ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত ছোট শহর নারায়ণগঞ্জের রয়েছে বিশ্বজোড়া সুনাম। এ সুনাম অর্জিত হয়েছিল এক সময়ের রাজধানী সোনারগাঁ, শীতলক্ষ্যা নদী, আর পাট ও বস্ত্রশিল্পের কারণে। কালের বিবর্তনে পাট ও বস্ত্রশিল্প কিছুটা কমে গেলেও বেড়েছে পোশাক শিল্পের পরিসর। সুনাম রয়েছে রং, সুতা ও কেমিক্যাল ব্যবসার দিক দিয়েও।

মানুষ বাড়ার সাথে সাথে কর্মসংস্থানের সন্ধানে দূর-দূরান্ত থেকে নানা সুনামের এই বন্দর শহরে বেড়েছে লোকদের আনাগোনা, সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলছে যানবাহনও। এই বাড়তি চাপের ফল হিসেবে নারায়ণগঞ্জবাসী পেয়েছে নৈমিত্তিক যানজট সমস্যা। ভোরবেলা থেকে শুরু হওয়া যানজট রাত-দুপুরেও যেন শেষ হতে চায় না। মূল সড়কগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চেষ্টায় যানজটের কবল থেকে নগরবাসী কিছুটা রক্ষা পেলেও শহরের লিংক রোডগুলোতে সবসময়ই যানজট লেগে থাকে। এসব লিংক রোডের মধ্যে অন্যতম নিউ মেট্রো সিনেমাহল টু ডেমরা ভায়া চিটাগাং রোডের যানজটের সমস্যার কথা আজ জানাবো।

যে বিষয়টি জানানোর জন্য আজকের লেখা সে বিষয়ে এর আগেও কয়েকবার লিখেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এলাকাবাসীর নিত্যদিনের কষ্ট দেখে আবারো লিখতে বাধ্য হলাম। এই সংযোগ সড়ক দিয়ে শুধু নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা-চিটাগাং রুটেই নয়, যাতায়াত হয় বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতেও। এই সড়কের মধ্যে প্রায় ২২টি বাসস্ট্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে কেবল একটি মাত্র বাসস্ট্যান্ডে ট্রাফিক ব্যবস্থা আছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল বাসস্ট্যান্ডের এই ট্রাফিক ব্যবস্থা শুধু সামনে থাকা আদমজী ইপিজেডের কারণেই হয়েছে। তা না হলে হয়তো সিদ্ধিরগঞ্জ পুলেও ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকতো না। অন্যান্য বাসস্ট্যান্ড মোড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশের একজন-দুইজন করে সদস্য থাকে। থাকলে কী হবে? তারা সবসময় থাকে তাদের নিজেদের ধান্ধায়। বড় বড় গাড়িগুলোকে একটু সাইড করে দিতে পারলেই ১০ টাকা। আর থামানো ইজি বাইক ধরে ধরে পাঁচ-দশ টাকা আদায় করাই যেন ওদের কাজ।


গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি চৌরাস্তা মোড় বাসস্ট্যান্ডের যানজট যেন যন্ত্রণার আরেক নাম। ছবিটি কয়েকদিন আগে তোলা।

এই সড়ক দিয়ে যখন এমপি-মন্ত্রী কিংবা মেয়র যাতায়াত করেন তখন এসব বাসস্ট্যান্ড আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের ভিড় লেগে যায়। অথচ অন্য সময়ে ট্রাফিক পুলিশ কেউ চোখেও দেখে না। শুধু থাকে হাতে লাঠি ধরা কমিউনিটি পুলিশের পরিচয়ধারী কিছু ‘ধান্ধাবাজ’ লোক। এমন নামধারী কমিউনিটি পুলিশ গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডেও দুইজন আছে। তবে ওদের পড়নে কমিউনিটি পুলিশের কোনো পোশাক নেই, এলাকার স্থানীয় বলে সবাই তাদের চেনে-জানে। ওরা প্রথমে হাতে মোটা লাঠি নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ায়। তারপর ‘পাওনা’ আদায়ের জন্য শুরু করে এলোপাথাড়ি লাঠির বাড়ি। দুই-এক ঘণ্টা এভাবে হৈ-চৈ করে কিছু উপরি নিয়ে তারা উধাত্ত হয়ে যায়। পকেট খালি হয়ে গেলে আবার লাঠি হাতে রাস্তায় নামে। এভাবেই চলে নারায়ণগঞ্জ টু চিটাগাং রোডের বাসস্ট্যান্ড গুলোর ‘ট্রাফিক পুলিশের’ কাজ। যার কারণে এই নারায়ণগঞ্জ টু চিটাগাং রোডে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা যানজট লেগেই থাকে। বর্তমানে এই রোডে যে যানজট, তা নারায়ণগঞ্জ মূল শহরের ভেতরেও হয় না।

