ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 
p20180103-184149

মহল্লার একটি প্রাইমারি স্কুলের সামনে, ঘুগনিপুরি বিক্রেতা, নূর হোসেন মিয়া। ছবি সংগ্রহ: নিতাই বাবু।

একসময় স্কুলে যাবার সময় মায়ের কাছে দুই আনা প্যসার জন্য কাঁদতাম। কোনদিন পেতাম, আবার কোনদিন পেতাম না। তখন টাকাপয়সার খুবই মূল্য ছিল। যার কাছে হাজার টাকা ছিল, লোকে তাকে হাজারি বলত। এখন অনেক হাজারি, আর কোটি টাকার মালিকও আমাদের দেশে আছে। তাদের লোকে বলে কোটিপতি বা শিল্পপতি। ছোটবেলায় বাবার সাথে বাজারে গেলে, চার আনার তক্তি বিস্কুট কিনে দিতো। যতক্ষণ বাজারে থাকতাম ইচ্ছেমত খেতাম। আসার সময়ও কিছুপরিমাণ বাসায় নিয়ে আসতাম। সেগুলো বড়দিদিদের দিতাম, তারা খেতো। সিনেমা দেখতে গেলে, চটপটি বেশি খেতাম। সিনেমাহলের সিটে বসে বাদাম চিবাইতে ভারি মজা লাগত। আর রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে জ্বালমুড়ি, চানাচুর, বাদাম, বুট ভাজা।

বিকালবেলার অবসরে হোটেলে গিয়ে পুরি সিঙ্গারা আর পেঁয়াজু। শীতের দিনে সকালবিকাল বাজারে, রাস্তার পাশে চিত্তা পিঠারতো জুরিই ছিল না। এসব ফেরিওয়ালাদের বিক্রি করা খাবার, অনেকেই শখ করে খেয়ে থাকে। আর শহরের আনাচেকানাচের ফুটপাতের খাবারদাবার সবার কাছেই পরিচিত। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন ব্যস্ততম শহরে সবসময় আনাগোনা করে, তাদের কাছে। কিন্তু_কেউ কী কখনো ঘুগনিপুরি খেয়ে দেখেছেন? পুরি বলতে আমরা সকলেই জানি, ডালপুরি, আলুপুরি, কিমাপুরি। যেগুলো বিক্রি হয়, ছোটখাটো হোটেলগূলোতে। শহরের রাস্তার দ্বারে, গ্রামের হাট-বাজারের হোটেলে। এই ঘুগনিপুরি ছোটবেলায় আগে কখনো দেখিনি। কোনওসময় খেয়েও দেখিনি। আগেকার সময় আজকালকার হরেকরকম খাবারের নামগন্ধও ছিল না।

আগেকার সেই সময় এখন আর নেই। এখন ডিজিটাল যুগ, সবকিছুই অত্যাধুনিক। মানুষের বেঁচে থাকার ধান্ধাও ডিজিটাল পদ্ধতি। চুরি করার ধান্ধাও ডিজিটাল। হাইজ্যাক, ডাকাতি, ছিনতাই, পকেটমার সবই ডিজিটাল। কম্পিউটারের মাধ্যমে নাকি, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকাও গায়েব করে ফেলা হয়। মোট কথা আমাদের দেশটাইতো এখন ডিজিটাল। পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্যও মানুষ শুরু করে দিয়েছে ডিজিটাল চেষ্টা। ক্ষুধার্ত মানুষেও ডিজিটাল বেশে ক্ষুধা নিবারণর করছে। রাস্তার দ্বারে ফুটপাতে একটা চটপটির দোকানের সামনে দেখা যায়, সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে অর্ধশত চেয়ার। এক প্লেট চটপটির মূল্য ২৫ থেকে ৩০ টাকা। ফেরিওয়ালারাও থেনে নেই, ডিজিটালি চেষ্টায়। তারাও ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করে, সুন্দরভাবে জীবিকা সংগ্রহ করছে।

