ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 
p20180114-011416

ছবির পালকির ছবিটি আমাদের চৌধুরী বাড়ি বন্ধু সিনেমাহলের সামনে একটা ভ্যানগাড়ি উপরে বসানো ছিল। হয়তো কারোর বিয়ের অনুষ্ঠানে বর ও নববধূকে বহন করার জন্য, ঢাকা লালবাগ থেকে বেহারা সহ এই পালকি আনা হয়েছিল। বহুবছর পর এই ঐতিহ্যবাহী পালকি চোখে পড়লো। তাই নিজের মোবাইল দিয়ে ছবিটি তুললাম।

পালকি এক ধরনের বিলাসবহুল যানবাহন। যা রাজা বাদশাহ আর জমিদারদের পারিবারিক যানবাহন হিসেবে পরিচিত। চাকাবিহীন যানবাহনটির নাম, ‘পালকি।’ পালকি মানুষের শক্তি প্রয়োগে অর্থাৎ কয়েকজন ব্যক্তি পালকিকে ঝুলন্ত অবস্থায় বহন করে নিয়ে যায়। আগেকার দিনে এই যানবাহনটি ধনীব্যক্তি ও রাজা বাদশাহদের স্ত্রী কন্যাদের বহন করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এই পালকি দিয়েই বহন করে নেওয়া হতো। রাজবাড়ির রাজকন্যা বা রাজপরিবারের কারোর বিয়ে সাদি হলে, এই চাকাবিহীন যানবাহন পালকির দরকার হতো সবার আগে।

জানা যায়, ‘আগেকার রাজা বাদশাহ আর জমিদারদের সময়ে, এই পালকি সাধারণ মানুষে ব্যবহার করতে পারতো না। যদি কেউ এই পালকি ব্যবহার করার ইচ্ছে পোষণ করতো, তাহলে তাকে ওই মুল্লুকের রাজা কিম্বা জমিদারদের অত্যাচার সইতে হতো। কারণ, এই ঐতিহ্যবাহী চাকাবিহীন যানবাহনটি শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। তাদের ব্যতীত অন্য কেউ এই পালকি ব্যবহার করতে পারতো না। প্রত্যেক জমিদার, রাজা মহারাজাদের রাজ মুল্লুকে তাদের নিজস্ব পালকি বাহনটি থাকত। রাজা জমিদারদের কর্মচারী, চাকর চাকরানির মতন, বেতনভোগী পালকি বহনকারী লোকও থাকতো। তাদের কাজই ছিল, শুধু রাজা মহারাজা আর জমিদারদের পারিবারিক সদস্যদের বহন করা।’

আরও জানা যায়, ‘এই পালকি নাকি দেবদেবীদের বহনকারী বাহনও ছিল।’ তাই ভারতের পুরানো বিভিন্ন মন্দিরের আস্তরে, এখনো এই পালকি অঙ্কিত রয়েছে। মন্দিরের দেয়ালে সেই অঙ্কিত চিত্র মন্দিরগুলোর সামনে গেলেই দেখা যায়। আবার আগেকার সময়ে যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ উপভোগ করার জন্য, রাজপরিবারের মহিলারা এই পাকলি চড়েই যুদ্ধের ময়দানের সামনে যেত। পালকিতে বসে বসেই তাদের এবং বিরোধী সৈন্যদলের লড়ায়ের দৃশ্য উপভোগ করতো।

পালকি এর ইংরেজি নাম: Palanquin, Litter. এই পালকি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামেও পরিচিত। যেমন: ভিয়েতনামে কিউ, ইংল্যান্ডে সিড্যান চেয়ার, স্পেনে লিটারা, ফ্রান্সে পালানকুইন, পর্তুগালে লিটেইরা, রোমে লেটিকা, চীনে জিয়াও, থাইল্যান্ডে ওহ, কোরিয়ায় গামা, জাপানে নোরিমোনো, তুরস্কে টাহটিরেভান ইত্যাদি নামে পালকি পরিচিত হয়ে আসছে। একসময় রাজা বাদশাহদের রাজত্ব আর তাদের বাহাদুরি শেষ হয়ে যায়। তখন এই ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের মঝে এই পালকির প্রচলন শুরু এবং স্থায়ী হয়। পালকির সেই প্রচলন অনেক অনেক বছর পর্যন্ত এদেশের গ্রামবাংলার মানুষের সমাজে স্থায়ী ছিল। আর এই চাকাবিহীন পালকি নিয়ে আমাদের দেশের অনেক কবিগণ ছড়া কবিতাও লিখে গেছেন। যা এখনো ছোটেদের পাঠ্যবইতে ওইসব ছড়া কবিতাগুলো প্রচলিত আছে।

আমার মায়ের মুখে শোনা কথা। মা বলেছেন, ‘আমার বাবার বাড়ি থেকে এই পালকি করেই, আমাকে এই বাড়িতে আনা হয়েছিল।’ আমার বড়দি’র বিয়ের সময়ও নাকি এই পালকি দিয়ে জামাইবাবুদের বাড়ি নেওয়া হয়েছিল। আমাদের গ্রামের ঠাকুরবাড়িতেও দেখেছি, এই পালকি। ওই ঠাকুররা ছিল আমাদের গ্রামের প্রতাপশালী বড়লোক। তাদের ছিল, অনেক অনেক জমিজমা, আর ব্যবসা। এদেশে যেমন ছিল, ভারতেও তাদের প্রচুর ছিল। তাদের ছিল নিজস্ব চাকরবাকর, নিজস্ব পাকলি বহন করার লোক। যারা এই পালকি বহন করতো, লোকে তাদের বেহারা বলে ডাকতো। তাদের পেশাই ছিল এই পালকি বহন করা। ওইসব দৃশ্য এখন দেখা যায়, ভারতী কিছু তামিল ছায়াছবিতে।

