুষ্ঠি ছিল। এখন হাতের রেখা নিয়ে জ্যোতিষীদের কিছু কথা এখানে আলোকপাত করছি।

অনেক বছর আগের কথা। আমি একদিন নারায়ণগঞ্জ ডিআইটি মার্কেট গেয়েছিলাম। এই ডিআইটি মার্কেটের ফুটপাত থেকে একটা বই কিনেছিলাম। বইটির নাম ছিল, করকুষ্ঠি শিক্ষা। বইটি ছিল, আমাদের দুই হাতের রেখা নিয়েই লেখা। বইটিতে হাতের রেখা ও ১২ টি রাশি নিয়ে অনেক কিছুই লেখা ছিল। বইটি পুরোপুরিভাবে আমি পড়ে শেষ করতে পারিনি। এখন আর বইটি আমার কাছেও নেই। ১৯৯৮ সালের বন্যায় সব শেষ। বইটি যেটুকু পড়েছি, আমার হাতের রেখার সাথে মিলিয়েছি। বইটিতে যা লেখা ছিল, আমার ভাগ্য ও কর্ম জীবনে হুবহু মিলে গেছে। আর ভারতে বড়দি’র বাড়িতে জ্যোতিষীর কথাগুলোও আমার জীবনের সাথে হুবহু মিলে যায়।

আবার অনেক মনোবিজ্ঞানী হাতের এই রেখাগুলোকে মাতৃগর্ভের ভাঁজ বলে। তাদের মতে শিশু যখন মাতৃগর্ভে থাকে, তখন একটা ফুটবলের মতন গোলাকার হয়ে গুটিয়ে থাকে। শিশুর মাথা থাকে নিচে, আর তার পুচ্ছ থাকে উপরের দিকে। হাত ও পা থাকে, মায়ের পেটের ভেতরের দিকে। আর শিশুটির পিঠ থাকে, মায়ের সামনের দিকে। এভাবে তিনমাস পর, দিনদিন শিশুটি বেড়ে ওঠে। এর সাথে তার হাত ও পায়ের তালুতে কিছু ভাজ পড়ে। সেই ভাজকেই জ্যোতিষীরা রেখা বলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলে, এই রাখায় কোনও ভাগ্য লেখা থাকে না, ভাগ্য হলো যার যার কর্মের উপর নির্ভর করে। কর্ম আন্দাজ তার তার প্রতিফল।

কিন্তু জ্যোতিষীদের মতে, এই হাতের রেখায় বিবাহ থেকে চাকরি, ব্যবসা সবই নাকি আমাদের হাতের তালুতে লেখা। আর এই অর্ধচন্দ্র রেখাটিকে দু’ভাগ করে বলা হয়, হৃদয়-রেখা। এই দুটি হৃদয় রেখাটিকে একসাথ করলেই, দেখা যাবে একটি অর্ধচন্দ্র রেখা তৈরি হয়ে গেছে। যদি তা হয়, তবে মনে রাখবেন, আপনি অত্যন্ত কঠোর মনের মানুষ। আপনার ভাগ্য আপনি নিজেই গড়ে নেন। কর্মক্ষেত্রে আপনি সাফল্য পান। আপনার মধ্যে নেতৃত্বের গুণ আছে। থাকে কবিত্বের গুণ ও সত্যপরায়ণ ব্যক্তিত্ব। পরোপকার আপনার জীবনের সবসময়ের সঙ্গী। নিজের সিদ্ধান্তকেই প্রধান্য দিয়ে থাকেন বেশি।

তবে মনে রাখবেন, সকলের হাতেই এমন হুবহু অর্ধচন্দ্র তৈরি হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দু’টি রেখা মিলিয়ে প্রায় সরলরেখার কাছাকাছি অবস্থান নেয়। এমন যদি হয়, তাহলে তারা অর্ধচন্দ্র বা হৃদয় রেখার অধিকারী। তাঁরা খুবই হৃদয়বান হন। সহজ, সরল জীবন পছন্দ করেন। জীবন চলার মাঝে কঠিন পরিশ্রমেও পরাস্ত হয় না। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলে অপরের উপরে নির্ভর করেন।

আমিও ঠিক একইরকম স্বভাবের মানুষ। আমি পরিশ্রম ছড়া অর্থ, সুখশান্তি কিছুই বিশ্বাস করি না। কথায় আছে, ‘পরিশ্রমে ধন আনে পুণ্যে আনে সুখ, আলস্যে দরিদ্রতা আনে পাপে আনে দুখ।’ তবে যাই হোক, আমার দুইহাতের রেখা মিলিয়ে অর্ধচন্দ্র রেখা দেখা যায়। যা ভারতের দিদির বাড়িতে আসা জ্যোতিষী বলেছে অর্ধচন্দ্র রেখা। আপনার দুইহাতে এই সৌভাগ্যের প্রতীক, অর্ধচন্দ্র রেখা আছে কি? যদি থাকে, তবে সত্যি আপনি একজন অর্ধচন্দ্র রেখার জাতক-জাতিকা।

পূর্ব প্রকাশিত; জার্মা বাংলা নিউজ

নিতাই বাবু
নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