এসব চেষ্টায় কেউ সফল হয়, আবার কেউ হেরে যায়। তবে সবাই কিন্তু জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয় না। কোনও না কোনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। ওইসব জীবন যোদ্ধাদের মধ্যে একজনের সাথে আজ সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিব। তার আগে আমাদের চারপাশের খাবারদাবার নিয়ে একটু বকবক করে নিই।

বর্তমানে আমাদের আশেপাশে, হাট-বাজারে, যেখানে-সেখানে অনেক খাবারের দোকান দেখা যায়। এরমধ্যে আছে চা-দোকান, ফাস্টফুড, চাইনিজ রেস্তোরা ও বড়বড় হোটেল। চায়ের দোকানে, চা-বিস্কুট, পাউরুটি, পাকা কলা-সহ অনেক ধরনের খাবার থাকে। যা এখন দেশের বিস্তীর্ণ জনশূন্য এলাকাতেও দেখা যায়। এমনকি দুর্গম পাহাড়ি এলাকাতেও। এই স্বাদের চা এখন মানুষের জন্য দস্তুরমত কবিরাজি মহৌষধ বলা যায়। যেই চা একসময় মাগনা জোরপূর্বক মানুষের হাতে ধরিয়ে দিতো। সেই বিনা মূল্যের চা এখন প্রতি কাপ ৫/১০ টাকা। তবু মানুষকে চা পান করতেই হচ্ছে। এখন চা ছাড়া মানুষের ভদ্রতা প্রকাশ পায় না। হঠাৎ করে কারো সাথে দেখা হলেই, আগে চায়ের সমাদর, পরে অন্যকিছু।

আবার এই ইংরেজি নামের ফাস্টফুড খাবারটা আগে ছিল না। যখন ছোট ছিলাম, তখন এই ইংরেজি খাবারের নামও শুনিনি। এই যুগে এই খাবারটার এখন রমরমা ব্যবসা। স্কুলজীবনে চাইনিজ রেস্তোরার নাম শুনেছি, কিন্তু কখনও রেস্তোরায় যাইনি বা খেয়েও দেখিনি। তখন মাত্র একটা চাইনিজ রেস্তোরা ছিল, পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরে। আর এখন এই চাইনিজ রেস্তোরার অভাব নেই। যা এখন শহর চেড়ে গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলোতেও দেখা যায়। এরসাথে আছে বড়বড় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেল। এসব হোটেলগুলোতে সবচে রমরমা ব্যবসা হলো, মুরগি-গ্রিল, নানরুটি, হালিম ও চিক-কাবাব, বিরিয়ানি, ভুনাখিচুড়ি। এই গ্রিল কোনও বাড়ির জানালার লোহার তৈরি গ্রিল নয়। এই গ্রিল হলো, আস্তা মুরগি মসলা মেখে আগুনে পোড়া গ্রিল। যা আগে কখনও এর নাম শুনিনি। এখন মানুষ তা অহরহ চিবিয়ে খাচ্ছে।

একদিন একবার খেয়েও দেখেছি, এই স্বাদের গ্রিল। এর স্বাদ বলতে আমি তেমন কিছুই পাইনি। তবে যখন এই গ্রিল চিবুচ্ছিলাম, তখন আর গলা দিয়ে যাছিল না। অনেক কষ্টে হাফ গ্রিল উদরে ঢুকিয়েছিলাম। তবে কে খেতে পারে আর কে পারে না, তা কারোর দেখার প্রয়োজন নেই। দুএকজনের জন্য-তো-আর এসব থেমে থাকে না। প্রতিদিন হোটেলগুলোতে সকাল থেকে অর্ধরাত্র পর্যন্ত, মানুষের আনাগোনা থাকেই। উপরিল্লিখিত খাবারদাবার নিয়ে যা আলাপ করলাম, তা বেশিদামের খাবার। এসব নিয়ে বিস্তারিত আলাপসালাপ না করাই ভালো। কেননা, এসব নামীদামী খাবারের হোটেলে গরিবদের বেশি একটা যাওয়া হয় না। কাজেই এসব হোটেল রেস্তোরায় যারা যায়, তাদেরি এসব নিয়ে আলোচনা করা মানায়। আলোচনা করবো, ফুটপাতের খাবার নিয়ে।
p20180104-220126