পালকি নিয়ে আমাদের দেশেও একটা ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল। ছায়াছবিটির নাম ছিল, ‘বিনি সুতার মালা।’ পরিচালক ছিলেন, ফখরুল হাসান বৈরাগী। নায়কের অভিনয়ে ছিলেন, ওয়াসিম। নায়িকা ছিলেন, রোজিনা। আরও ছিলেন, খলিলুর রহমান ও রোজিসামাদ। ছায়াছবিটি নির্মিত হয়েছিল, ১৯৮৪/৮৫ খ্রিস্টাব্দ সময়ে। ছায়াছবিতে দেখা যায়, ওয়াসিমের পরিবারবর্গ থাকে পালকি বহনকারী। গ্রামের কোরোর বাড়িতে বিয়ে সাদি হলেই, ডাক পড়ে ওয়াসিমের বড়ভাই খলিলুর রহমানের। খলিলুর রহমান তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে, ঐ বিয়ে বাড়ির নববধূকে তার স্বামীর বাড়ি পৌঁছে দিতো। বিনিময়ে পেত দুবেলা খাবার, আর সামান্য কিছু টাকা। এই দিয়েই চলতো খলিলুর রহমানের অভাবের সংসার। খলিলুর রহমান প্রতিদিন পালকি নিয়ে বাজারে বসে থাকতো, কাজের আশায়। কোনদিন বরযাত্রী পেতো, আবার কোনদিন পেতো না।

এখনকার দিনে শহরের অলিগলিতে সকালবেলা যেভাবে রাজ যোগালি, কাঠমিস্ত্রি, রাস্তা নির্মাণ শ্রমিকরা কাজের আশায় বসে থাকে, ঠিক তেমন করে আগেকার দিনে এই পালকি বহনকারী লোকেরা লাইন ধরে বসে থাকতো। যার পালকি দরকার হতো, সে তাদের বায়না করে নিয়ে যেতো। আবার কারোর বাড়ির বিয়ে সাদির কথা পাকাপাকি হলেই, এই পালকি অগ্রিম বায়না করে রাখা হতো। তাদের কাজ হলো, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পালকিতে করে নববধূকে স্বামীর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। সকালে দুপুরে বিয়েবাড়িতে চলতো তাদের দুবেলা খাওয়াদাওয়া। আর কিছু টাকাপয়সা।

কোনো এক সময় দেখা যেতো, গ্রামাঞ্চলের একজন কৃষকের মেয়ের বিয়েতেও পালকি ব্যবহার করা হতো। তখনকার দিনে এই পালকির উপরেই, অনেকের আয়রোজগারের একমাত্র পথ ছিল। তাদের পেশাই ছিল এই পালকি বহন করা। এই বহনকারীদের একটা নামও ছিল। তাদের বলা হতো বেহারা। একসময়ে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে স্টিমার ও রেলগাড়ি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পালকির ব্যবহার কমতে শুরু হয়। থেকে যায় শুধু যেকোনো পারিবারিক বিয়ে সাদির অনুষ্ঠানে এই পালকির প্রচলন। যুগে যুগে ক্রমশ সড়ক ব্যবস্থার উন্নতি হতে থাকে। বাড়তে থাকে বেবিট্যাক্সি, ট্যাক্সি, বাস, রিকশার মতন নানারকম ছোটবড় যানবাহন।

এসব ছোটবড় যানবাহন বাড়ার সাথে সাথে, দিনদিন পালকির মতন, পশুচালিত যানবাহনগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। যেমন, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, মহিষের গাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। আধুনিককালে পালকির ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবুও সীমিত আকারে ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহ অনুষ্ঠান, জন্মদিন, তীর্থযাত্রা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে শখের বশবর্তী হয়ে, এই পালকি ব্যবহার করতে দেখা যায়। আমাদের দেশেও এই আধুনিককালে আগেকার পালকির অদলে লোহার রড ও এঙ্গেল দিয়ে তৈরি, হুবহু পালকির মতন মাঝেমধ্যে দেখা যায়। এগুলো দিয়ে মানুষে বিয়ে সাদি অনুষ্ঠানে রাজা বাদশাহদের মতন মনের স্বাদ মেটায়। যেমন, ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো।’ আবার কথায় আছে, “শখের তোলা আশি টাকা।” তাই কেউ কেউ ঘোড়ার গাড়িও নিয়ে আসে, ঢাকা থেকে। দিন যাচ্ছে, মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে রাস্তাঘাট, বাড়ছে যানবাহন। যুগের সাথে তালমিলিয়ে সবকিছুই হচ্ছে আধুনিক। হারিয়ে যাচ্ছে, পুরানো সবকিছু। ঐতিহ্যবাহী এই চাকাবিহীন যানবাহন পালকিও কোনোএকদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে মনে হয়।