নারায়ণগঞ্জ টু চিটাগাং রোডের বাসস্ট্যান্ডগুলোর মধ্যে চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ড হলো সবচেয়ে ব্যস্ততম। এই স্ট্যান্ডটি একটা জনবহুল চৌরাস্তার মোড়। এর চারদিক শতাধিক নীট গার্মেন্টস সহ রয়েছে নানা ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান। অথচ এমন একটা ব্যস্ততম বাসস্ট্যান্ড মোড়ে নেই কোনও স্থায়ি ট্রাফিক ব্যবস্থা। ভিআইপিদের যাতায়াতের সময় কেবল ট্রাফিক পুলিশের কিছু তৎপরতা দেখা যায়, কিন্তু এমনিতে লেগেই থাকে রাত-দিনের যানজট।

চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের উভয় পশে আছে শ’খানেক স্কুল। এসব স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি ছোট শিশুরা সহ সাধারণ পথচারীরা বাসস্ট্যান্ড মোড় পার হয়। রাস্তার ধারে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সুযোগ বুঝে গাড়ির ফাঁক ফোকর দিয়ে তারা রাস্তা পার হয়। অনেক সময় যানজটের হিড়িকে পড়ে অনেকে আহত-নিহত হন। তখন শুরু হয় গাড়ি ভাংচুরের তাণ্ডব, বন্ধ করে দেওয়া হয় রাস্তা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে করে লাঠিচার্জ। হয় মামলা, শুরু হয় ধরপাকড়। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধানে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না।


তীব্র যানজটের এই ছবিটি গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি মোড় থেকে তোলা

এই যানজট সমস্যা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। নিজেও মাননীয় মেয়রের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছিলাম। দাবি জানিয়েছিলাম চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে স্থায়ীভাবে একটা ট্রাফিক ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। এ নিয়ে দেশের নাগরিক সাংবাদিকতার স্বনামধন্য প্লাটফর্ম ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও লেখালেখি করেছি। কিন্তু দুঃখ শুধু থেকেই গেল। গত দুই-তিন বছর ধরে এত লেখালেখি করেও চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে স্থায়ীভাবে একজন ট্রাফিক পুলিশ চোখে দেখলাম না।

বর্তমানে এতই যানজটের সৃষ্টি হয় যে, দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে কমবেশি দশ ঘণ্টাই যানজট লেগে থাকে। সন্ধ্যার পরের কথা তো বাদই দিলাম। যানজটের কারণে এই এলাকা ও আশপাশের অন্যান্য সংযোগ রাস্তাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। চিত্তরঞ্জন গুদারা ঘাট থেকে একজন রিকশাওয়ালাকে কোনও যাত্রী যদি বলে, তাঁতখানা যাবো। তখন রিকশাওয়ালা দুই হাত জোড় করে তিনবার মাফ চেয়ে নেয়। কারণ শুধু একটাই, সেটা হলো চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের যানজট। মেইন রোডের এপার থেকে ওপারে আসা-যাওয়া একরকম বন্ধই থাকে।

চৌধুরীবাড়ি এলাকাটি নারায়ণগঞ্জের ছোটখাটো একটা শহরের মতন। জনসংখ্যার দিক দিয়েও শহরের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। এই জনবহুল এলাকার প্রধান চৌরাস্তার মোড় চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ড। এই বাসস্ট্যান্ড দিয়েই দৈনিক হাজার হাজার মানুষ রাস্তা পার হয়। নারী-পুরুষ সহ স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি শিশুরাও গাড়ির ফাঁক ফোকর দিয়ে যাতায়াত করে। এভাবে চলাফেরার কারণে যেকোন সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই বলেই এখানে ড্রাইভাররা খামখেয়ালিভাবে গাড়ি চালায়। ফলে যখন-তখন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। যানজটের কারণে এলাকার ব্যবসায়ীরাও পড়ে বিপদে।

এই নিত্যদিনের তীব্র যানজটের মূল কারণ হচ্ছে স্থায়ীভাবে কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকা। এই মহা যানজটের কবল থেকে চৌধুরীবাড়ি এলাকাবাসী কবে রেহাই পাবে তা কারোর জানা নেই। তবে দীর্ঘদিনের এই বেহাল দশায় এলাকার জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। মানুষের মনের ভেতরে জমানো ক্ষোভ হয়তো একদিন বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে। সেদিন হয়তো বেশি একটা দূরে নয়! তাই দাবি উঠেছে স্থায়ীভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থার। আর এই দাবি আদায়ে এলাকাবাসী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এলাকাবাসীর এই দাবি পূরণ না হলে যেকোন সময় ঘটে যেতে পারে গাড়ি ভাংচুর সহ অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোন ভয়াবহ ঘটনা। তখন সামলাবে কে? স্থানীয় প্রশাসনই কেবল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।