নূর হোসেন মিয়ার তৈরিকৃত সুস্বাদু ঘুগনিপুরি।

তাই আজকে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো একপ্রকার সুস্বাদু খাবারের সাথে। যা আপনারাও অবসর সময়ে ঘরে বসে তৈরি করে নিতে পারবেন। খাবারের নাম, ঘুগনিপুরি। মানে হলো, ডালপুরি, আলুপুরির মতন একপ্রকার সুস্বাদু পুরি। এই ঘুগনিপুরি আবার কোনও হোটেলে পাওয়া যায় না। এ-প্রকার পুরি শহরে বা শহরের পাড়া-মহল্লার আনাচেকানাচে পাওয়া যায়। এগুলো বিক্রি করে থাকে, ফেরিওয়ালারা। যেসব ফেরিওয়ালারা জ্বালমুড়ি, চটপটি, বুট-বাদাম বিক্রি করে, তারাই এগুলো ঘুরেঘুরে বিক্রি করে। এগুলো হুবহু ডালপুরি, আর আলুপুরির মতো দেখতে। পুরিগুলোর ভেতরে থাকে চটপটি তৈরির মটর সেদ্ধ। সাথে থাকে ঘুগনির গুড়া মসলা ও কিছু শসা কুচি, আর পেয়াজ কুচি।

সেদিন হঠাৎ করে একটা স্কুলের সামনে, এক ঘুগনিপুরিওয়ালার সাথে দেখা। তার নাম, মোহাম্মদ নূর হোসেন মিয়া। থাকেন, নারায়ণগঞ্জ হাজীগঞ্জ এলাকায়। তিনি কোনোএক সময়, চাকরি করতেন। সীমিত বেতন দিয়ে ঠিকমত সংসারের চাহিদা পূরণ করতে পারছিলেন না। বহুবার চাকরি নিয়েছেন, বহুবার চাকরি ছেড়েছেন। উপর পদস্থ কর্মকর্তাদের বকুনিঝকুনি তার বেশি ভালো লাগত না। তাই এক জায়গায় চাকরিও বেশিদিন করতে পারতো না। চাকরি না থাকলে নেমে যেত জ্বালমড়ি নিয়ে। নয়-তো-বা ঘুগনি, নাহয় চটপটির ঠেলাগাড়ি। এখন তিনি নিয়মিত বিক্রি করছেন ঘুগনিপুরি। একটা পুরির দাম মাত্র, পাঁচ টাকা। প্রতিদিন হাতে গোনা দুইশ পুরি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। সময়মত একটা স্কুলের সামনে দাঁড়ালেই, তার ঘুগনিপুরি শেষ। সেদিন স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের খেতে দেখে, নিজেও দুইটা নিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘জ্বাল খাবেন?’
_জ্বাল ছড়া হলে ভালো হয়।’
আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘টক খাবেন?’
_টক দিলে যদি ভালো হয়, তো দিন।
নূর হোসেন মিয়া সুন্দর করে দুটো পুরি তৈরি করে হাতে দিলেন। তিন আঙুলে চিবি দিয়ে ধরে, একটা পুরি মুখে দিলাম। আঃ কী মজা! দাঁত দিয়ে চুবুনি দিতেই, মচমচ কচকচ শব্দ। সাথে মসলা দেওয়া ঘুগনি মেশানো। আর শসা কুচির সালাত।
সত্যি একপ্রকার সুস্বাদু খাবার। ঠিকমত দুইটা পুরি খেতে পাড়লেই, দুপুরের খাবারের প্রয়োজন শেষ। বড়সড় একটা গামলায় ঘুগনি আর পুরি সাজানো। দেখতেও খুব সুন্দর। পলিথিন কাগজ দিয়ে সবসময় ঢাকা থাকে। রাস্তার ধুলাবালি খাবারে পড়ে না। বলতে গেলে একেবারে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার।
p20180103-184109

ঘুগনিপুরি ঢালায় করে সাজিয়ে কাস্টমারের আশায়। দাঁড়িয়ে আছে, নূর হোসেন মিয়া।

নূর হোসেন মিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, এই পুরি বিক্রি করে আপনার সংসার ঠিকমত চলে কি না? বললেন, ‘হ্যা খুব চলে। খেয়েদেয়ে খুব ভালো আছি।’
_আগে কী করতেন?
_’চাকরি করতাম। মালিকদের আচারব্যবহার বেশি ভালো লাগতো না। তাই আর চাকরি ভালো লাগে না। এখন এই ঘুগনিপুরি বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছি।’
_প্রতিদিন কয়টা পুরি বিক্রি করতে পারেন?
_’আমার টার্গেট হলো দুইশ।’
_সব বিক্রি হয়তো?
_’হ্যা, হয়!, আরও শর্ট পড়ে যায়।’
-পুরিগুলো কি বাইরে থেকে কিনে নেন?
_’না, আমি নিজেই তৈরি করি।’
-আপনার সংসারে খানাওয়ালা ক’জন?
_’এক ছেলে, এক মেয়ে।’
_লেখাপড়া করে?
_’হ্যা, করে।’
_এই ঘুগনিপুরি কীভাবে তৈরি করে থাকেন, একটু বলবেন?
_’অবশ্যই বলবো।’
নূর হোসেন মিয়া বলে দিলেন, কীভাবে ঘুগনিপুরি তৈরি করে এবং এর সাথে কী কী দিতে হয়।

এখন এই ঘুগনিপুরি তৈরি করার একটা পদ্ধতি সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি। আধা কেজি আস্ত মটর, রাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন। সকাল ১০টায় পানি থেকে ভেজানো মটরগুলো থেকে পানি সরান। এরপর সেদ্ধ করারমত পানি দিয়ে, ভালো করে সেদ্ধ করে নিন। একেবারে নরম হয়ে গেলে, সেগুলো চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন। এর আগে আপনাকে কিছু মসলা শিলপাটায় বেটে ফাকি করে নিতে হবে। মসলাগুলো হলো, জিরা, ধনিয়া, গোলমরিচ, দু’একটা এলাচি দানা ভালো করে ভেজে, ফাকি করে নিন। এবার মটর সেদ্ধগুলো একটু আলতো আলতা করে হাতে মোছলে নিন। মসলার ফাকিগুলো মোছলানো সেদ্ধ মটরের সাথে মেশান। সাথে কিছু কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ কুচি মেখে নিন। সাথে ধনিয়া পাতস কুচি হলে আরও ভালো হবে। ব্যস হয়ে গেল আপনার ঘুগনি তৈরি।

এবার প্রয়োজন আলুপুরি বা ডালপুরি। তা পাবেন কোথায়? বর্তমানে শহরের আনাচেকানাচে হোটেল বা রেস্তোরায়, এই আলুপুরি বা ডালপুরি পাওয়া যায়। সেখান থেকে প্রয়োজনমত মাঝারি সাইজের কিছু আলুপুরি অথবা ডালপুরি কিনে আনুন। নাহয় হাফ কেজি ময়দা গুলে নিজেই পুরি তৈরি করে নিতে পারেন। এবার পুরিগুলো মাঝখানে চাকু দিয়ে অর্ধেক কেটে ফেলুন। এরপর পুরিগূলোর ভেতরে তৈরি করা ঘুগনি ভরে দিন। এবার সবার মাঝে পরিবেশন করুন। একবার খেলে বারবার খেতে মন চাইবে। নিজেও খেতে থাকুন অপরকেও তৈরি করা শেখান, নূর হোসেন মিয়ার সুস্বাদু ঘুগনিপুরি।

প্রথম প্রকাশ: জার্মান বাংলা নিউজ